রমাদান আমাদের জন্য আকাঙ্ক্ষিত একটি সময়। এটি কুরআন নাযিলের মাস। এ মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। রমাদান মাসে করা যেকোনো ভালো কাজের পুরস্কার মহান আল্লাহ নিজ হাতে দিবেন। তাই রমাদানের জন্য যেকোন মুসলিম প্রস্তুতি নিবেন এটাই স্বাভাবিক।

এ মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে আছে,

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন সিয়াম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য তাই আমি স্বয়ং এর (সিয়ামের) প্রতিদান দিব।

সহীহ বুখারী ১৯৩৪, মুসলিম ১১৫১

সুতরাং এটা আমরা খুব ভালো করে অনুধাবন করতে পারছি যে এই মাসের ইবাদত আমল অন্য মাসগুলোর চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে করা উচিত হওয়া উচিত। কিন্তু দেখা যায়, সাংসারিক কাজ সামলে, সন্তানদের দেখাশোনা করে, ইফতার-সেহেরীতে বিভিন্ন খাবার প্রস্তুত করে আমাদের মায়েদের হাতে ইবাদতের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকেনা। অনেক ক্ষেত্রে হাতে সময় থাকলেও শরীর অনেক ক্লান্ত থাকায় ইবাদতে আমরা মনোযোগী হতে পারি না। 

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

সাংসারিক কাজের ফাঁকে ইবাদতের জন্য একজন মা কিভাবে সময় বের করতে পারে এবং বাচ্চারাও কিভাবে এই রমাদান মাসটা কাজে লাগাতে পারে সেটা নিয়ে কথা বলার জন্য মাতৃত্ব থেকে ফেসবুক লাইভ আয়োজন করা হয়েছিল। সেই আলোচনার আলোকে মায়েদের এবং মেয়েদের জন্য কিছু টিপস শেয়ার করছি।

মায়েদের জন্য পরিকল্পনা

১. পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা

If you are not planning, then you are planning to fail.

যেকোনো কাজ করার ক্ষেত্রে আমরা যদি আগে থেকে পরিকল্পনা করে করার চেষ্টা করি তবে সেই কাজ ভালোভাবে করতে পারার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। আমরা যদি কখন কোন কাজটা করব, কিভাবে করব, কাকে কোন কাজের দায়িত্ব দিব, এভাবে যদি একটা দৈনন্দিন প্ল্যান করে নেই, তবে আমাদের কাজগুলো অনেক ক্ষেত্রে সহজ হয়ে যাবে। 

আমাদের মধ্যে কেউ আছে কর্মজীবী মা, কেউ গৃহিণী, কেউ যৌথ পরিবারে থাকেন, কেউ একক পরিবারে থাকেন। প্রত্যেকের বাস্তবতা আলাদা। সেই বাস্তবতা অনুযায়ী আমাদের পরিকল্পনা করা উচিত , যাতে করে আমরা রমজান মাসের ফজিলত পরিপূর্ণভাবে পেতে পারি। 

আমাদের যাদের পিঠাপিঠি দু’চারটা করে ছেলে মেয়ে আছে তাদের জন্য কাজ করাটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং এবং পরিশ্রমসাধ্য। সেক্ষেত্রে রমজান শুরু হওয়ার আগেই আমরা পরিকল্পনা করে বিভিন্ন কাজগুলো ভাগ করে ফেলতে পারি। কোন দিন কি রান্না হবে , ইফতারের মেন্যুতে কি থাকবে, বাজারটা কখন করা হবে, ঈদ শপিং কখন হবে- এই জাতীয় জিনিস গুলো যদি আমরা মোটামুটি গুছিয়ে ফেলতে পারি তবে আমাদের কাজ কিছুটা হলেও কমে যাবে যা আমাদের ইবাদত করার পথটা একটু হলেও সহজ করবে।

সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আমরা রমজান মাসকে পরিপূর্ণভাবে ঈমান-আমল বৃদ্ধি করার জন্য ব্যবহার করব এবং সেই জন্য আমাদের কাজগুলো সহজ করার চেষ্টা করব।

২. ইবাদত

এই মাসে আমরা যত বেশি আমল করবো তত বেশি সওয়াব পাবো ইনশাআল্লাহ। কুরআনের মাস রমাদানে আমাদের অনেকের জোরালো চেষ্টা থাকে ৩০ পারা কোরআন খতম দেওয়ার জন্য। সংসারের কাজের চাপে অনেকেই হয়ত পেরে উঠেন না যেটা মনোকষ্টের কারণ হয়।

সেক্ষেত্রে আমরা অর্থসহ দু’তিন রুকু করে পড়তে পারি, অল্প পরিমাণে তাফসীর পড়তে পারি। কুরআন খুব অল্প সময়ের জন্য পড়লেও আমরা অর্থসহ বুঝে পড়ার চেষ্টা করব, যাতে করে এই বোঝাটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের উপরে প্রভাব ফেলে।

আমরা ছোট ছোট দোয়া, সুরা ইত্যাদি মুখস্ত করতে পারি। প্রতি ওয়াক্তের নামাজের পর অথবা যেকোনো এক ওয়াক্তের নামাজ শেষে আমরা কুরআন পড়তে বসতে পারি। যদি একান্তই সময় বের করতে না পারি তবে মোবাইলে কুরআন অ্যাপস থেকে পড়ে নিতে পারি।

কাজ করার সময় মোবাইলে কুরআন ছেড়ে রাখা যায় যাতে করে কাজ করার সময় আমাদের মনোযোগ একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে থাকে, ফলে অপ্রয়োজনীয় চিন্তা মাথায় আসবেনা।

অনেক মায়েদের দুগ্ধপোষ্য সন্তান থাকে, পিঠাপিঠি বাচ্চা থাকে এবং তাদের  জন্য ইবাদতের সময় বের করা কঠিন। তারা সব সময় মুখে জিকির ধরে রাখতে চেষ্টা করতে পারেন। ছোট ছোট জিকিরের মাধ্যমেও আমরা অনেক বড় পুরস্কারের আশা করতে পারি। আল্লাহ’র রাসূল (সাঃ) বলেন,

“যে ব্যক্তি ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পাঠ করবে, প্রতিবারে তার জন্য জান্নাতে একটি করে খেজুর বৃক্ষ রোপণ করা হবে।”

জামে তিরমিজি ৫/৫১

আমরা মায়েরা সারা দিন-রাত পরিশ্রম করি স্বামী, সংসার, সন্তানের জন্য। তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করি, বাসা পরিষ্কার রাখি, বাচ্চাদের দেখেশুনে রাখি ইত্যাদি। আমরা আশা রাখবো আল্লাহ সুবহানু তায়ালা প্রতিটি কাজকে সাদাকা হিসেবে গণ্য করবেন এবং এজন্য আমাদের পুরষ্কৃত করবেন।

রমজান মাসে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। সেহরিতে একটু আগে ঘুম থেকে উঠে গেলে আমরা এই অভ্যাসটা করে ফেলতে পারি। এছাড়া প্রতি ওয়াক্তের নামাজ আউয়াল ওয়াক্তে  পড়ার চেষ্টা করা যায়।

করোনাকালীন রমজানে অনেকেই লকডাউন অবস্থায় আছি, তাই প্রতিদিন যত বেশি পরিমাণ নামাজ স্বামী সন্তানসহ সবাই একসাথে জামাতে আদায় করতে পারি। এই অভ্যাসটা আমাদের সন্তানদের মাঝে নিয়মানুবর্তিতা ও ইবাদতের জন্য ভালোবাসা তৈরি করবে, এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হবে।

৩. কাজ সহজ করা

দেশের সামাজিক বাস্তবতা হলো ইফতার এবং সেহেরিতে আমরা নানা ধরনের খাবার খেয়ে থাকি এবং এগুলো প্রস্তুত করা মায়েদের জন্য সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ। খাবারের এই অনাবশ্যক বাহুল্য যদি কমাতে পারি তবে রান্নাঘরে আমাদের অনেক কম সময় দিতে হবে।

  • রমজানের আগেই ঘর পরিষ্কারের কাজ করে ফেলা উচিত। জানালার পর্দা, সোফার কভার, কুশন কভার ধুয়ে আয়রন করে রাখা যায়, ফ্যান ,লাইট পরিষ্কার করা, রান্নাঘর পরিষ্কার করা , অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ডাস্টবিনে ফেলার মতো কাজগুলো করে ফেললে রমজানে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ এড়ানো যাবে।
  • তান্দুরি বা চিকেন ফ্রাই’র জন্য অনেকে গোশত ম্যারিনেট করে রেখে দেয়। মাছ মসলা মাখিয়ে ফ্রিজারে (প্রচলিত ডিপ ফ্রিজ) রেখে দেয়া বা কাবাব রেডি করে ফ্রোজেন করে রেখে দেয়া যায়।
  • রসুন, আদা একসাথে অনেক পরিমান ব্লেন্ডার করে বা বেটে ডিপে বক্স বক্স করে রাখতে পারে। পেঁয়াজ বেরেস্তা করে ডিপে রাখলে ঝটপট অনেক রান্নায় ব্যবহার করা যায়। তবে এর স্বাস্থ্যগত দিক নিয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে।
  • অনেকে ছোলা সিদ্ধ করে পাঁচ সাত দিনের অনুপাতে ছোট ছোট জিপ লক ব্যাগে করে রেখে দেয়। পেঁয়াজুর জন্য ডাল বাটা একসাথে বেশি করে বেটে ছোট ছোট প্যাকেট করে সাত দিন, দশ দিনের জন্য একবারে রাখা যায়।
  • রান্নাতে কম সময়ে লাগানোর জন্য প্রেসার কুকার ব্যবহার করলে বেশ ভালো ফল দেয়। গোশত রান্না বা কোন কিছু সিদ্ধ করতে প্রেসার কুকার কম সময় নেয়। 

মোদ্দাকথা, যতভাবে সময় বাচিঁয়ে কাজ করা যায়। ফ্রিজিং করার সময় মূলত স্বাস্থ্যগত বিষয়টি খেয়াল করতে হবে এবং প্রতিটি খাবার আলাদা ভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যেন কোন খাবারই খোলা না থাকে।

৪. খাবার

রামাদানে অনেকে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা, পেটের সমস্যায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘক্ষণ পেট খালি রেখে রোজা ভেঙেই অনেকে শুধু তেলেভাজা খাবার খেতে পছন্দ করে। অত্যাধিক তেল মসলা জাতীয় খাবার সবসময়ই আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। 

এক্ষেত্রে আমরা যদি দই চিড়া জাতীয় খাবার, ফ্রুট সালাদ, লাচ্চি, বিভিন্ন রকমের ফলের জুস, খেজুর, বিভিন্ন মৌসুমী ফল , বাদাম, কাস্টার্ড এ জাতীয় খাবার শুরুতেই খাই তবে আমাদের পেটে আরামবোধ হবে এবং শরীর দুর্বল হবে না। 

ইফতারে ভরপেট শরীরে যে ক্লান্তিভাব আসে, সেটা এড়ানোর একমাত্র উপায় একসাথে অনেক কিছু না খাওয়া এবং হালকা খাবার দিয়ে ইফতার করা।

অনেকে ইফতারিতে ভাত জাতীয় খাবার খেয়ে থাকেন। এটাও বেশ ভালো অভ্যাস। এইসময় দুধ চা, কফির মত ক্যাফেইন জাতীয় খাবার এড়িয়ে যেতে পারলে শরীরের জন্য উপকারী হবে।

যেসব মায়েরা রোজা অবস্থায় বাচ্চাদের স্তন্যদান করেন, তাদের একটু সচেতন ভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সেহরিতে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি জাতীয় খাবার খাবেন। এছাড়া ইফতার এবং সেহরিতে খেজুর রাখতে হবে। দুধজাতীয় খাবার সেহরিতে রাখলে শরীরে সহজে পানি শূন্যতা তৈরি হবে না। আর পাশাপাশি বেশি করে দোআ করতে হবে যেন বাচ্চার খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে আসে। দুগ্ধদানকারী মায়েদের জন্য মাতৃত্ব থেকে এই দুটো লেখা আছে যা মায়েদের কাজে লাগতে পারে।

অনেকেই সেহরিতে কিছু না খেয়ে রোজা রেখে দিতে চান। একজন মায়ের এধরনের অভ্যাস অবশ্যই পরিহার করতে হবে। কোনভাবে সেহেরি বাদ দেয়া উচিত হবে না এবং সামান্য করে হলেও যে কোন ধরনের খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

৫. ঈদ কেনাকাটা

ঈদের কেনাকাটা রোজা শুরু হওয়ার আগেই শেষ করে ফেলা যায়। রোজা অবস্থায় মার্কেট/শপিং মলে কেনাকাটা দরদস্তুর করা একদিকে যেমন কষ্টকর, তেমনি অন্যদিকে এটা ইবাদতের সময়, শারীরিক সক্ষমতা ও মনযোগ কমিয়ে দেয়। 

এছাড়া অনেকেই একাধিক মার্কেট ঘুরতে পছন্দ করে। একজনের জন্য একের অধিক পোশাক কেনাকাটা করে। এসব ক্ষেত্রে আমরা যদি একটু পরিকল্পনামাফিক কেনাকাটা করি, তাহলে আর্থিক ও শ্রমের অপচয় থেকে বেঁচে যাবো।

৬. যাকাত

রমাদানকেই অনেকে আমরা যাকাত গণনার ভিত্তিমাস হিসেবে ধরে নেই। ইসলামের অন্যতম ফরয ইবাদত যাকাতের হিসেব নিকেশ ও আদায়ের কাজটা আমরা রোজার আগেই করে ফেলতে পারি। আমাদের সম্পদ, সোনা গয়না হিসাব করে সে অনুযায়ী যাকাত নির্ণয় করা এবং যাকাতের খাত জেনে নিয়ে যথাযথ গ্রহীতা খুঁজে বের করে যাকাত দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারি।

যাকাতের জন্য কম দামে শাড়ি/লুঙ্গি/কাপড় না কিনে পুরো টাকাটা যেকোন একটি পরিবারকে দিতে পারি, গ্রহীতাকে পরবর্তীতে যাকাত না নিতে হয়। যাকাত দেয়ার জন্য এখন বিশেষায়িত অনেক সংস্থা (সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট) কাজ করে যারা এই দানগুলো মানুষের কাছে পৌঁছাতে সহযোগিতা করে। 

৭. পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক

যদিও প্রযুক্তির কল্যাণে আত্মীয়স্বজনদের খোঁজখবর করা অনেক সহজ, তবুও জীবন-জীবিকার ব্যস্ততা আমাদের সম্পর্কগুলোকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে দিচ্ছে। রমাদানে যখন আমরা আল্লাহ’র দিকে ফিরে আসার জন্য বেশি চেষ্টা করি, স্বাভাবিকভাবে এইমাসে আমাদের মানসিক প্রশান্তি অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি থাকে। এই মাসে আল্লাহ’র সাথে আমাদের বন্ধন বাড়ানোর সাথে সাথে আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত করতে পারি। 

রমজানের প্রতিদিন যেকোনো একটা সময় আত্মীয়স্বজনদের খবরাখবর নেয়াতে ব্যয় করতে পারি। সাধ্যমত ঈদ উপহার দিতে পারি আপনজনদের। এতে সম্পর্ক গুলো মজবুত হয়। তবে কথা বলার সময় গীবত ও পরনিন্দা না করার ব্যাপারে বেশি মনযোগী হতে হবে। 

আরো যা করা যেতে পারে:

  • ছেলেমেয়েদের তাদের মামা-চাচা, খালা-ফুপু, নানু-দাদুদের মাঝে যারা কাছাকাছি থাকেন না, তাদের সাথে ফোনে কথা বলিয়ে দিতে হবে। বাচ্চারা দেখে শিখে। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে পারিবারিক বন্ধন গুলো কেমন মজবুত তবে বড় হয়েও তারা তা রক্ষা করতে শিখবে।
  • প্রতিবেশির হক আমরা কদাচিৎ আদায় করি। এই মাসে আমরা আমাদের ইফতার বানানোর সময় পরিমাণে যদি একটু সামান্য বাড়িয়ে বানাতে পারি, হোক সেটা এক পদের খাবার, সেটা আমরা আমাদের আশেপাশে দু’এক বাসার প্রতিবেশীকে সেটা হাদিয়া হিসেবে দিতে পারি। 

এভাবে আমরা একই সাথে রোজাদারকে ইফতার করানোর অশেষ সওয়াব এবং প্রতিবেশির সাথে সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করার হক আদায় করতে পারি। আমরা মনে রাখব, বিপদে-আপদে আমরা সবার আগে এই প্রতিবেশীদের সাহায্য আশা করতে পারি।

বাচ্চাদের জন্য পরিকল্পনা

১. রমাদান চেকলিস্ট 

বাচ্চাদের চেকলিস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মা ও বাচ্চা এই কার্যক্রমকে নিজের মনে করা এবং এজন্য একসাথে চেকলিস্ট তৈরি করা। মানসিক স্টেজ ও বয়সভেদে বাচ্চার অ্যাক্টিভিটিতে ভিন্নতা থাকবে। চেকলিস্টে যেসব বিষয় আসা উচিত সেগুলো হলো: 

  • জামাআতে সালাত আদায়
  • সাওম পালন
  • জিকির
  • দোয়া/সুরা মুখস্থকরণ
  • ভালো কাজ, 
  • পারিবারিক কাজে সাহায্য করা, 
  • সাদাকা ইত্যাদি।

চেক লিস্ট অনুযায়ী প্রতিদিন তার কাজের পাশে টিক চিহ্ন বা স্টার চিহ্ন দেয়া যায়। দু’তিন বছর বয়সী বাচ্চারা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারে। পাঁচ ছয় বছর বয়সী বাচ্চারা দোয়া সুরা ইত্যাদি মুখস্থ করতে পারে, বাবা মায়ের সাথে নামাজে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া তাদের জন্য আধা বেলা রোজা রাখা চেকলিষ্ট অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এভাবে আরেকটু বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে রোজা পূর্ণাঙ্গভাবে রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো যদি তাদের চেকলিস্ট আসে তবে তারা সেই স্টারমার্ক গুলো দেখে অনুপ্রাণিত হবে।

২. ইবাদতে আগ্রহ তৈরি করা

রমজান মাসে ইবাদত ও আল্লাহমুখীতার যে আমেজ তৈরি হয়, সেটা বড়দের সাথে বাচ্চাদেরও স্পর্শ করে। এ সময় তাদের মনে সালাত, সাওম, কুরআন, রমজান, ঈদ, সাদাকা ইত্যাদি নিয়ে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়। বড়রা সময় নিয়ে তাদের জন্য উপযুক্ত ভাষায় সেসব প্রশ্নের উত্তর দিবে। আমরা আমাদের কথা, কাজ দিয়ে তাদের মাঝে ইসলামের মৌলিক বিষয় (শাহাদাহ, সালাত, হজ্ব, রমাদান) নিয়ে আগ্রহ তৈরি ও পরিষ্কার ধারণা দিতে পারি।

ইবাদাতে আগ্রহী করার জন্য আরো যা করা যায়:

  • ছেলে বাচ্চাদের তাদের বাবা সাথে মসজিদে জামাতে সালাত আদায়ের জন্য পাঠানো
  • সামর্থ অনুযায়ী বাচ্চাদের আধবেলা থেকে পুরো রোজা রাখার জন্য উৎসাহিত করা
  • বাচ্চাদের সেহরি ও ইফতারে সামিল করা
  • সেহরি ও ইফতার কেন্দ্রীক ইবাদাতগুলোতে তাদের সম্পৃক্ত করা

রমাদান ছাড়াও অন্যান্য সময়ের কিছু কাজ হতে পারে এরকম:

  • বাচ্চাদের কুরআন শোনানো, হতে পারে বাবা-মা তাদের কাজের মাঝে তেলাওয়াত করবেন অথবা রেকর্ডকৃত তেলাওয়াত শোনাবেন।
  • ঘুমের সময় বাচ্চাকে নিয়ম করে তেলাওয়াত শোনানো। এটা বাচ্চাদের সহজে কোরআন মুখস্থ করতে সাহায্য করে।
  • ভাই বোন মারামারি না করা, নিজের খেলনা নিজে গুছিয়ে রাখার মতো ভাল কাজের বিনিময়ে চেকলিস্টে স্টারমার্ক এবং  নির্দিষ্ট পরিমাণ স্টারমার্কের বিনিময়ে পছন্দের খেলনা/গিফট কিনে দেয়ার মতো কোন ব্যবস্থা করা। এতে তারা আল্লাহ’র কাছ থেকে ভাল মন্দের বিনিময়ে জান্নাত-জাহান্নামের বিষয় অনুধাবন করতে পারবে।

৩. বাসার কাজে যুক্ত করা

ইফতারিতে সালাদ তৈরি, ফলমূল কাটা, খেজুর ধোয়া, শরবত বানানো, জগে পানি ভরা, প্লেট-বাটি প্রস্তুত করা ইত্যাদি কাজগুলো অনায়াসে বাচ্চাদের দিয়ে করানো যায়। এই কাজগুলো তাদের করতে দিলে তারা নিজেদেরকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে মনে পড়বে। 

দশ বছর বা তার থেকে বেশি বয়সে বাচ্চাদের পরিবারের কিছু দৈনন্দিন কাজ যেমন: ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করা, ঘর গোছানো, জামা-কাপড় ভাঁজ করা, পড়ার টেবিল পরিষ্কার রাখা, নিজের কাজ নিজে করা ইত্যাদি ভাগ করে দেয়া যায়।

৪. রামাদান ক্র্যাফটিং করা

রমজান মাসকে স্বাগত জানানোর জন্য বাচ্চাদের নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা করা যায়। 

  • ঘর সাজানো 
  • সাদাকা বক্স বানানো 
  • রমাদান চেক লিস্ট তৈরি করা 
  • লন্ঠন বানানো ইত্যাদি

বেশ কিছু কাজ বাচ্চাদের নিয়ে একসাথে করা যায়। ক্রাফটিং কেন্দ্রিক অনলাইনে অনেক ধরনের ম্যাটেরিয়ালস পাওয়া যায় । এই কাজগুলো বাচ্চাদের সাথে নিয়ে করলে তারা যেমন খুশি হবে, একই সাথে রমজান সম্পর্কে তাদের আগ্রহ তৈরি হবে। 

বাচ্চাদের নিয়ে এধরনের যৌথ কাজগুলোর উপকারিতা অনেক। সাদাকা বক্স বাচ্চার মাঝে দানের মানসিকতা তৈরি করবে। রমাদান চেকলিস্ট তাকে সুশৃঙ্খল জীবন যাপনে অভ্যস্থ হতে অনুপ্রাণিত করবে। মুসলিম হিসেবে রমাদান আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়, এটা বোঝানোর সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো বাবা-মা তাদের কাজের মাধ্যমে সেটা তুলে ধরবেন। ক্র্যাফটিং এরকম একটি কাজ যেটা বাচ্চার সৃজনশীলতা জাগিয়ে তুলবে, একইসাথে মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখবে।

নবজাতক এবং ছোট বাচ্চাদের মায়েদের জন্য করণীয়

একাধিক পিঠাপিঠি সন্তান বা দুই বছরের ছোট বাচ্চার মা –  এদের জন্য রমাদান বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং। রোজার কাজকর্ম সামলে দৈনন্দিন ফরজ ইবাদত করা অনেক কষ্টকর হয়ে যায়। এই মায়েরা মনে কষ্ট না নিয়ে বরং সাধ্যমতো ফরজ ইবাদত গুলো করার চেষ্টা করবেন। 

ছোট বাচ্চাকে কমপক্ষে দুই বছর হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হয়। ইংরেজিতে একটা কথা প্রচলিত আছে:

“It takes a village to raise a kid”। 

ছোট বাচ্চার হক হলো মা-বাবা সহ পরিবারের সব সদস্য তার প্রতি নজর রাখবে, যথাযথ যত্ন নিবে। তাই রমাদানে মা তার সাংসারিক কাজের সাথে সাথে বাচ্চার প্রতি সমপরিমাণ মনযোগী থাকবেন। ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি বেশি বেশি জিকির করবেন। 

সর্বোপরি, একজন মা তার সন্তান, সংসার সামলিয়ে তখনই ইবাদতে মনোযোগী হতে পারবে যখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তাকে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিবেন। পরিবারে সদস্যরা বাচ্চার দেখাশোনার পাশাপাশি রসনা বিলাসের আব্দার না করেন, এবং বাচ্চার মা’কে ইবাদতের সুযোগ করে দেন, তাহলে সামগ্রিকভাবে পুরো পরিবারে সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে বাচ্চার বাবা’র ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই মা হিসেবে রমাদান শুরুর আগে সবার সাথে এনিয়ে কথা বলুন। সহযোগীতামূলক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করুন।

পরিশেষে এটা বলবো, দোয়া মুমিনের অস্ত্র। আমরা অনেক পরিকল্পনা করতে পারি, কিন্তু আমাদের চেষ্টা এবং রিজিকের এই দুইয়ের সম্মিলনে আমাদের অর্জন নির্ধারিত হবে। রাব্বে করিম আমাদের একটি সফল রমাদান দান করুন, আমীন।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা