কিছুদিন আগে একটি পরিবারের সাথে পরিচিত হলাম, যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই আগে ক্যাথলিক ছিল কিন্তু বর্তমানে মুসলিম। তাদের তিনটি সন্তানকে তারা এতো সুন্দর শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছে আমি দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। কথায় কথায় একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস শিখলাম।

তাদের বাসায় প্রতি সপ্তাহের কোন একটা দিন (mainly weekend) পারিবারিক সভা হয়। এখানে সবাই তাদের নিজেদের বিভিন্ন রকমের সমস্যা, দুঃখ, অভিযোগ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে। এই সভায় সবাই পরিবারের যে কোন সদস্যের সম্পর্কে মুক্ত সমালোচনা করতে পারবে। কিভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারবে সেটা নিয়েও আলোচনার সুযোগ থাকে।

তবে এই সভায় একেবারেই যে আচরণগুলো করা নিষেধ সেগুলো হলোঃ উত্তেজিত হওয়া, রাগ করা, খারাপ ভাষা (গালি-গালাজ) ব্যবহার করা এবং উচ্চস্বরে কথা বলা। এই পরিবারের বাবা-মা দুজনই একটিভ দা’ঈ এবং তিনটি বাচ্চাকেই সচেতনভাবেই দা’ঈ হিসাবে তৈরি করছেন। একটা প্রসঙ্গে মা তার মেয়েকে বলছিল, ‘বেহেশতে যাবার চারটি ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে শেষ দুটি হল মানুষকে হকের পথে ডাকা এবং সবরের পরামর্শ দেয়া [সুরা আসর দ্রষ্টব্য]। এই কাজ কি সহজ বলে তুমি মনে করো? কারো কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে তুমি যদি তোমার টেম্পার লুজ কর, তাহলে তো তুমি কথা শুরু করার আগেই হেরে যাবে। নিজেই যদি সবর রাখতে না পারো তাহলে অন্যকে হকের দাওয়াত এবং সবরের পরামর্শ কিভাবে দিবে?’

মজার ব্যপার হচ্ছে, এই বাচ্চারা এই শিষ্টাচারগুলোতে এতটাই অভ্যস্থ হয়েছে যে, তাদের বন্ধু-বান্ধবের (বেশিরভাগই অমুসলিম) ভেতরেও নাকি এই অভ্যাস চালু করেছে; তাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের কেউ জোরে কথা বললেই তারা নাকি সমস্বরে বলে ওঠে, “সব আওয়াজের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে গাধার আওয়াজ”!

হাজার বছর আগে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তি, লুকমান। তাঁর সম্পর্কে আল্লাহতালা কুরআনে বলেছেন, “আমি লুকমানকে দান করেছিলাম সূক্ষ্মজ্ঞান। যাতে সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়।” অর্থাৎ উনার জ্ঞান ও অন্তরদৃষ্টি তাঁর নিজস্ব কোন অর্জন নয়, বরং সম্পূর্ণই আল্লাহ‌ প্রদত্ত। তাই আল্লাহ্‌ যে ব্যক্তিকে জ্ঞান দান করলো, সে যেন তা নিজস্ব অর্জন মনে করে অহংকার না করে, বরং আল্লাহর প্রতি বিনীত ও কৃতজ্ঞ হয়। সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যাক্তির একটি চমৎকার চারিত্রিক গুণ এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি (লুকমান) তাঁর ছেলেকে এমন কিছু কালজয়ী পরামর্শ দিয়েছিলেন যা কুরআনের আয়াতরূপে সুরা লুকমানে বর্ণিত হয়েছে। পরামর্শ শুরুই হয়েছে তাওহীদের শিক্ষা দিয়ে [“হে বৎস, আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়”।]।

এবং ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের ব্যবহার, আদব-কায়দা, সুন্দর আচরণ, সামাজিক শিষ্টাচার — সদাচার ও শিষ্টাচারের একটি সুবিশাল গাইডলাইন তিনি দিয়েছেন। আমার মতে, প্রত্যেক দায়িত্ববান বাবার সুরা লুকমানের ১৩-১৯ আয়াতসমুহ তাফসীরসহ বুঝে পড়া দরকার এবং কিছুদিন পর পর তাঁর ছেলেমেয়েদেরকে এই পরামর্শগুলো দেয়া একান্ত প্রয়োজন।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

আমার মেয়ের একটি মরোক্কান ফ্রেন্ডের বাসায় গত ঈদের পরে বেড়াতে গিয়ে চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তারা এই দেশে তিন জেনারেশন ধরে বসবাস করছে। দাদা-দাদী, নানা-নানী নিয়ে বিশাল ফ্যামিলি। প্লেগ্রুপ থেকে এই ছেলেটি আমার মেয়ের সাথে পড়ে। টিন এজার এই ছেলেটিকে দেখলাম মা আর বড় বোনদের সাথে সালাদ কাটছে, প্লেট-গ্লাস ধুচ্ছে, দাদাকে খাইয়ে দিচ্ছে! আমরা বসেছিলাম তাদের বাবা-মায়ের বেডরুমে। বেডরুমের দরজা খোলা থাকা সত্ত্বেও ছেলেটি যতবার খাবার সারভ করতে বেডরুমে আসছে, ততবারই তার ছোটবোনকে দিয়ে দরজায় নক করিয়ে (তার নিজের হাতে খাবারের ট্রে থাকায়) ঘরে প্রবেশ করার অনুমুতি চাইছে! আমি এক সময় বলেই বসলাম, তুমি আসো, প্রতিবার তোমাকে পারমিশন নিতে হবে না। সে অতি বিনয়ের সাথে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “No madam, I shouldn’t”!

ওদের মা আমাকে বলল যে আসলে একদম ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে তাদের বাবা-মা কুরআনে উল্লেখিত এই শিষ্টাচারটি শিখিয়েছে। কোন একটি বইয়ে পড়েছিলাম যে, ওমর বিন আল খাত্তাব তাঁর শাসনামলে সব মহিলাদেরকে সুরা নুর পড়ার পরামর্শ দিতেন। এই সুরার ৫৮ এবং ৫৯ আয়াতে বাচ্চাদের শেখানোর জন্য দুটি অসাধারণ শিষ্টাচার উল্লেখ করা হয়েছে। বাচ্চা যদি সাবালক নাও হয় তবুও কারো বেডরুমে প্রবেশের আগে তিনটি সময় (ফজরের নামাযের আগে, দুপুরে এবং এশার নামাযের পর) অনুমুতি নিতে হবে এবং সাবালক হলে তো কোন কথাই নাই, অর্থাৎ সবসময়ই অনুমুতি নিতে হবে এবং অনুমুতি ছাড়া অন্যের বেডরুমে প্রবেশ করা যাবে না।

আমি সত্যিই অভিভূত হয়ে গেলাম। কারন, আমি খুব কম মুসলিম পরিবারেই এই অতি প্রয়োজনীয় আচরণটির প্রকট অভাব লক্ষ্য করেছি এবং যারপরনাই বিব্রত হয়েছি। এই পরিবারে ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদেরকে এই ধর্মীয় অনুশাসনটি শেখানোর কারনেই ছেলেটি তার এতদিনের শেখা শিষ্টাচার বহির্ভূত কোন কাজ করতে পারেনি। সুবাহান’আল্লাহ!

সুরা বাকারাতে বর্ণনা করা হয়েছে ইব্রাহিম (আঃ) এবং ইয়াকুব (আঃ) এর ঠিক মৃত্যুর আগের কিছু কথা। কুরআনের ভাষায়, “এরই ওছিয়ত করেছে ইব্রাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকুবও যে, ‘হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলমান না হয়ে কখনও মৃত্যুবরণ করো না’। তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বললঃ ‘আমার পর তোমরা কার এবাদত করবে’? তারা বললো, ‘আমরা তোমার পিতৃ-পুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের এবাদত করব। তিনি একক উপাস্য’।[১৩২-১৩৩]

খেয়াল করে দেখুন, ইব্রাহিম (আঃ) এর দুই সন্তানই ছিলেন প্রফেট [ইসমাইল (আঃ) এবং ইসহাক (আঃ)]।এবং ইয়াকুব (আঃ) এর ক্ষেত্রেও একই অর্থাৎ উনারও সন্তান ছিলেন প্রফেট [ইউসুফ (আঃ)] আমাদের সাধারন বুদ্ধিতে কি বলে? ছেলে প্রফেট জানার পরও কি তাকে তাওহীদের শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন আছে? অথচ, তাঁরা তাদের মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও ছেলেদেরকে তাওহীদের উপর অটল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। কারন তাঁরা জানতেন, আখেরাতের জীবনই আসল জীবন এবং একমাত্র তাওহীদের পথই হচ্ছে সফলকামদের একমাত্র পথ। সন্তান যতই বড় হোক আর যতই ভালো হোক, খেয়াল রাখতে হবে সে যেন পথভ্রষ্ট না হয়। যদি সে পথভ্রষ্ট হয় তাহলে তাকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি মারা যান বা সে মারা যায়। যেমনটা হয়েছিল নুহ (আঃ) এর ক্ষেত্রে। ৯৫০ বছর বয়সেও তিনি নিজের ছেলেকে আসন্ন ধংসের মুখ থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন!

একটি মুসলিম পরিবারের মুল ভিত্তিই হচ্ছে তাওহীদ তাই শুধু মাত্র বাচ্চাদেরকে শুদ্ধ তাজউইদ দিয়ে কুরআন মুখস্ত করালেই চলবে না; বরং কুরআনের অন্তর্নিহিত শিক্ষাকে হৃদয়ঙ্গম করে তা প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার করতে হাতে কলমে শিক্ষা দিতে হবে। এবং বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে সফল শিক্ষা পদ্ধতি হচ্ছে বাবা-মাকে দেখে শেখা। বাবা-মায়ের দৃঢ় ঈমান ও সদাচারণ তাদের সন্তানদেরকে ঈমানদার ও আদর্শ মুসলিম হিসাবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করবে।

শুধুমাত্র বাবা-মায়ের অবহেলার কারনে আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি প্র্যাকটিসিং অথবা অর্ধ প্র্যাকটিসিং মুসলিম পরিবারে নাস্তিক সন্তান তৈরি হচ্ছে। প্রত্যেক মুসলমানই একেকজন দা’ঈ যার কাজ হল মানুষকে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের নির্দেশিত পথের দিকে আহ্বান করা। আর তাই প্রথমেই আল্লাহ্‌র নির্দেশিত পথের দিকে আহ্বান করতে হবে নিজের সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনকে যারা সবচেয়ে কাছের মানুষ। পাশাপাশি তাদেরকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে হবে যাতে শিষ্টাচার বহির্ভূত কোন কাজ তাদেরকে দিয়ে না হয়। রাসূল সা: বলেছেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের মহৎ করে গড়ে তোলো এবং তাদের উত্তম আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দাও” [মুসলিম]।

অপর হাদিসে রাসূল সা: বলেন, “সন্তানকে আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া সম্পদ দান করা অপেক্ষা উত্তম”। [বায়হাকি]। পরিবার, সমাজের বা রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক। ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম আর এই শিক্ষার প্রথম স্তর হলো পরিবার। সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সঠিক ভূমিকা পালনের মৌলিক শিক্ষা লাভ করা হয় পারিবারিক পরিবেশে। শৈশবেই শিশুকে আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া আবশ্যক, যেন শিশু প্রশংসনীয় ও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হয়ে গড়ে উঠতে পারে। মানুষ ও সমাজের জন্য সে হবে অনুকরণীয়, তার চারিত্রিক গুণাবলির মাধ্যমে সত্যের আলো ছড়াবে সমাজে ও মানুষের হৃদয়ে। একইসাথে অন্ধকার সমাজের দিকভ্রান্ত মানুষকে দেখাবে সত্যের পথ, মুক্তির পথ।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা