জন্মনিয়ন্ত্রণে আজল (pull out method) এর কার্যকারিতা

বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মাঝে আজল একটি। ধর্মীয় কারণে মুসলমানদের মাঝে এর বেশ গুরুত্ব আছে। তবে আজল পদ্ধতির সুবিধার পাশাপাশি বেশ কিছু অসুবিধাও আছে, আছে কিছু ভুল তথ্য।

এই লেখায় জন্মনিয়ন্ত্রনে আজল পদ্ধতির কার্যকারিতা আলোচনা করা হয়েছে। 

আজল কী

স্ত্রী সঙ্গমের সময় শেষ মুহূর্তে যোনীর ভেতরে বীর্যপাত না করে বাইরে বীর্য স্খলন আজল বলা হয়, যা ইংরেজিতে পুল আউট (pull out) / উইথড্রয়াল মেথড (withdrawal method)  নামে পরিচিত।

এক্ষেত্রে কোন রকম বাড়তি পদ্ধতি যেমন কনডম, পিল, ইনজেকশন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়না।

আজল করার সুবিধা

আজল পদ্ধতির বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে, যেমনঃ

  1. এটি অর্থ সাশ্রয়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
  2. এই পদ্ধতিতে কোন রকম কেমিক্যাল জাতীয় বস্তু ব্যাবহার করতে হয় না। অনেকেই একান্ত মুহূর্তে বাড়তি কোন কিছু পছন্দ করেন না।
  3. সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে জন্মনিয়ন্ত্রণের সুবিধা পাওয়া যায়, যদিও এটির সাফল্য নিশ্চিত করে বলা যায় না।

আজল পদ্ধতির অসুবিধা

প্রিম্যাচুরড ইজাকুলেশন

যেহেতু আজল পদ্ধতিতে একটা নিয়ম থাকে যে সঠিক সময়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তাই সহবাস নিজস্ব গতিতে আগায় না। আবার কখনো কখনো সময়ের আগেই বীর্যপাত হয়ে যেতে পারে। বীর্যপাতের উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রন না থাকলে এটা কাজ করবে না।

পরিপূর্ণ শারীরিক তৃপ্তি না পাওয়া

শারীরিক সম্পর্কের স্বাভাবিক যে নিয়ম ও তৃপ্তি, আজলে সেটি বেশ খানিকটা অনুপস্থিত। বীর্যপাতের দিকে নজর রাখতে গিয়ে দুজনেই দুশ্চিন্তায় ভুগতে পারেন, যেটা সহবাসের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পারা

যৌন সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই বেশ স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করা যায়না। আজলে নিয়ন্ত্রণ রাখা বাধ্যতামূলক। তবে প্রায়ই সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ থাকে না ও স্ত্রী যোনীর মাঝেই বীর্যপাত হয়, যার ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্থ হয়।

নারীর শারীরিক তৃপ্তিতে বিঘ্ন

নারী ও পুরুষের শারীরিক আনন্দের ধরনে কিছুটা ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য রয়েছে। আজলের ফলে পুরুষের আনন্দ নিশ্চিত হলেও নারীর আনন্দ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই অধরা থেকে যায়, যা নিয়ে নারীরা লজ্জা বা জড়তায় স্বামীকে এ ব্যাপারে জানান না। এর ফলে অনেক স্ত্রী শারীরিক ও মানসিক অসুবিধায় ভোগেন এবং এ থেকে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও দাম্পত্য সমস্যাও তৈরি হয়।  

আজল কতটুকু কার্যকর?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষ্যমতে, জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য আজল খুব বেশি কার্যকরী নয়। একটি জরীপ বলছে, কেউ যদি সারা বছর জুড়ে আজল করে থাকেন, তবে ৭৮% ক্ষেত্রে এটি সফল হতে পারে, যার মানে প্রতি ১০০ জনে ২২ জন নারী আজল করেও কন্সিভ করেন, বাকিদের ক্ষেত্রে আজল এর মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। অন্যভাবে বললে, প্রতি ৫ জনে একজন নারী আজল করেও কন্সিভ করেন।

আজলের সময় পরিপূর্ণ বীর্যপাতের পূর্বেও কিছু কিছু শুক্রাণু নির্গত হয় যার মাধ্যমেও কন্সিভ হয়। বীর্যপাত নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও শারীরিক সম্পর্ক চলাকালীন এই শুক্রাণুর নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা যায়না। 

২০১১ সালে হিউম্যান ফার্টিলিটি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে পুরুষদের কাছ থেকে বীর্যপাতের আগে নেওয়া তরলের (pre-cum) নমুনায় ৩৭%-এ গতিশীল (motile) শুক্রাণু ছিল। যদি প্রাক-বীর্যপাত (Pre-ejaculate) যোনিপথে প্রবেশ করে, তাহলে পূর্ণ বীর্যপাত ছাড়াই গর্ভাবস্থা ঘটতে পারে।

তাছাড়া, বীর্যপাত যদি স্ত্রী যোনীর বাইরেও হয়, তবুও যোনীর আশেপাশের এরিয়ায় হলেও সেটা থেকে কন্সিভ হতে পারে কেননা শুক্রাণু সাঁতরে জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছে যাবার ক্ষমতা রাখে।

বুঝা যাচ্ছে, আজল করার পরেও গর্ভধারণ হতেও পারে। শারীরিক সম্পর্ক যারা করছেন, তারা এটা বুঝতে পারবেন না যে কখন আজলের ফলে কন্সিভ হচ্ছে। তাই কন্সিভ হয়ে যেতে পারে- এই চিন্তা মাথায় রেখেই আজল পদ্ধতির শরনাপন্ন হওয়া উচিত।

আজল সম্পর্কে হাদিসের ভাষ্য

সাহাবাদের সময়েও অনেকে আজলে অভ্যস্ত ছিলেন বলে ধারণা করা যায়। তবে যে হাদিসটি আজলের রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করা হয়, সেটার মাধ্যমে নিশ্চিত করে বলা যায় না যে সাহাবীরা এটা নিয়মিত প্র্যাকটিস করতেন। এছাড়া রাসুল (সাঃ) যে আজলের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন এমনটিও প্রতীয়মান হয়না। বরং তিনি এটা জেনে কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। 

আজল সম্পর্কিত হাদিসটি হচ্ছে-

“আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধকালীন সময়ে গানীমাত হিসাবে কিছু দাসী পেয়েছিলাম। আমরা তাদের সঙ্গে ’আযল করতাম। এরপর আমরা এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তরে বললেনঃ কী! তোমরা কি এমন কাজও কর? একই প্রশ্ন তিনি তিনবার করলেন এবং পরে বললেন, ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত যে রূহ পয়দা হবার, তা অবশ্যই পয়দা হবে।”

এখানে বরং দেখা যায়, রাসুল (সাঃ) সাহাবির এই কথায় বিস্মিত হয়েছেন এবং সন্তান জন্মের ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিয়েছেন।

তাছাড়া এখানে আজল পদ্ধতি যে মুসলিমদের পদ্ধতি এরকম বুঝানো হয়নি, বরং আরবের অধিবাসীদের মাঝে প্রচলিত একটি পদ্ধতি বলেই প্রতীয়মান হয়।

তবে খেয়াল রাখা উচিত, এই হাদিসে রাসুল (সাঃ) আজলকে পুরোপুরি নিষেধ করে দেননি।

জন্মনিয়ন্ত্রণের ইসলামিক বিধি মেনে, আল্লাহর উপর তাওয়াককুল রেখে সাময়িক পদ্ধতি হিসেবে আজল পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে বলেই আলেমগন মত প্রকাশ করেছেন।

ইসলাম ধর্ম অনুসারে জন্মনিয়ন্ত্রণের কিছু নির্দিষ্ট সীমা মান্য করে অন্যান্য পদ্ধতিও গ্রহণ করা যাবে যেমন কনডম ইত্যাদি। জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কেবল আজল-ই শরিয়তসম্মত বা সাহাবাদের আমল কিংবা উৎসাহ দেয়া হয়েছে, এরকম ধারণা ভুল।

ভুল ধারনার বশে অপ্রস্তুত কন্সিভ করে নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকি, বাচ্চাদের তরবিয়তগত ঝুঁকি ও নিজেদের দাম্পত্য বা স্ত্রীর যৌন আনন্দ নষ্ট করা বোকামি। সঠিক তথ্য জানলে অনেকেই আজল পদ্ধতি সম্পর্কে দুইবার ভাববেন।

শেষকথা

পরিশেষে বলা যায়, আজল একটি সাময়িক ও অনিশ্চিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। তাই যেসব দম্পতি এমন অবস্থায় আছেন যে কন্সিভ হয়ে গেলেও তাদের অসুবিধা নেই, সেসব দম্পতি কিছুটা সময় লাভের উপায় হিসেবে এই পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন।

তবে যেসব দম্পতি অসুস্থতা বা আগের বাচ্চা খুব ছোট- ইত্যাদি কারণে এখন সন্তান গ্রহণে প্রস্তুত নন, তাদের জন্য আজল পদ্ধতি গ্রহন উচিত নয়, কারণ এই পদ্ধতিতে শতভাগ জন্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত নয়, বরং ব্যর্থতার হার বেশি।

একটি সুন্দর দাম্পত্যের জন্য স্বামী স্ত্রী দুজনের শারীরিক বোঝাপড়া থাকা উচিত, দুজনেরই শারীরিক চাহিদা পূরণ হওয়া উচিত। আজল পদ্ধতিতে এই বোঝাপড়ায় কোন সমস্যা তৈরি করছে কিনা সেটাও বিবেচনা জরুরী।

প্রতিটি দম্পতির উচিত ধর্মীয় ব্যাপারগুলো লজ্জার দোহাই না দিয়ে সঠিকভাবে জানা, নিজের শারীরিক ক্রিয়া- প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে অবগত থাকা এবং নিজের স্বামী/ স্ত্রীর চাহিদার খেয়াল রাখা। তবেই দুজন স্বামী –স্ত্রী মিলে সুন্দর দাম্পত্য তথা সুন্দর পরিবার গঠন করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ মার্চ ২১, ২০২৫