প্রেগন্যান্সি যে আল্লাহর দেওয়া একটা বড় নেয়ামত তা খুব ভালভাবেই বুঝতে পারলাম যখন বিয়ের চার বছর পরেও আমি কন্সিভ করছিলাম না। নানা জনের নানা কথা শুনতে শুনতে অবশেষে ডাক্তার দেখাতে গেলাম৷ যদিও আমি বা আমার হাজব্যান্ড কেউই নিরাশ ছিলাম না। আমার হাজব্যান্ড বলতো, আল্লাহ আমাদের জন্য যা রেখেছেন তাই হবে। উনি যদি আমাদের সন্তান দেন তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি নাও দেন তাহলেও হয়তো এর মধ্যে কোন ভাল কিছুই রেখেছেন। তুমি মন খারাপ করোনা। তারপরও মানুষের কথা শুনতে তো খারাপ লাগতোই।

ডাক্তার দেখানোর পর উনি দু’জন কেই কিছু টেস্ট দিলেন। রিপোর্ট এ কোন খারাপ কিছুই আসেনি। তারপর আবার আশায় বুক বাধলাম। হয়তো এবার ভাল কিছু হবে। প্রতি নামাজে আল্লাহর আছে একজন নেক সন্তান চাইতাম৷ আলহামদুলিল্লাহ অবশেষে আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করলেন।

আমার নরমালি পিরিয়ড কখনো ইরেগুলার হয়না। তাই যখন একদিন ডেট ওভার হল তখনই পজেটিভ কিছু ধরে নিয়েছিলাম। ডেট ওভার হওয়ার এক সপ্তাহ পর বাসায় প্রেগন্যান্সি টেস্ট করলাম। আলহামদুলিল্লাহ পজিটিভ আসলো। তারপরও শিউর হওয়ার জন্য আবার এক সপ্তাহ পর টেস্ট করলাম। এবার ও পজেটিভ আসলো৷

আমি ভেবেছিলাম এক মাস পর ডাক্তারের কাছে যাব। কিন্তু এর মধ্যেই আমার অনেক বমি শুরু হল। দেখা গেল দিনে ৭-৮ বার করে বমি হতো। মাথা ঘুরানো, অরুচি সব মিলিয়ে একটা বাজে অবস্থা। রান্না করার সময় আমি আমার রুমে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতাম।

একদিন বমি করার সময় টের পেলাম আমার ব্লিডিং শুরু হয়েছে। রাতের বেলা। বাসায় আমার হাজব্যান্ড ও নেই। এতো ব্লিডিং হচ্ছিল যে দাড়িয়েও থাকতে পারছিলাম না। তারাতাড়ি রুমে এসে শুয়ে পরলাম। পরিচিত একজন গাইনী ডাক্তার ছিল। উনাকে ফোনে সব জানালাম। যদিও না দেখে উনি কোন ওষুধ দিতে চাচ্ছিলেন না তাও পরে ব্লিডিং আর বমি বন্ধ হওয়ার ওষুধ দিলেন। ৩ দিন পর ব্লিডিং বন্ধ হলে ডাক্তার দেখাতে গেলাম৷ ওখানে আল্ট্রাসাউন্ড এ আসলো যে বাচ্চা ভাল আছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমি এতো ভয়ে ছিলাম যে স্ক্রিনের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। ৩ মাস বেড রেস্ট আর প্রতি সপ্তাহে একটা করে ইঞ্জেকশন নিতে হবে।

নরমালি প্রতিদিন ২-৩ ঘন্টা রেস্ট নেওয়ার জন্য শুয়ে থাকা যায়। কিন্তু বেড রেস্ট এর মত খারাপ জিনিস আর নেই। শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠ ব্যথা হয়ে যেত। নড়লেই ব্লিডিং শুরু হতো৷ একটানা ২২ দিন ব্লিডিং হয়ে তারপর বন্ধ হয়। আর ইনজেকশন গুলো দেয়ার সময় এতো কষ্ট হতো যে নিজে নিজেই চোখ দিয়ে পানি ঝরতো। এক মিনিট লাগতো একটা ইঞ্জেকশন পুশ করতে। তারপর ২ দিন ওই জায়গাটা শক্ত হয়ে থাকতো।

৪ মাস শেষ হওয়ার পর আবার ডাক্তার দেখালাম। এইবার উনি আবার আমার সব টেস্ট দিলেন। এই প্রথম আমি আমার মেয়েকে দেখলাম। চোখের পানিতে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। ডাক্তার ও বুঝতে পারছিলেন যে এটা আমাদের প্রথম বেবি। যেহেতু আলট্রাসাউন্ড রুমে শুধু পেশেন্ট ঢুকার অনুমতি ছিল। তাই উনি বেবির একটা ছবি বের করে আমাকে দিয়ে দিলেন হাজব্যান্ড কে দেখানোর জন্য।

সাড়ে চার মাসের দিকে মনে হলো আমার পেটে কিছু একটা নড়ছে। অনেকে বলে প্রথম বেবির ক্ষেত্রে এতো তাড়াতাড়ি মুভমেন্ট বুঝা যায়না কিন্তু আমি খুব ভালভাবেই বুঝতে পারছিলাম। রাতে বা দুপুরে শুয়ে থাকলে বেশি বুঝা যেত।

৪ মাস ১৮ দিনের দিন আমি বাবার বাড়ি চলে আসি। এই সময় প্রায় পুরোটা রাস্তায় আমার বমি হয়েছে। এবং এরপর পুরো প্রেগ্ন্যাসিতে আর বমি হয়নি আলহামদুলিল্লাহ।

নরমালি আমি দেখেছি, যখন একটা মেয়ে কন্সিভ করে তখন তার মনে অনেক পজেটিভ নেগেটিভ ধারণা ঢুকিয়ে তাকে অনেক ভয় পাইয়ে দেয় আশেপাশের মানুষগুলোই। যেমন আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, আমি নরমাল ডেলিভারিতে খুব ভয় পাচ্ছিলাম। অনেকেই বলছিল, এতো পেইন সহ্য করতে পারবে না। তাই আমি ভেবেছিলাম সি সেক এই হয়তো আমার যেতে হবে। কিন্তু বাবার বাড়িতে আসার পর আমি আলহামদুলিল্লাহ অনেক সাহস পেলাম নরমাল ডেলিভারিতে যেতে।

অনেকেই আমাকে বলেছে নরমাল ডেলিভারি চাইলে অনেক হাটতে হবে। নরমাল কাজ করতে হবে। কিন্তু আমি বেশি কিছু করতে পারতাম না। হাপিয়ে যেতাম। যদিও সাপ্লিমেন্ট চলছিলো ফুল প্রেগ্ন্যাসিতেই৷ আমি হাটতেই পারতাম না। ১০ মিনিট হাটলেই আমার মাথা ঘুরানো শুরু হতো। আমি ডিম খেতেই পারিনি প্রেগন্যান্সিতে। অনেকেই বলে এটা খেতে ইচ্ছা করে ওটা খেতে ইচ্ছা করে বাট আমার কিছুই খেতে ইচ্ছা করতোনা। সারাক্ষণ মুখ তেতো হয়ে থাকতো। এই তেতো ভাব টা ডেলিভারির আগ পর্যন্ত ছিল।

৭ মাসে চেক আপ করলাম। আলহামদুলিল্লাহ সব ভাল ছিল। কিন্তু বেবির ওজন টা একটু কম ছিল। ৮ মাসেও একই অবস্থা। ফুল প্রেগ্ন্যাসিতে আমার ওজন বেড়েছিল ১৫ কেজি। যেটা নরমাল৷

বেবি মুভমেন্ট অনেক হতো। ৮ মাস যেদিন শেষ হলো ওইদিন খেয়াল করলাম মুভমেন্ট উপরের পেটের দিকে হচ্ছে না। তলপেটে হচ্ছে। আর শরীর টা অনেক ভারী মনে হচ্ছিল।

আমার ইডিডি ছিল একদম রোযার ঈদের দিন। তাই খুব টেনশনে ছিলাম আরো। বাসায় বাবা মা ছাড়া আর কেউ ছিল ও না। কিভাবে কি করব? হাজব্যান্ড ও বিজনেস ছেড়ে গিয়ে থাকতে পারবে না। আমার এক বন্ধু ছিল ডাক্তার। ওর সাথে কন্টিনিউ যোগাযোগ রাখতাম। তারপর ও টেনশন তো হতোই।

জুনের ৫ তারিখ আমার ডেলিভারি ডেট ছিল। কিন্তু মে মাস শুরু হতেই আমার মনে হলো আর পারছি না। হাটতে পারছিনা। বসে ও থাকতে পারছিনা। পায়ে পানি চলে আসছে। প্রচন্ড গরমের দিন। সব মিলিয়ে আমার অস্থির দিন কাটছিল। মে এর ১২ তারিখ আবার ডাক্তার দেখালাম। এবার তো আরও টেনশন বেড়ে গেল। আমার প্রেশার ফল করেছে অনেক। ডাক্তার আমার প্রেশার ই পাচ্ছিল না। বেবি মুভমেন্ট ও কম হচ্ছে অনেক। একদিন অক্সিজেন দিয়ে রাখলেন। আর ব্লাড ডোনার রেডি রাখতে বললেন।

ওইদিন অক্সিজেন দেওয়া শেষ হলে আমি বাসায় চলে আসি। ১৫ তারিখ রাতে ঘুমের মাঝে আমার পেইন উঠে। আম্মা আমার পাশেই ছিলেন। পায়ে কিছুক্ষণ তেল মালিশ করে দেওয়ার পর ভোরবেলা ব্যথাটা চলে যায়। ফলস পেইন আমার ওই একবারই হয়েছিল।

১৯ তারিখ সকাল ৬ টায় আমার ঘুম ভেঙে যায়। তলপেটে চিন চিন একটু ব্যথা হচ্ছিল। বাথরুম ঘুরে এসে একটু শুয়ে রইলাম। ব্যাথাটা থেমে থেমে আবার হচ্ছিল। ৭ টায় আর সহ্য করতে না পেরে আম্মা কে জানালাম। ৮ টা বেজে গেছে। ব্যথা যাচ্ছে না। আমাদের পাশের বাসায় একজন অভিজ্ঞ nurse ছিলেন। আম্মা ওই আন্টিকে জানালেন। ডাক্তার আমাকে একটা পেইন কিলার দিয়েছিলেন। ওটা খেয়ে যদি পেইন না কমে তখন ওটা ডেলিভারি পেইন হবে উনি বলেছিলেন। ওই ওষুধ টা খাওয়ার পরও পেইন কমছিল না। আস্তে আস্তে পেইন টা বাড়ছিল।

ডেলিভারিতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই খালি পেটে না থাকাই ভাল। ডেলিভারি পেইন এটা বুঝার পর আম্মা আমাকে ভাত খাইয়ে দিলেন। আমার হাজব্যান্ড কে জানানো হল। আমাকে আন্টি জোরে জোরে পা ফেলে হাটতে বললেন। আমার একটু পর পর বাথরুমের প্রেশার হচ্ছিল। যেটা নরমাল। কিন্তু বারবার বাথরুমে যেতেও ভয় লাগছিল। ১১ টার দিকে আন্টি চেক করে বললেন জরায়ু মুখ খুলে গেছে অনেক খানি। উনি আশা করছিলেন যে যোহরের নামাযের আগেই হয়তো ডেলিভারি হয়ে যেতে পারে।

১২ টা ১০ মিনিটে আমার একচুয়াল ডেলিভারি পেইন শুরু হলো। এতো ব্যথা যে আমাকে ২-৩ জন ধরে রাখছিল। আমাকে আন্টি ব্যথার সাথে সাথে নিচের দিকে পুশ করতে বলছিলেন। কিন্তু ব্যথা শুরু হলেই আমার পুশ করার কথা মনেই থাকতো না।

১২ টা ৩০ মিনিটে বাবুর মাথা চলে আসছে কিন্তু আমি পুশ করতে পারছিলাম না৷ বাবুর মাথায় প্রেশার পরছে দেখে আন্টি আর রিস্ক নিতে চাইলেন না। এপিসিওটোমির প্রিপারেশন নিলেন।

এইবার আমি ঘাবড়ে গেলাম। যে কাটাকাটির ভয়ে আমি সিজারে গেলাম না তা আমার সাথেই হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার ছিল না। ১২ টা ৪৫ এ উনি এপিসিওটোমি করে দিলেন। এইবার ব্যথার সাথে সাথেই ভালভাবে পুশ করতে পারলাম। আলহামদুলিল্লাহ ১২ টা ৪৯ এ আমার মেয়ে পৃথিবীতে আসে। সাথে সাথেই সব পেইন মনে হলো ভ্যানিশ হয়ে গেল। পরে প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল বের করার সময় ও একটু চাপ দিয়েছে। তবে ডেলিভারির ব্যথার কাছে ওটা কিছুই না।

আব্বা আমার মেয়ের কানে আযান দিলেন। এপিসিওটোমি সেলাই করে সব ক্লিন করতে করতে ২ টা বেজে যায়। এরপর আমার হাজব্যান্ড গিয়ে আবার মেয়ের কানে আযান দেয়। সত্যিই এই সময় গুলোর চেয়ে মূল্যবান আসলে কিছুই নেই।

এরপরও অনেক কিছুর পর দিয়ে একটা নতুন মা কে যেতে হয়। ব্রেস্ট ফিডিং, ইনফেকশন, মানসিক চাপ ইত্যাদি। তারপরও মাতৃত্বের চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নেই।

কিছু বিষয় যা সবার জানা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি-

১. সি সেক বা নরমাল যেটাই হোকনা কেন মিনিমাম ৬ মাস কোন ভারী জিনিস না উঠানো।

২. এপিসিওটোমি করে যাদের ডেলিভারি হয় তারা সেলাইয়ের সুতা টা না মিলিয়ে যাওয়া পরযন্ত গরম পানি ব্যবহার না করা।

৩. ডেলিভারির পর হাই কমোড ব্যাবহার করা।

৪. সেলাইয়ের জায়গা টা সব সময় শুষ্ক রাখার চেষ্টা করা। যদিও এসময় ব্লিডিং এর কারনে ভিজা থাকে তারপরও টিস্যু দিয়ে যতটা সম্ভব শুষ্ক রাখতে হবে।

৫. রাতে ঘুমানোর সময় ফ্যানের বাতাসে কিছুক্ষন সেলাইয়ের জায়গাটা খুলে রাখা। তাহলে সেলাই টা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে।

(লিখেছেনঃ উম্ম ইনায়া)

ছবিঃ Pexels