বাবু পেটে আসার পর থেকে বাবুর সাত/আট মাস সময় পর্যন্ত নিজের চিন্তা ভাবনা, কর্মকাণ্ড নিয়ে ভাবলে মনে হয়, আমি হয়তো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম৷ ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে- প্রেগনেন্সি ও পোস্ট পার্টাম সময়ে হরমোনের তীব্র ও দ্রুত ওঠা/ নামা/ চেঞ্জের কারনে আবেগ, অনুভুতি, অন্যের প্রতি আচরণ সব কিছু একেবারে উল্টে পালটে যাওয়া।

আমার বিচিত্র কর্মকান্ডের পেছনে হরমোনের পরিবর্তনের সাথে সাথে আরো কিছু বিষয় উদ্দিপক হিসেবে কাজ করেছিল।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

-দীর্ঘকালীন ইনফার্টিলিটি।

-আশে পাশের মানুষের অযাচিত উপদেশ।

-বাবু হবার পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া।

– মা হওয়ার কারনে নিজের শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য।

– মাতৃত্বের নতুন দায়িত্বে অভ্যস্ত হতে সময় লেগেছিল, বাবুর কোন সমস্যা হলেই মনে হত, আমার দোষে হয়েছে।

-বাচ্চা, স্বামী, ঘরের কাজ ও নিজেকে – সবকিছু সামলাতে গিয়ে লেজে গোবরে হওয়া ও কোন কাজই ঠিকভাবে সময় মতো শেষ করতে না পারা।

– অনেক দিন ধরে আরাম করে খাওয়া, ঘুম, নিজের যত্ন না নিতে পারা। ইত্যাদি।

 

এবার আমার কাজ কারবারের কয়েকটা উদাহরণ দেই। (লিখতে গিয়ে নিজেরো লজ্জা লাগছে, সত্যি এমন পাগলামো করেছিলাম!)।

*বরকে অসহ্য লাগতো, বাবু সংক্রান্ত তার যে কোন সাজেশন কে মাতব্বরি মনে হতো। মনে হত, আমি এত কষ্ট করলাম বাচ্চা হবার সময়, আর উপদেশ সে দেবে?

(অথচ বাবুর আব্বুও কিন্তু কম কষ্ট করে নি, বিদেশে একা ছিলাম আমরা, সাধ্য মত সেবা করেছে আমার আলহামদুলিল্লাহ। সেও নতুন বাবা হয়েছে, নব্য গুরু দায়িত্ব ভার সম্পর্কে উনিও অনভিজ্ঞ। তারপরেও আমি কারণে অকারনে চিৎকার করেছি তার ওপর।)

*অহেতুক কান্নাকাটি করতাম। কিছু ভাল লাগতো না। পাগলের মত লাগতো।

*অনেক কে অসহ্য লাগতো। তাদের নাম শুনলেও গা জ্বালা করতো।

* বাবু হবার পর, কাওকে বাবু ধরতে দিতে ইচ্ছে হতো না। শাশুড়ি কে না, এমনকি আপন মাকেও না।

সারাক্ষণ ভয় হত, কারো কাছে বাবু দিলেই সে আমার বাবুকে নিয়ে নেবে ( আস্তাগফিরুল্লাহ)।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে হত বাবু নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাই।

* বাংগালী তো এমনিতেই মাগনা উপদেশ দিতে পছন্দ করে। নতুন মা দেখলে উপদেশ বাণে জর্জরিত করতে কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷

ডায়পার পরাবে না, ছয় মাসের আগে সলিড শুরু করো, এভাবে শোয়াও, ওভাবে খাওয়াও, হেন করো, তেন করো ইত্যাদি বক্তব্যে আমিও ভেসে যেতে লাগলাম।

অন্যান্য সময় হলে, এসব কথা হাসিমুখে উড়িয়ে দিতাম/ এড়িয়ে যেতাম/ এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্যকান দিয়ে বের করে দিতাম।

কিন্তু পোস্ট পার্টাম সময়ে আমি একজন ভয়ানক বাঘিনীতে রুপান্তরিত হয়েছিলাম। যে কারো যে কোন কথায় প্রচণ্ড ভাবে ভেংগে পরতাম, রেগে যেতাম। মানসিক ভাবে আরো অসুস্থ হয়ে যেতাম।

(এ সময় কেনো যে মানুষ নতুন মা টার প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হয় না! আগ বাড়িয়ে তাকে শেখাতে না যেয়ে অপেক্ষা করলেই পারে, মেয়েটি কোন সমস্যায় পরলে নিজেই জিজ্ঞেস করে নেবে। যাকে আস্থাভাজন মনে হতো, তাকে নিজেই জিজ্ঞেস করতাম।)

এখন সেসব উপদেশ এর কথা মনে পরলে বুঝি, কিছু কিছু কথা মূল্যবান ছিল সত্যি। যদিও তাদের বলার ধরণ ও টাইমিং ঠিক ছিল না।

চাইনিজরা এসব ক্ষেত্রে খুব ভাল। তারা পেটের ভেতর জ্ঞান গরিমা নিয়ে বসে থাকে। জিজ্ঞেস করার আগ পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটে থাকে, আগ বাড়িয়ে একটা কথা বলে না।

* মনের ভেতর আরো একটা ভয় কাজ করতো। মা হবার পর অনেক পরিবর্তন হয়েছে আমার। বাবুর আব্বু কি আগের মত ভালবাসবে? না কি বদলে যাবে?

*নানাকারণে নিজেকে একজন ব্যর্থ মা মনে হত।

* কিছু ক্লোজ প্রতিবেশি/ বান্ধবীর সাথে দুরত্ব মেইন্টেইন করা শুরু করি। তাদের আচরণকে আমার কাছে মানসিক ভাবে পীড়াদায়ক ও ডমিনেটিং মনে হচ্ছিল। অনেকের সাথেই বেশ অভদ্রতা করে ফেলি। যা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ।

আমার অবশেষে সন্তান হয়েছে, ওই আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে তারা, তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা দিয়ে আমাকে অতিরিক্ত শিক্ষিত করতে চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ‘অনভিজ্ঞ’ আমাকে একরাতে ‘অভিজ্ঞ’ করে ফেলা।

উৎসাহের আতিশয্যে সুন্দর করে সাজেশন দেবার বদলে, অবচেতনভাবেই তাদের মতামত জবরদস্তিমূলক ভাবে চাপিয়ে দেয়া শুরু করেছিল।

 

এক কথায় সন্তান জন্ম পরবর্তী সময়ে আচারে ব্যবহারে খুব রাগী হয়ে গিয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিল।

এখন যত দিন যাচ্ছে আস্তে আস্তে আল্লাহর রহমতে আগের মত হয়ে যাচ্ছি। হরমোনেরা মনে হয় ধীর স্থির হচ্ছে আবার।  আর আলহামদুলিল্লাহ ভালোবাসার কিছু মানুষের অনবরত সাপোর্ট ও কাউন্সেলিং, বিশ্রাম নেবার সুযোগ সাহায্য করেছে এ সমস্যা থেকে উঠে আসার জন্য।

এখন যে কোন সমস্যা নেই তা নয়। তবে অন্তত যুক্তিসংগত ভাবে চিন্তা করার মন টা ফিরে পেয়েছি। অন্যদের কথায় রি একটিভ না হবার এবিলিটি অর্জনের চেষ্টা করছি ইন শা আল্লাহ্।

আমার এ অভিজ্ঞতা থেকে যে শিক্ষা নিয়েছি, তা হল-

– মা হওয়া সহজ কিছু নয়। মা হতে গিয়ে একটা মেয়ে অবর্ননীয় শারীরিক ও মানসিক ধকল ভোগ করে। মৃত্যুর কাছ থেকে ঘুরে আসে সন্তান জন্মদানের সময়।

মেয়েটা নতুন মানুষের জন্ম দিতে গিয়ে, নিজেও যেন নতুন করে জন্মায়।

– এরকম কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে যে সদ্য মা হয়, তার দোষ ত্রুটি কিছুকালের জন্য হলেও উপেক্ষা করা উচিৎ।

তার শরীর মন সারতে দেয়া উচিত। তাকে উৎসাহ দেয়া উচিত, “তুমি পারবে না” না বলে, বলা উচিৎ, “you are doing amazing!”

-হতে পারে মেয়েটি কিচ্ছু জানেনা, কিন্তু তাকে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে শিখতে দিন। শেখার ম্যাটেরিয়াল যোগাড় করে দিন, তার motherly instinct কে nurture করতে সাহায্য করুন।

-আপনার বাচ্চার জন্য যে টিপস কাজে এসেছে, দুনিয়ার সবার বাচ্চার জন্য একই পদ্ধতি কাজে নাও লাগতে পারে। তাই অন্যকে ডমিনেট করে উপদেশ না দিয়ে, তার কাছে আস্থা ভাজন হবার চেষ্টা করা উচিত। তাহলে দরকার হলে আপনাকে এমনিতেই জিজ্ঞেস করবে।

-নতুন মা কে প্রচুর বিশ্রাম ও নিজের যত্ন নেবার, ভাল করে খাবার সুযোগ দিন।

-তার জন্য নিশ্চিন্ত আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করুন।

-হতে পারে সে এখন বিশাল মৈনাক পর্বত হয়ে গিয়েছে, তার মেদহীন কোমরের যায়গায় শোভা পাচ্ছে থলথলে পেট। তার দাগহীন শরীরে এখন স্ট্রেচ মার্ক আর সি সেকশনের দাগ।

কিন্তু তাকে বারবার বলুন তারপরেও সে অপরূপা৷ একজন মায়ের চেয়ে রূপবতী এই পৃথিবীতে কেও হতে পারে না। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মানবশিশুকে জন্ম দেবার মত দুঃসাহসিক কাজ করতে গিয়ে যেটুকু চেহারার পরিবর্তন ঘটেছে, সেই পরিবর্তন হল একজন সাহসী যোদ্ধার যুদ্ধের স্বাক্ষর।

– হরমোনের কারনে মা যদি রাগারাগি, অস্থিরতা করে, তাকে মমতা দিয়ে শান্ত করুন। আশ্বাস দিন। ধৈর্য ধরুন। বিশ্বাস করুন, একদিন মেয়েটা আপনার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।

-মেয়েরা প্রেগন্যান্সি ও পোস্ট পার্টাম সময়ে অন্যদের থেকে পাওয়া তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভালোবাসা বা কষ্টও পুংখানুপুংখ ভাবে মনে রাখে। এ সময়ে আপনার অল্প একটু ভালোবাসা সে সারাজীবন মনে রাখবে।

 

মা হওয়া যেহেতু সহজ নয় মোটেও, তাই এ সময় মায়ের শরীরের পাশাপাশি মনের যত্ন নেয়াটাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল টাই সবার আগে নেয়া উচিত বলে মনে করি।

মানসিক ভাবে আনন্দিত ও পজিটিভ থাকলে প্রেগ্নেন্সির শারীরিক জটিলতা কম হয়, বাচ্চা হবার পর তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা যায়, বাচ্চার যত্ন সুন্দর করে সম্ভব হয়। দুশ্চিন্তা বিহীন থাকা গেলে, সন্তানকে দুধ খাওয়ানো অনেক সহজ হয়ে যায় আলহামদুলিল্লাহ।

সব কথার শেষ কথা হল, মা যদি প্রফুল্ল থাকে, বাচ্চাও হাসিখুশি থাকবে। মায়ের ইমোশোনাল অবস্থা একটা কয়েকদিনের বাচ্চাও অনুভব করতে পারে। তাই যদি হাস্যোজ্জ্বল সন্তান চান, তাহলে সন্তানের মা কে আনন্দিত রাখুন। মাতৃত্বের এই অভাবনীয় যাত্রার শুরুটি সুন্দর করতে সাহায্য করুন।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা