পর্ব ১ 


জীবনে কিছু অভিজ্ঞতার কোনো তুলনা হয় না। নিজের বাচ্চাদের জন্মের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে তেমনি একটি অভিজ্ঞতা, তার উপর যদি খুব অসাধারণ কিছু ঘটে ডেলিভারির সময়, তাহলে তো কথাই নাই।


আমার মিরাকেল বারথের ঘটনাটা না লিখলেই না। তাই আজকে সময় করে বসলাম লিখতে। হয়ত কারো উপকার হবে জানলে যে এমনও হতে পারে!
আমার প্রথম বাচ্চার জন্মেরও অনেক স্মৃতি, ইনশাআল্লাহ লিখব এক সময় সেই গল্পটাও। আজকে বলি আমার দ্বিতীয়জন হওয়ার সময় কী হয়েছিল সেই গল্প।


খুব চাচ্ছিলাম নরমাল ডেলিভারি হোক। প্রথমজনও নরমাল (NVD) হয়েছিল আলহামদুলিল্লাহ। যাক এবার খুব একটিভ ছিলাম, শুরু থেকেই চেষ্টা ছিল একটিভ থাকার, আর উপায়ও ছিল না কারণ বড় ছেলেকে দেখে রাখা, বাসার কাজ, অনলাইন অফিসের কাজ ইত্যাদি করতে হতো। সময় পেলেই বার্থবলে বসে একটু এক্সারসাইজ করতাম বিশেষ করে শেষের দিকে।
প্রথম ডেলিভারির সব কথা, খুঁটিনাটি মনে করে সেই অনুযায়ী এইবার দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সিতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যেন নরমাল ডেলিভারি হয় আল্লাহর হুকুমে। ডাক্তারের রেগুলার এপয়েন্টমেন্ট শেষে নিয়ম করে বড় একটা পার্কে যেতাম যেন বেশ খোলা বাতাসে বড় জায়গায় হাটতে পারি। ঘরের কাজে এবার বেশ সময় দিয়েছি। হাতে ধুতাম অনেক কাপড়। থালাবাসন ধোয়া, হাড়ি পাতিল ধোয়া ইত্যাদি অনেক কিছু।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন


ঘটনার শুরু মূলত যেইদিন ৩৯ সপ্তাহ হলো, সেইদিন থেকে। সোমবার ছিল। রেগুলার এপয়েন্টমেন্ট ছিল ডক্টরের। সেখান থেকে পার্কে চলে গেলাম যেমন প্রতিবার যেতাম ডক্টরের চেম্বার থেকে বের হয়ে। উদ্দেশ্য ছিল খুব হাঁটাহাঁটি করা। শুনেছিলাম ন্যাচারাল ডেলিভারিতে খুব এফেক্টিভ হাঁটাহাঁটি।


সাধারণত নরমাল হাঁটাহাঁটি করতাম পার্কে। এবার খুব সিরিয়াসলি হাঁটলাম কিছুক্ষন, ছেলেকে তার বাবার কাছে দিয়ে। সেইদিনটা পার হল। পরের দিন মঙ্গলবার রাতে এমনি হঠাৎ প্ল্যান করে আস্ত মুরগির রোস্ট করলাম (ছেলের বাবা সাহায্য করলেন গরম ওভেনের কাজে), খাবার শেষে সমস্ত বাসন মেজেও ফেললাম আলহামদুলিল্লাহ।


রুমে এসে কী মনে করে স্কোয়াট পজিশনে বসলাম এক দুই মিনিট, মনে হল এবার স্কোয়াট করাই হয়নাই। ছেলেকে গল্প বলতে বলতে আবার বসলাম বার্থবলে। রুমেও হাঁটলাম একটু। ছেলে খুব দেরীতে ঘুমালো কেন যেন, রাত ৩টা বেজে গেল সেইদিন! ছেলের বাবাও ওর সাথে ঘুমালো। আমি শুধু শুধুই জাগলাম সাড়ে চারটা পর্যন্ত। ৫:৫২তে ঘুম ভেঙে গেলো ফজরের এলার্মের আগেই।


ওযু করতে গিয়ে মনে হল ব্যাক কন্ট্রাকশন হচ্ছে। বড় ছেলের সময় এরকম সারা রাত ধরে হয়েছিল দেড়টা থেকে ৬টা ৪০এ পানি ভাঙা পর্যন্ত, তাই এবারও ভাবলাম হয়ত মাত্র শুরু। 


ফিরে আসি এবারের ঘটনায়। নামাজ পড়তে পড়তে টের পেলাম কন্ট্রাকশন্স একইরকম, কিন্তু সামনের দিকে মানে পেটের উপর তখনও কিছু অনুভব করলাম না দেখে ভাবলাম হয়ত সময় আছে।


সাড়ে ৬টার দিকে হাসব্যান্ডকে বললাম মনে হয় সময় আছে। তুমি আরেকটু ঘুমাও। এরকম বলার পিছনে কারন ছিল অনেকের বার্থ স্টোরি পড়েছিলাম যে এরকম ব্যথা শুরু হয়ে বেবি হয় বেশ কয়েক ঘন্টা পরে। তাই এস্টিমেট করতে ভুল করে ফেললাম!


ব্যথাটা ছিল শুধু পিঠে। ঠিক যেমন আগেরবার হয়েছিল শুরুতে। না দাঁড়িয়ে আরাম পাচ্ছিলাম, না বসে, না শুয়ে। একটা ভিডিওতে দেখেছিলাম একজন এক্সপার্ট বলছিলেন, নিজের ইনস্টিংক্টস অনুযায়ী কাজ করলে এরকম ব্যথায় একটা মানুষ চার হাত পায়ে ভর দিয়ে কুঁজো হত। (if you followed your instincts, you would be crouching on all fours!) আমি তাই করলাম। আবার সাথে সাথে হিপ রোটেশন করলাম যেমন আগে এক বোন সাজেশন দিয়েছিলো। এখন আমি মনে করি এটাই আমার লেবর অতি দ্রুত প্রগ্রেস হতে সহায়ক ছিল আলহামদুলিল্লাহ, আর আগে থেকেই আমি, আমার মা আরো অনেকে দুআ করেছিলাম সহজ ডেলিভারির জন্য। কয়েকদিন ধরেই আজওয়া খেজুর খাচ্ছিলাম ৬-৭টা করে, এই রাতেও খেয়েছিলাম। এটাও হয়ত ডিলেশন হতে সহায়ক হয়েছিল। সব মিলিয়ে হল এক মিরাকেল বার্থ… 


রুমেই ছিলাম পুরো সময়। বড় ছেলে ঘুম বিছানায়। কিছুক্ষন পরে মনে হল কন্ট্রাকশন কাছাকাছি সময় হচ্ছে। টাইম ইন করার চেষ্টা করলাম, হাসব্যান্ডকে বললাম যেতে হবে। ও রেডি হতে শুরু করল, কিন্তু ভাবল সময় আছে। ব্যাগ গুছানো ছিল, সব চেক করল। আমার আবায়া বাইরে শুকাতে দিয়েছিলাম, এনে দিলো। আমার ফাইল এটাসেটা ও রেডি করছে এদিকে তখন আমার ব্যথায় কথা বলা সম্ভব হচ্ছেনা।


আবায়া, মাস্ক পরে রেডি হলাম প্রচন্ড ব্যথার মধ্যেই। আম্মুকে দেশে মেসেজ পাঠালাম। বললাম দুআ করতে।
ব্যথায় অস্থির হয়ে বাথরুমে গেলাম, মনে হল অটোমেটিক্যালি বডি পুশ করা শুরু করেছে! ভয় পেয়ে গেলাম। তখন যে ওয়াটার ব্যাগ থেকেও পানি বের হয়েছে সেটা বুঝতে পারিনি। এতক্ষন ছিলাম ভিতরে যে হাসব্যান্ড জানতে চাইল আমি ঠিক আছি কিনা। বললাম হ্যাঁ…


ও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রেখেছিল। তবে আমাকে নিতে আবার ভিতরে আসল। অবশেষে বের হলাম আমরা, তখন সকাল ৮টার বেশী বাজে। Rush hour ট্রাফিকের কথা আমার খেয়াল ছিল না তাহলে হয়ত ব্যাপারটা অন্যরকম হত।

পর্ব ২ 


কাছের মেডিকেল সেন্টারে যাব কিনা এটা ভাবতে ভাবতেই হাসব্যান্ড গাড়ি টার্ন করল বড় রাস্তায় উঠার জন্য। কন্ট্রাকশন্সের জন্য কথা বললাম না কোন। আল্লাহকে ডাকছিলাম।


এলাকার বড় হাসপাতালও দ্রুত পার হলাম, তখন ব্যথায় আমি কিছু ভাবতে পারছিলাম না। হাসব্যান্ড তখনও ঠিক জানেনা যে আমি লেবরের কোন পর্যায়ে। আমি নিজেও জানি না সত্যি কথা বলতে!


জ্যাম দেখলাম চৌরাস্তা পার হয়ে! তখন আমি জোরে জোরে কয়েকবার চিৎকার করে উঠলাম ব্যথায়। নিজে থেকেই পুশ করল বডি দুই-একবার. এটাই আমার পুশিং ছিল। আর আলাদা কোন পুশ করিনি… চারিদিকে গাড়ির সমুদ্র। হাসব্যান্ড বুঝে গেল আমার হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হবেনা যেখানে ডাক্তার দেখাচ্ছিলাম। এমনিতে যেটা ১৫ মিনিট ড্রাইভ, এই rush hour এ সেটা কতক্ষন লাগবে আল্লাহু ‘আলাম। তাই আমার হাসব্যান্ড দ্রুত জানতে চাইল আরেকটা হাসপাতালের কথা, সেখানে যাব কিনা। ওখানেই হয়েছিল আমার বড় ছেলে। মনে পড়ল আমার ডাক্তার সকালের এই সময়ে ওখানেই থাকবেন (এবার একটু দূরের হাসপাতাল বেছে নিয়েছিলাম করোনার সময়ের ভিড় থেকে বাঁচতে)।


যাক আল্লাহর তরফ থেকেই ছিল এটা, হাসব্যান্ড গাড়ি ইউ টার্ন করল সেই হাসপাতালে যাওয়ার জন্য। আমরা ভিড় ছাড়িয়ে একটা নীরব রেসিডেন্সিয়াল এলাকায় প্রবেশ করলাম, আর আল্লাহ তাআলা এই সময়টা পছন্দ করলেন আমার ছেলে এই পৃথিবীতে আসার জন্য। একটা মানুষও ছিল না কোথাও।


টের পেলাম আমার বেবির মাথা এসে গেছে বাইরে। একটা ভিডিও দেখেছিলাম ইউটিউবে দুই-এক বছর আগে। ঠিক সেইম পজিশনে ছিল মা ফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার সিটে, বাবা ড্রাইভ করছিলো আর ভিডিও করছিল। বেবি হওয়াটা যতটা গ্রাফিক ঘটনা সাধারণত, এই ভিডিওতে অতকিছু বোঝা যায়নি, কিন্তু ভিডিওটা মনে পড়ে গেল ঠিক সেই মুহূর্তে। আমিও সেটা মনে করে কাপড় এডজাস্ট করলাম। আক্ষরিক অর্থেই আমার জামার বাঁধা পেয়ে বেবির শুধু মাথার তালুটা বাইরে এসেছিলো। জামা সামান্য একটু এডজাস্ট করতেই নিজে নিজে বের হয়ে আসলো ও। মাথাটা বের হল, চুল দেখলাম প্রথম, অর্থাৎ face down ছিল। আমি ভেবেছিলাম sunnyside up হতে পারে যেহেতু আমার কেবল ব্যাক কন্ট্রাকশন্স হচ্ছিলো।


আগেই পড়েছিলাম এইরকম সময়ে বেবিকে আটকে রাখা, ওই পজিশনে রেখে দেয়া, বের হতে না দেওয়াটা ভয়ংকর হতে পারে। তাই আমার একবারও মনে হয়নাই যে এভাবেই থাকুক। আগেও শুনেছি ডাক্তার আসার আগে নার্স কখনো কখনো বলে পুশ করবেন না, বা এমনকি একজনের বেবিকে ওভাবে ধরে রেখেছিলো নার্স ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে। আমি তাই সাথে সাথেই চেষ্টা করলাম যেন বেবি বাইরে চলে আসে। 


অনেক আগে শুনেছিলাম বাবু নিজে নিজেই মাথা বের হওয়ার পর কাঁধটা ঘুরে, তাই হল। আমার হাতে বের হল আমার বাচ্চা, আমার হাসব্যান্ড তখন ড্রাইভ করছে। বেবি সামনের দিকে ঘুরল, অনুভব করলাম ওর পা তখনও ভিতরে, আস্তে করে বের করলাম। ইয়া রাব্বি ইয়া রাব্বি বলে আল্লাহকে ডাকলাম, বললাম আল্লাহ আমার বাচ্চাকে বাঁচাও। হাসব্যান্ডও জোরে আল্লাহকে ডেকে উঠল। বলল, কাছের হাসপাতালে নিব? আমি সায় জানালাম। তাড়াতাড়ি এসি বন্ধ করতে বললাম। মনে ছিল যে জন্ম হয়েই বেবির খুব ঠান্ডা লাগে, কিন্তু আমার কাছে কিছু ছিল না বেবিকে জড়ানোর মত, পরনে ছিল কামিজ, পায়জামা, আবায়া আর স্কার্ফ। সকালের রোদে ও এদিক ওদিক তাকাল চোখ পিটপিট করে। আমার মনে ছিল জন্ম হয়েই কাঁদতে হয়, আমি খুব হালকা একটা ঝাকুনি দিলাম “ও কাঁদছে না যে?” বলে। সাথে সাথেই কাঁদল আলহামদুলিল্লাহ।


সাত-আট মিনিট লাগল সেই হাসপাতালে পৌঁছাতে। ইমার্জেন্সির সামনে হর্ন দিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে গেল আমার হাসব্যান্ড। স্ট্যাফ দৌড়ে আসল উইলচেয়ার নিয়ে। আমি গাড়ি থেকে বের হয়েই বাবু কোলে নিয়ে বসে গেলাম উইলচেয়ারে। আমাকে এক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে দিল ইমার্জেন্সির ভিতরে। আমি জোরে জোরে বলতে শুরু করলাম বেবির কর্ড কাটতে হবে! ইমার্জেন্সির দুই মহিলা ডাক্তার দৌড়ে আসলেন, “গাইনি গাইনি” বলে চিৎকার করতে করতে আমাকে নিয়ে লিফটে রওনা দিলেন লেবার রুমে। আমরা ওখানে গেলাম, সিনিয়র ডিউটি ডাক্তার দৌড়ে এসে বললেন তোমরা আমাকে নিচে যেতে খবর দিয়ে পেশেন্ট উপরে নিয়ে এসেছো! যাক অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই হল এসব, কর্ড কাটা হল। আমাকে বলল ক্লিনাপ করবে, তখন বুঝলাম প্লাসেন্টা ডেলিভারিও হয়ে গেছে, এত ঘটনার মধ্যে আমি টের পাইনি। অবশ্য পড়েছিলাম এরকম হয়, নানান ঘটনার মধ্যে অনেকেই প্লাসেন্টা ডেলিভারি আলাদা করে খেয়ালও করেনা। আমার দুই বাচ্চার সময়ই এটা হয়েছে। তবে ওনাদের সামনে হয়নি বলে আমাকে কিছুক্ষন পরে আল্ট্রাসাউন্ড করতে হয়েছিল, কন্ফার্ম হওয়ার জন্য যে ভিতরে কিছু রয়ে যায়নি। 


ক্লিনাপের সময় ডাক্তার যখন বললেন, “দেখি টিয়ার হয়েছে কিনা? হুম হয়েছে।” আমি জানতে চাইলাম, “কতখানি? মানে ফার্স্ট ডিগ্রী না সেকেন্ড ডিগ্রী…?” ডাক্তার উত্তরে বললেন, “সেকেন্ড ডিগ্রী। এতো কিছু জানো তাহলে এতো দেরী করে আসলে কেন?” 🙂 
বেবি মিকোনিয়াম (প্রথমবার স্টুল) করে দেওয়ায় দুইদিন অব্জারভেশনে থাকতে হয়েছিল। এই ডাক্তারও একই ধরণের কথা বললেন, আমাদের সামনে বেবিটা হলে এই ক্ষেত্রেও আমরা রিলিজ করে দিতাম কিন্তু বেবি গাড়িতে হয়েছে, তাই আমরা অবজার্ভ করব কোনো ইনফেকশন হয় কিনা। আল্লাহর অশেষ রাহমাতে বাবু একদম ঠিক ছিল। বার্থ ওয়েইট ছিল ৬.২ পাউন্ড। ডেলিভারি শেষে সবাইকে খবর দিয়ে যখন আমরা একটু জিরাচ্ছি, তখনও সকাল ১০টা মাত্র, বাসায় বড় ছেলে ঘুম। ওর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিলো আর ইচ্ছা ছিল ঐদিনই বেবিকে বাসায় নিয়ে যাই কিন্তু কিছুটা সাবধানতার কারণে ডাক্তারের উপদেশ মেনে অব্জারভেশন প্রোটোকল দুইরাত শেষ হওয়ার পর আমরা বাসায় আসলাম। দুআও করেছিলাম আগেই যেন যেদিন ডেলিভারি সেইদিনই বাসায় ফিরতে পারি। নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। কাছের হাসপাতাল হওয়ায় ওর বাবা রাতে দুইদিনই গিয়ে ওকে নতুন খেলনা দেয়া, গোসল করা, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো এসব করল। বাসায় দাদা দাদী ছিলেন, দিনের বেলা তাঁদের কাছেই ছিল এই দিনগুলোতে। 


আমি যাওয়াআসা করলাম না বেবিকে ফিড করাবো বলে। আমাকে ডিসচার্জ করার পর তাই ফিডিংএর জন্য থাকলাম হাসপাতালে। অস্থির হয়ে গেছিলাম বাসায় যাওয়ার জন্য আমার বড় ছেলের কারণে।

আলহামদুলিল্লাহ তিন বছরও হয়নি কিন্তু অনেক ধৈর্য ধরল আমার ছেলে। আল্লাহ সব সহজ করে দিলেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে বড় ছেলেকে হাসপাতালে আনিনি। 


আমাকে দেখতে দল বেঁধে আসছিলো অনেকেই, আর সবাই ভীষণ অবাক হচ্ছিলো। প্রথমে আসল স্টুডেন্টদের দল। ডিটেইলস জানতে চাইল। খুব অবাক হচ্ছিলো ওরা। নার্স বলাতে আমি তখন স্যান্ডউইচ আর কফি খেতে খেতে কথা বললাম, বলল ডেলিভারি হয়েছে মাত্র, তাই কিছু খেতে। 


কন্সাল্ট্যান্ট ডাক্তার এসে কথা বললেন। স্টিচ চেক করলেন। উনিও খুব অবাক আমার ঘটনায়। আমি বললাম আমি তো ভাবতাম এরকম শুধু মুভিতে হয়! ৩-৪জন ডাক্তার ছিলেন, সবাই হেসে দিলেন! 
দ্বিতীয়দিন দেখা করতে আসল ইমার্জেন্সি টিম। হাসিখুশি চমৎকার টিম। জানতে চাইল কী হয়েছিল? ডিটেইলস বললাম! ওরাও বিস্ময় প্রকাশ করল। বলল এরকম কেইস আগে পায়নি। জানতে চাইল আমি এতো কাভার্ড কীভাবে ছিলাম? বললাম আল্লাহ হওয়ায় দিয়েছেন। এটা আমাকে অনেকেই জিগ্যেস করেছে পরেও। আরেকটা প্রশ্ন ওদের ছিল – এটাও অনেকে জানতে চেয়েছে – গাড়ির নিশ্চয়ই একদম খারাপ অবস্থা! সবাই খুব অবাক হচ্ছিলো যখন আমার হাসব্যান্ড সবাইকে বলছিল যে না, বোঝাই যাচ্ছে না! আসলেই তাই। গাড়িতে প্রায় কোনো চিহ্নই ছিল না। 


এটাও আমার কাছে মিরাকলের মতোই। পুরো ঘটনাটাই এক আশ্চর্য ঘটনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। 


আমার ডাক্তারের কথা সবাই জিজ্ঞাসা করছিলেন, নাম শুনেই চিনতে পারছিলেন। একজন ডাক্তার বললেন, ওনাকে জানিয়েছেন? বললাম, না, জানাবো। মজার ব্যাপার হল জানানোর পর আমার ডাক্তারও খুব অবাক হয়েছিলেন, বলছিলেন এরকম দেখেন নাই যে মা নিজে ডেলিভারি করেছে। 


আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে প্রথম যেটা আমি বলব যাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় ডেলিভারি এবং ঘরের কাজে এক্টিভ, বেশী দেরী করবেন না। পেন উঠলে তাড়াতাড়ি যাওয়া ভালো, যেন এরকম কোন অবস্থা না হয়। সাথে আমার ধারনা আমি যে “crouching on all fours” আর হিপ রোটেশন করেছিলাম দুই ঘন্টা যাবৎ প্রতিবার কন্ট্রাকশন আসলেই, এটাও একটা বড় কারণ ভীষণ তাড়াতাড়ি প্রগ্রেস হওয়ার পিছনে। লেবার প্রগ্রেস ধীরে হচ্ছে মনে হলে চেষ্টা করে দেখতে পারেন ইনশাআল্লাহ যদি অন্য কোন সমস্যা না থাকে। 


প্রতিটা গল্পেই তার নিজস্ব বিশেষত্ব থাকে, আমি ভরসা রেখেছিলাম আমার রবের উপর, যিনি বলেছেন, {ثُمَّ السَّبِيلَ يَسَّرَهُ} [عبس : 20]

সত্যিই আল্লাহ সহজ করে দিলেন কল্পনাতীত! আলহামদুলিল্লাহ।

(লিখেছেন উম্ম ই.)

ছবিঃ Pinterest

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা