আমার মেয়ে পেটে থাকতেই আমার অনেক ইচ্ছে ছিলো বার্থ স্টোরি লেখার। যখন সবার স্টোরি পড়তাম তখন মনে হতো আমিও লিখবো।
আমার প্রেগন্যান্সির দ্বিতীয় টাইমেস্টারে হেভি ব্লিডিং হয়,সেদিন এতো ভয় পেয়েছিলাম তা বলার মতো না,খুব কান্নাকাটি করছিলাম। বিয়ের দুই বছর পরও আমি কন্সিভ করছিলাম না,অনেক ওষুধ, ডাক্তার পাল্টিয়েছি।
যেহেতু অনেক চাওয়ার পর আল্লাহ আমাকে এই নেয়ামত দিয়েছিলেন, তাই এতো ব্লিডিং দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ, ইনজেকশন প্লাস বেডরেস্ট থাকার পর আমি সুস্থ হই।
শুরু থেকেই দৃঢ় ইচ্ছা যদি সবকিছু ঠিক থাকে নরমালে চেষ্টা করবো।কিন্তু এমন অসুস্থতার জন্য ভয়ে ছিলাম।
শুরু থেকেই আমি হাটাহাটি করতাম কিন্তু মাঝে মধ্যে গ্যাপ দিয়ে। শেষের দিকে এসে নিয়মিত হাটতে বের হতাম,
আমার EDD ছিলো মে মাসের বারো তারিখে।
যেদিন এপ্রিল মাসের ২৭ তারিখ, সেদিন রাতে আমার খুব অসস্থি হতে লাগলো কোনো ব্যাথা না, হালকা কোমর ব্যাথা মতো। রাত থেকে পেশাব লেগেই যাচ্ছে একটু পর পর।ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে দেখছি কিছুই হচ্ছে না। একদম স্বাভাবিক, কোনো ব্যাথা নেই।
ভাবলাম নামাজ পড়ে ঘুমাবো,কিন্তু আমার উনি আমাকে জোর করে বললেন হাটতে বের হও, কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ। আমি প্রতিদিন যতদূর হাটতাম সেদিন তার অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে আমার তলপেটে ব্যাথা শুরু হলো, সেখান থেকে আর একপা-ও নড়তে পারলাম না।
অনেক কষ্টে বাসায় ফিরলাম।
সকালে উনি নাশতা করতে আসেন, তাই আমি ভাবলাম কিছু বানায়,রুটির খামির করে ফেলেছি, কিন্তু ব্যাথাও সহ্য করতে পারছি না এমন হয়ে গেলো। সব রুটি বানালাম, ডিম ভাজি করলাম। দুজনায় খেলাম,উনি যাওয়ার সময় বললেন বেশি ব্যাথা হলে আমাকে ফোন দিও। তখন সাতটা বাজে।
একটু পরই আমি ফোন দিলাম, উনি আসলেন আটটা বিশের দিকে।আমার মাকেও জানিয়ে দিলাম, কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছিল এটাই কি আসল ব্যাথা? আজকেই কি আমার বাবু হবে?
আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না।
আমি ভাবছিলাম আল্লাহ আবার নামাজ পড়তে পারবো কিনা, তাই দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করলাম আল্লাহ সহজ করে দিও।
আমার রিপোর্ট গুলো নিয়ে উনার মোটরসাইকেল করে আমরা হাসপাতালে গেলাম। পরে সবাই বলছিলো ব্যাথা নিয়ে তুমি মোটরসাইকেলে গিয়েছো?
নয়টার সময় আমাকে ভর্তি করলো,পিভি চেক করে জানালো আমার পাঁচ সে: মি: জরায়ুমুখ খুলে গেছে।
আমার মাকে ফোন দিয়েছিলাম, তারপর আমার মা চলে আসলো।
দশটা এগারোটা পর্যন্ত তো সহ্য করে নিয়েছি, এরপর শুরু হলো যেনো মরনযন্ত্রণা। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না, জোরো জোরে চিৎকার করছিলাম আর কান্না করছিলাম, এতো আহাজারি করছিলাম আমার মা'র কাধে মাথা রেখে।
তখন আমার এতদিন যাদের স্টোরি পড়েছি তাদের সবার স্টোরি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো
তাদের সবার কি এতো কষ্ট হয়েছে?
কই তাদের স্টোরি পড়লে তো মনে হয়না নরমাল ডেলিভারি এতো কষ্টের?
ডাক্তার এসে আমার পানি ভেঙে দিলেন,আমি দেখলাম পানিটা কেমন যেনো ঘোলাটে মত, এতো বুঝ তখন মাথায় ছিলো না। আমার
তখন শুধু চিন্তা হচ্ছিল ব্যাথা কিভাবে কমবে।
এতো ব্যথার পর শরীরে এক ফোটাও যেন শক্তি নেই। বারবার ঘুমে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম
ক্লান্তিতে,
অবশেষে লেবার রুমে নিয়ে গেলো।
রুমটা ছিলো দোতলা, পাশে জানালা দিয়ে রাস্তা, গাড়ি চলাচল মানুষ দেখা যাচ্ছে,আমি ভাবছিলাম তাদের কত শান্তি আর আমি এখানে কত কষ্টে।
যিনি খালাস করবেন উনি এতো বার বার বলছেন পুশ করো, কিন্তু আমি একদম নিস্তেজ মতো হয়ে গিয়েছিলাম,যতোটুকু শক্তি বাকি ছিলো পুরোটা দিয়ে চেষ্টা করেছি, তারা বললো বাবুর মাথা চলে এসেছে এখন দেরি করা যাবে না।টানা মনে হয় পনেরো থেকে বিশ মিনিট পুশ করার পর আল্লাহর অশেষ রহমতে একটা বিশ মিনিটে "আমার কলিজার টুকরা মেয়ে " আমার মা" দুনিয়ায় আসলো।
মনে হলো আমার সব কষ্ট নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো।মা হওয়া এতো মধুর, আমার মেয়ে না হলে জানতেই পারতাম না?
আমি মুখে মুখে অনেক শক্ত, কিন্তু সহ্যশক্তি খুবই কম।সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি কত শক্ত।
আমি লেবার রুম থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম ভিতরে নিয়ে আমার মেয়ের কানে তার বাবা আজান দিচ্ছে। সবাই আমার মেয়েকে কোলে নিচ্ছে আর বলছে ছোট সুরাইয়া হয়েছে,আমার মা সবাইকে ফোন দিয়ে বলছে আমাদের আরেকটা সুরাইয়া এসেছে। (আমার নাম সুরাইয়া)
যিনি খালাস করেন উনি বললেন তোমার বাবু বাথরুম করে ফেলেছিলো ভিতরে। তখন বুঝতে পারি পানিটা ঘোলাটে কেন ছিলো।
সার্ভিস মোটামুটি ভালোই। তবে একটা বিষয় খারাপ লেগেছে, সেটা হলো লেবার রুমে যতগুলো ইন্টার্ন মেয়ে ছিলো সবাই ওখানে উপস্থিত ছিলো। আমি বলছিলাম চলে যেতে কিন্তু তারা যায়নি,বলেছে মেয়ে মানুষই তো।
আমি এটা কাউকে বোঝাতে পারলাম না যে মেয়েরাও মেয়েদের সতর দেখতে পারবে না, প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা।
হাসপাতাল থেকে আমরা মনে হয় দুইটার দিকে বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম।অনেক অনেক শুকরিয়া আল্লাহর, যথেষ্ট সহজ করেছেন আলহামদুলিল্লাহ।
সবশেষে, মা হওয়া সহজ না। সিজার হোক বা নরমাল।
সব মা- ই সম্মানিত।
