braxton hicks contraction বা 'প্রচলিত ফলস পেইন'

গর্ভাবস্থার শেষ ট্রাইমেস্টারে গিয়ে মহিলারা অনেক সময় ফলস পেইন বা “ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন” এর মুখোমুখি হতে পারেন। সত্যিকারের প্রসব বেদনা শুরুর আগে একজন মা এমন ধরণের ব্যথা বা পেট শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা পেতে পারেন, যাতে তার মনে হতে পারে প্রসব বেদনা বুঝি শুরু হয়ে গেল! প্রসব বেদনা শুরুর আগে এধরনের কন্ট্রাকশনের কাজ হলো আপনার শরীরকে  সত্যিকারের প্রসব অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত করা। তবে এর মানে এটা নয় যে আপনি সন্তান প্রসবের একেবারে নিকটবর্তী। কিছু মা দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারেই ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন অনুভব করতে পারেন।

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন কী?

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন হল জরায়ুর মাংসপেশির বিক্ষিপ্ত সংকোচন ও শিথিলায়ন। ধারণা করা হয় যে  গর্ভাবস্থার ৬ সপ্তাহ থেকেই এই  কন্ট্রাকশন শুরু হয় কিন্তু সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টার এর আগে তা অনুভূত হয় না। অনেকে একে বলেন “আসল প্রসব বেদনার  প্র্যাকটিস”, কারণ এসময় আপনার শরীর আসল প্রসবের জন্য তৈরি হয়। এই কন্ট্রাকশন আপনাকে “ব্রিদিং এক্সারসাইজ” করার সুযোগ করে দেয়। (পাশ্চাত্যে অনেক মা গর্ভাবস্থায় কিছু কোর্স করেন যেখানে তাদের বিভিন্ন ব্যায়াম শেখানো হয়। ব্রিদিং এক্সারসাইজ অর্থাৎ গভীরভাবে শ্বাস নেয়ার ব্যয়াম  হলো এধরনের ক্লাসে শেখানো একটা ব্যায়াম যেটা সন্তান প্রসবের সময় বেশ কাজে দেয়।)

অনেকে একে পেটে একধরনের চেপে ধরার অনুভূতি বলে বর্ননা করেন। এটা সাধারনত ক্ষণস্থায়ী এবং আসা যাওয়ার মাঝে থাকে। অনেকে একে মাসিকের ব্যথার (cramp) সাথে তুলনা করেন।

সত্যিকারের প্রসবের সাথে এর পার্থক্য হলোঃ

  • এটা সাধারণত ততটা ব্যথাযুক্ত না তবে অস্বস্তিকর
  • কোন নির্দিষ্ট ধরন নেই
  • বেশি সময় ধরে ব্যথা থাকে না 
  • ব্যথা ক্রমাগত বাড়ে না
  • শুধু পেটেই এটা অনুভূত হয়
  • এর সাথে সাথে জরায়ুর মুখ খুলে যায় না
  • গর্ভবতীর নড়াচড়া বা অবস্থান বদলে ব্যথা বা পেটের শক্তভাব কমে যেতে পারে
  • ব্যথা কমতে কমতে একেবারে চলে যায়

কেন হয়? 

কিছু ডাক্তার ও মিডওয়াইফদের মতে এই কন্ট্রাকশন জরায়ুর মাংশপেশিকে শক্তিশালী করে এবং প্লাসেন্টাতে রক্ত প্রবাহ বাড়ায়। বেশিরভাগ সময় পানির স্বল্পতা (ডিহাইড্রেশান) এধরনের কন্ট্রাকশনের কারণ। অন্য যে বিষয়গুলো এধরনের ‘নকল’ প্রসব বেদনাকে উসকে দেয় তা হলোঃ

  • বমিভাবের মতো অসুস্থতা
  • গর্ভস্থ বাচ্চার নড়াচড়া
  • গর্ভবতীর সক্রিয় অবস্থা (যেমন ভারী কিছু উঠানো বা সহবাস)
  • প্রস্রাবের বেগ

কীভাবে আসল প্রসব বেদনা চেনা যাবে?

নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন এবং উত্তর মিলিয়ে নিনঃ

প্রশ্ন: কন্ট্রাকশনের ধরণ কী রকম?

নকল ব্যথার ক্ষেত্রে কন্ট্রাকশন অনিয়মিত এবং দুইটা কন্ট্রাকশন এর মাঝে বিরতির সময় ক্রমাগত কমে না।
আসল ব্যথায় কন্ট্রাকশন নিয়মিত বিরতিতে ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড ধরে হয় এবং দুইটা ব্যথার মাঝে বিরতির সময় ক্রমাগত কমতে থাকে।

প্রশ্ন: আপনার নড়াচড়ায় কী ব্যথায় কোন পরিবর্তন হয়?

নকল ব্যথায় আপনার হাঁটাচলা বা পাশ পরিবর্তনে কন্ট্রাকশন থেমে যেতে পারে বা একেবারে চলে যেতে পারে।
আসল প্রসববেদনায় আপনার সক্রিয়তা কোন প্রভাব ফেলে না এবং ব্যথা চলতেই থাকে।

প্রশ্ন: ব্যথার তীব্রতা কেমন?

নকল ব্যথার তীব্রতা বেশ কম। অনেকসময় শুরুতে বেশি হলেও ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।
সত্যিকারের প্রসব বেদনায় ব্যথা ক্রমান্বয়ে ধীরগতিতে বাড়তে থাকে।

প্রশ্ন: কোথায় ব্যথা হয়?

নকল ব্যথায় পেটের সামনের দিকে বা পেলভিসে ব্যথা হয়।
আসল প্রসব বেদনায় ব্যথা মেরুদন্ডের নিচে থেকে শুরু হয়ে তলপেটের সামনের দিকে যেতে পারে অথবা  তলপেট থেকে শুরু হয়ে পেছনের দিকে যেতে পারে।

ব্র্যাক্সটন হিক্সের ব্যথা কীভাবে কমানো যায়?

  • অবস্থান বদলে এই ব্যথা কমে। তাই আপনি দাঁড়ানো থাকলে শুয়ে পড়ুন। আর বসা বা শোয়া থাকলে উঠে হেঁটে আসুন।
  • ২০-৩০ মিনিট উষ্ণ গরম পানিতে গোসল করুন।
  • পানি স্বল্পতা হলে কয়েক গ্লাস পানি পান করুন।
  • হালকা গরম দুধ বা হার্বাল চা পান করুন।

গর্ভকালীন তলপেটে আর কী ধরনের ব্যাথা হতে পারে?

পেটের দুই পাশে হঠাৎ ও তীব্র ব্যাথাকে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন বলে। সন্তান পেটে আসার পর ক্রমবর্ধমান জরায়ুকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য পেটের এই লিগামেন্ট এ টান পড়তে পারে এবং ফলে ব্যথা হতে পারে।

বিভিন্ন শারীরিক কর্মকান্ড, যেমন দাঁড়ানো, শোয়া অবস্থায় পাশ ফেরা, কাশি দেয়া, সজোরে নাক টানা এমনকি প্রস্রাবের সময় এই ব্যথা শুরু হতে পারে। এটি জায়গা বদল করতে পারে এবং কয়েক সেকেন্ডেই থেমে যায়। ব্যাথা উপশমের জন্য –

  • দাঁড়ানো বা পাশ ফেরার সময় পেটে হাত দিয়ে পেটকে সাপোর্ট দিতে পারেন এবং বেশ ধীরে নড়াচড়া করবেন
  • অবস্থান বদলে দেখুন। যদি ডান কাত হয়ে শুয়ে থাকেন, তবে বাম কাত হয়ে দেখুন।
  • বিশ্রাম নিন। দরকার হলে গরম সেক বা উষ্ণ পানিতে গোসল করুন।

ব্যথায় কখন ডাক্তার দেখাবেন?

বিভিন্ন রকম ব্যথা বা অস্বস্তি গর্ভাবস্থায় বেশ সাধারণ ঘটনা। তাই যেকোন ব্যথায় ডাক্তার ডাকা বা হাসপাতালে যাওয়ার দরকার নেই। গর্ভাবস্থার প্রথম কাজ হলো এর বিভিন্ন অবস্থা, উপসর্গ সম্পর্কে ভালমতো বিস্তারিত জানা।

নিন্মোক্ত দৃশ্যপটে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন বা হাসপাতালে যানঃ

  • যোনিপথে রক্তপাত (vaginal bleeding)
  • ক্রমাগত পানি নিঃসরণ বা পানি ভাঙ্গা। সেটা হতে পারেন একসাথে অনেক পানি বা অল্প অল্প পানি চুইয়ে পড়া (leaking or rupture membrane) 
  • এক ঘন্টা ধরে প্রতি ৫ মিনিটে তীব্র কন্ট্রাকশন বা খিঁচুনি
  • এমন কন্ট্রাকশন যে আপনি দাঁড়াতেই পারছেন না
  • বাচ্চার নড়াচড়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন, যেমন প্রতি ১২ঘন্টায় ১০বারের কম নড়াচড়া বা টানা ৪ ঘণ্টা বাচ্চা না নড়া
  • ৩৭ সপ্তাহের আগে আসল প্রসব বেদনার কোন লক্ষণ

তথ্যসূত্র

১. ওয়েবএমডি
২. আমেরিকান প্রেগনেন্সি

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ সাবরিনা আফরোজ
MBBS, MPH
লেকচারার, ঢাকা কমিউনিটি মেডিসিন কলেজ

সম্পাদনায়ঃ হাবিবা মুবাশ্বেরা
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ফ্রিপিক