গর্ভাবস্থার যাত্রাটা হবু মা বাবার জন্য আনন্দ, কৌতূহল আর ভয়ের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
অনাগত সন্তানের হার্টবিট প্রথমবার শোনার অনুভূতি যে কারো জন্যই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অদ্ভুত সেই মায়া আর ভালোবাসা থেকেই অনেকে ঘরে বসে যখন-তখন হার্টবিট শোনার জন্য 'পোর্টেবল ফীটাল ডপলার' কিনে আনেন।
কিন্তু এটি ব্যবহার করা কতটুকু নিরাপদ? বিশেষজ্ঞদের মতামত কি এ সম্পর্কে, চলুন একদম সহজ ভাষায় জেনে নিই।

বিষয়সূচী
ফীটাল ডপলার আসলে কী এবং কাজ করে কীভাবে?
সহজ কথায়, এটি একটি ছোট হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস যা আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি ব্যবহার করে গর্ভস্থ শিশুর হৃদপিণ্ডের স্পন্দনকে শব্দে রূপান্তর করে শোনায়।
এটি কিভাবে কাজ করে?
- এই ডিভাইসটি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তরঙ্গ পাঠায় যা জরায়ুর ভেতরে প্রবেশ করে।
- যখন এই তরঙ্গ শিশুর হৃদপিণ্ড বা রক্তপ্রবাহে বাধা পায়, তখন তা প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে।
- ডিভাইসটি সেই পরিবর্তনকে শ্রবনযোগ্য শব্দে রূপান্তর করে।
আশার কথা হলো, এই ফেটাল ডপলারে এক্স-রের মতো কোনো ক্ষতিকর রেডিয়েশন নেই। তবে এর কার্যকারিতা সম্পূর্ণভাবে সঠিক ব্যবহার ও উপযুক্ত পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
চিকিৎসকরা কেন এটি ঘরে ব্যবহার করাকে নিরুৎসাহিত করে?
- ভুল বোঝার ভয়: একজন মা অনেক সময় নিজের পেটের ভেতরকার অন্যান্য শব্দ—যেমন নিজের রক্ত সঞ্চালন বা প্লাসেন্টার শব্দকে শিশুর হার্টবিট ভেবে ভুল করতে পারেন।
- মিথ্যা আশ্বাস: ধরুন, শিশুটি কোনো কারণে অস্বস্তিতে আছে বা নড়াচড়া কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আপনি ডপলার দিয়ে ভুল করে নিজের হার্টবিট শুনলেন এবং এটাকে শিশুর হার্টবিট ভেবে নিশ্চিন্তমনে ঘরে বসে থাকলেন। এই 'ভুল আশ্বাস' এভাবে কখনো কখনো বড় বিপদও ডেকে আনতে পারে।
- অযথা আতঙ্ক: অনেক সময় শিশু পজিশন বদলালে হার্টবিট খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন মা-বাবা ভীষণ ভয় পেয়ে যান, যা মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ (যেমন FDA ও NHS)
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা ঘরে ফেটাল ডপলার ব্যবহারের বিষয়ে বেশকিছু সতর্কতার কথা বলেন।
১. FDA: যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক স্বাস্থ্য সংস্থা FDA ঘরোয়া ডপলার ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়। কারণ, এগুলো আসলে চিকিৎসকদের ব্যবহারের জন্য তৈরি (Prescription devices)।
প্রশিক্ষণহীন কেউ এটি ব্যবহার করলে ভুল ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি থাকে।
২. NHS ও অন্যান্য:
যুক্তরাজ্যের NHS এবং ব্রিটিশ মেডিকেল আল্ট্রাসাউন্ড সোসাইটিও এই ডিভাইস ব্যবহারের সময়সীমা সীমিত রাখার ওপর জোর দেয়। পোর্টেবল ডপলার এর চেয়ে নিয়মিত চেক আপের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে তাদের রিপোর্টে।
নিরাপত্তা ও ঝুঁকি: কিছু জরুরি সতর্কতা
যদিও এই পোর্টেবল ডপলার ব্যবহারে সরাসরি কোনো ক্ষতির অকাট্য প্রমাণ নেই, তবুও কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
- তাপ সৃষ্টি: আল্ট্রাসাউন্ড তরঙ্গ টিস্যুতে সামান্য তাপ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ ধরে বারবার এটি ব্যবহার করলে সেই তাপের প্রভাব শিশুর উপর কেমন হতে পারে সেটা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
- ALARA নীতি: চিকিৎসকরা সাধারণত ALARA (As Low As Reasonably Achievable) নীতি অনুসরণ করেন, যার অর্থ হলো—যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই কম সময় আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করা।
- ডিভাইসের মান: ঘরে ব্যবহারের অনেক ডিভাইসের মান ক্লিনিক্যাল ডিভাইসের মতো উন্নত নয়, ফলে এতে বিভ্রান্তিকর শব্দ পাওয়ার একটা সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যায়।
যদি ব্যবহার করতেই হয়, তবে কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
যদি আপনি কৌতুহলের বশে এটি কিনেই থাকেন, তবে এই টিপসগুলো মেনে চলুন:
- ১২তম সপ্তাহের আগে হার্টবিট খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই এরপর ই ডপলার ব্যবহার করতে পারেন।
- প্রতিটি সেশন মাত্র ১-২ মিনিটের মধ্যে শেষ করুন।
- শব্দ তরঙ্গ যাতে বাধা না পায়, সেজন্য অবশ্যই আল্ট্রাসাউন্ড জেল ব্যবহার করবেন।
সবচেয়ে সেরা বিকল্প কী?
চিকিৎসকরা বলেন, কোনো যন্ত্রের চেয়ে আপনার নিজের অনুভূতিই বেশি নির্ভরযোগ্য।
- কিক কাউন্ট (Kick Count): শিশুর নড়াচড়া খেয়াল রাখা। যদি শিশুর নড়াচড়া অস্বাভাবিক কম মনে হয়, তবে ডপলার দিয়ে হার্টবিট চেক না করে সরাসরি ডাক্তারের কাছে যান।
- নিয়মিত চেকআপ: প্রফেশনাল আল্ট্রাসাউন্ডে শুধু হার্টবিট নয়, শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য দেখা হয়। তাই বিশেষজ্ঞ রা নিয়মিত চেক আপ এর উপর গুরুত্ব দেন।
ডপলার দিয়ে শিশুর হৃদস্পন্দন শোনা হয়তো আনন্দের হতে পারে, কিন্তু এটিকে যেন আমরা চিকিৎসার বিকল্প না ভাবি। দিনশেষে মায়ের সুস্থতা আর শিশুর নিরাপত্তাই সবচেয়ে বেশি দামী।
