সুবহানআল্লাহ, আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় সব মানুষকে বিভিন্ন ধাপে ধাপে সৃষ্টি করেছেন। নবজাতক সন্তানের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার সময় বিস্ময়কর লাগে ভাবতে যে তাকে শুধুমাত্র কয়েক ফোঁটা তরল থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার চেয়েও বেশি বিস্ময়কর এই যে শিশুটি জন্ম নেয়ারও আগে তার রিযিকের অঙ্গীকার করা হয়ে গেছে এবং এই পৃথিবীতে তার আয়ুষ্কাল নির্ধারিত হয়ে গেছে।

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সত্যবাদী ও সত্যবাদী স্বীকৃত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেই আপন আপন মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত (শুক্র হিসেবে) জমা থাকে। তারপর ঐরকম চল্লিশ দিন রক্তপিন্ড, তারপর ঐরকম চল্লিশ দিন গোশত পিন্ডাকারে থাকে। তারপর আল্লাহ্ একজন ফেরেশতা পাঠান এবং তাকে রিযিক, মৃত্যু, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য- এ চারটি বিষয় লিখার জন্য আদেশ দেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর কসম! তোমাদের মাঝে যে কেউ অথবা বলেছেন, কোন ব্যক্তি জাহান্নামীদের ‘আমাল করতে থাকে। এমনকি তার ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র একহাত বা এক গজের তফাৎ থাকে। এমন সময় তাকদীর তার ওপর প্রাধান্য লাভ করে আর তখন সে জান্নাতীদের ‘আমাল করা শুরু করে দেয়। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। আর এক ব্যক্তি জান্নাতীদের ‘আমাল করতে থাকে। এমনকি তার ও জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত বা দু’হাত তফাৎ থাকে। এমন সময় তাকদীর তার উপর প্রাধান্য লাভ করে আর অমনি সে জাহান্নামীদের ‘আমাল শুরু করে দেয়। ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।” [বুখারি ও মুসলিম]

আমার মনে আছে মানুষ আমাকে বলত, “বাচ্চার নবজাতক অবস্থা উপভোগ করো; এটা খুব দ্রুত পার হয়ে যায়।” আমাদের বাচ্চারা এত দ্রুত বদলায় যে অনেক সময় আমরা ভুলে যাই বা নবজাতক অবস্থার এসব ছোটখাট জানা বিষয়ও লক্ষ্য করি নাঃ

১। নবজাতকের মাথার খুলিতে একটা “নরম অংশ” আছে যা প্রায় দুই বছর বয়স হওয়ার আগে পর্যন্ত শক্ত হয় না। এটা জন্মের সময় প্রসব নালার ভেতর দিয়ে তাদের বের হয়ে আসার জন্য মাথাকে উপযুক্ত আকৃতি নিতে সাহায্য করে।

২। তারা গর্ভে থাকতেই শুনতে পায় এবং জন্ম থেকে তারা তাদের বাবা-মায়ের কণ্ঠ চিনতে পারে। এই তথ্যটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাচ্চা গর্ভে থাকতেই তাদের শুনিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করার কথা।

৩। আম্বিলিক্যাল কর্ড না নাড়ীর গড় দৈর্ঘ হচ্ছে ৫০ সেমি। নাড়ী কাটার আগে দুধ খাওয়ানোর জন্য এটা যথেষ্ট লম্বা। দেরী করে নাড়ী আটকানো এবং সাথে সাথে দুধ খাওয়ানোতে মা ও বাচ্চার জন্য স্বাস্থ্য উপকারিতা আছে এবং এটা শুরুতেই বন্ধন গড়ার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে।  

৪। নবজাতকের গাল স্পর্শ করলে, তারা স্পর্শের দিকে ঘুরে মুখ খুলে এবং দুধ খেতে চায়।

৫। নবজাতকের প্রথম কয়েকবারের মল হচ্ছে আঠাল, আলকাতরার মতো একটা পদার্থ যাকে মেকোনিয়াম বলে। যদি তাদের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো হয় তাহলে কয়েক দিনের মাঝেই সেটা পাতলা ও হলদেটে হয়ে আসে।

৬। নবজাতক বাচ্চারা দেখতে পায় তবে তারা হয়ত কয়েক মাস পর্যন্ত কোন বস্তু চোখ দিয়ে অনুসরণ করতে পারে না।

৭। তাদের দৃষ্টি ২০-৩০ সেমি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ যেটা শুধুমাত্র মায়ের কোলে শুয়ে দুধ খাওয়ার সময় মায়ের মুখের দূরত্ব পর্যন্ত। আমার এই ব্যপারটা খুব ভালো লাগে, যেহেতু এটা দুধ খাওয়ানোর গুরুত্বের একটা চিহ্ন এবং আল্লাহর নিখুঁত এক পরিকল্পনা।

৮। নবজাতক শিশুদের চোখে পানি হয় না। অবশ্যই তারা কাঁদে, কিন্তু কয়েক মাস না হওয়া পর্যন্ত তাদের চোখ থেকে দৃশ্যমান কোন পানি বের হয় না।

৯। সাধারণত নবজাতক বাচ্চারা কালো বা ধুসর চোখ নিয়ে জন্মায়। জন্মের কয়েক মাস না হওয়া পর্যন্ত তাদের চোখের সত্যিকার রঙ নির্ধারণ করা যায় না (প্রায় যে সময়ে চোখের পানি হয়)।

১০। প্রথমে বাচ্চারা নিজ থেকে তাদের মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়া সমন্বয় করতে পারে না। যদি তাদের নাক বন্ধ করে দেয়া হয় তাদের অবশ্যই কাঁদতে হবে ভেতরে বাতাস টেনে নেয়ার জন্য।

আমাদের বাচ্চারা যখন তাদের জীবনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যায় তখন সেটা অবলোকন করা ও সেই সময় তাদের দেখভাল করতে পারা একটা বিশাল আশীর্বাদ ও দায়িত্ব বটে। আমাদের সন্তানদের সৃষ্টি ও বেড়ে ওঠা আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার) বহু অলৌকিকতার মাঝে একটি। প্রথম থেকে এই অলৌকিকতার সাক্ষী হতে পারা কতই না সৌভাগ্যের ব্যপার, আলহামদুলিল্লাহ্‌।

[লেখাটি অনূদিত। মূল লেখকঃ আইশা আল হাজার। মূল লেখাটি পাবেন এখানে। ]