পপুলার একটা প্যারেন্টিং গ্রুপে একটা পোস্ট এসেছে সম্প্রতি যে হাজব্যান্ডদের লেবার রুমে উপস্থিত থাকা আইন করে বাধ্যতামূলক করে দেয়া উচিত। পোস্টটার নিচে প্রায় এক হাজার কমেন্ট এসেছে। এত কমেন্ট তো পড়া সম্ভব না তবে বেশ কয়েকটা পড়ার পর আমি কিছু কথা বলতে চাই এই নিয়ে। কারণ আমি নিজে লেবার রুমে হাজব্যান্ডের উপস্থিত থাকার একজন আন্তরিক সমর্থক! এবং আমার মনে হচ্ছে যে কেন লেবার রুমে হাজব্যান্ড থাকা উচিত বা উচিত না এই ধারণাটা আমাদের কাছে পরিষ্কার না। কয়েকটা পয়েন্ট নিয়ে কথা বলেছি নিচে।

১।

কেউ সেই পোস্টে কমেন্ট করেছেন যে এটা করলে খুব ভালো হয় তাহলে স্বামীরা সেই সময়ে স্ত্রীর কষ্টটা বুঝতে পারবেন এবং তাকে আরও বেশি ভ্যালু করবেন। কেউ পাল্টা বলেছেন যে এতে কিছুই হবে না কারণ হূমায়ুন আহমেদও উপস্থিত ছিল কিন্তু তাতে তার দাম্পত্য জীবনে লাভ হয়নি।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

এই ক্ষেত্রে আমি বলতে চাই যে লেবার রুমে হাজব্যান্ডের উপস্থিতি এই জন্য জরুরী না যে এতে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মূল্যায়ন বেড়ে যাবে বা দাম্পত্য সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। তবে এটা সত্যি যে এমনটা হয়। এর বহু প্রমাণ আছে। তবে এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদে বেশি দেখা যায়। উদাহরণ হিসাবে যদি বলি, আমার তিনটা লেবারের সময়ই আমার হাজব্যান্ড মাঝারী থেকে বেশি মাত্রায় অ্যাকটিভ রোল প্লে করেছে, আলহামদুলিল্লাহ। এই জন্য তাঁর প্রতি আমার মনে গভীর কৃতজ্ঞতা আছে। কিন্তু তারপরও দাম্পত্য ঠোকাঠুকি থেমে নেই। আজ থেকে বিশ বছর পর লেবার রুমে আমার কষ্টের অনুভূতি তাঁর মনে কতটুকু থাকবে আল্লাহই ভালো জানেন, কারণ আমি নিজেই সেই কষ্টের অনুভূতি আর ভালভাবে মনে করতে পারি না! সেই সময় আরও নেগেটিভ কোন ঘটনা যদি আমাদের জীবনে উদয় হয় তখন দাম্পত্য সম্পর্কে চীড় ধরতেই পারে, আল্লাহ না করুক। তাই দীর্ঘমেয়াদে সুদৃঢ় দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য স্বামীর ওই বিশেষ দিনের স্মৃতি মনে রাখা ছাড়াও উভয়ের নিজস্ব বিশ্বাস ও চরিত্রে আরও বেশি কিছু থাকা প্রয়োজন।

২।

কেউ কমেন্ট করেছেন যে লেবার রুমে হাজব্যান্ডের উপস্থিত থাকা আইন করে দেয়ার প্রস্তাব খুবই অপরিপক্ক চিন্তা কারণ সরকারী হাসপাতালগুলোতে ওয়ার্ডে পর্দা দিয়ে পাশাপাশি অনেকের ডেলিভারি হয়। এক্ষেত্রে অন্য মেয়েদের পর্দার ইস্যু চলে আসবে।

আসলে, বেশিরভাগ মেয়েই লেবার রুমে সাপোর্ট পারসন হিসাবে হাজব্যান্ডকে রাখতে চায়। এই উত্তর আমি মাতৃত্ব ওয়েবসাইটে একটা আর্টিকেল লেখার জন্য গ্রুপে পোল করে পেয়েছি, রৌদ্রময়ী স্কুলের প্রিনাটাল কোর্সের স্টুডেন্টদের জিজ্ঞেস করেও একই উত্তর পেয়েছি। কিন্তু তার মানে কিন্তু এই না যে সব মেয়েরাই তাই চায়। অনেকেই স্বামীর চেয়ে মা বা অন্য কোন মহিলা আত্মীয়াকে বেছে নিতে পছন্দ করেন। এখানে মূল কথা হচ্ছে লেবার রুমে একজন সাপোর্ট পারসন সাথে থাকা। সরকারী হাসপাতালগুলোতে যদি পর্দা নিয়ে সমস্যা হয় তাহলে স্বামী ছাড়া অন্য কেউ সাথে থাকতে পারেন সহজেই। তাই, স্বামীকেই থাকতে হবে এই ধারণার পরিবর্তে একজন সাপোর্ট পারসন বা প্রসব সঙ্গী থাকার ব্যবস্থা দেশের হাসপাতালগুলোতে হওয়া উচিত এই কথা আমরা বলতে পারি।

৩।

একজন কমেন্ট করেছেন যে দূর্বল মনের হাজব্যান্ডরা এমন মূহুর্ত সহ্য করতে পারবে না। আরেকজন মন্তব্য করেছেন যে উনার হাজব্যান্ড উপস্থিত ছিলেন কিন্তু এত কষ্ট দেখে পরে বলেছেন যে নেক্সট টাইম সিজার করে ফেলতে!

এখানেই আমি একজন চাইল্ড বার্থ এডুকেটর হিসাবে বলতে চাই যে লেবার রুমে হাজব্যান্ডের উপস্থিতি নিয়ে শুধু দাবী তুললেই হবে না, একজন সাপোর্ট পারসন কেমন হওয়া উচিত সেটা নিয়েও আমাদের জানা থাকতে হবে।

সাপোর্ট পারসন হবেন এমন একজন যিনি নরমাল ডেলিভারি ও সিজারিয়ান সেকশনের ভালো-মন্দ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, লেবার ও ডেলিভারি প্রসেস সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখেন, লেবারের প্রতিটা স্টেজে একজন মাকে কিভাবে সহযোগিতা করা যায় সেই নিয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি নেন, এমনকি সিজার হলেও ওটি রুমে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে অবগত থাকেন। 

এই ক্রাইটেরিয়াগুলো পূরণ হলে দুর্বল মনের ও অপ্রতুল জ্ঞানসপন্ন মানুষরা সাপোর্ট পারসন হিসাবে এমনিতেই বাদ পরে যাবেন।

৪।

এবার আসি মূল কথায় যা শুরুতে বলেছিলাম –  কেন হাজব্যান্ড বা একজন সাপোর্ট পারসন লেবার রুমে থাকা উচিত?

কারণ এতে মা মানসিকভাবে দৃঢ় থাকেন। লেবার শুধুই শারীরিক বিষয় না। এর সাথে মনের যোগ ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। মায়ের মানসিকতা পজিটিভ হলে লেবার দ্রুত প্রগ্রেস করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, অন্যদিকে মা মানসিকভাবে নেগেটিভ বা আতঙ্কিত অথবা অনিরাপদ বোধ করলে লেবার ধীর গতির হতে পারে অথবা থেমেও যেতে পারে। এমন কঠিন ও নাজুক পরিস্থিতিতে একজন আপন মানুষ, যিনি তার ভালো চান ঠিক তার মতো করেই, এমন একজনের উপস্থিতির গুরুত্ব অপরিসীম। সাপোর্ট পারসন মাকে নরম ভাষায় উৎসাহ দিলে, অন্তত হাতটা ধরে রাখলেও মা নিরাপদ বোধ করেন ও সাহস পান, যেখানে হাসপাতালের অপরিচিত পরিবেশে, অপরিচিত মুখের ভীড়ে সেই ব্যাথাতুর নাজুক সময়ে মায়ের দিশেহারা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। সাপোর্ট পারসন লেবারের প্রতিটা স্টেজে নিজ করণীয়র পাশাপাশি মায়ের সেই সময়ে কী করণীয় তা স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন, কারণ খুব সম্ভাবনা থাকে যে মা এই সময় নিজের করণীয় সম্পর্কে জানা জিনিসও ভুলে যেতে পারেন। এমনকি লেবার, ডেলিভারি ও ইমিডিয়েট পোস্টপার্টাম পিরিয়ডে কোন বিষয়ে মায়ের নিজস্ব কোন মতামত থাকলে তিনি সেই সময় সেটা ঠিকমত পালন হচ্ছে কিনা তা খেয়াল রাখতে পারেন যেহেতু মায়ের তখন নিজের মতামতের পক্ষে কথা বলার মতো অবস্থা থাকে না সাধারণত।

সুতরাং লেবার রুমে একজন সাপোর্ট পারসন উপস্থিত থাকা আইন করে বাধ্যতামূলক করে না দিলেও এতে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবী, এবং সেই সাপোর্ট পারসন স্বামী বা অন্য যে কেউই হতে পারে। তবে এই দাবী তোলার আগে আমাদের উপরের বিষয়গুলো নিয়ে ভালভাবে জানতে চেষ্টা করা খুব জরুরী। রৌদ্রময়ী স্কুল আয়োজিত অনলাইন প্রিনাটাল ক্লাসে আমরা মায়েদের পাশাপাশি তাদের স্বামীদেরও বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত জানাই, আলহামুদলিল্লাহ। ক্লাসের বাইরেও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমরা সাপোর্ট পারসনদের ভূমিকা নিয়ে টিপস শেয়ার করি। অনেকেই সেখান থেকে উপকৃত হচ্ছেন মাশাল্লাহ।

সেই সাথে আশার কথা হচ্ছে এখন দেশের নামীদামী কিছু হাসপাতালের পাশাপাশি ছোটখাট হাসপাতালেও লেবার রুমে সাপোর্ট পারসনদের এলাও করছে, আলহামদুলিল্লাহ, যদিও তা সংখ্যায় খুব কম। আশা করি অদূর ভবিষ্যতে বাবা-মায়েরা যখন আরও সচেতন হবেন ও জেনে-পড়ে প্রস্তুতি নিবেন তখন হাসপাতালগুলোর কাছে তারা এই দাবী আরও জোরালোভাবে তুলতে পারবেন, ইনশাল্লাহ!   

পরের পর্ব দেখুন এখানে

(লেখিকা চাইল্ডবার্থ এডুকেটর, AMANI Birth এবং প্রিনাটাল ইন্সট্রাকটর, রৌদ্রময়ী স্কুল)     

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা