বিভন্ন সময়ের বিভিন্ন বিষয়ের বহু স্কলার এর মতে, বুদ্ধিমান আর বোকার মধ্যে বুদ্ধির যে পার্থক্য তার মূল কারণ হলো ‘মনোযোগ দেয়ার ও ধরে রাখার ক্ষমতার পার্থক্য”।

যেই বাচ্চা গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করতে পারে, আশেপাশের সব ভুলে চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়, সে যে বিষয়েই চিন্তা করুক না কেন, সেটাতে তার বুদ্ধিকে ধার দিতে থাকে। যেমন, একটা বাচ্চা চিন্তা করছে গাছের পাতা কেন সবুজ। উত্তরের কুল কিনারা করতে না পারলেও তার যদি পাঁচ মিনিট মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করার অভ্যাসটা থাকে পাঁচ মিনিট পর তার রিজনিং এর ক্ষমতায় কিছু শক্তিবৃদ্ধি হয়, খুবই সামান্য হলেও।

আর যেই বাচ্চাটা বিশ সেকেন্ড চিন্তা করার পরই খেলায় মন দেয় বা মনোযোগ একটু পর পর এদিক ওদিক সরিয়ে নিতে থাকে তার সেই সামান্য ক্ষমতা বৃদ্ধিটা হয় না। বছরের পর বছর এই ছোট্ট অভ্যাসটাতে ধার দিতে দিতে একটা সময় এই দুই বাচ্চার মধ্যে যুক্তি বোঝার ক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবেই, যুক্তি তর্ক কম বোঝে এরকম বাচ্চা ফিক্বহ যত বেশিই পড়ুক, যুক্তি ভালো বোঝে এরকম বাচ্চাই ফিক্বহ শাস্ত্র ভালো বুঝবে এবং একটু কম পড়লেও দিনশেষে এগিয়ে থাকবে।

যে বাচ্চাটা মনোযোগ দিয়ে গোলাপ ফুলটা দশ মিনিট ধরে দেখে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, আশেপাশের সব ভুলে যায়, সে সম্ভবত খুব ভালো ছবি আঁকবে, অথবা জীববিজ্ঞান ভালো বুঝবে। সে এই এক মনোযোগ দেয়ার মাধ্যমে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক একটি গুণে নিজের অজান্তেই ধার দিচ্ছে। সেটা হলো অবজারভেশন বা পর্যবেক্ষণ।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

আরেকটা বাচ্চা মনোযোগ দিয়ে বড়দের কথা শোনে। তার স্পিচ ডিলে একারণেই হয়না কেননা সে তার বুদ্ধিকে ধার দিয়ে কথা শেখার চেষ্টা করে। সে ভাষার প্যাটার্ন ধরার চেষ্টা করে, শব্দ মনে রাখার চেষ্টা করে, নিজে নিজে মনে সেগুলো নিজের মতো করে আউড়ায়, রিভিশন দেয়। সে মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার মাধ্যমে তার ভাষাগত স্কিল(বুদ্ধিরই একটা দিক) ধার দিচ্ছে। যেই শিশু আশেপাশের কথাবার্তায় একনিষ্ঠভাবে মনোযোগ দিচ্ছে না বরং এই খেলনা থেকে ঐ খেলনায় ছুটছে বা মোবাইল নিয়ে পড়ে আছে তার শুধু মাতৃভাষা শিখতে দেরি হচ্ছে তাই না, সে সারা জীবনের জন্যই ভাষা শেখার জন্য মস্তিষ্কের যে অংশকে ধার দেয়া দরকার সময়মতো না দেয়ার কারণে ভবিষ্যতেও যে কোন ভাষা শেখা তার জন্য কঠিন হবে।

বেডটাইম স্টোরি শোনার সময় মন দশবার এদিক ওদিক ছোটে যে বাচ্চার তার কল্পনাশক্তির বিকাশ ভীষণভাবে ব্যহত হবে।

বইয়ে মনোযোগ দিতে না পারলে কী কী গুণের বিকাশ ঘটবে না সেগুলো লিস্ট করে শেষ করা যাবে না।

দিনশেষে, একজন বুদ্ধিমান মানুষের ‘অনেক বুদ্ধি’ হওয়ার পেছনে যত ক্রাইটেরিয়া প্রায় সব(যদি ব্যাতিক্রম থেকে থাকে, আমার জানা নেই) ঘুরে ফিরে এক জায়গায় এসে ঠেকে।

মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা।

এই ক্ষমতা ধার দেয়ার, অথবা স্বাভাবিক যা আছে তাকেও ধরে রাখার মোক্ষম সময় হলো বয়স যখন শুণ্য থেকে সাত।

এর মধ্যে সাধারণত অনেকটা ঠিক হয়ে যায় যে বাচ্চা ‘বুদ্ধিমান’ নাকি ‘একটু স্লো বোঝে’, যে কোন বিষয়ে।

মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধির অনেক উপায় আছে। চার্লট ম্যাসন হোম এডুকেশন বইয়ে অসাধারণ অনেক আইডিয়া দিয়েছেন। শিক্ষকের দিক থেকে কী কী করা যেতে পারে তার কিছু আইডিয়া আছে The seven laws of teaching বইয়ে। দুটো বইই নেটে ফ্রীতে পাওয়া যায়। সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত নাই বা বললাম।

বিস্তারিত বরং বলা যাক কিভাবে মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতাকে একেবারে গলা টিপে হত্যা করা যায় সেটা নিয়ে।

বাচ্চার হাতে ডিভাইস, ঘরের দেয়ালে টিভি অথবা টেবিলে ল্যাপটপ, ব্যাটারিচালিত খেলনা, অনেক অনেক খেলনা। যেন কোনটা ছেড়ে কোনটা খেলবে ভাবতে ভাবতেই সময় কেটে যায়। একটা নিয়ে এক মিনিটও ঠিকমতো খেলা হয় না। তার আগেই মনোযোগ ছোটে আরেকটার দিকে।

এই ফাঁদগুলোতে আমরা প্রায় সবাই পা দিই।

অনলাইন স্কুল, অনলাইন একাডেমি, অনলাইন মাদ্রাসা, অনলাইন কোর্স বাচ্চাকে ইনফরমেশন বোঝাই ‘স্লো লার্নার’ অন্য কথায় বোকাসোকা বানাবে।

বাচ্চাকে সাত বছর বয়সের আগে পড়াশোনাই না করানো তার বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য ভালো। তাও যদি একান্তই করাতে হয়, বই খাতা নিয়ে কারো সামনে বসে, তার চোখে চোখ রেখে। ল্যাপটপের সামনে বসে হোমস্কুলিং হয়না। বাচ্চাকে প্রতি ঘন্টা ক্লাসের পর আগের চেয়ে আরেকটু বোকা, আরেকটু ইনফরমেশন বোঝাই গাধা বানানো হয়।

ইউটিউবে এত সুন্দর ভিডিও, এত শিক্ষামূলক, এত আকর্ষণীয় যে এই আকর্ষণ উপেক্ষা করা কঠিন। কিন্তু স্ক্রিনের ক্ষতির বাইরেও ভিডিওর আরেকটি ক্ষতিকর দিক আছে যা মাথায় থাকলে এই আকর্ষণ আমাদের আর থাকতো না।

সরাসরি বই থেকে শব্দ পড়লে বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি শেখে। তাকে অক্ষরগুলো প্রসেস করে শব্দ পড়ে বাক্যের অর্থ উদ্ধার করে, আগের অভিজ্ঞতা এবং দেখার রেঞ্জ থেকে কল্পনায় সেই ছবি সাজিয়ে গল্প চলার সাথে সাথে সেই ছবিকে সচল রাখতে হয়। ভিডিও বানানোর পুরো প্রসেস তার নিজের করা লাগে।

আরেকটু কম শেখে ঐ গল্পটা পড়ে শোনালে। অক্ষর বিশ্লেষণ করে অর্থ উদ্ধারের কাজটা তাকে করা লাগে না।
আরেকটু কম বুদ্ধির ধার হয় ইলাস্ট্রেশন দেখিয়ে বই পড়ে শোনালে। কল্পনার ছবি তার নিজের আঁকা লাগে না, ত্রার কল্পনা ইলাস্ট্রেটর করে দেন।

আর বুদ্ধি কোন ধারই পায়না যেটা থেকে সেটা হলো ভিডিও। তার spatial intelligence তৈরি করার পরিবর্তে ভিডিওই সব কাজ করে দেয়। ওর মাথার কোন কাজ থাকে না ইনফরমেশন নেয়া ছাড়া। কাজেই অনেক ইনফরমেশন নেয়, দ্রুত নেয়, অলস থাকা যায় বলে খুব আরাম লাগে, খুব মজা লায় ভিডিও দেখে। অনেক্ষণ দেখলেও ক্লান্তি লাগে না। গল্প শুনলে এক সময় না এক সময় ক্লান্তি আসেই, ভিডিওতে আসে না।

এখন আমাদের সিদ্ধান্ত, আমরা বাচ্চাকে ইসলামিক ইনফরমেশনের ঝুড়ি বানাবো, নাকি সত্যিকারের আলেম হওয়ার জন্য তৈরি করবো।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা