উম্ম নুসাইবা

প্রথম বাচ্চার দুই বছর পর কনসিভ করলাম। দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সি কিছুটা কষ্টকর এই সেন্স এ যে বড় বাচ্চারও টেইক কেয়ার করা লাগে। মোটামুটি প্রথম প্রেগন্যান্সির মতোই প্রথম ট্রাইমিস্টারে নসিয়া ছিলো, খেতে পারতাম না ভালো। সেকেন্ড ট্রাইমিস্টারে যখন থেকে খেতে পেরেছি, জ্যাষ্টেশনাল ডায়েবেটিস ধরা পড়লো। যেহেতু সেকেন্ড টাইম ডায়েবেটিস, ডাক্তার স্ট্রিক্ট ডায়েটের সাথেসাথে শুরু থেকেই ইনসুলিন দিলো। প্রতিদিন চারবার (সকালে খালি পেটে, সকালে নাশতার পর, দুপুরে খাওয়ার পর, রাতে খাওয়ার পর)নিয়ম করে ব্লাড টেষ্ট করতাম। সকালে এক্সারসাইজ/হাঁটা, দুপুর আর রাতে খাওয়ার পর মিনিমাম ৪০-৫০ মিনিট করে হেঁটে এসে ব্লাড টেষ্ট করতাম। ফাস্টিং সুগার (সকালে খালি পেটে) কন্ট্রোল হতো না কোন সময়। কাজেই রাতে শোয়ার আগে ইনসুলিন নিতাম। অল্প ডোজ দিয়ে শুরু হলেও প্রেগন্যান্সির এডভান্সড স্টেজের সাথে সাথে ডোজ বেড়েছে অনেক খানি। শেষের দিকে রেগুলার ডাক্তারের চেক আপ ছাড়াও ডায়াবেটিস হসপিটাল, নন-স্ট্রেস টেষ্ট এইগুলার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।

জ্যাষ্টেশনাল ডায়াবেটিসে প্ল্যাসেন্টা তাড়াতাড়ি ম্যাচিউরড হয়ে যায়, তাই এইক্ষেত্রে সাধারনত ডাক্তার ডেলিভারীর জন্য ৪০ সপ্তাহ পর্যন্ত ওয়েট করে না। ৩৯ সপ্তাহতেই ইনডিউস করে। প্রথম বাচ্চা ইনডিউসড ডেলিভারী। এইবার চাইছিলাম না ইনডাকশনের ভেতর দিয়ে যেতে। গোটা প্রেগন্যান্সি প্রচুর প্রচুর হেঁটেছি, এক্টিভ ছিলাম। প্রায় রেগুলার এক্সারসাইজ করেছি। ৩৯ সপ্তাহ ৩ দিনের মাথায় হসপিটালে ভর্তি হতে বলল।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

সকালে হসপিটাল থেকে ফোন করার কথা। তার আগের দিন রাতে দেড় ঘন্টা হাঁটলাম। বাসায় ফিরে বাসা গুছালাম। বড় মেয়ের ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। ও কে পরিচিত এক বাসায় ড্রপ করে হসপিটালে যাওয়ার কথা। এক সপ্তাহ আগে থেকে মিউকাস প্লাগ যাচ্ছিলো, সাথে হালকা কন্ট্রাকশন। সেদিন রাতে বাইরে থেকে হেঁটে এসে বাসার কাজ করতে করতে টের পাচ্ছিলাম, পেইন শুরু হয়েছে, আধাঘন্টা ইন্টারভালে। রাত ১২ টা বাজে। ফ্রিজ ধুয়েমুছে গুছালাম। নেষ্টিং ইন্সটিংক্ট কাজ করছিলো আসলে। মেয়ে আর তার বাবা এরই মধ্যে ঘুম। হালকা ব্লিডিং উইথ পেইন (সহনীয়) শুরু হয়েছে। রাত একটার দিকে ফোনে একটা এপ ইন্সটল করলাম, যেটাতে ট্র্যাক রাখা যায় কত সময় পরপর ব্যাথা যাওয়া-আসা করছে। ২/৩ মিনিট ইন্টারভ্যালে হলে হসপিটালে যেতে বলে। বাসায় ক্রমাগত হাঁটলাম। মাঝখানে রেষ্ট নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পেইনের ইন্টেন্সিটি বাড়ায় সেটা হলো না।

রাত দুইটার পর ব্যাথা অসহনীয় হওয়ায় মেয়ের বাবাকে ডেকে তুললাম। ফোনের এপে দেখাচ্ছিলো হসপিটালে যাওয়া উচিত। মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে, আরেকবাসায় দিয়ে এসে হসপিটালে রওনা দিয়েছি। বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে হসপিটাল। রাত বলে রাস্তাঘাট ফাঁকা। হসপিটালে গাড়ি পার্কে করে, থেমে থেমে বেশকিছুটা হেঁটে হসপিটালে ঢুকলাম। ফরমালিটিজ শেষে, ডেলিভারী রুমে সার্ভিক্স চেক করে জানালো ৪ সেন্টিমিটার ওপেন। ঘন্টাখানেকের মধ্যে মেডিকেল হিস্ট্রি চেক করে, স্ট্রেপ-বি পজেটিভ থাকায় এন্টিবায়োটিক আর ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন দিলো আইভি’র সাথে। সাথে বাচ্চার মুভমেন্ট মনিটর করার জিনিসপত্র। এইসব নিয়ে ছোট্ট রুমের ভেতর হেঁটেছি। হাঁটতে না পারলে বার্থিং বলে বসেছি। পেইন ম্যানেজমেন্টে অসম্ভব হেল্পফুল একটা জিনিস। এইবার শরীর যেহেতু আগে থেকে পেইনের সাথে পরিচিত, প্রত্যেকটা ব্যাপার ফিল করতে পারছিলাম। এই সময়গুলোতে বেসিক্যালি নার্সরাই টেইক কেয়ার করে, ডাক্তার মাঝেমাঝে এসে দেখে যান।

৪ থেকে ১০ সেন্টিমিটার আসতে আসতে ভোর পার হয়ে গেছে। পুরো সময় বার্থিং বলে ছিলাম। এপিডিউরাল নেব না, আগেই বার্থ প্ল্যানে লেখা ছিলো, শুরুতে নার্সকেও বলা ছিলো, দরকার হলে আমিই বলবো, আমাকে বারবার জিজ্ঞেস না করতে (এটা সুপার ইম্পর্টেন্ট, না হলে কতক্ষন পরপর ওরাই এসে জিজ্ঞেস করে। আর এই জিজ্ঞাস করাটা মেন্টালি উইক করে ফেলে। তাই কেউ এপিডিউরাল না চাইলে, সেটা ক্লিয়ারলি বলা ভাল)। লিটারেলি সার্ভিক্সের ১০ সেন্টিমিটার ওপেনিং ফিল করতে পেরেছি এবং ডাক্তারকে জানিয়েছি ইটস টাইম। সবমিলিয়ে ১০ মিনিটের মতো পুশিং স্টেজ। প্রথম বারের সাথে তুলনা করলে, এভরিথিং ওয়াজ সো স্মুদ। ইনডাকশন/ ন্যাচারালি ইনডিউসড পেইনের মধ্যে ভালো পার্থক্য আছে। প্রথমটাতে এপিসিওটমি প্লাস ভ্যাকুয়াম এসিসড চাইল্ডবার্থ ছিলো। এইবার আর্টিফিশিয়াল এসিসটেন্স লাগে নি। যদিও সেকেন্ড ডিগ্রি টিয়ার ছিলো। সাথেসাথে বাচ্চা ব্রেষ্টফিড করেছে (প্রথম বাচ্চার সময় কিছুটা সময় লেগেছিলো)। পরদিন বাসায় চলে এসেছি। নরমাল পেইন কিলার ছাড়া আর  কোন ওষুধ দেয় নি।  

প্রেগন্যান্সীর সময় ডিপ্রেশন ছিলো প্লাস পরে পোষ্টপার্টাম ডিপ্রেশন ছিলো। যতদূর সম্ভব নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করেছি। বাইরের হেল্প নিয়েছি। এই সময়ে মেন্টাল হেলথ সুপার সেন্সেটিভ থাকে। বিশেষ করে, বাচ্চার জন্মের পর যে পরিমান ফিজিক্যাল, মেন্টাল স্ট্রেস যায়, এগুলো খুব স্বাভাবিক। একএকজনের জন্য এক এক টনিক কাজ করে এগুলো থেকে বের হয়ে আসতে। পর্যাপ্ত ঘুম, হেলদি খাবার, নরমাল ডেলিভারীর পর একটু সুস্থ হলেই হাঁটাহাটি, ৪ সপ্তাহ পর এক্সারসাইজ চালিয়ে যাওয়া সাহায্য করে মন-মেজাজ ভালো রাখতে।

হবু মায়েদের জন্য টিপসঃ

  • নরমাল ডেলিভারীর জন্য ফিজিক্যাল-মেন্টাল প্রিপারেশন নিন। পুরো সময় যত এক্টিভ থাকবেন, তত ভালো। আগে কখনো এক্সারসাইজ করার অভ্যাস না থাকলেও, এখন সেটাকে অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসুন।
  • প্রেগন্যান্সি, চাইল্ড বার্থ, ব্রেষ্টফিডিং, পোষ্টপার্টাম কেয়ার এইগুলা নিয়ে পড়াশুনা করুন। সুযোগ পেলে প্রি-ন্যাটাল ক্লাস করুন। ইউটিউবে অনেক শিক্ষনীয় ভিডিও পাবেন বাসায় বসে দেখার মতো।
  • খাদ্যাভাস হেলদি রাখুন। ভাজাপোড়া/ একসাথে একগাদা খেয়ে না ফেলে গ্যাপ দিয়ে পুষ্টিকর খাবার খান। প্রচুর পানি খান। খেজুর খান রেগুলার (ডায়াবেটিসে কন্ট্রোলড এমাউন্ট)।  
  • যাদের জ্যাষ্টেশনাল ডায়াবেটিস আছে, কন্ট্রোলে রাখুন। অন্যদের থেকে এক্সট্রা ইফোর্ট দেন ফিজিক্যাল এক্টিভিটিজে, রেগুলার মেডিক্যাল চেক-আপে থাকুন।
  • ৩৮ সপ্তাহ পার হয়ে গেলে ন্যাচারাল পেইনের জন্য প্রিপারেশন নিন। হাঁটাহাটি বাড়িয়ে দিন। রেগুলার স্কোয়ার্ট করুন। ফিজিক্যাল ইন্টিমেসি ন্যাচারাল পেইন ট্রিগার করে। কিপ ইট আপ।
  • নরমাল ডেলিভারীতে ব্যাথামুক্ত বলে কোন কিছু নাই। তবে হ্যাঁ, ব্যাথা ম্যানেজ করা যায়। পেইন ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে জানুন। অনেকগুলো পসচার আছে, বসা/দাঁড়ানো অবস্থার, যেগুলোতে ব্যাথা কম অনুভূত হয়। নিজে একটু পড়াশোনা করা নিন, ডাক্তারের সাথে এগুলো নিয়ে কথা বলুন।
  • পেইন ম্যানেজমেন্টের যত টেকনিক আছে, আমার কাছে বেষ্ট মনে হয়েছে বার্থিং বল। বড় ফোলানো বলের উপর বসে পেলভিক এরিয়া মুভমেন্টে ব্যাথা কম অনুভূত হয়। এক একজনের জন্য এক একটা টেকনিক কাজে দেয়। কারো কারো জন্য ওয়ার্ম বাথ উপকারী (গরম পানিতে বাথটাবে বসা)। টানা শুয়ে থাকবেন না। শুলে ব্যাথা বেশী লাগে। দাঁড়িয়ে/ বসে পেলভিক এরিয়া ক্রমাগত মুভমেন্টের মধ্যে রাখেন (বার্থিং বলে বসে লাফানো/ নাচের ভঙ্গি), ব্যাথা কম লাগে।
  • এপিডিউরাল লাষ্ট রিসোর্ট হিসেবে রাখুন। এটা তাৎক্ষনিক ব্যাথার অনুভূতি নাই করে দেয়, কিন্তু ডেলিভারী প্রগ্রেস স্লো করে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাকপেইন তৈরী করে। সুবিধা-অসুবিধা ভালো মতো জেনে নিন।
  • প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে সময় বেশী লাগতে পারে। লেবার পেইন লম্বা সময় থাকবে এটা ধরে নেন ডাক্তাররা। ধৈর্য্য ধরে থাকাটাই মূল ব্যাপার। প্রথম ডেলিভারীতে সাধারনত মায়েরা বুঝতে পারেন না, লেবার পেইন একজাক্টলি কিরকম। ব্যাথাটা শুরু হয় পিরিয়ডে ব্যথার (যাদের পিরিয়ডে ব্যাথা হয়) মতো মাইল্ড ক্র্যাম্পিং দিয়ে। আস্তে আস্তে তীব্র হতে থাকে। রেগুলার ইন্টারভ্যালে (প্রত্যেক ১০/৫/৩ মিনিট পরপর) ব্যাথা হতে থাকবে।  
  • পুশিং স্টেইজে ভালো এনার্জির দরকার পরে। এটা মাথায় রাখেন। যখন আপনি ফিল করবেন পুশ করা দরকার/ ডাক্তার বলে দিবেন, তখন কিছু জিনিস মাথায় রাখতে পারলে এই স্টেজটা ইজি হয়। অনেকে বুঝেন না কিভাবে পুশ করবেন। যেজন্য পুশিং স্টেইজ লেংদি হয়। এই সময় অনেকটা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কন্সটিপেটেড বাওয়েল মুভমেন্ট বের করবার মতো। গ্যাপ দিয়ে দিয়ে পুশ করতে বলে এনার্জি গেইন করার জন্য। দাঁড়িয়ে বা বসে পুশ করতে পারলে মধ্যাকর্ষন শক্তি কাজ করে বাচ্চাকে বার্থ চ্যানেল থেকে ঠেলে বের করতে। যদি শুয়েও করার দরকার পড়ে, চেষ্টা করবেন বাথরুম করার মতো করে পুশ করতে। ব্রেদিং টেকনিক ভালো কাজে দেয়। বিশাল দম নিয়ে ছোট ছোট নিঃশ্বাস নিতে নিতে পুশ করতে থাকলে টিয়ারের সম্ভাবনা কম হয়। এই সময় পেরিনিয়াম এরিয়াতে ওয়ার্ম ম্যাসাজও টিয়ার রোধে সাহায্য করে।
  • প্রেগন্যান্সীর সময় এবং পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা বিষয়ে আগেই পড়াশোনা করে নিন। হাজব্যান্ড শতভাগ হেল্পফুল হলে অনেকাংশেই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। যদি মনে করেন নিজের আবেগ সামলাতে পারছেন না নিজে কোনভাবে, অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলেন। কাউন্সিলিং করান।

নরমাল (ভ্যাজাইনাল) ডেলিভারী চমৎকার একটি বিষয়। আল্লাহ্‌ সুবহান ওয়াতায়ালা মেয়েদের শরীর এমনভাবেই তৈরী করেছেন, যে এটা এইভাবে বাচ্চার জন্ম দিতে সক্ষম। মেডিকেল রিজনে (ব্রিচ/ ট্রানভার্স পজিশন, কর্ড পেঁচানো ইত্যাদি) বা ইমার্জেন্সীতে সি-সেকশনের দরকার হতেই পারে। কিন্তু ঢালাও ভাবে, কিংবা ব্যাথা সহ্য করতে পারা যাবে না- এই অযুহাতে সি-সেকশনে যাবেন না।   

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা