তিন বছর পাঁচ মাস পর অবশেষে আমার পিঠাপিঠি দুই বাচ্চারই দুধ খাওয়ার সময় শেষ হয়েছে। এই সময়ের মাঝে ব্রেস্টফিডিং নিয়ে বিভিন্ন ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তবে, আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমার নরমাল ডেলিভারি ছিল এবং ব্রেস্টফিডিং নিয়ে বাড়তি কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি।

একটা নবজাতক বাচ্চা যে কিনা কিছুই জানে না, যার কোন স্মৃতি নেই, অভিজ্ঞতা নেই, তাকেই যখন জন্মের পর পর মায়ের বুকের কাছে নেয়া হয় সে ঠিকই একটু সহায়তা পেলে সেটা খুঁজে নিয়ে নিজেই টেনে খেতে শুরু করে। আল্লাহ্‌ মানব শিশুকে এভাবেই প্রোগ্রাম করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই দৃশ্যটা যে কী বিস্ময়কর সুন্দর, সুবহানআল্লাহ!

নবজাতক বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর টেকনিক নিয়ে অল্প করে কিছু কথা বলতে চাই। মায়েদের জানা থাকা দরকার যে বাচ্চা ‘নিপল’ খায় না, নিপলের চারপাশের কালো বৃত্তের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাচ্চা খাওয়ার সময় মুখে নেয়। স্তন বাচ্চার কাছে নেবেন না বরং যখন বাচ্চা দুধ মুখে নেয়ার জন্য বড় করে মুখ খুলবে তখন বাচ্চাকে বুকের কাছে নিয়ে আসুন। বাচ্চাকে পজিশন করাবেন এমনভাবে যেন মায়ের পেটের সাথে বাচ্চার পেট লাগান থাকে যাতে করে নিশ্চিত করা যায় যে বাচ্চা স্তনের দিকে ফিরে আছে এবং দুধ খাওয়ার জন্য তাকে ঘাড়ের দুর্বল পেশী ব্যবহার করে মাথা ঘোরাতে হবে না।

ফিরে আসছি আমার কথায়, গত প্রায় সাড়ে তিন বছরে প্রথমে আমি এক বাচ্চাকে একা দুধ খাওয়ালাম, এরপর প্রেগন্যান্ট অবস্থায় বাচ্চাকে খাওয়ালাম, তারপর আরও সাত মাস দুই বাচ্চাকে একসাথে খাওয়ালাম। এরপর বড় বাচ্চাটাকে দুধ ছাড়িয়ে শুধু ছোটটাকে দুই বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত খাওয়ালাম। কাজটা শুনতে কঠিন মনে হলেও তৃপ্তিদায়ক এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্পের চেয়ে উপকারী ও সহজ মনে হয়েছে আমার কাছে।
আমরা বাচ্চাকে ব্যথা পেলে বুকের দুধ খাওয়াতাম। আমার হাজব্যান্ডও এই ব্যপারটায় জোরাল সমর্থন করত। এতে বাচ্চা সহজেই স্বস্তি পেত মানসিকভাবে।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

টিকা দেয়ার পর বাচ্চাকে শান্ত করতে দ্রুত বুকের দুধ দিতাম। বাইরের দেশে ঠাণ্ডা লাগলেও বেশি বেশি দুধ খাওয়াতে বলে। আমার দুই বাচ্চাই ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খেয়েছে, তারা কখনোই নবজাতকদের জন্য তৈরি ফর্মুলা দুধ খায়নি। এক বছর বয়সের পর থেকে ওরা বুকের দুধের পাশাপাশি গরুর দুধ খেয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমার বাচ্চাদের ছয় মাসের মাঝে কখনো পেটের সমস্যা হয়নি, শুধু একবার আমার ছোটটার খুব ঘন ঘন বাথরুম হয়েছিল যা পরে বুঝেছিলাম যে আমি বাংলাদেশ থেকে নেয়া কেমিক্যাল মেশানো শুটকি খেয়েছিলাম বলে হয়েছিল (আমরা তখন দেশের বাইরে ছিলাম)।

আমার ছোটটাকে নিয়ে যখন আমি আট মাসের প্রেগন্যান্ট তখন থেকে দুধ কম আসা শুরু হয়। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই দুধের যোগান কমে যায়। আমার মেয়ে সবসময় দুধ খেয়ে ঘুমাত। এই অভ্যাস পরিবর্তন করা তখন আমার জন্য কষ্টকর ছিল কারণ এটা ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতি যেমন পায়ে নিয়ে ঘুম পাড়ান, হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়ান ইত্যাদি আমার শারীরিক অবস্থায় কঠিন ছিল। তাই আমি প্রাকৃতিকভাবে দুধের যোগান বাড়ে এমন পদ্ধতির আশ্রয় নিলাম। কালোজিরা, মেথী এসব খেতাম নিয়মিত। মেয়েকে দুধ খাওয়ানোর সময়টাও কমিয়ে দিয়েছিলাম, শুধু রাতে আর দুপুরে ঘুমের আগে দিতাম। রাতে ঘুমের মাঝেও খেত।

এক থেকে দুই বছর বয়সী বাচ্চারা সাধারণত যেমন খাওয়া নিতে ঝামেলা করে, আমার মেয়েটাও এমন করত। কতদিন যে ইশার সালাতে দু’আ করতাম মেয়েটা যেন রাতে ঠিকমতো খায়! কারণ রাতের খাবার ভালমতো না খেলে ও ঘুমের মাঝে বেশি দুধ খেতে চাইত আর পর্যাপ্ত দুধ না থাকায় আমার তখন কষ্ট হতো। অনেকসময় রাগ হয়েও যেতাম। চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে খাওয়ার অভ্যাস ছিল ওর তাই ঘুমের মাঝে অন্য কিছু দিলেও নিতে চাইত না। আমরা অন্য কিছু দিতে চেষ্টা করেছিলাম, লাভ হয়নি। দিনের পর দিন এমন বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা দেখে আমার হাজব্যান্ড ইউটিউবে ইনফ্যান্ট ফর্মুলা মিল্ক নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখল। কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারল না।

বাজারজাত ফর্মুলা দুধে এমন কিছু উপাদান থাকে যা বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর। এরপরও আমার হাজব্যান্ড একদিন এক কৌটা দুধ কিনে এনেছিল। কিন্তু সেটাতেও ওর আগে ভিডিওতে দেখা উপাদান পেয়ে আবার ফেরত দিয়ে আসতে বলেছিলাম। ক্ষতিকর উপাদান আছে জেনেও মেয়েকে খাওয়াতে মন সায় দেয়নি। মেথী আরও বেশি করে খেতে শুরু করেছিলাম বরং।

এরপর আমার ছোটটা হওয়ার দুই/তিনদিন পর পূর্ণ মাত্রায় নতুন দুধ আসা শুরু করল। সেই প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বড় অদ্ভূত! আমার মেয়েটা মনে হয় অবাক হয়ে গিয়েছিল হঠাত এতদিন পর এত দুধ পেয়ে। ও পুরো একঘণ্টা খেয়েছিল সেদিন! একটা নবজাতক আর একটা সতের মাসের বাচ্চা সাথে নিয়ে ঘরে আমি একা। সেই প্রথম মাসটা ছোটটাকে যতবার খাওয়াতাম, আমার বড়টাও ততবার খেতে আসত। আলহামদুলিল্লাহ্‌ এক মাস পর ওর এই অভ্যাস আর থাকেনি।

আমার মেয়ের দুই বছর হওয়ার এক মাস আগে আমরা দেশে আসি। এই সময়টা বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়ার উপকারিতা খুব অনুভব করেছিলাম। ঠাণ্ডার দেশ থেকে বাংলাদেশের জুন মাসের গরমে এসে পৌঁছেছিলাম। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ; মেয়েটা অসুস্থ হয়ে খাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন ভরসা ছিল এই বুকের দুধ। আলহামদুলিল্লাহ্‌ তাও একটা জিনিস ছিল ওর খাওয়ার যা শুধু ওর ক্ষুধা নিবারণই করবে না, ওর জন্য রোগ প্রতিরোধক হিসাবেও কাজ করবে। তখন একজনের পরামর্শে ফিডারে গরুর দুধ দেয়া শুরু করেছিলাম। আমার মেয়ে তো ফিডার খায়নি কখনো, বিদেশে একবার চেষ্টা করেছিলাম দিতে কিন্তু ততদিনে ওর দাঁত উঠে যাওয়ায় ও নিপল না টেনে কামড়াত। এবার দেশে দেয়ার পর নতুন জিনিসে আকর্ষণ বোধ করায় খেয়েছিল কিছুদিন। ওকে দুধ ছাড়ানোর সময় আমি এটারই সুযোগ নিয়েছিলাম।

বেশ চিন্তিত ছিলাম ওর দুধ কিভাবে ছাড়াব এই নিয়ে। ওর সামনেই ওর ছোট ভাই দুধ খায়, এমন অবস্থায় ও মানতে চাইবে কিনা ইত্যাদি কথা ভেবেছিলাম। দুই বছর হওয়ার কয়েক দিন পর আলহামদুলিল্লাহ্‌ ছাড়িয়ে দিয়েছি। ঘুমের সময় মাথার কাছে ফিডার, পানির বোতল রাখতাম। ও খাওয়ার জন্য জিদ করলে বোতল দেখিয়ে বলেছিলাম খেতে চাইলে এটা পাবে, আর কিছু পাবে না। আগে থেকেই দুধ ছাড়ানোর জন্য মুখে মুখে বোঝাতাম।

মেয়েটা সবসময় গরুর দুধ খেতে চাইত না তাই বিকালে দুইজনের জন্যই দুধ দিয়ে নাস্তা করে দিতাম। ধীরে ধীরে আমার ছোটটাও কিছুটা বড় হয়ে ওঠে আর তখন দুইজনকেই একসাথে গ্লাসে গরুর দুধ খেতে দেই। ছোটটার দুধ ছাড়ানোর আগে ধীরে ধীরে প্রতিদিনের বুকের দুধ খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনি। দুপুরে আর রাতে ঘুমের আগে, রাতে ঘুমের মাঝেও দিতাম।

শেষ মাসে এসে মুখে মুখে বুঝাতে শুরু করি খুব বেশি করে। আমার ছোটটা কখনোই দুধ না খেয়ে ঘুমায়নি, খুব বেশি ঘুম পেয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া ছাড়া। সেই সাথে নিজের মতামতের ব্যপারে সে বেশ দৃঢ়ও। তাই আমি ভালোই চিন্তিত ছিলাম ওকে দুধ ছাড়ানো নিয়ে। তবে ওর আঙ্গুল চোষার স্বভাব আছে। এই ক্ষেত্রে আমাকে এটা সাহায্য করেছে। একদম শেষের দিকে এসে কিছুক্ষণ খাইয়ে বলতাম তুমি খেয়েছ এখন আঙ্গুল খেয়ে ঘুমাও। মেনে নিত আলহামদুলিল্লাহ্‌।

এভাবে দুই বছর একদিন পর রাতের ঘুমটা আঙ্গুল খেয়েই ঘুমিয়ে গেল। দ্বিতীয় রাতে হঠাত দুধ খাওয়ার কথা মনে পড়ায় আঙ্গুল বাদ দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছিল। আস্তে আস্তে কান্নার মাত্রা বাড়তেই থাকে। আমিও একসময় দ্বিধান্বিত হয়ে গিয়েছিলাম দেব কি না। কিন্তু প্রেগন্যান্সী গ্রুপেই এক আপুর কমেন্টে পড়েছিলাম যে ছাড়িয়ে দেয়ার সময় দৃঢ় থাকতে হয়। না মানে না! কান্নাকাটি করে যদি পেয়ে যায় তাহলে মনে করবে কাঁদলেই পাওয়া যাবে। একসময় কেঁদে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এতে কাজ হয়েছিল আলহামদুলিল্লাহ্‌। যত ভয় পেয়েছিলাম তেমনটা কিছুই হয়নি, খুব সহজেই দুধ ছাড়ানো গেছে।

একটা কথা বলে রাখি, দুই বছর হতে হতে বাচ্চারা সারা রাত না খেয়ে থাকা আর এক ঘুমে রাত পার করে দেয়ার মতো বড় হয়ে যায়। আমি ঘুমের সময় পানির বোতল সাথে রাখতাম। ছোটটা ঘুমের মাঝে খেতে চাইলে পানি দিতাম। ওতেই কাজ হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ্‌।

এবার একটা চমক দেই আপনাদের। দুইবার নরমাল ডেলিভারি আর দুই বাচ্চাকে পূর্ণ দুই বছর দুধ খাওয়ানোর ফলে আমি প্রেগন্যান্সীর পুরো ওজন হারিয়ে আরও কয়েক কেজি কমেছি আলহামদুলিল্লাহ্‌। তবে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো কমিয়ে দেয়ার সাথে সাথে ওজন বেড়ে যাওয়ার সুযোগও বেড়ে যায়। তাই দুধ খাওয়ানো কমিয়ে দেয়ার সাথে সাথে ভাত, রুটির পরিমাণ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করেছি। এমনিতে পুরো মাত্রায় দুধ খাওয়ানোর সময় নিজের খাওয়ার ব্যপারে যেমন ক্ষুধা লাগত তেমনই খেতাম। সেই সাথে নিয়মিত কিছুক্ষণ ব্যয়াম করতে চেষ্টা করতাম।

ক্যালশিয়াম গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে চেষ্টা করেছি। বড়দের দৈনিক ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম প্রয়োজন হয়। প্রেগন্যান্ট ও ব্রেস্টফিডিং মায়েদের জন্যও তাই। এক থেকে তিন বছর বয়সী বাচ্চাদের প্রয়োজন হয় ৭০০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম। এক গ্লাস দুধে থাকে ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালশিয়াম। তাই চেষ্টা করতাম এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য দেশের বাইরে থাকতে দুধ আর দই (ইয়োগার্ট) খেতে আর দেশে আসার পর এক গ্লাস দুধের পাশাপাশি ক্যালশিয়াম ট্যাবলেট খেতে। আর বাচ্চাদের চেষ্টা করে যাচ্ছি দিনে দুইবার দুধ জাতীয় খাবার দিতে।

তথ্যসূত্রঃ
১। বই AMANI Birth লিখেছেন Aisha Al Hajjar
২। Calcium Fact Sheet for Consumers
৩। Calcium Content of Foods 

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা