আজকের লেখায় লেবার পেইন মোকাবেলা করার একটি টেকনিক নিয়ে আলোচনা করব। আলোচনাটি তুলে ধরছি একটি ভিডিও থেকে। ভিডিওটা আমি দেখেছিলাম আমার নিজের প্রেগন্যান্সীর সময় এবং এটাকে কাজে লাগিয়ে আমি ভীষণ উপকৃত হয়েছিলাম। ভিডিওটা যিনি বানিয়েছেন, সারা কামরাথ, নিজেও বলেছেন যে আলোচিত পদ্ধতিটি ছাড়া লেবার পেইনের তীব্রতা সামলানো ও সুস্থ, নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে নিজের দুই বাচ্চাকে জন্ম দেয়ার কথা উনি ভাবতেই পারেন না! এই টেকনিকটা ছাড়া উনার লেবার পেইনও অসহনীয় কষ্টকর হয়ে উঠত।

পশ্চিমা এই নারী আরও বলছেন যে, প্রায় সব হাসপাতালই লেবার পেইন মোকাবেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে ভুল পরামর্শ দিচ্ছে। এই সাধারণ টিপসটা আপনার লেবার পেইন সহজ ও দ্রুত করার সম্ভাবনা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিবে।

এই ভিডিওতে বিশ্বখ্যাত অবস্টেট্রিশিয়ান, গাইনোকোলজিস্ট, মিডওয়াইফ, ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, সন্তান প্রসব প্রশিক্ষকদের দেয়া দারূণ কিছু টিপস পাবেন। ভিডিওটা দেখতে পারেন এখানে

এবার আপনাদের বোঝার সুবিধার জন্য ভিডিওর বিষয়বস্তু এখানে তুলে ধরছি। ভিডিওর মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে পেইনের তীব্রতা মোকাবেলায় মায়েরা যে দুইটা সহজ কাজ করতে পারেন তা হচ্ছে “নড়াচড়া করা” এবং “শ্বাস নেয়া ও আওয়াজ করা”। এই সাধারণ কাজগুলো লেবার পেইনের তীব্রতা কমিয়ে এনে মাকে স্বস্তি দেয়। সেই সাথে বাচ্চার বের হওয়াটা সহজ ও দ্রুত হয় তাই লেবার পেইনের সময়টাও তুলনামূলক কম লাগে। এটা কেন ও কিভাবে হয় সেটাই পুরো ভিডিওতে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা বুঝিয়ে বলেছেন।

নারীরা ট্র্যাডিশনালি লেবার পেইন ম্যানেজ করতে অনেক কিছু করে এসেছে। এখনকার দিনে মেয়েরা এরোমা থেরাপী, হোমিওপ্যাথি ইত্যাদি ব্যবহার করে এবং এগুলো অনেক উপকারী হতে পারে কিছু ক্ষেত্রে। লেবার পেইনের সময় এসব কোন একটা পদ্ধতি নিজের সাথে রাখা ভালো হবে। কিন্তু মায়েদের জেনে রাখা ভালো যে একটা জিনিস সবসময় আমাদের সাথেই থাকে আর সেটা হচ্ছে শ্বাস নেয়া, আওয়াজ করা ও নড়াচড়া করা।

নড়াচড়া করা ও স্থান পরিবর্তন করা সম্ভবত ফিজিওলিজিক্যালি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যা নরমাল ডেলিভারিকে সহজ করার জন্য মায়েরা করতে পারে। লেবার পেইনের সময় মা গতি ও পজিশন পরিবর্তন করবেন এটাই স্বাভাবিক। এই সময় একজন নারীকে জাস্ট বিছানায় শুয়ে থাকতে বলা, নড়তে নিষেধ করা, অবস্থান পরিবর্তন করতে না দেয়া, কোন খাবার বা পানি না দেয়া এসবই কিছুটা অদ্ভূত বটে!

লেবার ও প্রসবের সময় নারীদের চিত হয়ে শুয়ে থাকা ফিজিওলজিক্যালি সম্পূর্ণ অর্থহীন, কারণ মানব জন্ম একটি অসমঞ্জস (asymmetrical) প্রক্রিয়া। অন্য সব স্তন্যপায়ীদের প্রসব নালা হচ্ছে সোজা এবং বাচ্চা সোজা বেরিয়ে আসে। কিন্তু মানুষ সোজা হয়ে হাঁটে। আমাদের পেলভিসে ইউনিক বাঁক ও পেঁচ আছে, যা লেবার পেইনের সময় আমাদের বাচ্চাদের পাড়ি দিতে হয়। লেবার পেইনের সময় যখন মা হাঁটে তখন পেলভিস কোন না কোনভাবে মোচড় খায় যার ফলে মা বাচ্চাকে সাহায্য করেন এই পথটা সহজে পাড়ি দিতে।

আমাদের পেলভিসের ওপেনিং-টা উপর থেকে নিচের দিকে আলাদা। পেলভিসের উপরকে বলা হয় ইনলেট এবং ইনলেটের সবচেয়ে চওড়া ডায়ামিটার আড়াআড়িভাবে থাকে, অনেকটা পশ্চাদ্দেশের বাম থেকে ডানে। তাই বেশিরভাগ বাচ্চাকে পেলভিসে প্রবেশ করতে হয় যাকে বলা হয় তির্যকভাবে। কিন্তু লেবার অগ্রসর হওয়ার সময় যখন বাচ্চা নিচে নামে তখন মধ্য পেলভিসে নেমে আসে এবং যখন তারা বের হওয়ার জন্য রেডি হয়, তাদের ঘুরে যেতে হয় কারণ বের হওয়ার সবচেয়ে চওড়া পথটা এখন সামনে-পেছনে হয়ে গেছে। ভিডিওতে পেলভিসের ভেতর থেকে মাথা আগে দিয়ে বাচ্চা কিভাবে বের হয়ে আসে তা দেখানো আছে।

খাড়া অবস্থায় থেকে, হাঁটু সামান্য বাঁকা করে নিতম্ব ঘোরানো, যেমনটা সব আদিম নৃত্যে দেখা যায়, এটা বাচ্চার মাথাকে বার্থ ক্যানেলের ভেতর দিয়ে আরও অনেক সহজে ও দ্রুত পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এর সাথে শ্বাস নেয়া ও যদি বাচ্চার বাবা উপস্থিত থাকে তাহলে তাকে ধরে একসাথে দুইজন সামান্য দোলা ইত্যাদি অনেক উপকারী হতে পারে। ভিডিওতে লেবার পেইনের সময় কিভাবে খাড়া অবস্থায় থেকে নিতম্ব ঘোরাবেন সেটাও দেখানো হয়েছে।

একজন বিশেষজ্ঞ উদাহরণ দিয়ে বলেছেন যে যদি আমাদের আঙ্গুলে কোন আংটি থাকে এবং সেটা টাইট হয় তাহলে তা সহজে বের করার জন্য আমাদের তা নাড়তে হয়। তেমনই মায়ের পেলভিসে একটা আস্ত বাচ্চা আছে, তাকে বের করতে হলে আমাদের এমন সব মুভমেন্ট চেষ্টা করে দেখতে হবে যা বাচ্চাকে বের করতে সাহায্য করবে।

লেবার পেইনের সময় ইয়োগা বল বা জিম বলে বসে শরীর ও নিতম্ব নাড়ানো যেতে পারে, বলের ওপর হেলান দিয়ে থাকা যায় , স্কোয়াট করা যায় বলের ওপর বসে। এসবকিছুই যেভাবে আমাদের পেলভিসকে রিল্যাক্স করে বাচ্চার মাথাকে বের হতে সাহায্য করে তা খুবই উপকারী।

মেয়েদের শেখানো হয় যে লেবার পেইনের সময় বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়, নাটক-সিনেমায় আমরা এমনটাই দেখি। কিন্তু এটা খুব ভুল একটা কাজ। যদি রাতের বেলা আপনি ঘুমাতে যান তাহলে এটা ঠিক আছে, কিন্তু তা ছাড়া আপনাকে লেবার পেইনের সময় নড়াচড়া করতে হবে, আপনার শরীর যেভাবে চায় সেভাবে থাকতে হবে। সেটা হতে পারে সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা করা বা আগে কখনোই আপনি থাকেননি এমন কোন অদ্ভূত ভঙ্গীতে থাকা। কিন্তু আপনি হয়ত এই সময় বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে দুই পা উপরে তুলে দিয়ে থাকতে চাইবেন না।

যদি কোন নারী নাটক-সিনেমায় দেখানো লেবার পেইনের ভঙ্গী না দেখে থাকে এবং নিজের প্রজ্ঞার অনুসরণ করে তাহলে সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে তার হাত ও হাঁটুতে ভর দিয়ে থাকতে চাইবে, সে স্কোয়াট করবে বা হাঁটাহাঁটি করবে। টয়লেট করার কথা যদি চিন্তা করেন, তাহলে এর জন্য বিছানায় চিত হয়ে শোয়া নিশ্চয়ই ভালো ভঙ্গী হবে না। কারণ এই ভঙ্গীতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আপনার ওপর কাজ করতে পারবে না। আরেকটা ব্যপার হচ্ছে, যখন আপনি খাড়া অবস্থায় বা হাত-হাঁটুতে ভর দেয়া অবস্থায় থাকেন আপনি পেলভিসের এন্টেরিয়র-পোস্টেরিয়র ডায়ামিটারের সীমা বাড়াচ্ছেন, যার ফলে পেলভিসের মুখ বড় হয় ও বাচ্চা আরও সহজেই বের হয়ে আসতে পারে।

লেবার পেইনের সময় যখন মায়েরা স্কোয়াট বা কিছুটা ঝুঁকে থাকার মতো ইত্যাদি ভঙ্গী করে তখন পেলভিসের মুখ ২৫% বেশি উল্লেখযোগ্য হারে খুলতে পারে, কিন্তু যখন মায়েরা চিত হয়ে শোয়া অবস্থায় থাকে তখন গুরুত্বপূর্ণ শিরা-উপশিরা দিয়ে জরায়ু ও বাচ্চার কাছে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্থ হয়। সেই সাথে মায়ের নিম্নাংশ হচ্ছে স্পাইন ও জরায়ুর জন্য বালিশের মতো, এর উপর যখন আমরা ১০/২০/৩০ পাউন্ড ওজনের বাচ্চার ভর রাখি তখন বাচ্চার কাছে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। এটা বাচ্চাকে ফেট্যাল ডিস্ট্রেসে নিয়ে যেতে পারে। সেই সাথে, মায়ের টয়লেট বের হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই, মাকে চিত করে শুইয়ে রাখার কোন মানেই হয় না। ডাক্তার, মিডওয়াইফরা মাকে নয় মাস ধরে চিত হয়ে না ঘুমানোর জন্য বলে, এরপর যখন তিনি প্রসব করতে আসেন তখন তাকে চিত করে শুইয়ে রাখা হয়!! এই চর্চাটা যে মায়েদের জন্য উপকারী না এটা বুঝতে খুব বেশি বিজ্ঞান জানতে হয় না।

মাকে যদি সত্যিই তার নিজের ভেতর ফোকাস করে তার শরীরের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করতে দেয়া হয় তাহলে দেখা যাবে যে সে আসলে নিজেই জানে এই লেবার পেইন কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে। কখনো কখনো লেবার পেইনে থাকা মাকে মনে করিয়ে দিতে হয়, যেমন একজন বিশেষজ্ঞ বলেন যে তিনি অনেকসময় মায়েদের বলেন যে, ধরুন আপনি কোন বিড়াল, বা ঘোড়া যাকে নানারকম কালচারাল পরামর্শ, উপদেশ দেয়া হয়নি, তাহলে আপনি যদি এই মূহুর্তে একদম আপনার নিজের ভেতর ফোকাস করেন ও শরীরের সাথে তাল মেলান তাহলে আপনি কেমন ভঙ্গীতে থাকতে চান? এবং মায়েরা তাদের লেবার পেইন সহজ করার জন্য কী কী ভঙ্গীতে থাকতে চায় সেটা বেশ বিস্ময়কর, এরপর পুশ করার সময় হয়ত মেঝেতে বসে করছেন, পাশ ফিরে আছেন বা হাত-হাঁটুতে ভর দিয়ে বিছানার কিনারায় আছেন। মোট কথা, মায়েরা কিভাবে এই ব্যথাটা প্রক্রিয়া করেন সেটা আসলে বেশ প্রগাঢ় একটা ব্যপার!    

পেলভিক রকিং বা শরীরের নিম্নাংশ দোলানো লেবার পেইন আশ্চর্যজনকভাবে কমিয়ে আনে ও ডেলিভারিকে সহজ করে, আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। কারণ এই সময় বাচ্চা যেমন ভেতর থেকে বের হতে চাচ্ছে, সেভাবেই মা-ও তাকে কিভাবে সহজে সে বের হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে সাহায্য করছে। লেবার পেইন মোকাবেলায় এই সহজ টিপসটা আমাকে যেভাবে উপকৃত করেছে আশা করি আপনাদেরও করবে, ইনশাল্লাহ।  

এই ভিডিওতে যারা কথা বলেছেন তারা হচ্ছেনঃ

১। ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ও “Gentle Birth, Gentle Mothering” বইয়ের লেখিকা সারা বাকলে

২। ফিজিশিয়ান, মিডওয়াইফ, হারবালিস্ট এবং “The Natural Pregnancy Book” বইয়ের লেখিকা আভিভা রোম

৩। অবস্টেট্রিশিয়ান ও গাইনোকোলজিস্ট রবার্ট বিটার

৪। সন্তান প্রসব ও দৌলা প্রশিক্ষক ডেবরা প্যাস্ক্যালি–বোনারো

৫। Birth as we know it মুভির পরিচালক এলেনা টোনেটি

৬। মিডওয়াইফ আলেক্সান্ড্রা এভানগেলিডি

৭। ফার্ম মিডওয়াইফারি সেন্টারের ফাইন্ডার ও ডিরেক্টর এবং “Ina May’s Guide to Childbirth” বইয়ের লেখিকা ইনা মে গাস্কিন

৮। অবস্টেট্রিশিয়ান ও গাইনোকোলজিস্ট এবং বেস্ট সেলিং বই “Women’s Bodies, Women’s Wisdom” – এর লেখিকা ক্রিস্টিয়ান নর্থার্প

বিঃদ্রঃ

১। ভিডিওতে শ্বাস নেয়া ও আওয়াজ করা বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়নি। এখানে শ্বাস নেয়া বলতে ধীরে ধীরে পেট থেকে গভীরভাবে শ্বাস নেয়া ও আস্তে আস্তে শ্বাস ছাড়া (Deep abdominal breathing) বোঝানো হচ্ছে। এটা স্টেপ বাই স্টেপ জানতে এই লেখাটা দেখতে পারেন।

আওয়াজ করার সময় আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক শব্দ ব্যবহার করতে পারি, যেমন আল্লাহু আকবার, আস্তাগফিরুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সুবহানআল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা ক্কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ ইত্যাদি।

২। উপরের ছবিতে স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক প্রসবের জন্য সক্রিয় (active) থাকার উপযোগী একটি লেবার রুম কেমন হতে পারে তার ছবি দেয়া হয়েছে।