সাধারন গর্ভধারনের সময়কাল ৯ মাস বা ৪০ সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে বা শেষে সচরাচর প্রাকৃতিক ভাবে প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার কথা। যদি কোন কারনে না হয়ে থাকে, বা কোন চিকিৎসাগত কারন (Medical Reason) থাকে, তবে ওষুধের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে প্রসব বেদনা শুরু করার ব্যবস্থা করা হয়, এই প্রক্রিয়াকে ইন্ডাকশন (Induction) বলে।

কখন ইন্ডাকশন দরকার?

সাধারনত কোন নির্দিষ্ট কারন ছাড়া ইন্ডাকশনের প্রয়োজন হয় না। তবে ডাক্তার যদি স্বাভাবিক প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার জন্য বেশী সময় অপেক্ষা করাকে (মায়ের স্বাস্থ্যগত কারন বা ডিউ ডেটের পরও আরো দুই এক সপ্তাহ বেশী হয়ে যাওয়া) ঝুঁকিপূর্ন মনে করেন, তবে ইন্ডাকশন’র জন্য পরামর্শ দিতে পারেন। যে সব কারনে চিকিৎসক ইন্ডাশনের পরামর্শ দেন-

  • যদি পানি ভেঙ্গে(Water break) হয়ে যায় কিন্তু ব্যাথা শুরু না হয়। বাচ্চার স্বাস্থ্যগত ব্যাপার চিন্তা করে ইন্ডাকশন করতে পারেন।
  • যদি ডেলিভারীর নির্ধারিত সময়ের আগেই পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা যায় প্লাসেন্টা ঠিকমতো কাজ করছে না বা আমনিয়োটিক ফ্লুইডের পরিমান কম।
  • যদি মায়ের কোন ক্রনিক অসুখ থেকে থাকে, যেটা মা এবং বাচ্চা দুইজনের জন্য ক্ষতির কারন হতে পারে, যেমন- গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনীর অসুখ।
  • প্রি-এক্লেমশিয়া থাকলে।
  • ইউটেরাসে ইনফেকশন থাকলে।
  • গর্ভকালীন সময়ে বাচ্চার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেলে।
  • যদি মায়ের আগের প্রেগন্যান্সীতে কোন বাচ্চা হতে যেয়ে বা হওয়ার পরপর মারা যাওয়ায় অভিজ্ঞতা থাকে।
  • ডেলিভারীর নির্ধারিত সময়ের পরও এক-দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলে।
  • যদি সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিগত কারনে কোন মা গর্ভধারনের ৩৯ সপ্তাহের পর নিজেই প্রসব ত্বরান্বিত করতে চান।

ডাক্তার যদি মনে করেন ইন্ডাকশনের দরকার আছে এবং আপনাকে জানান, তাহলে আগেই ডাক্তারের কাছ থেকে সুবিধা-অসুবিধা জেনে নিন। কিভাবে ইনডিউস (Induce) করবেন, কখন হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে এসব তথ্য জানুন।

যেভাবে ইনডিউস করা হয়

প্রসব তরান্বিত করার বেশ কিছু উপায় আছে। ডাক্তার যে কোনটি অনুসরন করতে পারেন। একবার প্রসব বেদনা শুরু হলে, নিজেই অগ্রসর হতে থাকে। তবে কখনো কখনো লম্বা সময়ও লেগে যেতে পারে। সাধারনত যে উপায়গুলো ইন্ডাকশনের জন্য ব্যবহার হয়-

  • অনেক সময় ডাক্তারের ভিজিটের সময়, ডাক্তার গ্লাভস সহ আঙ্গুল জরায়ুর মুখে ঢুকিয়ে আমনিয়োটিক স্যাক জরায়ুর দেয়াল থেকে আলাদা করে দিতে পারেন। এটা প্রসব ত্বরান্বিত করতে পারে।
  • ডাক্তার স্যালাইনের সাথে অক্সিটসিন নামক হরমোন দিতে পারেন, যা প্রসব ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে কন্ট্রাকশন এবং বাচ্চার হার্ট বিট ক্রমাগত পর্যবেক্ষন করা হয়।
  • সিনথেটিক প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিস মুখে বা যোনিপথে দেয়া হয়, যা জরায়ুর মুখ খুলতে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে বেলুন সদৃশ ক্যাথেটার বা সি-উইড দিয়ে তৈরী রড ব্যবহার করা হয়।
  • আমনিওটমি বা মেম্ব্রেন র‍্যাপচার করতে পারেন ডাক্তার। যাতে সরু একটা প্লাসিক হুক দিয়ে আমনিওটিক স্যাক থেকে পানি বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে পানি ভেঙ্গে দিলে প্রসব বেদনা শুরু হতে পারে।

ইন্ডাকশনের সাথে জড়িত ঝুঁকি

কৃত্রিম ভাবে প্রসব বেদনা শুরুর এই প্রক্রিয়াতে কিছু ঝুঁকি জড়িত থাকে। যেমন এ থেকে কখনো কখনো বাচ্চা এবং মা- দুইজনেরই ইনফেকশন হতে পারে। ইন্ডিউস করার পরও যদি সার্ভিক্স নরম ও ডাইলিউট না হয়, তখন সি-সেকশন বা অপারেশনের দরকার হতে পারে।

ইন্ডাকশনে যে ধরনের ওষুধ ব্যবহার হয়, তাতে কন্ট্রাকশনের পরিমান অনেক বেশী হতে পারে যাতে বাচ্চার অক্সিজেনের সাপ্লাই কমে যেতে পারে এবং হার্ট বিট বেড়ে যেতে পারে। বেশী আগে ইন্ডিউস করা হলে, বাচ্চা প্রি-ম্যাচিউর হতে পারে এবং বাচ্চার শ্বাস নিতে সমস্যা হতে পারে। আম্বিলিকাল কর্ড প্রলেপস ( ডেলিভারীর আগে কর্ড বের হয়ে আসা) হতে পারে। ইউটেরিন র‍্যাপচারের কারনে অকস্মাৎ সি-সেকশনের দরকার হতে পারে। জরায়ুর পেশীর সংকোচন ঠিকমতো না হলে, ডেলিভারীর পর রক্তপাতের পরিমান বেশী হতে পারে।

কাদের জন্য ইনডাকশন প্রযোজ্য নয়?

  • আগে সিজারিয়ান অথবা জরায়ুতে বড় ধরনের সার্জারি হয়ে থাকলে।
  • প্লাসেন্টা প্রিভিয়া থাকলে।
  • বাচ্চা জরায়ুতে আড়াআড়িভাবে থাকলে।
  • প্রজননতন্ত্রে গুরুতর হার্পিস ইনফেকশন থাকলে।
  • বার্থ ক্যানেল যদি খুব সরু থাকে যা স্বাভাবিক বাচ্চার জন্মদানে ব্যাঘাত ঘটায়।

ইন্ডাকশনে যেহেতু মা এবং গর্ভস্থ শিশুর নিবিড় পর্যবেক্ষনের প্রয়োজন, তাই এটা হাসপাতালেই করা হয়। তবে প্রক্রিয়া আরো আগেই শুরু করা যায় (ডাক্তারের ভিজিটের সময় আমনিওটিক মেমব্রেন সুইপ)। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক উপায়ে প্রসব শুরুর ব্যবস্থা করা হলে, নরমাল ডেলিভারী সম্ভব। তবে ইন্ডাকশনের পর স্বাভাবিক প্রসব না হলে যেহেতু সিজারিয়ানের ঝুঁকি আছে, তাই তারও মানসিক প্রস্তুতি দরকার।

কৃতজ্ঞতাঃ মায়োক্লিনিক