প্র্যাগ্নেন্সি থেকে পোস্টপার্টাম: লড়াইটা নিঃশব্দ কিন্তু শক্তিশালী

জাদুর কিটে বহুল প্রত্যাশিত লাল দুই দাগ। আবেগ উচ্ছাসে চোখ ছলছল, হৃদয় টলমল। জীবন ভরপুর। কত প্রতিক্ষার পর অবশেষে সে এল।

কিন্তু কিছুদিন যেতেই লক্ষ্য করলেন জীবন যেন ক্রমশ ছন্দ হারাচ্ছে। খেতে ইচ্ছা করছে না, বমি পাচ্ছে। সবচেয়ে পছন্দের খাবারেও কেমন এক উৎকট গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন।
কি খাবেন আর কি খাবেন না বুঝেই পাচ্ছেন না। অথচ পেটে তখন বেশ খিদে।

এই মন ভালো তো এই মন খারাপ। মুড সুইং যেন নিত্যকার সাথী। খুব ছোট ছোট কারণেও অযথাই কষ্টে বুক ভার হয়ে আসছে। কান্না পাচ্ছে ভীষণ! অথচ কখনও আপনি এমনটা ছিলেন না।

প্র‍্যাগ্নেন্সির পুরো লড়াইটা ঠিক এইরকম নানা উত্থান পতনের গল্পে ভরপুর।
পরিবারের সদস্যরা যদি খুব সাপোর্টিভ হয় তাহলে হয়তো তারা আপনাকে আগলে রাখবে। কিন্তু সবসময় যে তারা বুঝবে এমনটা নাও হতে পারে।
আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় সাপোর্টিভ হয় না।

আপনার শারীরিক কষ্ট, ক্লান্তি বুঝতে পারে না। বরং আপনার উপরই তাদের প্রত্যাশা চাপিয়ে দিচ্ছে। কিংবা আপনার জন্য যদি কিছু করছে সেটা নানা আচরণ, কথায় বিরক্তি দিয়ে প্রকাশ করছে।

প্র‍্যাগ্নেন্সির শুরু থেকে পোস্ট পার্টাম….
এই গল্পটা আপনার। আপনার একার।
কারণ কেউ আপনার এই কষ্টটা টের পাচ্ছে না।

একজন নতুন মা হিসেবে আপনি তখন কি করবেন?
স্বভাবতই ভেঙে পড়বেন।
এতে কি হবে?
আপনার এবং আপনার সন্তানের ক্ষতিই হবে।
আপনি কান্না করবেন। সাথে সেই কষ্ট বাজেভাবে ছুয়ে যাবে আপনার সন্তানকে।


আপনি হতাশা, রাগ, ক্ষোভ, অভিমান জমিয়ে ডিপ্রেশনের চূড়ান্তে পৌঁছে যাবেন।
আর সেই ডিপ্রেশন আপনার সন্তানের নিউরনে পৌঁছে যাবে।
আপনার কাছের মানুষটা আপনার খাওয়ার খোঁজ নিল না।
আপনি অভিমানে না খেয়ে বসে থাকলেন।
আপনার সন্তানও আপনার সাথে না খেয়ে থাকলো।
যে কথা গুলো একসময় খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারতেন। এখন সেসবের কিছুই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছেন না। অভিমান, কান্নায়, আক্রোশে ভেঙে পড়ছেন। সাথে ভেঙে যাচ্ছে আপনার প্রতীক্ষিত প্রিয় সন্তান!

সেই বিষণ্ণ সময় গুলোতে মনে হচ্ছে আপনার মধ্যে থাকা চিরাচরিত সবর আর ধৈর্য্য হারিয়ে গেছে।
অন্যের আচরণে যতটা কষ্ট পাচ্ছেন। তারচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগছে নিজের কাছে নিজের অচেনা রুপকে।

প্রিয় মা, আপনি অধৈর্য্য হারাবেন না।
এসবকিছুকে আপনি সহজভাবে নেয়ার চেষ্টা করুন।
একটু দম নিন।


ভাবুন আপনার শরীরে আরেকটা প্রাণ বড় হচ্ছে। আপনার রক্ত, মাংসে আপনার নাড়িতে জড়িয়ে থাকা। সে আপনার প্রিয় সন্তান।


সেই সন্তানকে ধারণ করতে গিয়ে আপনার শরীরে হরমোনের একটা বড় ধরনের পরিবর্তন হয়ে গেছে আপনারই অলক্ষ্যে। যা কিনা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।


আপনার শারীরিক একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে, যাচ্ছে। এটা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।


আর এসবই প্রতিটা মায়ের মাতৃত্বের স্বাভাবিক গল্প। এই গল্পের আপনি একাই একক চরিত্র নয়।


আপনার মতো হাজারো মা আছেন। যাদের অবস্থা আপনার মতোই। অথবা তাদের অনেকেই আপনার থেকেও অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছে।

আপনি তাদের কথা ভাবুন।

নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করুন।

আপনি ভাবুন, আপনার জন্য আপনার রব আছেন।
তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট।

অন্যের উপর প্রত্যাশা কমান। রবের উপর প্রত্যাশা বাড়ান।
ভেতর ঠান্ডা হবে। অভিযোগ কমে যাবে। অভিমান পাহাড় হয়ে গলার কাছে আটকে যাবে না।

ভাবুন এই সময়টা একদিন শেষ হয়ে যাবে।

আপনার প্রিয়তম সন্তান তার আধো আধো বুলে আপনাকে মা বলে ডাকবে। আপনার গলা জড়িয়ে ধরবে। আপনার সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকবে।
কেউ যেদিন আপনার মলিন মুখটা দেখবে না সেদিন ছোট দুই হাতের মায়া আপনার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিবে।
মাতৃত্বের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো সন্তানের মুখের মায়া আপনার অজান্তেই আপনার প্রিয় গল্প হয়ে যাবে।

সেই সন্তানের জন্য আপনি নিজেকে আগলে রাখুন। নিজের ভালো থাকার দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিন। আপনার যা যা করলে শরীর, মন ভালো লাগবে সেটা দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করুন।
ইস্তেগফার করুন, রবের কাছে সাহায্য চান। এই সময়ে দোয়া কবুল হয়।

কাছের মানুষদের সাথে একটু গল্প করুন।
কে কি বলল সেটা একটু এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।


অন্যের কাছে সাহায্য চাইলে ছোট হয়ে যাবেন। এই চিন্তা আপাতত সরিয়ে রাখুন। নিজের ভালো থাকার জন্য নিজের প্রয়োজনে কিছুটা গা সওয়া হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

পাছে লোকে কিছু বলে টাইপ লোকদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখুন।
ধরে নিন আপনার লড়াইটা আপনার। লড়াইয়ে জিততে সবসময় শরীরের জোর দিয়ে টিকা যায় না। যেমনটা পারবেন না প্র‍্যাগ্নেন্সিকালীন কিংবা ডেলিভারি পরবর্তী সময়ে।

সেইসময় গুলোতে কিছুটা কৌশল আপনাকে অবলম্বন করতেই হবে।
কখনও সয়ে গিয়ে, কখনও অন্যের কথা আচরণকে গুরুত্ব না দিয়ে, কখনও সবর করে, কখনও নিজের ভালো লাগাকে গুরুত্ব দিয়ে।

আপনি একজন মা হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন নিজেকে। নিজেকে গুরুত্ব দেয়ার মানেই গর্ভের সন্তানকে গুরুত্ব দেয়া। কিভাবে আপনি শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকবেন, কিভাবে মানসিক ভাবে সুস্থ থাকবেন সেটার প্রায়োরিটি দিন।

আপনার লক্ষ্য হোক আপনি সুস্থ থেকে সুস্থ সন্তানের জন্ম দেয়া।

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ জানুয়ারি ১৫, ২০২৬