gap between babies

আমরা অনেকেই প্রথম বাচ্চা নেয়ার পর দ্বিতীয় বাচ্চা নেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে গিয়ে সঠিক গ্যাপ/ব্যবধান খুঁজে বের করতে গলদগর্ম হই। এ বিষয়ে জুলিয়া ইওল নামের একজন মিডওয়াইফ প্র্যাকটিশনার তার নিন্মোক্ত মতামত তুলে ধরেছেন:

দুটো বাচ্চার মাঝে কত গ্যাপ হওয়া উচিত তা নির্ভর করে আপনি ও আপনার স্বামী/স্ত্রী কখন নিজেদের প্রস্তুত মনে করবেন এর উপর। নিজেকে প্রস্তুত মনে করার অর্থ হলো, আরেকটা বাচ্চা নেয়ার জন্য আপনারা মানসিক ভাবে প্রস্তুত কি না। এছাড়া শারীরিক প্রস্তুতিরও একটা দিক আছে। বাচ্চা এমন বিষয় না যে আপনি অর্ডার দিলেন আর তা চলে আসলো! যদি মা হিসেবে আপনার বয়স ৩০ এর বেশি হয় তাহলে আপনার ইতিবাচক ভাবে চিন্তা করা উচিত, কারণ নারীদের গড়পড়তা ৩৫ বছরের পর ফার্টিলিটি/গর্ভধারনের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে।

এছাড়াও আগের গর্ভধারণ পরবর্তী শারীরিক ধকল কাটিয়ে উঠা এবং আরেকটি বাচ্চা নেওয়ার মতো প্রস্তুত শরীরও একটা ইস্যু। বিশেষজ্ঞরা বলে এই ধকল কাটিয়ে উঠতে সাধারনত ১৮ মাস সময় প্রয়োজন।

তবে পূর্বের সন্তান যদি মৃত হয় কিংবা বারবার গর্ভপাত এইধরণের কিছু কেইসে নির্দিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শই সিদ্ধান্ত।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

০৬ মাসের কম ব্যবধানে সমস্যা

গবেষণায় দেখা যায়, যেসব বাচ্চা আগের বাচ্চা জন্মানোর ৬ মাসের মধ্যে গর্ভে আসে, তাদের কতগুলো সমস্যা হতে পারে:

  • নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব
  • কম ওজন হওয়া
  • আকারে ছোট হওয়া
  • দ্বিতীয় বাচ্চার মাঝে অটিজম থাকার সম্ভাবনা
  • পুষ্টিহীনতা থাকার সম্ভাবনা
  • জন্মগত ত্রুটি

এই তো গেল বাচ্চার ক্ষেত্রে কি কি হতে পারে। মায়ের ক্ষেত্রে যা হতে পারে তা হলোঃ

  • গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর,মায়ের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অভাব
  • প্রথমবার সিজারের পর কম ব্যবধানে বাচ্চা হলে স্বাভাবিক প্রসবের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া
  • গর্ভকালীন রক্তশূন্যতা
  • প্রসবোত্তর বিষন্নতা ও সাইকোসিস
  • সিজোফ্রেনিয়া

দুই সন্তানের মাঝে ব্যবধান ১বছর হলে, তারা নিজেদের মাঝে বন্ধু হতে পারে ঠিকই তবে মা ও দ্বিতীয় সন্তানের শারীরিক কিছু সমস্যার সম্ভাবনার কথা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায়না।

বয়সের ব্যবধানের বিভিন্ন দিক

WHO (World Health Organization) এর পরামর্শমতে, দুই গর্ভধারণের মাঝে ব্যবধান ২৪মাস হওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। এতে মায়ের শরীর সকল ধকল এবং পুষ্টিহীনতাকে কাটিয়ে আবারও নতুনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে পারে। ২৪ মাস সম্ভব না হলেও অন্তত ১৮মাস ব্যবধানের ব্যাপারে পরামর্শ দেয় WHO।

এই ব্যবধান ১৮ মাস হলে আপনি সহজেই আগের গর্ভধারণসংক্রান্ত ধকল কাটিয়ে আরেকটি গর্ভধারনের প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করতে সমর্থ হবেন। এজন্য প্রয়োজনীয় মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ।

যদি এই ব্যবধান ১৮ মাস থেকে ২ বছরের হয়, তবে আপনি প্রথম গর্ভধারণের সময় নিজের জন্য যেটুকু সময় পেয়েছিলেন ততটা পাবেন না। কারণ তখন আপনাকে নিজের যত্নের পাশাপাশি একটা ছোট বাচ্চারও দেখভাল করতে হবে। তবে ইতিবাচক বিষয় হলো, আপনি ইতোমধ্যেই গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন যেটা আপনাকে কি কি ঘটতে পারে তা অনুমান করতে সাহায্য করবে।

বাচ্চাদের ব্যবধান আরও অনেক পারিবারিক বিষয়কে প্রভাবিত করে। ছোট ব্যবধানের ক্ষেত্রে ছোট বাচ্চা বড় করার সময়টা তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যায়। তবে খরচের বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে। কারণ প্রথম বাচ্চাকে দেয়া খেলনা দ্বিতীয় বাচ্চাও একই সময় পেতে চাইবে, ফলে একই খেলনার দুই কপি কিনতে হতে পারে। ব্যবধান যদি ৩-৪বছর হয়ে থাকে তবে বড় বাচ্চা তখন কিছু কাজ নিজেই করতে পারে। এসময়টা তাই মায়ের জন্যে স্বস্তিদায়ক।

বড় ব্যবধানের ক্ষেত্রে প্রতিটি বাচ্চাকে আলাদা ভাবে মনযোগ দেয়া সম্ভব হয়। এর ফলে বাচ্চা জন্মদানসংক্রান্ত খরচও আপনি হয়তো ভালভাবে ম্যানেজ করতে পারবেন- একই খেলনা বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী আপনি যেমন প্রথম বাচ্চার জন্য ব্যবহার করতে পারবেন, ঠিক তা দিয়েই দ্বিতীয় বাচ্চাও চালাতে পারবেন।

বাচ্চাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কও এই ব্যবধান দ্বারা প্রভাবিত হয়। যেমন ব্যবধান বেশি হলে তাদের মাঝে হৃদ্যতা কম হতে পারে। হয়তো তাদের মাঝে নেতিবাচক অনুভূতিও জাগ্রত হতে পারে। তবে তা শুধু ৩ বছর ব্যবধান পর্যন্ত থাকে,৪ বছর থেকে এই নেতিবাচক চিন্তা কমে আসে বাচ্চাদের মাঝে।

আরেকটা গবেষনার ফল থেকে দেখা যায়, বড় ব্যবধানের বাচ্চারা গণিত ও পড়ার ক্ষেত্রে ভাল দক্ষতা দেখায়। দুই বছরের বেশি ব্যবধানের বাচ্চারা এর কম ব্যবধানের বাচ্চাদের তুলনায় পড়াশুনায় ভাল করে, হয়তো তারা তাদের বাবা মা’র সঙ্গে বেশি সময় কাটায় বলে এমনটা হতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল

কিছু গবেষণালব্ধ ফলাফল উল্লেখ করা জরুরী

University of British Columbia এবং Harvard TH Chan School of Public Health যৌথভাবে একটি গবেষণা করেন কানাডায় ১,৫০০০০ মায়ের উপর, যা JAMA Internal Medicine এ প্রকাশ হয়, এই গবেষণায় তারা পান- জন্মদান এবং পুনরায় গর্ভধারণের মাঝে আদর্শ সময় হলো ১২-১৮ মাস।

এছাড়াও তারা আরও পান-

  • ১২ মাসের কম ব্যবধানে যারা গর্ভবতী হোন তাদের সকলের জন্যেই এটি ঝুঁকিপূর্ণ।
  • মায়ের জন্যে ঝুঁকি সৃষ্টি হয় বেশি যদি মা পয়ত্রিশোর্ধ্ব হোন, কিন্ত সকল বয়সের মায়ের ক্ষেত্রেই বাচ্চার জীবনের ঝুঁকি থাকে অনেক বেশি।
  • পয়ত্রিশোর্ধ্ব মায়েদের ক্ষেত্রে যারা ৬মাসের ব্যবধানে গর্ভধারণ করেন তাদের মাতৃমৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে ১.২%(প্রতি ১০০০ মায়ের মাঝে ১২ জনের মৃত্যু হয়)
  • এক্ষেত্রে ১৮মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করলে এই ঝুঁকি কমে হয় ০.৫% (প্রতি ১০০০ এ ৫জন)
  • কমবয়সীদের মাঝে যারা ৬মাসের ব্যবধানে গর্ভধারণ করেন তাদের সময়ের আগে (৩৪ সপ্তাহের আগেই) প্রসবের ঝুঁকি বাড়ে ৮.৫%।(প্রতি ১০০০এ ৮৫জন)
  • কিন্তু তারা যখন ১৮মাস অপেক্ষা করেন এই ঝুঁকি কমে আসে ৩.৭% এ (প্রতি ১০০০ এ ৩৭জন)

এই গবেষণার একজন গবেষক Laura schummers বলেন, “আমাদের গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, কাছাকাছি ব্যবধানের গর্ভধারণ মা এবং বাচ্চা দুইজনের জন্যেই ঝুঁকিপূর্ণ,এমনকি পয়ত্রিশোর্ধ্ব মায়েদের ক্ষেত্রেও।“

তিনি আরো যোগ করেন”এই গবেষণা বেশি বয়সের মায়েদের জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেখা যায়, তাদের মাঝে গর্ভধারণে ব্যবধান কম দেওয়ার প্রবণতা বেশি।“ তবে এই গবেষণা কানাডার এক শহরের মায়েদের উপর করা,তাই জাতি,শারীরিক,জিনগত পার্থক্যে এই ফলাফলে অনেকটাই বদল আসতে পারে।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ

এবার আসি কিছু তুলনামূলক বিশ্লেষণেঃ দেখি কত বছরের ব্যবধানে কি কি সুবিধা অসুবিধা হতে পারে-

১বছর বা তার কাছাকাছি ব্যবধান

সুবিধা

  • বাচ্চারা হতে পারে একে অপরের বন্ধু।
  • প্রথম বাচ্চা বুঝ হওয়ার আগেই যেহেতু দ্বিতীয় বাচ্চার আগমন ঘটে এবং তারা কেউই বাবা-মাকে একচ্ছত্রভাবে পায়নি,তারা সে স্বাদ জানেনা। তাই তাদের মাঝে থাকেনা কোন ঈর্ষাবোধ। (ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকতে পারে)
  • আপনি মা কিংবা বাবা হিসেবে হতে পারেন আরো দক্ষ। কারণ বড়জনকে নিয়ে সময়টা কাটিয়েছেন খুব বেশি দূরে নয়(তবে প্রত্যেক বাচ্চা, প্রত্যেক গর্ভধারণ আলাদা)
  • বাচ্চাদের অনেককিছু শেখানোতে করতে হবেনা দ্বিগুণ চিন্তা। বড়জনকে দেখেই শিখে নিবে ছোটজন।

অসুবিধা

  • ছোট বাচ্চাকে পৃথিবীতে সামলে, গর্ভে অন্য বাচ্চাকে নিয়ে থাকা কষ্ট বটে। তবে পরিবারের সাহায্য যদি থাকে যথেষ্ঠ তো এই সময়টা সামলে নেওয়া যায়।
  • মায়ের পুষ্টিহীন্তা যেমন সমস্যা একে মোকাবেলা করতে দরকার বাড়তি পুষ্টি এবং তার সম্পর্কে জ্ঞান।
  • মা এবং বাচ্চার শারীরিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রেখে, সাবধান থাকা, স্ক্রিনিং করা খুবই জরুরি

২ বছরের ব্যবধান

সুবিধা

  • মায়ের শরীর গর্ভধারণের জন্যে পুরোপুরি প্রস্তুত।
  • গর্ভকালীন এবং পরবর্তী জটিলতা গুলোর সম্ভাবনা কমে আসে।

অসুবিধা

  • এক্ষেত্রে বাচ্চাদের মাঝে ঈর্ষাবোধ হতে পারে প্রবল।
  • বড় বাচ্চা তখনো কঠিন শৈশব “টেরিবল টু” পার করেনি,এমন সময়ে আরেকজন বাচ্চার দেখাশোনা করে দু’জনকেই সমানভাবে সময় দেওয়া কঠিন বটে। তবে বাবা মা এর দুইজনের একত্রে পরিকল্পনা সবকিছুকে করতে পারে অনেক সহজ।

৩ বছরের ব্যবধান

সুবিধা

  • বড় বাচ্চা এইসময় অনেক কিছুই নিজে করতে শিখছে। মাকে সেসময় সে দিতে পারে সস্তি।
  • মায়ের শারীরিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ।

অসুবিধা

দুই বাচ্চার মাঝে এই ব্যবধানেও ঈর্ষাবোধ বিদ্যমান থাকে।তবে বাবা মা-এর পরকল্পিত প্যারেন্টিং সবকিছুকে সহজ করতে পারে। এক্ষেত্রে পজিটিভ প্যারেন্টিং এর ব্যাপারে জানা খুব জরুরি

৪ বছর বা ততোধিক ব্যবধান

সুবিধা

  • এক্ষেত্রে ঈর্ষাবোধ অনেকটাই দূরে থাকে।
  • বড় বাচ্চা অনেক কাজে মা বাবাকে সাহায্য করতে পারে।
  • যখন মা অন্যকাজে ব্যস্ত,বড়জন তখন ঘুমন্ত ছোটজনকে দেখে রাখতে পারে।

অসুবিধা

  • ৪ পর্যন্ত সবটা ঠিক থাকলেও WHO ও পরামর্শ দেয় ব্যবধান যেন ৫ অতিক্রম না করে।
  • ভাইবোনের মাঝে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

সব সিদ্ধান্ত, সব ঘটনারই সুবিধা অসুবিধা থাকতে পারে-যা মানুষভেদে হবে ভিন্ন ভিন্ন। গবেষণা লব্ধ ফলাফল যাই হোক, পরিবর্তন হয় প্রতি কেইসে। গবেষক, চিকিৎসকরা সবসময়ই প্রাধান্য দেন একজন মা কি নিজেকে প্রস্তুত মনে করেন কিনা সে বিষয়ে, অবশ্যই এই প্রস্তুতিতে মাকে চিন্তায় রাখতে হবে শারীরিক,মানসিক,আর্থিক এবং পারিবারিক বিষয়কে। বাচ্চাদের আগমনের সাথে সাথে দাম্পত্য জীবনকেও দিতে হবে সম্পূর্ণ মনোযোগ। সেইজন্যেই সিদ্ধান্ত হবে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের একসাথে।

তাই, ব্যবধান যা-ই হোক না কেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব বিষয় দুজনে মিলে ঠিক করুন, যাতে তা পুরো পরিবারের বিকাশকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এ বিষয়ে আপনার কোন প্রশ্ন বা মতামত থাকলে আমাদের জানান।

তথ্যসূত্র

  1. হোয়াট টু এক্সপেক্ট ডট কম
  2. মেয়ো ক্লিনিক
  3. বিবিসি
  4. WHO
  5. UNICEF

সম্পাদনা ও পরিবর্ধন: ডাঃ মাশরুরা মাহজাবিন

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ মাশরুরা মাহজাবিন
MBBS
General Practioner, Trained Mental health counselor

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা