কেস স্টাডি ৩ঃ হাসনীন চৌধুরী

বাবু হবার পর প্রচণ্ড রাগী হয়ে যাই। খুব রেগে থাকতাম, অল্পতেই রেগে যেতাম, চ্যাঁচামেচি করতাম, কান্নাকাটি করতাম। সবার উপদেশ অসহ্য লাগতো। স্বামীকেও ভাল লাগতো না। আশে পাশের সবার উপদেশ, নেগেটিভ কমেন্ট, বাচ্চার প্রতিটি ব্যাপারে অন্যের অযাচিত ইন্টার ফেয়ারেন্স কষ্ট দিত খুব। জামাইর সাথে অস্বাভাবিক ঝগড়া হতো।

এরপর একটা হালাকায় যাই। সেখানে সুরাহ হুমাঝাহ এর ওপর একজন আলজেরিয়ান মহিলা বলেছিলেন। আমার জন্য সেদিনটি life changing ছিল। উনি একজন ম্যারেজ কাউন্সিলর। তাই ম্যারিটাল লাইফের বিভিন্ন সমস্যা ও সেগুলোর ওপর আমাদের এটিচুড কেমন হওয়া উচিত, সেগুলো ইসলামিক দৃষ্টিভংগি থেকে আলোচনা করেছিলেন। উনার যে কথা টা সবচেয়ে ভাল লেগেছিল, তা হল “আমাদেরকে ক্ষমা করতে শিখতে হবে।” সত্যিকারের ক্ষমা হল- মেমোরি থেকে খারাপ সব কিছু মুছে ফেলা এবং পরবর্তীতে কোন ঝগড়া বা সমস্যা হলে, পুরনো কথা বারবার না তোলা। যেটা মেয়েদের একটা কমন অভ্যাস।

যাই হোক, মন বা মেজাজ খারাপ হলে হালাকার কথাগুলো বারবার মনে করতাম৷ আর সেদিন থেকে আলহামদুলিল্লাহ মনোমালিন্যের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

আলহামদুলিল্লাহ সময়ের সাথে সাথে ঠিক হয়ে গেছে। তাই আমার সমস্যাটা নিশ্চয়ই পিপিডি ছিল না, তবে বেবি ব্লু বলা যেতে পারে। এর জন্য আমি কোন পদক্ষেপ নেইনি। আলহামদুলিল্লাহ ঘরের মানুষদের সহযোগিতা আর আমার চ্যাঁচামেচি সহ্য করাটা অনেক উপকারী ছিল আমার জন্য।

 

কেস স্টাডি ৪ঃ  সাদিয়া হালিমা তুজ সাদিয়া

দুইটা প্রেগন্যান্সির পরই পিপিডি/ বেবি ব্লু এর শিকার হয়েছিলাম।
প্রথম প্রেগন্যন্সীতে থাকাকালীন সময়েই এর সম্পর্কে জেনেছিলাম। তবে এর ব্যবহার করতে পারিনি (আমি আমার প্রথম প্রেগন্যান্সী ও প্রেগন্যান্সী পরবর্তী সময় নিয়ে কাছের মানুষদের ছাড়া আর কারো সাথে কথা বলতে পছন্দ করিনা।)

আমার বাবা-মা, স্বামী এ বিষয়ে কিছু জানতো বলে মনে হয় না। তবে বাবু হবার পর আম্মার কাছে ছিলাম দেড় বছরের মতো সময়। তাই অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল আলহামদুলিল্লাহ্।

এ সময়, বাবুকে কেন্দ্র করে সব কিছু চিন্তা করা হতো। নিজেকে অযোগ্য মনে হতো। ঘুম হতো না। ইমোশনাল হয়ে যেতাম, কারণ ছাড়াই কান্না আসতো, অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ হবার জন্য কাঁদতেও পারতাম না। মনে হতো কেউ আমাকে বুঝে না,
অভিমানী হয়ে পড়েছিলাম।

সবসময়ে মনে হতো বাবুর কোনো ক্ষতি না করে ফেলি, ব্যাথা না দিয়ে ফেলি। আমি ফুল টাইম বাবুর পাশে বসে / শুয়ে থাকতাম, obsessed ছিলাম বাবুর ব্যপারে। আমার বোনের ভাষ্যমতে সাপের মত বিড়া পেচিয়ে থাকতাম! তবে বাবুকে ব্যথা দেয়ার কোন চিন্তা আসেনি আলহামদুলিল্লাহ্‌। বাবুর ৩/৪ মাসের সময়ে একবার কোন কারন ছাড়াই রেগে গিয়েছিলাম,
এছাড়া কথা ভুলে যাওয়া, নাম ভুলে যাওয়া, শূন্য অনুভব করা, সময়ের খেই হারিয়ে ফেলা, সন্দেহ প্রবনতা, এগুলো সবই ছিলো।

দুয়া করা/জিকির করা হতো আলহামদুলিল্লাহ্‌। তবু, কেউ কিছু বললে মরে যেতে ইচ্ছে করতো। আশেপাশের সবার সমস্যার জন্য নিজেকে দায়ী মনে হতো।

 

 

কেস স্টাডি ৫ঃ  ডাঃ সারওয়াত জাবীন আনিকা 

প্রথম দিকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগতো নানা মুনির নানা মত, সব বিষয়েই সবার একটা মতামত এবং নেগেটিভ রেসপন্স থাকতো। ব্যাপারটা এমন ছিল যেন একমাত্র আমিই আমার মেয়ের ক্ষতি করার সুযোগে বসে আছি।  তাও মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছিলাম খুব; মেয়ে হওয়ার পর খুব অসুস্থ হয়ে যাই- বাঁচি না মরি এমন একটা অবস্থায় পড়েছিলাম। আমি হাসপাতালে আর মেয়ে বাসায়, ব্রেস্টফিডিং করতে পারতো না মেয়ে, ওর দুধ টেনে খেতে সমস্যা হতো ( এটা পরে ডায়াগনোসিস হয়)। এই ব্রেস্টফিডিং নিয়ে প্রচুর কথা শুনি, বাচ্চার হক মারছি- মা হওয়ার যোগ্য নই,  নিজের ফিগার ঠিক রাখতে/ আরাম করতে বাচ্চাকে খাওয়াই না। কিন্তু আমার বাচ্চা এক্সপ্রেসড ব্রেস্ট মিল্ক খেয়েছে প্রায় এক্সক্লুসিভলি মানে প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধই খেয়েছে বলা যায়, শুধু যেদিনগুলো আমি প্রচন্ড অসুস্থ থাকতাম, সার্জারী করা হতো আমার বা আইসিইউতে ছিলাম – সেদিনগুলো ছাড়া ও ফর্মুলা খায় নি।

আমার এমার্জেন্সী সিজার করা হয় নরমাল ট্রাই করার জন্য।  কিছু মা তাদের মাতৃত্বের সার্থকতা বা মহানত্ব নরমাল ডেলিভারিকে ধরে নেন। দূর্ভাগ্যবশত এমন কিছু অসুস্থ মানুষের কথা বেশি শুনতাম যে “খুব আরামে মা হয়ে গেছো! আমাদের ব্যথা উঠেছে,  ঘরের কাজ সেরে খাটের পায়া ধরে বসেছি উবু হয়ে, আর বাচ্চা হয়ে গেছে।” নিয়মিত ফোনে ও সামনাসামনি এইসব শুনতাম আর নিজের ৩দিনের অসহ্য প্রসব বেদনা, ট্রায়ালের পর ট্রায়াল, নিজের প্রচন্ড চেষ্টা সেই প্রথম তিন মাস থেকেই আর ট্রায়াল রুমে Antepartum haemorrhage এর ভয়াবহ সেই ব্লিডিং এর দৃশ্য চোখে ভাসতো। আমি ডাক্তার, নিজের হিসাবে নাই কত কত বাচ্চার ডেলিভারি করিয়েছি, কত বাজে পরিস্থিতি দেখেছি- আল্লাহর হুকুমে মায়েদের, বাচ্চাদের বাঁচাতে জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছি, কিন্তু নিজের এইভাবে ব্লিডিং দেখে আশা করিনি বাঁচবো। আমার মা- বাবা, স্বামী ডাক্তার,  দুইজন স্পেশাল কনসালটেন্ট এর আন্ডারে ছিলাম, তাদের সেই দিশাহারা চেহারা আমি আজো ভুলতে পারিনি। এতোটাই এমার্জেন্সী ছিল যে ডাঃ শিউলি স্পাইনাল এনেস্থিসিয়া কাজ করার আগেই পেটে ইনসিশান দেন, আমার মেয়েকে বের করা হয় ১০ মিনিটেরও কম সময়ে।

আমি পুরো ব্যথা টের পেয়েছি, ওটি টেবিলে আমি তওবা করেছি, কালেমা পড়েছি- আশা রাখিনি যে মেয়েকে দেখবো।  মেয়েকে দেখে শুধু এনেস্হেটিস্ট স্যারকে বলেছি ওর নাম ইউসরা হবে আর তারপর আমার কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়ে যায়।  এই জিনিসগুলো আমাকে একদম ভেঙে দিয়েছিল। নিজে নিজে সবর করতাম, ভেবেছিলাম যে আমি ফাইট করতে পারবো। মেয়ে সারারাত কাঁদতো। এই শরীর নিয়ে একা একা রাতের পর রাত জাগা একদম পাগলপ্রায় হয়ে গেলাম। স্বামী ঢাকায় কোর্স করছিলেন, ছুটি পেতেন না। আব্বু আম্মু ডাক্তার, প্রচন্ড ব্যস্ত- তাদেরও বা কী দোষ দেই। কোনো সাহায্যকারী ছিল না। মেয়ে হওয়ার ৫৫ দিন পর সুইসাইড করতে যাই আর কষ্ট সহ্য না করতে পেরে। এটা শায়তানের ওয়াসওয়াসা ছিল – যখন বোধ হয় কী করতে যাচ্ছি জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি আর দরুদ, কালেমা পড়তে থাকি। ফাজরের পর আম্মু উঠে আমাকে এই অবস্থায় দেখতে পান- তারপর সাইকিয়াট্রিস্ট এর সাথে কথা বলি আমরা। আমার পিপিডি আর পিটিএসডি ডায়াগনোসিস হয়, ওষুধ শুরু হয়। কিন্তু আমি আগের মতোই থাকি। মেয়ের বাবার উপর অভিমান,  রাগারাগি,  নিজের আম্মু আব্বুর সাথে রাগ, মেয়ে কাঁদলে অসহ্য লাগতো, নিজে নিজের মৃত্যু কামনা করতাম- মনে হতো মেয়ে হয়েছে, আমার আর প্রয়োজন নেই। আর খুব ভয় পেতাম, অবুঝের মতো দু’আ করতাম যেন আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেন।

মোটামুটি প্রায় দুই মাস পর যখন প্রথম সিজদা দিতে পারি, সেই দিন মনে হচ্ছিল আমি সুস্থ হয়ে উঠবো।  নামাজ আসলেই ফোকাস করতে সাহায্য করেছিল আমাকে। মোবাইলে Iquran ছিল, মেয়েকে খাওয়ানোর সময়- বিশ্রাম করার সময় বা ঘুম পাড়াতে গিয়ে কুরআন তেলাওয়াত শুনতাম, তাফসির পড়তাম। নোমান আলী খান, মির্জা ইওয়ার বেইগ আর ইয়াসির কাদির লেকচার শুনতাম প্রচুর।  আর বই পড়তাম – গল্পের বই হোক আর পড়ার বই।

তবুও ব্যাটে বলে মিলছিল না- সবকিছু আগের মত হচ্ছিল না। এমন একটা সময় গেছে আমার, পাশে কাউকে পাইনি। এই অসহ্য দিনগুলোর একদিন মেয়ের বাবার একটা চিঠি পাই- এই চিঠিটাই হয়তো মূল চালিকাশক্তি ছিল, এখনো আছে।  আমার আম্মু আব্বু ছোট বোন আর ইশফাক পাশে দাঁড়ায় আস্তে আস্তে।  আব্বু কোনোদিন বাচ্চা ধরেননি, অফিস করে এসে আনাড়ি হাতে ইউসরাকে ফিডার খাওয়াতেন, বাবুর ডায়াপার পালটানোর সময় বোকা বোকা হয়ে ডাকতেন। আম্মু ডিউটি থেকেই এসে মেয়েকে নিয়ে যেতেন, আমাকে ঘুমাতে দিতেন। ছোট বোন জোর করে টেনে বাইরে নিয়ে যেতো, ক্লাস করে এসে হয় বাবুকে নিয়ে আর নাহয় আমার সাথে সময় কাটাতো। ১০ বছর বয়সী খালাতো ভাই স্কুলের ছুটিতে এসে সারাদিন আমার পাশে, ওর সাথে গেইম খেলতাম- বই পড়তাম শেয়ার করে, বাবুকে নিয়ে খেলতাম। আর মেয়ের বাবা ছুটি পেলেই আসতো, ওর মোরাল সাপোর্ট আমার জন্যে অনেক বড় পাওয়া ছিল ।আমাকে কাউন্সিলিং করতো ও, সব নেগেটিভ কথা থেকে শিন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার জন্য। তারপর পাশে পাই ৩-৪জন দ্বীনি আপুদের। এদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আল্লাহর তরফ থেকে বিশাল রহমত এই বোন কয়জন আমার জন্যে৷

আলহামদুলিল্লাহ এই একটাই রিফিউজ ছিল আমার,  আমার যুঝে যাওয়ার সব শক্তি।  নামাজ,  দরুদ পড়া আর কুরআনের তাফসির পড়া সাহায্য করে আমাকে। আর নিজেকে রুকিয়া করতাম নিয়মিত।

হাজবেন্ডকে বলেছিলাম, সাহায্য চেয়েছিলাম। আব্বু আম্মু ব্যাপারটা দেরিতে হলেও বুঝতে পারেন। পাশে পাই সবাইকে দেরিতে হলেও।

প্রথম দিকে নিজের খেয়াল রাখতাম না, কিন্তু তারপর শুরু করি। এই ভুলটাই করি আমরা আসলে, নিজেদের খেয়াল রাখিনা। এটা খুব জরুরি।

আমি এই সমস্যার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলাম।

পরবর্তী প্রেগন্যান্সীর জন্য বলব, প্রথমত নিজের এবং পরিবারের মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। ইমার্জেন্সি যেকোনো ধরনের ব্যপার হতেই পারে – এটার জন্য মানসিকভাবে এবং নিজের সাধ্যমতো প্রস্তুত থাকা। দ্বিতীয়ত- আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ আস্থা আর তাঁর সাথে নিজের সম্পর্ক ভাল রাখা। তৃতীয়ত- নেগেটিভ মানুষগুলোকে সম্পুর্ণ এড়িয়ে চলা, যদি নিতান্ত সম্ভব না হয়- দূরত্ব বজায় রাখা সম্মানজনকভাবে।

আমি নিজে ডাক্তার এবং সাইকিয়াট্রি নিয়ে পড়ছি, তাই সচেতন ছিলাম।  তা সত্ত্বেও আমাকে ডিপ্রেশনে পড়তে হয়েছে৷ Knowledge is power. আমি জানতাম বলেই চেষ্টা করেছি, সচেতন হয়েছি। এইসব বিষয়ে অবশ্যই পড়াশোনা করা দরকার, শুধু ফেইসবুকের গল্প পড়ে না, বরং দেশের বাইরের বিভিন্ন ব্লগ, বই পড়ে।  জ্ঞানও সঠিক জায়গা থেকে আসা উচিত, না হলে ফলাফল হিতে বিপরীত হতে পারে।  আমি মেডিকেলের বই, আর্টিকেল পড়েছি, নিজে বিভিন্ন অনুপ্রেরণামূলক বই পড়েছি, লেকচার শুনেছি।

 

কেস স্টাডি ৬ঃ  যেবুন্নেসা তমা

আত্মহত্যা বাদে উপরে উল্লেখিত প্রতিটি চিন্তাই মাথায় এসেছে বহুবার। আত্মহত্যার কথাও এসেছে, কিন্তু একই সাথে ওইটা যে সম্ভব না সেই বোধও কাজ করেছে। আরেকটি মারাত্মক যে সমস্যা হয়েছে তা হল আল্লাহর প্রতি অসন্তোষ। খালি মনে হতো এত দুয়া করছি, তিনি চাইলেই তো আমার জন্যে এই পরীক্ষা একটু সহজ করে দিতে পারেন।

দেশের বাইরে থাকায় Counselor কে পাওয়া সহজ ছিল আমার জন্য। কিন্তু বড় মেয়েকে সাথে নিয়ে counseling এ যেতে হত যেটা বেশ ঝামেলার মনে হত। তাই যদিও উপকার পাচ্ছিলাম, তাও কাউন্সেলর এর কাছে যাওয়া বন্ধ করে দেই। তবে তার দেওয়া লিফলেটগুলো মনযোগ দিয়ে পড়ি এবং সেই অনুযায়ী depression combat stategy লিখি। সেখানে আগেই চিন্তা করে point by point লিখে রাখি যে যখন depression এর ধাক্কা আসবে, কী কী করব সামাল দিতে। নিজের ভালো লাগে এমন কোন কাজ ওখানে লিখতে বলা ছিল। আমি মেহেদি দেওয়া আর রান্নার কথা লিখে রেখেছিলাম। খুব কাছের কারো ফোন নাম্বার লিখে রাখতে বলা হয়েছিল, যার সাথে venting করা যায়, depression এর মুহূর্তে সব খুলে বলা যায়। আলহামদুলিল্লাহ আমার অনেক দ্বীনি বোন আছেন যাদের আমি আমার মনে কী চলছে খুলে বলতাম। ওই কাগজে আরেকটা point ছিল- নিজের strength সম্পর্কে লিখ, যা কিনা তোমাকে সাহায্য করে depression এর মুহূর্তেও নিজেকে সংযত রাখতে। আমি লিখেছিলাম- স্রষ্টার সাথে আমার সম্পর্ক। এই পয়েন্টটার এত শক্তি ছিল, যে যখনি আমি কাগজটা হাতে নিয়ে এই পয়েন্টটা পড়তাম, আমার মনে হত আমি পারব নিজেকে control করতে। এছাড়াও আমি ইন্টারনেটে বিভিন্ন লেখা পড়তাম এ বিষয়ে, আর সেখানে দেওয়া পরামর্শ গুরুত্বের সাথে নিতাম। যেমন আমি আমার মেয়ের coloring বুক এ ছবি কালার করতাম, gratitude diary রাখতাম যেখানে প্রতিদিনের ৩টি এমন বিষয় লিখতাম যার জন্য আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। এছাড়া আমি আমার কষ্ট নিয়ে venting করতাম, আমার ভাই-বোন, স্বামী এবং প্রিয় বন্ধুদের কাছে অভিনয় করতাম না কখনোই, বরং তাদের জানাতাম যে আমার মানসিক কষ্ট হচ্ছে। আমি সালাতের সিজদায় আল্লাহ্’র সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি দুইটা আমল করতাম- depression এর মুহূর্তে যতই বাজে চিন্তা মাথায় আসুক না কেন, আমি continuously ইস্তিগফার করতে থাকতাম। আর অন্যান্য সময় চেষ্টা করতাম যিকির করে মনকে ব্যস্ত রাখতে।

সেই সময় আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য কী করতাম এই উত্তরটা আমি উপরে লিখে ফেলেছি। মূলত আল্লাহর প্রতি সুধারণা ধরে রাখতে পারতাম না, বিশেষ করে ওই মুহূর্ত গুলোয় যখন দুই বাচ্চা একসাথে কাঁদতো, জ্বালাতো এবং স্বামী কোন সাহায্য করত না। দ্বীনি বোনদের সাথে আলোচনা, সিজদায় সাহায্য চাওয়া, ইস্তিগফার আর তাহমিদ- এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করেছি।

দেশের বাইরে থাকি বলে পরিবারের কারো সাহায্য পাবার সুযোগ ছিল না, তবে আমি আমার বোনের সাথে কষ্টগুলো শেয়ার করতাম, সেটাও আমার উপকারে এসেছে। স্বামী পিএইচডির ছাত্র হওয়ায় যথেষ্ট সময় দিতে পারত না। আর কিছুটা গাফিলতিও তার ছিল। তার পক্ষ থেকে যথেষ্ট support আমি পেতাম না। তাকে আমি জানিয়েছি কষ্ট গুলো, তবে রাগ আর অভিযোগের সাথে জানিয়েছি। ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়ে বলা বা আলোচনা করার মতন অবস্থায় আমি ছিলাম না।

নিজের যত্ন নেয়ার কোনটাই করতাম না ঠিক মত। এমন কি দাঁতও মাজতাম না নিয়মিত।

আমি USA থাকি, এখানে সব প্রেগন্যান্ট মহিলাকেই depression screening test করতে হয়। এটা বাধ্যতামূলক। তাই বলা যায় আমি ডাক্তারের সাহায্য নিয়েছিলাম।

পরবর্তী প্রেগন্যান্সীতে, আমি উপরে যেই কৌশলগুলোর কথা লিখেছি, সেগুলোই উপকারে আসবে। সাথে যেসব বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের কথায় মানসিক চাপ অনুভব করি, তাদেরকে যথা সম্ভব এড়িয়ে চলা।

অবশ্যই আগে থেকে জানা থাকলে বোঝা যায় যে আমার সাথে যা হচ্ছে এটা সাময়িক, অনেক মা-ই এই সমস্যায় ভুগেন, ইনশা আল্লাহ এই ঝামেলা কেটে যাবে। আর প্রতিকার বিষয়ক লেখা থেকে সবচেয়ে উপকৃত হয়েছি।

 

৩য় পর্ব দেখুন এখানে