শিশুদের হাতেখড়ি নিয়ে মনোবিদ এরিকসন এরিক তার “Childhood and Society” বইয়ে লিখেন, শিশুরা ৫ ভাবে শিখতে পারে। এই ৫ টি ভাগকে তিনি সাজিয়েছেন যথাক্রমে-

নিঃশব্দ খেলা, সৃজনশীল খেলা, সক্রিয় খেলা, সমবেত খেলা বা দলগত খেলা এবং অভিনয় জাতীয় খেলা।(১)

এরিকসন এরিক

তবে, ইউরি বনফ্রেনব্রেনারসহ সবাই একমত যে শিশুরা (এবং সকল মানুষ) নতুন কোন দক্ষতা শিখে চারটি বিষয়কে সমন্বয় করে; মনোযোগ, স্মৃতি, উপলব্ধি এবং দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে।(২)

শিশুদের হাতেখড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মূল দায়িত্বটা থাকবে পড়াশুনার প্রতি তাদের একটি পযিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করে দেয়া। তাদের স্মৃতিশক্তিতে পড়াশুনার উপাত্ত সরবরাহ করা। তাদেরকে কর্তৃত্বে অভ্যস্ত করে তোলা, অর্থাৎ ‘কথা শুনেনা’ এই হতাশার পর্যায়ে না গিয়ে ‘কথা শুনতে হবে’ এই দৃঢ়তা ও কঠোরতায় অটুট ধাকা। এতে শিশুরা অন্যের অধীনে থেকে মনোযোগ দিয়ে অভ্যস্ত হতে পারে। নাহয় নিজের মনমতো চলার ও বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণে না থাকার একটা প্রবণতা তাদের তৈরী হবে যা পরবর্তীতে তাদেরকে উগ্র হতে সাহায্য করে। (বিস্তারিত আলোচনা পরে করা হবে) এবং তাদের উপলব্ধিকে তীক্ষ্ণ ও ধারালো করা যাতে তারা সহজেই উপলব্ধি করতে পারে।

এই চারটি দক্ষতাকে মানুষ স্বভাবতই পেয়ে থাকে। কিন্তু সঠিক জায়গায় সঠিক মাত্রায় তা প্রয়োগ ও ব্যবহার শিখার জন্য তাদেরকে গাইড করতে হবে; উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত গাইডেন্স দিতে হবে। আর এই গাইডেন্স শিশুদেরকে শেখানো শুরু করতে হবে তাদের প্রথম বছর থেকে।

৮ বছরের আগে শিশুরা যুক্তি বুঝবে না এবং ৩ মাস থেকে তারা অচেতনভাবে শিখতে শুরু করে। ফলে, শিশুদের জন্য শিক্ষার সবথেকে বড় উপকরণ হলো বাবা মায়ের আচরণ। তারা বাবা মাকে যেমন দেখছে সেসব মনে রাখছে। বাবা মায়ের যেমন আচরণ পাচ্ছে তা নোট করে রাখছে। They don’t understand but they recognize. আলোচনা শুরু করি কীভাবে শিশুদের মনোযোগ গঠন করা যায় এবং কীভাবে তাদের স্মৃতিতে পড়াশুনার তথ্য সরবরাহ করা যায় তা নিয়ে।

শিশুকে অচেতনভাবে শিক্ষা দেয়াটা তাকে হামাগুড়ি দিতে শেখানোর মাধ্যমে শুরু করা যায়। ১ মাস বয়সের পর তাদেরকে টামি টাইম প্র্যাক্টিস করালে হামাগুড়ি দিতে শিখবে দ্রুত।(৩) টামি টাইম হলো শিশুকে তার পেটের উপর কিছু সময় কাটাতে দেয়া। সাধারণত ঘুম থেকে উঠলে কিংবা অনেক্ষন শুয়ে ধাকার পর শিশুদেরকে টামি টাইম প্রাক্টিস করানো যায়; দীর্ঘ সময় পিঠের উপর শুয়ে থাকলে। এর জন্য বপি পিলো পাওয়া যায় কিংবা তোয়ালে প্যাঁচিয়ে ইংরেজি ইউ (U) এর মতো রেখেও এটা প্রাক্টিস করা যায়।

এছাড়া বাবা-মায়ের পেটের উপরেও উপুড় করিয়ে শুইয়ে রাখা যায়। এই সময়ে তাকে ব্যস্ত রাখার জন্য লাল-হলুদ-সাদা-কালো রঙের খেলনা চোখ বরাবর রেখে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে অথবা যদি বাবা মায়ের পেটের উপর থাকে তাহলে তাদের (বাবা-মায়ের) চেহারাই হবে সবথেকে উত্তম আকর্ষণ বস্তু।

যেহেতু বাচ্চারা ১ মাস বয়সে তাদের থেকে ৮-১২ ইঞ্চি অবধি দেখতে পারে তাই খেলনাকে তাদের চোখের সেই দৃষ্টিসীমা অবধি রাখলেই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ সম্ভব। সাধারণত , প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুরা ২-৩ মিনিটের বেশি টামি টাইম সহ্য করতে পারবে না। অভ্যস্ত হয়ে উঠলে ৪-৫ মিনিট সহ্য করতে পারবে। এতে বাচ্চাদের স্মৃতিতে উপুড় হওয়ার তথ্য জমতে থাকে এবং দৃষ্টিশক্তি ও মনোযোগ গঠিত হতে শুরু করে। পাশাপাশি শারিরীক কিছু মাংসপেশীও সুগঠিত হতে থাকে।

১ম মাস থেকেই শিশুদেরকে শিক্ষা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা যায় তাদেরকে টামি টাইম প্রাক্টিস করানোর মাধ্যমে। এরপর হাঁটার প্রশিক্ষণ অবশ্য সবাই-ই কম-বেশি দিয়ে থাকেন। এছাড়া অন্যান্য যেসব জিনিস যেমন ওর সাথে স্বাভাবিক ইন্টার‍্যাকশন বজায় রাখতে এমনভাবে কথা বলতে হবে যেন কোন বড় মানুষের সাথে গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে, যেন ও সব বুঝতে পারছে। যেমন যেখানে সেখানে পটি করে দেয়া বাচ্চাদের স্বভাব, এটা বাচ্চারা না বুঝেই করে কিন্তু এই পটি দেখে মায়ের নাকি সুরে তাকে হালকা বকুনি দেয়াটা তাকে মায়ের বকুনির সাথে ও তার রাগী চেহারার সাথে পরিচিত করাবে। সামান্য সব নোংরাটে বিষয়ে তাকে শাসনের সাথে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। এটা তাদের উপলব্ধিকে ধারালো করতে শুরু করবে।

আবার ৭ মাস বয়স থেকে তাদেরকে সুইচ অন অফ করা শেখাতে হবে। এতে ফাইন মোটর স্কিল ডেভেলপ করবে এবং শব্দের সাথে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বাবা মায়ের অধীনে থেকে শিখে ও বাবা মায়ের কাছে শিখে অভ্যস্ত হবে। তারা কর্তৃত্বের অধীনে থেকে বড় হতে শিখবে।

দুই আঙুলে কোন বস্তুকে ধরতে পারা অর্থাৎ পিন্সার গ্রাস্পিং (Pincer grasping) বাচ্চারা ৮ মাস বয়স থেকে শিখতে শুরু করে। (৪) এই সময় থেকেই তারা শিখতে পারে কলম কীভাবে ধরতে হয়। মায়েরা তাদের হাতে কলম দিয়ে দিয়ে অভ্যস্ত করাতে পারেন এই বয়স থেকেই। শুধু কলম ধরতে শিখলেই যথেষ্ট। ১ বছরের মধ্যে তাদের শিখে যাওয়া উচিৎ কীভাবে কলম ধরতে হয়। ২ বছরের মধ্যেই তাদের শিখে যাওয়া উচিৎ কীভাবে খাতায় অন্তত একটি লাইন আঁকতে হবে। মা একটি লাইন এঁকে দিবেন আর ও সেটাকে কপি করার চেষ্টা করবে। যদি ইতোমধ্যেই মায়ের ভাষা, কমান্ড ও শাসনের সাথে তার পরিচিতি ঘটে থাকে তাহলে সে সহজেই মায়ের ইনস্ট্রাকশন মোতাবেক কাজ করবে।

২ বছরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা বাচ্চারা শিখবে যেটা হলো স্বাধীন বা বাঁধাহীনভাবে অন্তত ৩-৪ পৃষ্ঠা উল্টাতে পারে।(৫)

২ বছর বয়সী শিশুরা বইয়ে ছবি দেখে ও সেই ছবি শনাক্ত করতে পেরে আনন্দ পায়। ওরা নতুন কিছু করতে ও সবাইকে তার কৃতিত্বের ব্যাপারে জানাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর এটাই তাদেরকে বর্ণমালার সাথে পরিচিত করানোর উপযুক্ত সময়। যদি তাদের মনোযোগ সুগঠিত হয়ে থাকে তাহলে বইয়ের চিত্র দেখে খুবই আপ্লুত হবে এবং লেগে থাকতে চাইবে। আর মায়ের অনুশাসনের সাথে পরিচিতির কারণে তার মাঝে এই নির্ভরতা থাকবে যে মায়ের কাছে সে নতুন কিছু শিখবে। তার স্মৃতি তাকে অটোমেটিকলি অনুগত করে রাখবে এবং নতুন কিছু শেখার উন্মাদনা জন্ম দিবে।

তথ্যসূত্র

(১) প্রশিক্ষণ ডট নেট

(২) Sprouts (Youtube Channel)

(৩) Nekole Amber (Youtube channel). পারমিতার প্রতিদিন (ফেসবুক পেজ)

(৪) Development Psychology – Jeana Overby

(৫) Nekole Amber (Youtube channel)

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা