প্রেগনেন্সি টেস্ট কিটঃ একটা জাদুর কাঠি!

এই লেখাটা লিখতে গিয়ে ছোট বেলার একটা কাহিনী মনে পড়লো। তাই ভাবলাম সেই কাহিনী দিয়েই তাহলে শুরু করা যাক। 

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি তখন অনেক ছোটই। মাতৃত্ব ও এসম্পর্কিত সবকিছু নিয়ে লিটারেলি ক্লুলেস বলা যায়! তো আমাদের বাসার যে খাদেমা আপা আছেন উনার তখন অলরেডি চার-পাঁচটা বাচ্চা (এখন তো উনার মাশাআল্লাহ্ আটজন সাঙ্গপাঙ্গ, একজন বাদে সবাই ন্যাচারাল/নরমাল ডেলিভারি!)। তো আবার কনসিভ করেছে কি না এটা নিয়ে টেনশন করছিলো অনেক। কারণ, একে তো অভাবের সংসার, তারউপর পরপর আবার আরেকজন! সাথে সেসময় পশ্চিম থেকে আমদানি করা “দুটি সন্তানের বেশী নয়, একটি হলে ভালো হয়”— এই বস্তাপঁচা বয়ান চারদিকে খুব সয়লাবও হয়ে গেছে! তাই লোকে কি বলবে এই লজ্জা, আর কি খাওয়াবে সেই চিন্তায় বেচারী অস্থির! পরে আমার আম্মা উনাকে বলে যে ‘কাঠি’ দিয়ে আগে পরীক্ষা করে দেখতে। যে আসবে সে আল্লাহর কাছে থেকে তার রিযিক্ব নিয়েই আসবে। এতো টেনশন করে মাথা ফাটানোর মানে হয় না। 

এরমধ্যে আমি আবার ইনাদের কথোপকথন শুনে ফেলি, যেটার অর্ধেকটার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝে আসে না। তাই বরাবরের মতো গিয়ে সরাসরি আম্মাকে জিজ্ঞেস করি— "আম্মা, কাঠি কি? আর কাঠি দিয়ে কিভাবে পরীক্ষা করে যে পেটের মধ্যে বাবু আছে নাকি নাই?!"

আমার আম্মা তো আমার প্রশ্ন শুনে প্রথমেই একটা ঝাড়ি মারে আড়িপাতার জন্য! কিন্তু আমি আসলে আড়িপাতি নাই, শুনে ফেলছি আরকি। যাই হোক। তারপর অনেকক্ষণ নাছোড়বান্দা আমি ঘ্যানরঘ্যানর করার পর আম্মা অবশেষে ক্ষান্ত দেয় আর জানায়— এটা বিশেষ একধরনের কাঠির মতো জিনিস যেটাতে মায়ের কয়েক ফোঁটা প্রস্রাব দিয়ে পরীক্ষা করা যায় পেটের মধ্যে বাবু আছে কি না। বাবু থাকলে দুইটা লাল দাগ, আর না থাকলে স্রেফ একটাই লাল দাগ ভেসে উঠে। 

আম্মার উত্তর শুনে আমার প্রথমে বিশ্বাস হতে চায় নাই যে কাঠির মতো একটা জিনিসে প্রস্রাব ফেলে কিভাবে বুঝা যেতে পারে যে পেটের মধ্যে বাবু আছে নাকি নাই?! কারণ, তখন আমি মনে করতাম শুধু হসপিটালে ডক্টররাই আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন দিয়ে টেস্ট করে দেখে বলতে পারে যে পেটের মধ্যে বাবু আছে কি না। 

তারপরে আবার যখন শুনি এই বিশেষ কাঠি তৎকালীন মাত্র ১০-১৫ টাকাতেই কিনতে পাওয়া যায়, তখন প্রথম যে কথাটা আমার মাথায় আসে তা হলো— এটা নিশ্চিত জাদু! আর সেই কাঠি হচ্ছে ‘একটা জাদুর কাঠি’!

এখন আল’হামদুলিল্লাহ্ জানি যে প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট বা কাঠি কোনো জাদু না। তবে মর্ডান মেডিকেল সাইন্সের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার বটে!

এবার আসি আসল কথায়। 

আমাদের ‘মাতৃত্ব’ গ্রুপে প্রায়ই দেখি প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট নিয়ে মায়েদের অনেক প্রশ্ন! এটা কিভাবে কাজ করে, কখন করা উচিত, কতদিন পর করা উচিত, রেজাল্ট আসলে কতটা রিলায়েবল, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই ডিটেইলস লেখার ডিসিশন নিলাম। 

তো চলুন জেনে নেয়া যাক আপনাদের বহুল জিজ্ঞাসিত এই প্রশ্নের উত্তরগুলো, বিইজনিল্লাহ্!

শুরু করি এই প্রশ্নটা দিয়ে। প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট আসলে কিভাবে কাজ করে? 

ফার্টিলাইজেশনের দিন ছয়েকের পর থেকে মায়ের দেহে ‘বিটা হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন’ বা সংক্ষেপে ‘এইচ.সি.জি.’ নামক হরমোন তৈরী হতে থাকে [১]।  অনেকের ক্ষেত্রে আট-দশ দিন সময়ও লাগতে পারে। কনসিভ করলে মায়ের প্রস্রাবে এই হরমোনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। আর সেটাই প্রেগনেন্সি কিটের মাধ্যমে ডিটেক্ট করা হয়। 

এরপর আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। সঠিক রেজাল্টের জন্য ঠিক কখন করা উচিত প্রেগনেন্সি টেস্ট?

আপনার পিরিয়ড যদি রেগুলার হয়ে থাকে তাহলে শেষ  আনপ্রটেক্টেড ইন্টিমেসির পর প্রথম পিরিয়ড মিস হওয়ার দিনই টেস্ট করা যেতে পারে। আর যদি ইররেগুলার পিরিয়ড হয় তাহলে শেষ আনপ্রটেক্টেড ইন্টিমেসির পর কমপক্ষে ২১ দিন পর টেস্ট করা যেতে পারে। 

কমপক্ষে ২১ দিন অপেক্ষা করা উচিত কারণ প্রেগনেন্সির একদম শুরুর দিকে মায়ের দেহে এইচ.সি.জি. হরমোনের পরিমাণ কম থাকে। তাই কনসেপশনের একদম শুরুর দিকে এই টেস্ট করলে সাধারণত হরমোনের উপস্থিতি সঠিকভাবে ডিটেক্ট করা পসিবল হয় না।

তবে বর্তমানে খুবই রিসেন্টলি কিছু হাইলি সেনসিটিভ কিট ফার্মেসিতে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে যেগুলো দিয়ে পিরিয়ডের ডেইট আসার বেশ কয়েকদিন আগেই, এমনকি কনসেপশনের নয় দিনের মধ্যেই ডিটেক্ট করা যায় যে আপনি কনসিভ করেছেন কি না [২]! 

এখানে একটা মিথ নিয়ে একটু বলি। আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে যে প্রেগনেন্সি টেস্ট সবসময় সকালেই করতে হয়। না হলে করা যায় না। এই কথাটা আসলে পুরোপুরি ঠিক না। আপনি দিনের যেকোনো সময়েই প্রেগনেন্সি টেস্ট করতে পারেন। তবে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে প্রস্রাব করার সময়েই প্রেগনেন্সি টেস্ট করে ফেলা বেটার। কারণ, এই সময়ে প্রস্রাবে এইচ.সি.জি. হরমোনের ডেনসিটি সবচেয়ে বেশি থাকে যেটা পরে খাবার-দাবার খাওয়ার জন্য কিছুটা ডিলিউট হয়ে যায়। যার জন্য আপনি কনসিভ করে থাকলে সকালে কিছু খাওয়ার আগেই প্রথম প্রস্রাব দিয়ে টেস্ট করলে সঠিক রেজাল্ট পাওয়ার চান্সেস বেড়ে যায় [৩]। 

তারপরে আসি কিভাবে করবেন প্রেগনেন্সি টেস্ট?

প্রথমত, কিটের প্যাকেটের গায়ের সাথে ডিটেইল ইন্সট্রাকশন দেয়া থাকে। সেটা ভালোমতো ফলো করবেন। কেননা জেনারেলি সব কিট ব্যবহার করার নিয়ম মোটামুটি একই রকম থাকলেও কোনো কোনোটাতে ডিফরেন্স থাকতে পারে। তাই প্যাকেটের গায়ে দেয়া ইন্সট্রাকশন এক্সাক্টলি সেভাবেই ফলো করা ইম্পর্টেন্ট। 

তবে জেনারেলি একটু এক্সপ্লেইন করি। ইউজুয়ালি লম্বা কাঠিটাতে S, C, ও T লেখা ছোটছোট তিনটা বক্স মতোন থাকে। প্রথমে S লেখা বক্সে আপনাকে কয়েক ফোঁটা প্রস্রাব দিতে হবে। তারপর কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হবে, এবং কাঠিটার C ও T লেখা অন্য দুইটা বক্সের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর শুধু C লেখা বক্সে যদি একটা দাগ দেখা যায় তাহলে টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ, অর্থাৎ আপনি কনসিভ করেননি। আর C ও T দুইটা বক্সেই দাগ দেখা গেলে রেজাল্ট পজিটিভ, অর্থাৎ আপনি কনসিভ করেছেন!

এবার আসি শেষ প্রশ্নে।বাসায় বসে এই কিটগুলো দিয়ে করা টেস্টের রেজাল্ট আসলে কতটুকু অ্যাকুরেট? 

আসলে সত্যি বলতে গেলে কোনো টেস্টই তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট অ্যাকুরেট না। সেটা হসপিটালে গিয়ে করলেও নানান কারণে অনেক সময় ভুল রিপোর্ট আসতে পারে!

ইউজুয়ালি ঠিকঠাক ইনস্ট্রাকশন ফলো করে প্রেগনেন্সি কিট দিয়ে টেস্ট করলে রেজাল্ট ঠিকই আসে [৪]। তবে বেশ কিছু কারণ আছে যার জন্য রেজাল্ট উল্টাপাল্টা আসতে পারে। ফলস নেগেটিভ, ফলস পজিটিভ দুটোই। 

এখন ফলস নেগেটিভ, ফলস পজিটিভ আবার কি জিনিস? কোনটা কখন বলা হয়? [৫]

ফলস নেগেটিভ হলো আপনি প্রেগনেন্ট হওয়া সত্ত্বেও যদি টেস্ট রেজাল্ট নেগেটিভ আসে, অর্থাৎ কাঠিতে যদি স্রেফ একটাই দাগ উঠে। এটা কয়েকটা কারণে হতে পারে—

এক. অনেকসময় কাঠিতেই প্রবলেম থাকতে পারে। এজন্য একসাথে ভিন্ন ব্র্যান্ডের দুই-তিনটা কাঠি দিয়ে একসাথে টেস্ট করা একটা গুড আইডিয়া। 

দুই. একটু উপরে যেটা বললাম। প্রেগনেন্সির একদম শুরুর দিকে মায়ের দেহে এইচ.সি.জি. হরমোনের পরিমাণ কম থাকে। তাই কনসেপশনের একদম শুরুর দিকে এই টেস্ট করলে সাধারণত হরমোনের উপস্থিতি সঠিকভাবে ডিটেক্ট করা পসিবল হয় না, যার জন্য আপনি প্রেগনেন্ট হলেও টেস্ট রেজাল্ট নেগেটিভ আসতে পারে [৬]। 

তাই যদি এমন হয় তাহলে পাঁচ-সাতদিন পর আবার টেস্ট করে দেখতে পারেন। কনসিভ করে থাকলে এবার পজিটিভ আসবে ইংশাআল্লাহ্। 

আর ফলস পজিটিভ হলো উল্টোটা। 

আপনি প্রেগনেন্ট নন, তবুও যদি রেজাল্ট পজিটিভ আসে, অর্থাৎ কাঠিতে দুইটা দাগ দেখা যায়, তাহলে সেটাকে বলা যায় ফলস পজিটিভ। এটাও কিছু কারণে হতে পারে—

এক তো কিটেরই সমস্যা। এটা বাদে অন্য আরও কিছু কারণ, যেমন— প্রেগনেন্সি ছাড়াও অন্য কারণে দেহে এইচ.সি.জি. হরমোনের উপস্থিতি। আই.ভি.এফ ইঞ্জেকশন, এক্টোপিক প্রেগনেন্সি, অথবা কিছু ক্যান্সারের জন্য, যেমন— ইউটেরাইন ক্যান্সার থাকলে টেস্ট রেজাল্ট ফলস পজিটিভ আসতে পারে। 

তাই বেস্ট হলো, বাসায় কিট দিয়ে টেস্ট করে পজিটিভ বা নেগেটিভ যেটাই আসুক, কিছুদিন পর আরও শিওর হওয়ার জন্য হসপিটালে গিয়ে টেস্ট করে দেখা। ডক্টর আপনার আল্ট্রাসনোগ্রাম, ব্লাড টেস্ট, অথবা ইউরিন টেস্ট করে এইচ.সি.জি. হরমোন লেভেল চেক করেই জানাবেন যে আপনি আসলেই কনসিভ করেছেন কি না, তবে সেই টেস্টগুলো আরও বেশি সেনসিটিভ আর কোয়ান্টিটেটিভ হয়। যার জন্য সেইসব টেস্টের রেজাল্ট অ্যাকুরেসি বাসায় করা কিট টেস্টের রেজাল্টের চেয়ে অবশ্যই বেশি হয়ে থাকে!

কমেন্ট সেকশনে প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট বা জাদুর কাঠি নিয়ে আপনাদের এক্সপিরিয়েন্স জানাতে পারেন আপুরা! কখনো কি ফলস নেগেটিভ/পজেটিভ এর চক্করে পড়েছেন কেউ? 

অথবা, এটা নিয়ে যদি আরও কিছু জানার থাকে তাহলে সেটাও জিজ্ঞেস করতে পারেন। ইংশাআল্লাহ্ চেষ্টা করব উত্তর দেয়ার। 

আমাতুল্লাহ অদ্রি
চাইল্ডবার্থ এডুকেটর (আমানি বার্থ)
ডুলা ট্রেইনি (মাতৃত্ব)

রেফারেন্স:

[১] NHS. (n.d.). Doing a pregnancy test. Retrieved October 25, 2023, from https://www.nhs.uk/pregnancy/trying-for-a-baby/doing-a-pregnancy-test/

[২] Armstrong, E. G., Ehrlich, P. H., Birken, S., Schatterer, J. P., Siris, E., Hembree, W. C., & Canfield, R. E. (1984). Use of a highly sensitive and specific immunoradiometric assay for detection of human chorionic gonadotropin in urine of normal, nonpregnant, and pregnant individuals. The Journal of Clinical Endocrinology & Metabolism, 59(5), 867–874. https://doi.org/10.1210/jcem-59-5-867

[৩] U.S. Food and Drug Administration, Center for Devices and Radiological Health. (n.d.). Guidance for over-the-counter (OTC) human chorionic gonadotropin (HCG) 510(k)s. Retrieved October 25, 2024, from https://www.fda.gov/regulatory-information/search-fda-guidance-documents/guidance-over-counter-otc-human-chorionic-gonadotropin-hcg-510ks-guidance-industry-and-fda

[৪] Gnoth, C., & Johnson, S. (2014). Strips of hope: Accuracy of home pregnancy tests and new developments. Geburtshilfe und Frauenheilkunde, 74(7), 661–669. https://doi.org/10.1055/s-0034-1385550

[৫] Nguyen, T. [TED-Ed]. (2015, July 7). How do pregnancy tests work? [Video]. YouTube. https://youtu.be/aOfWTscU8YM

[৬] Wilcox, A. J., Bleker, O. P., & Hertig, A. T. (1999). Time of implantation of the conceptus and loss of pregnancy. New England Journal of Medicine, 340(23), 1796–1799. https://doi.org/10.1056/NEJM199906103402306

[৭] Shohay Health. (n.d.). Pregnancy test. Shohay Health. Retrieved October 25, 2024, from https://shohay.health/pregnancy/pregnancy-test

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ মার্চ ১৮, ২০২৫