প্রেগন্যান্সির শুরু থেকেই সব মায়ের অপেক্ষা থাকে কখন বাবুকে কোলে নেবেন। সেটার জন্য চলে সব আয়োজন। তবে লেবারের জন্যও প্রস্তুস্তি নেয়া দরকার। একটি লেখায় পড়েছিলাম লেবার কিছুটা ম্যারাথনের মত, এর জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। সঠিক জ্ঞান থাকলে আর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিলে লেবারের আর ডেলিভারির পুরো প্রসেসটাই একজন মায়ের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটা হতে পারে।

নর্মাল ডেলিভারি  কিংবা সি-সেকশান যেভাবেই বাবু আসুক না কেন, ডেলিভারির আগে মা যদি প্রসব প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তাহলে যেমন অপ্রয়োজনীয় সি সেকশান এড়ানো যায়, তেমনি কখন সি সেকশান একান্তই প্রয়োজন তা কিছুটা হলেও বুঝতে পারেন। প্রেগন্যান্সির পুরো সময়ে আমি খুব আগ্রহ নিয়ে লেবার, ডেলিভারী, পোস্ট-পার্টাম সম্পর্কে পড়াশোনা করেছিলাম আর নিজের ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলাম।

ডেলিভারির পূর্বে

নর্মাল ডেলিভারীর জন্য এমন ডাক্তার খুজে নেয়া উচিত যিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, কেননা যদি ডাক্তার- নার্সের টিম সহযোগীতা না করেন তাহলে একজন মায়ের জন্য লেবারের সময়টা খুব কঠিন হয়ে যায়। যেহেতু লেবার অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।

দুঃখজনকভাবে আমি যার কাছে ডেলিভারি করতে চাচ্ছিলাম উনি ডেটের কিছুদিন আগে দেশের বাইরে গেলেন। আমাকে অন্য একজন ডাক্তারের কাছে রেফার করে গেলেন।

আমার ডিউ ডেট পার হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ভয় দেখাতে লাগলেন যেন দেরি না করি, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাই। কিন্তু শরীর আর বাবু প্রস্তুত না হলে লেবার পেইন আসতে দেরি হতেই পারে- এই চিন্তা করে আরও অপেক্ষা করতে চাচ্ছিলাম।

 ডাক্তারের সাথে আলোচনা করলাম, উনি বললেন ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করবেন*।  সেই সময়ের আল্ট্রাসাউন্ডে দেখা গেল বাবুর গলায় কর্ড পেচানো, এক্ষেত্রে এমনিওটিক ফ্লুইড কমে গেলে সমস্যা হতে পারে। তাই আমি আরও বেশি বেশি তরল খেতে থাকলাম, খেয়াল রাখছিলাম কোনো ফ্লুইড লিক হয় কিনা। বেশি বেশি ব্যায়াম, হাটাহাটি আর সিড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে থাকলাম। নেট ঘেটে ন্যাচারালি লেবার ইন্ডিউস করার যত টেকনিক পেলাম মোটামুটি সবই ট্রাই করতে থাকলাম। 

সাত দিন পার হয়ে গেল । খুব হালকা ইরেগুলার কন্ট্রাকশান ছাড়া তেমন কিছু না থাকায় ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যেতে বললেন। উনি ইন্ডাকশানের কথা উল্লেখ না করায় আমি নিজেই জিজ্ঞেস করলাম। তবে খুব বেশি ভরসা দিলেন না। আমি ইস্তিখারা করে আরেকটু ওয়েট করার সিদ্ধান্ত নিলাম। 

ডেটের ৯ দিন পর নতুন আরেকজন ডাক্তারের কাছে গেলাম যিনি নরমাল করান বলে অনেকের কাছে শুনেছি। তিনি খুবই হেল্পফুল ছিলেন। তিনি চেক করে দেখলেন ২ সেমি ডায়লেটেড, বাবুও বেশ নিচে নেমে এসেছে। উনি আমার মেম্ব্রেন সুইপ করে দিলেন। বললেন পরদিন সকালে ইন্ডিউস করবেন।

ডেলিভারির দিন

সেদিন রাতেই আস্তে আস্তে ক্র্যাম্পস শুরু হল। মধ্যরাত থেকে শুরু হল ডায়রিয়া আর হাল্কা ব্লিডিং।

তখন থেকে মোটামুটি রেগুলার বিরতিতে কন্ট্রাকশানের মত চলছে, তবে তীব্রতা খুব বেশি নয়। ৫-১-১ রুলের ব্যাপারে আগেই জেনেছিলাম, যদি ৫ মিনিট বিরতিতে ১ মিনিট ধরে কন্ট্রাকশান হয় আর তা ১ ঘন্টা চলে তাহলেই কেবল হাসপাতালে যাওয়া উচিত। আমার যদিও সারারাত কন্ট্রাকশান হচ্ছিল তবুও সেটার তীব্রতা কম থাকায় হাস্পাতালে যাওয়ার ব্যাপারে তাড়া করিনি।

১০ টায় ইন্ডাকশানের টাইম দিয়েছিলেন ডাক্তার, সকাল সকাল চলে গেলাম। রুমে যাওয়ার পর নার্স আর ডিউটি ডাক্তার এসে উৎসাহ দিয়ে গেলেন, হাঁটাহাঁটি করতে বললেন, চেক করে দেখলেন ৩ সেমি ডায়লেশান।

পুরোটা সময় আমি হাঁটছি, স্কোয়াট করছি আর খেজুর খাচ্ছি। যদিও ডাক্তার বলছিলেন শুধু লিকুউড খাবার খেতে তবুও আমি খেজুর খাচ্ছিলাম।

১০:৩০ তে  ইন্ডাকশান শুরু হওয়া মাত্রই তীব্রতম ব্যথা শুরু হল। যেহেতু ইন্ডিউসড লেবারে কন্ট্রাকশানের মাঝে বিরতির সময়টা খুবই কম তাই একদমই রেস্ট পাচ্ছিলাম না। তবে পেইন ম্যানেজমেন্টের কিছু টিপস জানা থাকলে কিছুটা সহনীয় হয়। এই পুরো সময়টাই হাঁটলাম,
কন্ট্রাকশান আসলেই দেয়াল ধরে হিপ রোটেশান করলাম। সাথে যারা ছিলেন তারা পিঠে ম্যাসাজ করে দিলেও  একটু আরাম পাচ্ছিলাম। ব্যথার জন্য প্যাথেডিন ইঞ্জেকশান দেয়া হল, তবে খুব একট কাজে লাগল না। ডাক্তার কয়েকবার ডপ্লার দিয়ে বাবুর হার্টবিট চেক করে নিলেন।

১ ঘন্টা পর ডাক্তার চেক করে দেখলেন ৬ সেমি ডায়লেশান। পিটোসিন দেয়া বন্ধ করে দিলেন।  তখন আমাকে লেবার রুমে নেয়া হল। ডাক্তার বলে দিলেন যে উনারা আশা করেন যে প্রতি ঘন্টায় ১ সেমি ডায়লেশান হবে। সেই হিসেবে ১০ সেমি হতে আরও ৪ ঘন্টা লাগবে ভেবে কিভাবে এত ব্যথা সহ্য করব চিন্তা করেই অস্থির লাগছিল। তবে নেগেটিভ চিন্তা না করে প্রতি কন্ট্রাকশানে বাবু নেমে আসছে-এরকম ব্যপারেই ফোকাস করলে কিছুটা সহজ লাগে ইন শা আল্লাহ।

লেবার রুমেও অনেক হেল্পফুল একজন খালা পেলাম যিনি  আমাকে নিয়ে হাঁটছিলেন, পিঠ ম্যাসাজ করে দিচ্ছিলেন, পজিটিভ কথা বলছিলেন, কিভাবে মুভ করলে ব্যথা কম লাগবে দেখাচ্ছিলেন আলহামদুলিল্লাহ।

আমি প্রচন্ড ব্যথায় সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলাম। একটা পর্যায়ে ব্যথা এত বেড়ে গেল যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না, প্রতিবার কন্ট্রাকশানে বসে যাচ্ছিলাম। নিচের দিকে প্রচন্ড প্রেশার অনুভব করছিলাম, তাই নার্স ডাক্তারকে ডেকে আনলেন। এমন সময়ে আমার ওয়াটার ব্রেক হল।

কিছুক্ষণ পর আমার নিজের মনে হল বাবু চলে আসবে, ডাক্তারকে বলতেই আমাকে বেডে উঠতে বললেন। আলহামদুলিল্লাহ আমাকে তেমন কোনো পুশ করতে হয়নি। কিছুক্ষনের মধ্যেই বাবু হয়ে গেল আলহামদুলিল্লাহ। তবে আমার এপিসিওটমি লেগেছিল।

আলহামদুলিল্লাহ ৪০ সপ্তাহ ১০ দিনে, প্রায় ৩ ঘন্টার লেবারের পর আল্লাহ তা’আলা মেয়েকে আমার কোলে দিলেন। আর দিলেন সারাজীবন মনে রাখার মত অসাধারণ এক স্মৃতি।

আমি নিজে মেনে চলার চেষ্টা করেছি এমন কিছু টিপস

  • প্রেগন্যান্সির শুরু থেকেই যত বেশি সম্ভব প্রেগন্যান্সি, লেবার, ডেলিভারী , পোস্ট পার্টাম নিয়ে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করা উচিত। এখন এসব বিষয়ে অসংখ্য  সুন্দর আর তথ্যবহুল রিসোর্স রয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
  • সবসময় মনে রাখা উচিত যে আল্লাহ তা’আলা আমাদের শরীরের সম্পূর্ণ সক্ষমতা  দিয়েছেন বাবুকে জন্ম দেয়ার জন্য। ব্যথার ব্যাপারে বেশি চিন্তা করলে বা ব্যাথা নিয়ে বেশি ফোকাসড থাকলে নর্মাল ডেলিভারীর ব্যাপারে ভীতি চলে আসতে পারে। আমাদের উচিত ব্যাথা কিভাবে ম্যানেজ করা যায়, কি করলে লেবার সহজ করা যায় সেসব দিকে মনোযোগ দেয়া।
  • থার্ড ট্রাইমেস্টার থেকেই শরীরে কুলালে দিনের বেশিরভাগ সময় হাঁটাহাঁটি করা নয়ত দাঁড়িয়ে থাকা উচিত, এতে গ্র্যাভিটি বাবুকে নেমে আসতে সাহায্য করে।
  • শুরু থেকেই গর্ভকালীন ব্যয়াম , স্কোয়াট করা, পেলভিক ফ্লোর এক্সার্সাইজ- এসবের অভ্যাস করা। এসব বাবুকে লেবারের জন্য optimal position বা সবচেয়ে উপযোগী অবস্থানে আসতে সাহায্য করে।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রচুর পানি খাওয়া। ৩৬ সপ্তাহ থেকে রেগুলার খেজুর খাওয়া, রেগুলার ফিজিক্যাল ইন্টিমেসি- এগুলো সার্ভিক্সকে নরম করতে সাহায্য করে। 
  • লেবারের সময় এমন কাউকে সাথে রাখা যিনি আপনাকে সাহস দেবেন।
  • দুয়া, দুয়া আর দুয়ার কোনো বিকল্প নেই। নর্মাল ডেলিভারী কিংবা সি সেকশান- যেটাতে কল্যাণআছে আল্লাহ তা’আলা যেন তাই দেন। 

এই মায়ের দ্বিতীয় ডেলিভারির গল্প পড়ুন এখানে

(লিখেছেনঃ উম্মে সাফিয়্যাহ) 

*এমনিওটিক ফ্লুয়িডের স্বাভাবিক মাত্রা ৮-২৫ সেমি।৩৮ সপ্তাহের পর থেকে তা কমতে শুরু করে। ফ্লুয়িডের পরিমাণ ৬-৮ সেমি পর্যন্ত থাকলেও নরমাল ডেলিভারীর জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অপেক্ষা করা যেতে পারে, তবে যদি তা কমে ৬ এর নিচে নেমে আসে তাহলে অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসব ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা বা না করার সিদ্ধান্ত অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নেয়া উচিত। – মাতৃত্ব

সম্পাদনায়ঃ হাবিবা মুবাশ্বেরা

ছবি কৃতজ্ঞতা: Pinterest