গর্ভাবস্থায় আমাদের সবসময় ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে বলা হয়। আবার অন্য দিকে হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে প্রচুর মুড সুইং হয়। অনেকের পরিস্থিতিও ইতিবাচক থাকার পথে বাধা হয়ে দাড়ায়। কারো জন্য হয়ত গর্ভধারণ এমন সময় হয়েছে যখন এটা তার জন্য খুব কষ্টকর। সেটা ছাড়াও গর্ভাবস্থার শেষ সময়টা সকলের জন্যই খুব অস্বস্তিকর হয়। ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা এই সময় সত্যিই কঠিন। তাই কিভাবে ইতিবাচক থাকা যায় এই নিয়ে কিছু পড়াশোনা থাকলে উপকারে আসতে পারে। জানা জিনিসও আবার পড়লে মনের ওপর নতুন করে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর আমরা সকলেই জানি ধর্ম পালন মনে শান্তি এনে দেয়। তাই আমাদের আজকের আয়োজন ইসলাম কিভাবে ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে এই নিয়ে।

ইসলাম ও পজেটিভ সাইকোলজির মেলবন্ধন

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

মনোবিজ্ঞান ও ধর্ম – এই দুটি বিষয় প্রায়ই গবেষণায় একসাথে স্থান পায়।  সাধারণত এই ধরনের গবেষণার মূল লক্ষ্য থাকে কেন মানুষ ধর্মের অনুসরণ করে বা কেন ধর্মকে মানুষের প্রয়োজন এবং কিভাবে এটা তাদের জীবনে এক উচ্চতর অর্থ বহন করে। নিচের লেখায় এই বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।

পজেটিভ সাইকোলজি ও ইসলামের মৌলিক সংজ্ঞা এবং এ দুইয়ের মাঝের প্রগাঢ় সম্পর্ক নিয়েই আলোচনা শুরু করা সঠিক হবে বলে মনে করছিঃ

“পজেটিভ সাইকোলজি” মনোবিজ্ঞানের মোটামুটি নতুন এক শাখাএক কথায় এটা হচ্ছে”মানুষের সর্বাপেক্ষা কাম্য আচরণের বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র। ব্যক্তি ও সমাজের সমৃদ্ধকরণে যেসব জিনিস সহায়তা করে তা খুঁজে বের করে তুলে ধরাই এর লক্ষ্য।”

অপরদিকে, “ইসলাম” হচ্ছে একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম যা এক স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে (১)। এই বিশ্বাসই উপরে উল্লিখিত “মানুষের সর্বাপেক্ষা কাম্য আচরণের” চাবিকাঠি। এই ধারণা “ইসলাম” শব্দের মাঝেই বিদ্যমান। এই আরবী শব্দটির মূল হচ্ছে سَلَمَ যা থেকে তিনটি মৌলিক শব্দ এসেছেঃ আত্মসমর্পণ (إِسْتِسْلَام), শান্তি (سَلَام) ও পবিত্রতা (سَلِيْم)। 

ইসলাম এই তিনটি অর্থই বহন করে। যদি কোন মানুষ সম্পূর্ণভাবে শুধু এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং শুধু তাঁরই ইবাদত করে তাহলে সে দুনিয়ার জীবনে ও মৃত্যুপরবর্তী জীবনে স্রষ্টা প্রদত্ত যা কিছু আছে সবকিছু নিয়ে শান্তিতে থাকবে। অর্থ্যাৎ,

স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করা = দুনিয়ায় শান্তি  সম্পৃতি 

স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করার এই ধারনা শুধু যে মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত তা কিন্তু নয়! মানুষ স্বীকার করুক বা না করুক, প্রত্যেককেই স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয় কারণ আমরা কেউই স্বেচ্ছায় জন্ম নেই না বা আরোগ্য লাভ করি না। কিছু অসুখ থেকে সুস্থতা লাভ করা যায় আবার কিছু অসুখ থেকে সুস্থ হওয়া যায় না। কেউ কেউ আবার আরোগ্য লাভ করা সম্ভব এমন অসুখ থেকেও সুস্থ হয় না। এ সবকিছুই মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন।

একজন মুসলিম যখন নির্দ্বিধায় স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে তখন সে এমন এক সত্ত্বার কাছে নিজেকে সঁপে দেয় যে জানে সে কখন জন্ম নিবে এবং তাকে যে কোন অসুখ থেকে সুস্থ করে দিতে পারে। তাই সে অন্তরে এক ধরণের প্রশান্তি লাভ করে ও যা কিছু তার জীবনে ঘটে তাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে কারণ সে জানে যে সে এমন এক সত্ত্বার হাতে আছে যিনি সব কিছু করতে পারেন। নিজের স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করার মানে হচ্ছে আমাদের ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক জীবনে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা; নিজেকে ও নিজের চারপাশকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা কারণ সে বিশ্বাস করে যে তার জন্য যা ভালো স্রষ্টা তা-ই করেছেন।

“আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, তাঁরই অনুগত হবে এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবে।” (কুরআন ৩ঃ ৮৩)

মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস করে যে আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞানী। আমরা সকলেই জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পরেছি যা শুরুতে ভালো মনে হলেও পরবর্তীতে আর তেমনটা হয়নি যেমনটা আমরা চেয়েছিলাম। একইভাবে, আমরা সবাই ‘শাপে বর’ কথাটার সাথেও পরিচিত। আল্লাহ্‌ কুরআনে বলেছেন:

“তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়ত কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।” (কুরআন ২ঃ২১৬)

আমরা যদি মেনে নিতে পারি যে আমরা সব কিছু জানি না তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য যা আছে তার ব্যপারে আমাদের মন প্রশান্ত থাকবে; আমরা সবসময় খুশি থাকব, অন্ততপক্ষে নিজেদের পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব। শ্যারন ও শেইনার তাদের গবেষণায় এমন ইতিবাচক চিন্তার কথাই বলেছেন ( www.reflectivelearning.com, ২০০৭, পৃ. ৪): “অতীতের প্রতি ইতিবাচক আবেগের মাঝে রয়েছে সন্তুষ্টি, তৃপ্তি, গর্ব ও প্রশান্তি”। 

একই গবেষণায় ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত ইতিবাচক ভাবনার মাঝে আরও উল্লেখ করা হয়েছে আশাবাদ ও আস্থার কথা। এই দুটো জিনিসই মুসলিমদের এই বিশ্বাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত যে স্রষ্টা হচ্ছেন আমাদের প্রতিপালক, রক্ষণাবেক্ষণকারী। এবং নিজের রক্ষাকর্তার কাছে আত্মসমর্পন করা এক অপরিহার্য বিষয়। এর ফলে দুনিয়ার বুকে ভাগ্যানুসন্ধান করতে বেরিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত মনে থাকতে পারি কারণ আমরা জানি যে স্রষ্টা হচ্ছেন আমাদের প্রতিপালক যিনি সাগরের মাছ ও আকাশের পাখিকে যেভাবে রিযিক দান করেন তেমনভাবে আমাদের জন্যও খাদ্যের সংস্থান করে রেখেছেন। একবার ভাবুন তো, যখন কেউ জানবে যে খাবার জোগাড় করার জন্য তাকে কোন ইঁদুর দৌড়ে অংশ নিতে হবে না বরং স্রষ্টা আগে থেকেই তার জন্য খাদ্য বরাদ্দ করে রেখেছেন তখন সে কেমন নিশ্চিন্ততা অনুভব করবে (২)!

আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক  প্রতিশ্রুত সবকিছু। (কুরআন ৫১ঃ২২)

উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, ইসলামের এই মৌলিক সংজ্ঞায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পন করাই হচ্ছে শান্তি ও সম্পৃতির চাবিকাঠি। এই ধারনা পোষণ করা ও স্রষ্টার সাথে তেমন সম্পর্ক স্থাপন করা মুসলিমদের বিষণ্ণতা থেকে রক্ষা করে। শ্যারন ও শেইনারের মতে, এটা প্রমাণিত যে ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত ইতিবাচক ভাবনা বিষণ্ণতা প্রতিরোধ করে। সবকিছুই নির্ধারিত আছে ও যা কল্যাণকর তাই হবে। এই বিশ্বাস যদি আমরা বুঝে পালন করতে পারি তাহলে তা আমাদের পরিতৃপ্তির দিকে নিয়ে যাবে। ইতিবাচক মনস্তত্ত্বের ভাষায়, এই বিশ্বাসই আমাদের ‘সর্বাপেক্ষা কাম্য আচরণের’ দিকে নিয়ে গিয়ে সফলতার পথ তৈরি করে দেয়।

“হ্যাঁ , যে ব্যাক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পন করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরষ্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”(কুরআন ২ঃ১১২)

ফুটনোটঃ

(১) এর ফলে আরও অনেক কিছুর উপর বিশ্বাস আনতে হয় যেমন তাঁর কিতাবসমুহ (যার মাঝে আছে ইঞ্জিল, তাওরাত, কুরআন ও অন্যান্য গ্রন্থ) এবং তাঁর রাসুলগণ।

(২) এর মানে এই না যে আমরা রিযিক অনুসন্ধান করতে কাজ করব না। আমাদের রিযিক আমাদের কাজের ফলস্বরূপ অর্জিত হবে; কাজ না করলে আমরা তার ফল পাব না।

Where Islam and Positive Psychology meet… আর্টিকেল থেকে অনুবাদ করা হয়েছে)

ছবিঃ 123RF.com

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা