কোন এক অজ্ঞাত কারণে প্রেগন্যান্সীতে আমাদের মায়েদের অবচেতন মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নেয় – “বাচ্চা জন্ম হওয়ার সাথে সাথেই আমি একজন পারফেক্ট মা হয়ে যাবো এবং আমি ফুল ফিট হয়ে যাবো বলে আমার নিজের কোন যত্নের দরকার হবেনা”। কথাটা যে কি পরিমাণ ভুল তা আমরা কম বেশী সব মায়েরাই আমাদের চতুর্থ ট্রাইমেস্টারের ইমোশনাল লেবার পেইন ও শারীরিক কষ্টের মাধ্যমে তা হাড়ে হাড়ে টের পাই।

জি, এই পিরিয়ডকে চতুর্থ ট্রাইমেস্টার বলে। মেইনলি বাচ্চা জন্মের সময় থেকে তৃতীয় মাস পর্যন্ত সময়কে চতুর্থ ট্রাইমেস্টার ধরা হয়। কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমাদের সমাজ প্রসবের আগের তিন ট্রাইমেস্টার মা কে যতটা যত্ন আত্তি করে, ঠিক উল্টোটা করে চতুর্থ ট্রাইমেস্টারে। আর মানসিক স্বাস্থ্য বলতে যে কিছু আছে তা তো আরও বুঝেনা। এমনকি তথ্য প্রযুক্তির এমন সময়ে আমরা মায়েরা নিজেরাও গর্ভকালীন ও প্রসব সময়ের ব্যাপারে অনেক পড়াশুনা করলেও প্রসব পরবর্তী এই ট্রাইমেস্টার নিয়ে পড়াশুনা করিনা। আমাদের উচিত প্রসব পরবর্তী এই সময় নিয়ে বেশী বেশী পড়াশুনা করা।*

একজন সদ্যোজাত বাচ্চার সাথে সাথে সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েরও অনেক যত্নের প্রয়োজন; মায়ের ক্ষেত্রে যত্নটা প্রয়োজন হয় শারীরিক ও মানসিক দুই ক্ষেত্রেই। ৪০ সপ্তাহে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত একটা শরীর বাচ্চা হওয়ার সাথে সাথেই নরমাল হয়ে যায়না। এই সময় একজন মায়ের সুষম খাবার ও বিশ্রাম দুটোই দরকার। বাচ্চা ঘুমের সময় নিজেও একটু ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার। এতে যদি অন্যান্য কাজ না হয় তবে না হোক। নিউবর্ন বাচ্চা যেহেতু নির্দিষ্ট ব্যবধানে ঘুমায়, আপনিও সেইভাবে নিজের রুটিন করে নিন। বাচ্চার সাথে একবার আপনি ন্যাপ নিলেন আর বাচ্চার পরের ন্যাপে হয়তো প্রয়োজনীয় কোন ঘরের কাজ করে নিলেন।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

এসময় হরমোনাল কারণে, ঘুমের স্বল্পতার জন্য বিষন্নতা বা খিটেখিটে মেজাজ খুব নরমাল। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে এই বিষন্নতা যেন আপনাকে গ্রাস করে না ফেলে। তাই বাচ্চাকে খাওয়ার সময় অযথা ফেসবুকিং না করে কিংবা নিজেকে নিয়ে নেগেটিভ কিছু না ভেবে বই পড়ুন, যিকির করুন, কিংবা বাচ্চাকে খাওয়াতে খাওয়াতেই জামাইর সাথে একটু আডডা দিয়ে ফেলুন। দেখবেন মানসিকভাবে অনেক ভালো ফিল করবেন। মাঝ মাঝে বাচ্চাকে বাবা কিংবা পরিবারের কারও কাছে দিয়ে নিজে একটা আরামদায়ক গোসল করুন কিংবা এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসে খান কিংবা একান্ত মনে নিজের প্রিয় কিছু কাজ করুন। দেখবেন এই ১০/১৫ মিনিটের মী টাইম আপনাকে সারাদিন কত সজীব রাখবে।

খুব আপন ও বিশ্বশ্ত কাউকে নিজের মনের কথা বলুন। চেপে না রেখে শেয়ার করে দেখুন; দেখবেন আপন মানুষটার টুকটাক ভালো কথা কিংবা এই শেয়ারিং আপনাকে প্রতিনিয়ত মনের মধ্যে চলা ঝড়কে প্রশমিত করতে সাহায্য করছে। সমসাময়িক অন্য মায়েদের সাথে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে দেখবেন মাতৃত্বের এই যুদ্ধে আপনি একা নন বরং আরও অনেকেই আছেন।

ব্রেস্টফিডিং ইস্যু, বাচ্চার ঘুম সংক্রান্ত জটিলতা এমন ব্যাপারে নিজেকে আগে থেকে মেন্টালি প্রস্তুত করুন। পড়াশুনা করুন, মেন্টালি প্রস্তুতি নিন, নিজের যত্ন নিতে শিখুন। বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে হাঁটতে যান। বাচ্চা জন্মের সাথে সাথেই একদম আগের রুটিনে ফেরত যাওয়ার চেষ্টা না করে অল্প অল্প করে স্টেপ নিন নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার।

নিজেকে ব্যর্থ ভাববেন না। কারণ মাতৃত্বে ব্যর্থতা বা পরাজয় বলে কিছু নেই। যেকোন কিছু গড়তে হলে বাধা বিপত্তি আর সংগ্রাম তো থাকেই তাই না। আর আমরা তো মানুষ গড়ার কাজে হাত দিয়েছি। মনে রাখবেন আমরা সবাই হলাম যোদ্ধা মা – যারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছি নিজের সব মায়া মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে একটু একটু করে সন্তানকে বড় করে তোলার। আমাদের কাজ হলো নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে একান্তভাবে চেষ্টা করে যাওয়া। দেখবেন এই ফোর্থ ট্রাইমেস্টারের ইমোশনাল ও শারীরিক রোলার কোস্টার জার্নিটা পার হয়ে গেলেই আপনি অনেক ভালো ফিল করবেন। এরপরও সংগ্রাম থাকবে কিন্তু তখনকার আপনি হলেন এই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠা প্রস্তুত এক যোদ্ধা মা।

*কিছু সহায়িকা এই সময়ের পড়াশুনার জন্য
১) Now You are a mother By Du’aa Ra’oof Shaheen
২) বেবী সেন্টার ওয়েব সাইট
৩) এন্টিনাটাল ক্লাস
৪)  বাংলায় মাতৃত্ব ওয়েবসাইটটি খুবই হেল্পফুল

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা