পায়ের গোড়ালি থেকে আঙুল পর্যন্ত সংযোগস্থাপনকারী টিস্যুগুলোকে বলে প্লান্টার ফ্যাসিয়া। পায়ের পাতার নিচে অবস্থিত এই টিস্যুগুলো যখন ফুলে যায় বা জ্বালাপোড়া করে তখন প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস হয়। আপনি কী সিড়ি দিয়ে ওঠার সময় বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের পাতায় ব্যথা অনুভব করেন? গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর সময়ে এমনটা অনেকের হতে দেখা যায়। এটা প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস হওয়ার  লক্ষণ হতে পারে। এই আর্টিকেলে আমরা দেখব কেন এটা হয়, এর লক্ষণ ও প্রতিকার কী।

কেন প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস হয়

গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস হওয়ার প্রধান কারনগুলো হচ্ছেঃ

১. রিলাক্সিনের কারনে লিগামেন্ট শিথিল ও নরম হয়ে আসা – গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল থেকে রিলাক্সিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। সাধারণত প্রথম তিন মাস এর নিঃসরণের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, তবে শেষ তিন মাসে প্রসবের জন্য উপযোগী শারিরীক নমনীয়তা বাড়াতে রিলাক্সিন মায়ের নিতম্ব ও পেলভিসের চারপাশের লিগামেন্টকে নরম ও শিথিল করে তোলে। এটা প্রসবের জন্য সহায়ক হলেও মায়ের শরীরের অন্যান্য অংগ যেমন হাটু ও পায়ের পাতার লিগামেন্টকেও নরম করে তোলে যার ফলে মায়ের শরীরের দৃঢ়তা কমে যায় এবং পড়ে যাওয়া, পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সেই সাথে এটা আপনার পায়ের বাকা পেশীকেও নরম করে তোলে ফলে প্লান্টার ফ্যাসিয়ায় আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

২. ওজন বেড়ে যাওয়া – এ সময় মায়েদের ওজন অনেকটাই বেড়ে যায়। এই বাড়তি ওজন যদিও এই সময় স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় তবে এটা গর্ভবতী মায়েদের প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস হওয়ার অন্যতম প্রধান কারন। এক গবেষণায় জানা গেছে যে গর্ভবতী মহিলারা তাদের শেষ দুই ট্রাইমেস্টারে বা পঞ্চম মাস থেকে দশম মাস পর্যন্ত সময়ে দাড়ানো ও হাটার সময় স্থুলকায় মহিলাদের চেয়ে বেশি সামনের দিকে চাপ প্রয়োগ করেন। এই বাড়তি চাপের সাথে শিথিল লিগামেন্ট প্লান্টার ফ্যাসিয়াতে চাপ ফেলে যার ফলে তা ফুলে যায় ও ছিড়ে যায় যাকে প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস বলা হয়।

৩. ওভারপ্রোনেশন বা সমতল পায়ের পাতা – এমনটা হয় যখন আপনার পায়ের বাকগুলো ওজন বাড়ার কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে সমতল হয়ে যায় এবং আপনার হাটার ভংগি পরিবর্তন হয়ে যায়। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এমন হতে অনেক দেখা যায় এবং এর ফলে প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস হতে পারে যেহেতু প্লান্টার ফ্যাসিয়াতে চাপ পড়ে ও জ্বালাপোড়া হয়। একারণে হাটাচলা খুব কষ্টকর হয়ে যায়।

প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিসের লক্ষণসমূহ
যে লক্ষণগুলো সবচেয়ে বেশি শোনা যায় তার মাঝে আছেঃ

• গোড়ালির নিচে ব্যথা ও জড়তা যা অনেকসময় পায়ের পাতার মাঝামাঝি জায়গায় অনুভব হয়।
• দীর্ঘসময় বসে থাকা বা ঘুমানোর পর প্রথমবার পায়ের পাতা ফেললে ব্যথা লাগা, যা সাধারণত কয়েক মিনিট হাটার পর নিজ থেকেই ঠিক হয়ে আসে।
• পায়ের পাতার কিছু অংশে চাপ দিলে ব্যথা লাগা এবং একইরকম চাপ অন্য কোন অংশে দিলে ব্যথা না লাগা।
• দীর্ঘসময় হাটা, দাঁড়িয়ে থাকা, ব্যয়াম করা বা অন্যান্য কাজের পরে অনেক ব্যথা হওয়া।

প্রতিকার

প্রতিকারের ক্ষেত্রে আমরা মূলত ঘরোয়া চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করব। সহজ ঘরোয়া চিকিৎসায় ৯০℅-র বেশি মানুষের ১০ মাসের কম সময়ে প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস অসুবিধার উন্নতি হয়। ঘরোয়া কিছু সহজ চিকিৎসা হচ্ছেঃ
• প্রচুর বিশ্রাম নিন এবং এমন সব কাজ এড়িয়ে চলুন যা আপনার ব্যথার কারণ হবে বা একে বাড়িয়ে তুলবে যেমন দৌড়ানো। খালি পায়ে হাটা কমিয়ে আনুন। পডিয়াট্রিস্টরা বলেন যে শোবার সময় আপনার পা আপনার হৃদপিণ্ডের চেয়ে ১৫ মিনিট ৬ ইঞ্চি উপরে তুলে শোবেন যেন রক্তসঞ্চালন ভালো হয়।
• দিনে ৩-৪ বার ২০ মিনিট পায়ে বরফ লাগাতে পারেন বা ঠান্ডা পানির বোতলের ওপর পা ঘোরাতে পারেন। তবে এটা করার আগে আপনার অবস্টেট্রিশিয়ানের সাথে কথা বলে নিবেন।
• এমন জুতা ও স্লিপার পড়ুন যা পায়ের বাকগুলোকে ভালোভাবে সাপোর্ট করে, পায়ে রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং যা নরম। এর ফলে আপনার হাটাহাটি থেকে যে চাপ পড়বে তাতে টিস্যুতে ছোট ছোট  টিয়ার হওয়া রোধ হবে।
• রাতে ঘুমের সময় পায়ে splint বেধে নিতে পারেন কার্যকরভাবে ব্যথা রোধ করতে।
• সহজ কিছু ব্যয়াম করতে পারেন যেমন –
১) পায়ের পাতা বাকা করাঃ এটা একটা সহজ স্ট্রেচ যা প্রতিদিন সকালে বিছানা থেকে নামার আগে আপনি করতে পারেন। এর ফলে রাতে অনমনীয় হয়ে যাওয়া প্লান্টার ফ্যাসিয়া শিথিল হয়ে আসবে। বিছানায় শোয়া অবস্থায় পায়ের পাতা আপনার চেহারার দিকে বাকা করে আনুন। তিন পর্যন্ত গুণে ছেড়ে দিন। এভাবে দশ বার করুন। কোমলভাবে পায়ের পাতা ম্যসাজ করাও ঘুমের মাঝে তৈরি হওয়া অনমনীয়তা ও ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে পারে।


২)পায়ের আংগুল বাকানো ও ছড়ানোঃ বিছানায় থাকা অবস্থাতেই  পায়ের পাতা না নাড়িয়ে শুধু আংগুলগুলো যতটা সম্ভব বাকিয়ে প্রশস্ত করবেন। তিন পর্যন্ত গুণে ছেড়ে দিন। এভাবে প্রয়োজনে পাচ বা আরও বেশি বার করুন।


৩) পায়ের গোড়ালি উচু করাঃ বিছানা থেকে নেমে দুই পা ছড়িয়ে বসে পায়ের পাতা ফ্লোরে রাখুন। পায়ের আংগুল ফ্লোরে রেখে গোড়ালি উপর-নিচ করুন। এভাবে ৩০ বার করে দাড়ান। আবারও ৩০ বার করুন। এভাবে পায়ের পাতায় রক্তসঞ্চালন বাড়ে, পায়ের পাতা উষ্ণ ও নমনীয় হতে সাহায্য করে।


৪) পায়ের আংগুল স্ট্রেচ করাঃ খুবই সহজ এই ব্যয়াম অনেকসময় খুব আরাম দিতে পারে। পায়ের পাতা সামনে সোজা করে রেখে হাত দিয়ে আপনার পায়ের বড় আংগুল নরমভাবে নিজের দিকে টানুন। এভাবে ধরে রাখুন ১৫-৩০ সেকেন্ড। প্রতি পায়ে এভাবে ২-৪ বার করুন।


৫) দেয়ালের সাথে পা স্ট্রেচ করাঃ এই সহজ স্ট্রেচটা পায়ের সমস্যা, একিলিস টেন্ডন ও প্লান্টার ফ্যাসিয়া ব্যাথায় খুব উপকারী হতে পারে। দেয়ালের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে আপনার চোখের সমান্তরালে আপনার হাত দেয়ালে রাখুন। ডান পা এক স্টেপ পেছনে নিন। পায়ের গোড়ালি ফ্লোরে রেখেই সামনের পা এমনভাবে বাকান যেন পেছনের পায়ে আপনি টান অনুভব করেন।  ১৫-৩০ সেকেন্ড এভাবে থাকুন। এবার অন্য পায়ে একইভাবে করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুন। পুরো প্রক্রিয়া আরও তিন বার করুন।

এসবের পাশাপাশি আপনি ব্যথানাশক ওষুধ খেতে পারেন। তবে গর্ভাবস্থায় যে কোন ওষুধ আপনার ডাক্তারের পরামর্শে সেবন করবেন। প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস সমস্যায় ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে তিনি আপনাকে অপারেশনবিহীন আরও কিছু উপায় বলবেন যার সুবিধা-অসুবিধা উভয়টাই জেনে নিবেন। এর শেষ চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন যা আপনি ছয় মাসের বেশি অপারেশনবিহীন ঘরোয়া ও/বা অন্যান্য চিকিৎসা নেয়ার পরও ব্যথা অনুভব করলে এবং ব্যথা আপনার দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করলে শুধু তখনই ভাবতে পারেন।

পরিশেষে
প্রিয় মা, এতকিছু হয়ত আপনাকে বিহবল করে ফেলেছে, কিন্তু এই সবকিছুই লেখা হয়েছে আপনি যেন ভালো থাকেন এই জন্য। মনে রাখবেন, প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস সন্তান প্রসবের পর নিজ থেকেই চলে যায় না। ডেলিভারির পর আপনার ছোট্ট আনন্দটাকে নিয়ে যেন আপনি মেতে থাকতে পারেন তাই গর্ভাবস্থা থেকেই পায়ের যত্ন নেয়া ও প্রসবোত্তর সময়েও প্র‍য়োজনে তা বজায় রাখতে হবে।

প্রসব পরবর্তী পা ফোলা নিয়ে আমাদের আর্টিকেল দেখতে পারেন।

তথ্যসূত্রঃ

১. Plantar Fasciitis in pregnant mums: What you need to know about this common feet pain

২. Plantar Fasciitis Develops In Pregnant Women

৩. 10 Exercises for Plantar Fasciitis

ছবিঃ Harvard Health, LancasterOnline.com, Krazy kidz, Facty Health, vecteezy, stockhype,

এই আর্টিকেল রিভিউ করেছেনঃ

ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন

এফসিপিএস(অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলজি)

কনসালট্যান্ট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল।