কারপাল টানেল সিনড্রোম সচরাচর হতে দেখা যায়। এর ফলে হাত ও আঙ্গুলে শিরশিরে অনুভূতি, অবশ ভাব এবং মাঝে মাঝে ব্যথা হয়। গর্ভাবস্থায় এটি একটি সাধারণ ব্যপার।

 

কারপাল টানেল কী?

কারপাল টানেল হচ্ছে হাতের কব্জিতে অবস্থিত একটি সরু পথ যা ছোট আকারের হাড় ও একগুচ্ছ মজবুত টিস্যুর বন্ধনী দিয়ে গঠিত। এই কারপাল টানেলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় টেনডন, রক্তের আধার এবং নার্ভ যার মাঝে আছে মধ্যমা নার্ভ যা হাতের অনুভূতি ও নড়াচড়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। যদি মধ্যমা নার্ভে কোনভাবে চাপ পরে বা এটা দমিত হয় তাহলে কারপাল টানেল সিনড্রোম দেখা দেয়।

 

গর্ভাবস্থায় কারপাল টানেল সিনড্রোম

গর্ভাবস্থায়, টিস্যুতে তরল (oedema) জমা হওয়ার কারনে হাত ফুলে যায়। এই তরলের কিছুটা কারপাল টানেলে জমা হতে পারে যার ফলে মধ্যমা নার্ভে চাপ পড়ে এবং সেটা ছোট হয়ে যায় যা থেকে হাত ও আঙ্গুলে শিরশিরে, অবশ অনুভূতির সৃষ্টি হয়।

৬০% গর্ভবতী নারী কারপাল টানেল সিনড্রোমের লক্ষণ অনুভব করেন। লক্ষণগুলো নানা রকম হতে পারে এবং হালকা থেকে তীব্র ব্যথা হতে পারে। কোন এক হাত বা উভয় হাতেই হতে পারে।

লক্ষণগুলো সাধারণত রাতে এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সবচেয়ে খারাপ রূপ নেয়। লক্ষণগুলোর মাঝে আছেঃ

  • আঙ্গুল, হাত ও কব্জিতে অবশ ও শিরশিরে ভাব
  • আঙ্গুল, কবজি বা হাতে ব্যথা হওয়া বা দপদপ করা
  • আঙ্গুলগুলো ফুলে যাওয়া ও উত্তপ্ত হওয়া
  • কোন জিনিস শক্ত ভাবে ধরতে এবং আঙ্গুলের সাহায্যে করতে হয় যেসব কাজ সেসব করতে অসুবিধা হওয়া

 

নিচের পদ্ধতিগুলো আপনার এই লক্ষণগুলো কমিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে

  • বিশ্রাম নেয়া – হাতের অতিরিক্ত ব্যবহার আপনার লক্ষণগুলো বাড়িয়ে দিতে পারে। যেখানে সম্ভব অপ্রয়োজনীয় কাজ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করুন এবং যখনই সম্ভব আপনার হাত ও কব্জিকে কোন বালিশ বা তোয়ালের ওপর রেখে বিশ্রাম দিন। এটা আপনার হাতের ফোলা কমাতে সাহায্য করবে। ঘুমের সময় আপনার হাত বালিশের ওপর রেখে সামান্য উঁচুতে তুলে শুতে চেষ্টা করুন। যদি আপনার ব্যথা লাগে এবং এর কারণে ঘুমের অসুবিধা হয় তাহলে আপনাকে রাতে কব্জিতে স্প্লিন্ট পড়তে হতে পারে। স্প্লিন্ট আপনার হাত ও কব্জিকে যথাস্থানে রাখবে যেন ঘুমের মাঝে সেটা এলোপাতাড়ি পড়ে না যায় এবং আপনার কারপাল টানেলে চাপ না ফেলে। সেই সাথে, আপনার কবজি বাঁকাতে হয় এমন ধরণের কাজ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করুন, যেমন কম্পিউটারে টাইপ করা।
  • হাতে ঠান্ডা ও গরমের ছোঁয়া লাগানো – কব্জিতে দশ মিনিটের জন্য বরফ লাগাতে পারেন। ঠাণ্ডা ও গরম একটার পর অন্যটা পরিবর্তন করেও দিতে পারেন। এক গামলায় ঠাণ্ডা পানি আরেকটায় গরম পানি রাখতে পারেন। এক গামলায় এক মিনিট হাত ভিজিয়ে অন্যটায় আরেক মিনিট ভিজাতে পারেন। এভাবে পাঁচ থেকে ছয় মিনিট করতে পারেন। এভাবে দিনে তিন বা চারবার করবেন।
  • ম্যাসাজ করা – ব্যাথা কমানোর জন্য আপনি নিজের কবজি মালিশ করতে পারেন। হাতের তালু উপরের দিকে এঙ্গেল করে রেখে আপনার বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে কব্জির এক পাশ থেকে আরেক পাশে দৃঢ়ভাবে ঘষতে পারেন। যত বেশিবার প্রয়োজন এভাবে করতে পারেন। কব্জিকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন কিছু পেশী আপনার হাতে অবস্থিত। আপনার বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে চেষ্টা করুন হাতের উভয় দিক কনুই থেকে নিচের দিকে কব্জির প্রায় ১০ সেন্টিমিটার উপর পর্যন্ত ম্যাসাজ করতে।
  • ব্যথানাশক ওষুধ – আপনি যদি গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ানো মা হন তাহলে যেকোন ওষুধ, এমনকি হারবাল ওষুধও, সেবনের আগে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিন।

 

ব্যয়াম

বিশ্রামের পাশাপাশি কবজি ও হাতের ব্যয়াম করাও জরুরী। মূলত, এসব সমস্যায় ব্যয়াম বেশ কার্যকর এবং নিয়মিত ব্যয়াম সমস্যা অল্পতেই সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। এসব হালকা ব্যয়ামে বেশি সময়ও দিতে হয় না। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো বা শুয়ে ঘুম পাড়ানোর ফাঁকেও সহজেই চর্চা করা যায়।

নিচে কিছু সহজ ঘরোয়া ব্যয়াম দেয়া হোল। তবে, যদি এতে আপনার ব্যথা আরও বেড়ে যায় তাহলে ব্যয়াম আর চালিয়ে যাবেন না।

১। আঙ্গুল সোজা রেখে আপনার কবজি সামনে-পেছনে বাঁকান। এভাবে ১০ বার করুন।

২। আপনার আঙ্গুলগুলো যত দূর সম্ভব প্রসারিত করে কয়েক সেকেন্ড ধরে থাকুন, এরপর আবার শিথিল করুন।

৩। হাত মুঠ করুন এবং তারপর আঙ্গুলগুলো সোজা করুন। এভাবে ১০ বার করুন।

৪। আপনার বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে প্রতিটা আঙ্গুল একবার করে স্পর্শ করুন।

৫। ধীরে আপনার কবজি উপর থেকে নিচে বৃত্তাকারে ঘোরান। কয়েক বার ঘড়ির কাঁটার দিকে আবার কয়েক বার ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ঘোরান।

 

কারপাল টানেল সিনড্রোম থাকা অবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানো

কারপাল টানেল সিনড্রোম থাকা অবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানো কষ্টকর হতে পারে কারণ দুধ খাওয়ানোর জন্য সঠিক ভঙ্গীতে বসতে আপনার কবজি ব্যবহার করে আপনাকে বাচ্চার মাথা এবং স্তন ধরে রাখতে হবে। বিভিন্ন ভঙ্গীতে খাওয়াতে চেষ্টা করতে পারেন। প্রয়োজনমতো বালিশ বা কম্বল ব্যবহার করতে পারেন উঁচু করা, ঠেশ দেয়া বা বাচ্চাকে আলিঙ্গন করার জন্য।

আপনি পাশ ফিরে শোয়া অবস্থায় বাচ্চা আপনার দিকে মুখ ফেরান ভঙ্গীতে থাকা আপনার জন্য ভালো কাজ করতে পারে। “ফুটবল ধরা” ভঙ্গী আপনার কব্জির জন্য সহজ হবে কারণ এই ভঙ্গীতে আপনি সোজা হয়ে বসেন এবং আপনার বাচ্চাকে বাহুর এক পাশে রেখে তার মাথা আপনার কবন্ধের কাছে রাখেন।

 

বাচ্চা হওয়ার পর কতদিন এই সমস্যা থাকতে পারে?

বাচ্চা হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর থেকে কারপাল টানেল সিনড্রোমের লক্ষণগুলো চলে যেতে শুরু করে। তবে, যেহেতু কারপাল টানেল সিনড্রোম শরীরে পানি আসার সাথে সম্পর্কিত, তাই বাচ্চা হওয়ার পর এবং বিশেষ করে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এই লক্ষণগুলো আরও এক বা দুই মাস থাকতে পারে। কারণ প্রসবের পরও শরীরকে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে সময় লাগে।

যদি আপনার লক্ষণগুলো রয়ে যায় এবং আপনার আরও কোন তথ্য বা উপদেশের প্রয়োজন হয় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এই সমস্যার শেষ চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন করা। যদি দীর্ঘদিন অন্যান্য চিকিৎসা চালানোর পরও সমস্যা রয়ে যায়, লক্ষণগুলো তীব্র আকার ধারণ করে যার ফলে দৈনন্দিন কাজকর্ম বাধাগ্রস্ত হয় অথবা মধ্যমা নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে তাহলে তখন অপারেশনের কথা বিবেচনা করা হয়।

 

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ

 

এই আর্টিকেল রিভিউ করেছেনঃ

ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন

এফসিপিএস(অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলজি)

কনসালট্যান্ট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল।