প্যারেন্টিং জার্নি

কেউ কেউ অনুরোধ করেন আমার প্যারেন্টিং জার্নি নিয়ে লিখতে। আমি বাচ্চাদেরকে কিভাবে গড়ে তুলেছি। হয়তো অনেকের কাজে লাগতে পারে। সেজন্য যে কারোই এ বিষয়গুলোতে লেখা উচিৎ, বলার মত যা কিছু আছে। ভুল , সঠিক, সবকিছু। আমি আমার জীবনে ভুল থেকে যেসব শিক্ষা পেয়েছি তা আর অন্য কোনকিছু থেকে পাইনি।

আল্লাহর অশেষ রহমতে মাহের ফুরক্বান আমার অত্যন্ত চক্ষুশীতলকারী। আমার এমন কোন কথা নেই যা শোনে না। যে কেউ ওদেরকে দেখে মুগ্ধ হয়। যেকোন ভাল কাজ তারা উৎসাহের সাথে করে। বিশেষ করে মাহের। ব্যতিক্রম যে হয়না তা না। তবে মাঝে মাঝে ওদের ভাল কাজ করার উৎসাহ দেখে আমিই অবাক হয়ে যাই। ওরা সত্যিই মন থেকে সঠিক কাজটা করতে চায়।

মাহের এর স্কুলের টিচারদের মুখে শুধু ওর প্রশংসা শুনতে পাই। তার আচার ব্যবহার বিষয়ে। ক্লাস পারফরম্যান্সের বিষয়ে। সেদিন ওদের প্রিন্সিপলের মুখে ওর প্রশংসা শুনে সত্যি নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। বাচ্চাটা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। প্যারেন্টস মিটিংয়ের দিন ওর ম্যাডাম আমাকে বলেছিল, আপনি এমন কি করেন আমি জানিনা। তবে মাহের এর পারফরম্যান্স এ আমি মুগধ।

মাহের বাসায় এসে তার নিজের পড়া নিজেই কমপ্লিট করে ফেলা, নিজের সব কাজ নিজে নিজে করার স্পৃহা, ফুরক্বানের টেইক কেয়ার করার ব্যাপারে তার উৎসাহ দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে যায়।

কিছুদিন আগে স্কুল থেকে এসে আমি রেস্ট নিচ্ছিলাম। মাথায় টেনশন ছিল যে স্কুলের প্রজেক্ট ঠিকমত কমপ্লিট করাতে হবে। অনেক সময় দিতে হবে। বুঝাতে হবে। সেজন্য রেস্ট নিয়ে নিচ্ছিলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি সে প্রজেক্টের কাজ অর্ধেক কমপ্লিট করে ফেলেছে।
খুশিতে আমি ওকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ স্পিনিং করলাম, অনেক অনেক চুমু দিলাম। সে এতবড় একটা কাজ নিজে নিজে করে ফেলেছে, আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। পরবর্তীতে পুরো প্রজেক্টটাই সে একা একাই কমপ্লিট করেছে। আমি হেল্প করতে চাইলেও বলেছে লাগবে না।

সব মিলিয়ে ওর প্রতি আমার ভাল লাগা দিন দিন বেড়েই চলেছে। চক্ষুশীতলকারী সন্তানের উপযুক্ত উদাহরণ আমার কাছে মাহের (9 years)। ফুরক্বানও (3 years 11 months)।

এজন্যই আমার মনে হচ্ছে বাচ্চারা কিভাবে বাবা-মায়ের কথা বেশি করে শোনে, এই বিষয়ে কিছু পরামর্শ হয়তো আমার শেয়ার করা প্রয়োজন।

১. এক নাম্বারে আমি স্থান দিতে চাই সূরা ফুরক্বানের ৭৪ নাম্বার আয়াতকে।
স্বলাতে সালাম ফিরানোর পূর্বে এই দুয়াটা পড়া যে কত জরুরী। #দুয়া র থেকে বড় টিপস আর কিছু নেই।

২. দুই নাম্বারে যেটা বলা যায় সেটা হতে পারে বাচ্চাদেরকে অনেক বেশি #আদরকরা অনেক অনেক কোলে নেয়া, চুমু খাওয়া, সুড়সুড়ি দেওয়া। এতে করে যে বাচ্চারা শুধু আপনার অনুগতই হবে তা নয়, বরং বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং ব্রেইন ঋষ্টপুষ্ট হবে।

৩. তিন নাম্বারে হয়তো বলা যেতে পারে ওদেরকে অনেক বেশি #প্রশংসা করা। যেকোন ভাল কিছু করলেই সেটা যত ছোট ই হোক সেটা যে আমি খেয়াল করেছি এবং পছন্দ করেছি সেটা ওকে বুঝানোর জন্য প্রশংসাসূচক কিছু বলা। . যেমন আমি “মাশাআল্লাহ ” বলি। থ্যাঙ্কিউ জানাই। অনেকসময় কোলে নিয়ে আদর করি। চুমু দেই। জড়িয়ে ধরে আদর করি।

৪. চার নাম্বারে হয়তো বলা যেতে পারে #কাউন্সিলিং বিষয়ে। আমি ওদের সাথে বিশেষ করে মাহের এর সাথে , যখন থেকেই সে কথা বলা ও প্রশ্ন করার বয়সে এসেছে, প্রচুর কথা বলি। বিশেষ করে যখনই ও কোন বিষয়ে প্রশ্ন করেছে তখনই সব কাজ ফেলে চেষ্টা করেছি তার সেই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুছিয়ে ঠান্ডা মাথায় সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে।

কারণ এই বিষয়টা অন্যসময় আমি এর চাইতে বেশি ভালভাবে শিখানোর সুযোগ আর পাবনা, যখন সে নিজে থেকে জানতে চাইছে, তখনকার চাইতে। এই বিষয়টাতে অনেক ধৈর্য্যের প্রয়োজন। অনেকসময় মাথা অস্থির লাগে।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

কাজের মাঝখানে নানান প্রশ্ন করতে থাকলে অনেক বিরক্ত লাগে। কিন্তু আমি ওকে সেটা বুঝতে না দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি ওর কথার উত্তর দিতে। . কারণ একটা সময় আসবে ওরা আমাদের থেকে অনেক দূরে চলে যাবে শারীরিক ভাবে। সেই সময়ে মানষিকভাবেও যাতে দূরে সরে না যায় সেজন্য এখন থেকেই বন্ডিংটা মজবুত হওয়া জরুরী। ওর কথার উত্তর না দিলে একসময়ে সে আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবে না, বাইরের বন্ধুদের সাথে সব শেয়ার করবে। এবং নানানভাবে মিসগাইডেড হবে।

আমার সন্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধু পৃথিবীতে আমারই হওয়া উচিৎ। পৃথিবীর আর যেকারো কাছে যেটা শেয়ার করা যায়না সেটা আমার সাথে তার শেয়ার করতে পারা উচিৎ। সেই ফ্লোরটা আমারই তৈরী করা দায়িত্ব। এটাই অভিভাবকের কাছে সন্তানের হক্ব।

৫. প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেয়া।
এখানে সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যেটা সেটা হচ্ছে একটা বিষয়ে যখন ওর মাথায় প্রশ্ন এসেছে তখন যদি আমি বিষয়টা ইগনোর করি তাহলে এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে ওর কৌতূহলী মনটা নষ্ট হয়ে যাবে। বিভিন্ন বিষয়ে তার জানার আগ্রহগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।

আমি মাহেরকে সবসময় উৎসাহ দেই প্রশ্ন করার ব্যাপারে। সে যখন কোন প্রশ্ন করে তখন প্রশংসা করি যে এত সুন্দর একটা প্রশ্ন তার মাথায় এসেছে।

৬. মাহের – ফুরক্বান আমাকে যখন কোনকিছু দেখাতে চায় আমি তখন সেটা খুব উৎসাহ নিয়ে দেখি। অনেক খুশি হই। যেমন হয়তো ওরা কি দিয়ে খেলছে, কিভাবে খেলছে, লেগো দিয়ে কি বানাচ্ছে আমাকে দেখাতে চায়। অথবা কার্টুনের কোন একটা অংশ দেখাতে চায়। আমি একসাথে বসে দেখি। ওরা খুব মজা পায়।

প্যারেন্টিং নিয়ে পড়তে গিয়ে একটা বিষয়ে জেনেছি যে,

They survive for our approval.

অর্থাৎ বাচ্চারা আমাদের স্বীকৃতির জন্য বাঁচে।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে বেঁচে থাকার জন্য, চলার পথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটা অবলম্বন লাগে। যা আমাদেরকে প্রচন্ড ফ্রাস্ট্রেটেড মুহূর্তগুলোতেও উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। ক্লান্ত হতে হতেও নতুন করে এনার্জি দেয়।

যেমন আমাদের অনেকের জীবনেই সেটা হচ্ছে আমাদের সন্তান, অথবা আমাদের ভালবাসার মানুষটি।
অথবা দারিদ্র, যা থেকে আমরা মুক্তি পেতে চাই। অথবা জীবনে অনেক বড় কিছু হবার উচ্চাকাঙ্খা। আমাদের স্বপ্নগুলো।

আমাদের বাস্তবতাগুলো, আমাদের স্বপ্নগুলো, আমাদের দায়বদ্ধতা গুলো, আমাদের ভালবাসার মানুষ গুলো আমাদেরকে চলার পথের অনুপ্রেরণা যোগায়।

কিন্তু বাচ্চাদের জীবনে এরকম কিছু নেই। তারা বাস্তবতা কি বুঝে না। তাদের জীবনে কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকে না।
তাদের ভালবাসার মানুষ কে ? ভালবাসা কি? এগুলো তারা বুঝে না। তাদের বিশেষ কোন সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন থাকেনা। তাদের আকাংখাগুলো হয় খুবই স্বল্প মেয়াদি, হয়তো একটা খেলনা বা একটা চকলেট পর্যন্ত । ব্যস।
তাদের স্বত্তার ভিতরের শূণ্য ও ফাঁকা জগতে খুব বেশি কিছু থাকে না।

কিন্তু তারা মনে প্রাণে একটা জিনিস চায়। সেটা হচ্ছে আমাদের স্বীকৃতি ও ভালবাসা।
তারা একটা ভাল কিছু করে, সে ভাল মানুষ হতে চায় সেজন্য না। তারা, ভাল মানুষ কি? কেন তা হওয়া প্রয়োজন? এগুলো এখনো বুঝে না।

তারা এগুলো করে আমাদের কাছে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য।
আমাদের ছোট ছোট স্বীকৃতি, আদর, ভালবাসাগুলোই তাদের চলার পথের অনুপ্রেরণা। তারা সামনে এগিয়ে চলে আমাদের স্বীকৃতির জন্য।
পৃথিবীর সবাই তাকে উপেক্ষা করলেও একা একা সামনে এগিয়ে যাবার মত ক্ষমতা তাদের থাকে না।

সেজন্য পরিবারের সদস্যদের স্বীকৃতি তাদের কাছে খুব ইম্পরট্যান্ট। তারা তাদের কাজ দিয়ে আমাদেরকে খুশি করতে চায়, এবং আমাদের থেকে আরো বেশি আদর ভালবাসা পেতে চায়।
তারা একটা কিছু করে স্যাটিসফাইড ফিল করতে চায়। বিজয়ীর স্বাদ অনুভব করতে চায়। আর সেটা আসে বাবা মায়ের স্বীকৃতি ও প্রশংসা থেকে।

[উল্লেখ্য, নার্সিসিস্ট রা কাউকে স্বীকৃতি দিতে চায়না সহজে। #Narcissistic_Parent রা বাচ্চাকে ক্রেডিট দিতে চায়না সহজে। বিজয়ীর স্বাদ অনুভব করতে দিতে চায়না। বা এই বিষয়টাকে বাচ্চাকে কন্ট্রোল ও ম্যানিপুলেইট করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
যেহেতু এই বিষয়টা বাচ্চার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। সেই বিষয়টা দিয়ে মানুষকে সাফোকেইট করে রাখা, লাগাম টেনে ধরে কন্ট্রোল করা তাদের অভ্যাস।

এই ধরনের অভিভাবকরা বাচ্চাকে Sorry বলতে পারেনা সহজে। নিজের ভুল সহজে স্বীকার করেনা বাচ্চার কাছে।
মাসুম বাচ্চার সাথেও প্রতিযোগিতা করে জিততে চায়, নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চায়।
হ্যাঁ এরা এতটাই অসুস্থ!
বাচ্চার কাছেও প্রমাণ করতে চায় যে সে বেশি বেটার! বিশেষ কিছু!
দুনিয়ার সবার সাথে তো এমন করেই। বাচ্চার সাথেও করে।
Entitlement তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
অথচ সত্যিকারের ভালবাসা নিজে হেরে গিয়ে ভালবাসার মানুষটাকে জিতিয়ে দিতে চায়। তাতেই শান্তি পায়। ]

৭. আরেকটা বিষয় আমার কাছে খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সেটা হচ্ছে, আমরা যে ওদেরকে কতটা #ভালবাসি সেটা ভালভাবে ওদেরকে জানানো, বুঝানো।

মাহের আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, ওর যদি কিছু হয়ে যায়, অর্থাৎ হারিয়ে যায় বা মরে যায় তখন আমি কি করব ?
আমি শুধু বলেছি, আমি মরে যাব। তার থেকে সুখী সেদিন মনে হয় আর কেউ ছিলনা।

এরপর থেকে আমি ওর মধ্যে সিগ্নিফিক্যান্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। সে মনে হয়েছে যেন অনেক বেশি সুখী মানুষে পরিণত হয়েছে, এবং তার দৈনন্দিন কাজ গুলোর ব্যাপারে আরো বেশি আগ্রহ খুঁজে পেয়েছে।
আমি হয়তো হার্ট এট্যাক করে সত্যি সত্যি মরে যাব, অথবা ভিতরের মানুষটা মরে যাবে, শুধু রক্তমাংসের শরীরটা চলে ফিরে বেড়াবে। জীবন্মৃতের মত।

ফুরক্বানকে আমি কত অসংখ্যবার যে শুধু জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে বলি, I love you Baba!
এক পর্যায়ে সেও আমাকে বলে, I love you Ma!
মাঝে মাঝে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকে। যেভাবে আমি আদর করে থাকি।

৮. #বাচ্চার সাথে খেলাধুলা করা। খেলার সময় খুব একটা পাইনা আসলে। তবে একটা খেলা ওদেরকে অল্প সময়ে অনেক বেশি Cheer Up করে। সেটা হচ্ছে Tickling Game. সুড়সুড়ি খেলা। আমার কাছে আসলেই আমি সুড়সুড়ি দেই। ওরা পালিয়ে যায়। আবার আসলে আবার সুড়সুড়ি দেই। কখনো জড়িয়ে ধরে ভাল করে সুড়সুড়ি দিয়ে দেই। আর হাসতে হাসতে ওরা শেষ হয়ে যায়। এই খেলাতে যে ওরা কি পরিমাণ আনন্দ পায় সেটা বলে বুঝানো যাবে না।

টনিকের মত ওদের মন ভাল হয়ে যায়। খুশিতে ওরা উচ্ছল হয়ে ওঠে। আর দিনের মধ্যে কয়েকবার ৫ মিনিট করে এই খেলাটা খেললেই সারাটা দিন ওদের ভাল কাটে। আমার মত ব্যস্ত মা দের জন্য অল্প সময়ে বাচ্চাদেরকে অনেক বেশি রিফ্রেশমেন্ট দেয়ার জন্য এটা খুব ভাল খেলা।

আরেকটা হচ্ছে কাঁধে নিয়ে ঘুরা। মাহেরকে এখন আর নিতে না পারলেও মোটামুটি প্রায় ৭-৮ বছর পর্যন্ত সে কাঁধে উঠেছে। এটা যে ওদের কত প্রিয়।

আরেকটা হচ্ছে লুকোচুরি খেলা। এই খেলা খেলতে গেলে ওদের খুশি আর ধরে না।

৯. এই পয়েন্টে বলতে চাই #বাচ্চাদেরকে টক্সিক কথা নাবলা প্রসঙ্গে। বকাঝকা, ধমকা ধমকি না করা। সবসময় পজিটিভ টোনে কথা বলা। সবসময় ওদের সাথে হাসিখুশি , ফানি মুডে থাকা। হাস্য রসিকতা, এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ প্যারেন্টিং এ, তা বলে বুঝানো সম্ভব হবে না। সব মিলিয়ে তাদেরকে একটা হাসিখুশি আনন্দময় শৈশব উপহার দিতে পারাটাই হচ্ছে প্যারেন্টিং এর সবচেয়ে বড় কৌশল। বা সিক্রেট।

তাদেরকে হাসি আনন্দময় জীবন উপহার দিতে পারলে তারাও আমাদেরকে অনেক সুন্দর কিছু উপহার দিতে পারবে।

১০. #বাচ্চাদের মধ্যে সুন্দর চিন্তাভাবনা প্রবেশ করানো। তাদেরকে আমরা যত সুন্দর মনের শিক্ষা দিতে পারব তারা ততবেশি সুন্দর মানুষে পরিণত হবে। আর আমাদের চক্ষুশীতল করবে। তাদেরকে যদি আমরা আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা শিক্ষা দিই, তারাও আমাদেরকে সেগুলোই উপহার দিবে। নবী-রাসূল-মনীষীদের জীবনের মহানুভব শিক্ষাগুলো ওদের মনে প্রবেশ করাতে পারলে ওরাও সেভাবে চিন্তা করতে শিখবে। In sha Allah!

১১. #বাবা মা নিজেদের যত্ন নেয়া।
এই পয়েন্টটা মনে হয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তম ও ধৈর্য্যশীল প্যারেন্টিং এর সবচেয়ে বড় উপাদান আমার মনে হয় নিজেকে ভাল রাখার ব্যবস্থা করা।
আমি যদি নিজে ফ্রেশ না থাকতে পারি তাহলে বাচ্চাদেরকে খুব সুন্দর প্যারেন্টিং উপহার দেওয়া আমাদের পক্ষে কোনদিনও সম্ভব না।

নিজে ঠিকমত না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, না গোসল করে, বাচ্চার রুটিনের খুঁটিনাটি প্রত্যেকটা বিষয় ঠিক রাখতে গিয়ে আমি যদি খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাই, ধমকা ধমকি করে ফেলি, আউট বার্স্ট করে ফেলি, তাহলে সেটা তাদের জন্য অনেক অনেক বেশি ক্ষতিকর।
অনেক অনেক বেশি ক্ষতিকর।

না ঘুমাক তারা এক বেলা। না খাক এক বেলা। তারপরেও টক্সিক ব্যবহার করা যাবে না।

কারণ ক্ষুধার থেকে সাইকোলজিক্যাল টর্চার অনেক বেশি ক্ষতিকর। এগুলো ব্রেইনের ক্ষতি করে। মানষিক বিকাশে ক্ষতি করে।
জোর জবরদস্তি করে কোনকিছু করানোর চেষ্টা করাটা অনেক বেশি ক্ষতিকর। যেই বিষয়ে জোর করছি সেই বিষয়ের চাইতে।

বাচ্চা কথা না শুনলে আমাকে প্যারেন্টিং স্কিলে আরো বেশি ইমপ্রুভমেন্ট আনতে হবে। আরো বেশি পড়াশোনা করতে হবে বিষয়গুলো নিয়ে। আরো বেশি আদর স্নেহ দিতে হবে। বকাঝকা না করে।

১২. কারণ মুড্ ভাল থাকার সাথে বাচ্চাদের ক্ষুধার অনেক বেশি সম্পর্ক। আপনি তাকে বকে ঝকে যতটুকু না খাওয়াতে পারবেন, আদর স্নেহ কোমলতা, মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে তার থেকে বেশি খাওয়াতে পারবেন।

জোর করে খাওয়ানো বাচ্চাদের ব্রেইনের জন্য ক্ষতিকর। মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।

ওরাও খেতে না চাইলে আমি খুব বেশি বাড়াবাড়ি করি না। ওদের মত খেলতে দিই। খেলতে খেলতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে ক্ষুধা লাগবে l নিজেই খেতে চাইবে।

আমি সবচেয়ে বেশি যেটা গুরুত্ব দেই সেটা হচ্ছে ওদের উপর কোনভাবে মানষিক টর্চার যাতে না হয়। খাওয়াতে গিয়ে আমি যদি ব্রেইনের ক্ষতি করে ফেলি তাহলে তো হল না। স্ট্রেস হরমোন যাতে রিলিজ না হয় সেই বিষয়টা খেয়াল রাখি।

১৩. বাচ্চাদেরকে কোন বিষয় #বলার সাথে সাথেই শুনবে এমন এক্সপেক্টেশন না রাখাবরং যেকোন বিষয়েই পর্যাপ্ত পরিমাণে কাউন্সিলিং প্রয়োজন। অনেক আদর ভালবাসা দিয়ে নিরিবিলি সুন্দর করে বুঝানো প্রয়োজন। তারপর অপেক্ষা করা। ইন শা আল্লাহ কিছুদিনের মধ্যেই এর রেজাল্ট দেখতে পাওয়া যাবে। একটা বিষয় হুট্ করে বললাম, আর সাথে সাথেই তারা সেটা মেনে নিবে, এমন এক্সপেক্টেশন অনুচিৎ। হুটহাট এটা করো, ওটা করোনা, এরকম ইন্সট্রাকশন দিতে থাকা, যেকোন মানুষকেই অস্থির করে তুলবে। যেকোন বিষয়ই আগে ঠান্ডা মাথায় সুন্দর করে বুঝাতে হবে যে বিষয়টা কেন প্রয়োজন। আর যারা ফুরক্বানের মত ছোট বাচ্চা, তাদের জন্য আদর স্নেহের কোন বিকল্প নেই। অনেক আদর করে বললে ফুরক্বান সাধারণত সেটা ফলো করতে চায়। যদিও এগুলোর প্রয়োজনীয়তা হয়তো সে বুঝে না।

১৪. #হীনমন্যতায় ভুগা।
সারাদিন এটা করো না, ওটা করো না, এরকম ইন্সট্রাকশন যদি আমরা দিতে থাকি, তাহলে ওদের মনে হতে থাকে সে যেটাই করবে সেটাই ভুল। তখন তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। ভাবে যে সে হয়তো কোনকিছুই ঠিকমত করতে পারে না।
আবার বেশি শাসন করলে অনেকসময় ডেস্পারেইট হয়ে যায় এবং বেশি করে দুষ্টামি করতে থাকে।

তার চেয়ে বরং সে কি করতে পারে সেগুলোতে তাকে ডিস্ট্র্যাক্ট করার চেষ্টা করা উত্তম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডিস্ট্র্যাকশন টেকনিকে কাজ হয়।
তবে কিছু কিছু বিষয় তাদের মাথায় অনেক ভালভাবে ঢুকে গেলে সেটা বের করা কঠিন। সেজন্য আগে থেকেই বিষয়গুলো যাতে তার নজরে না পড়ে সেই চেষ্টা করতে হবে।

যেমন চকলেট সামনে রেখে দিলে সারাদিনে বার বার এসে চকলেট খেতে চাইবে, স্বাভাবিক। কিন্তু যদি চকলেট লুকিয়ে রাখা হয় তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার মনে থাকবে না বা সে জানবেই না যে চকলেট বাসায় আছে।

তেমনি আমি তার সামনে মোবাইল চালালে সেও চালাতে চাইবে।
যেমন মাহের আমাকে বলেছে আমি যেন ল্যাপটপ লুকিয়ে রাখি। কারণ স্কুল থেকে এসে ল্যাপটপ দেখলে ওর ওয়াসওয়াসা কাজ করে।

আর বাচ্চাদেরকে অনেকসময় ইচ্ছা করে স্বাধীনতা দেই। যত পারে দুষ্টামি করুক। মাঝে মাঝে একটু রিল্যাক্স এর প্রয়োজন আছে। সবসময় নিয়মকানুন ভাল লাগেনা। দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি, ঝাপাঝাপি, কাদা মাখামাখি যা মন চায় করুক।
বৃষ্টিতে খেলতে দিই। কাদায় গড়াগড়ি করতে দিই।

১৫. #রুটিনের মধ্যে আনার চেষ্টা করা। জোরাজুরি না করে ধৈর্য্যের সাথে আস্তে আস্তে।

ওরা যখন দেখবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু কাজ তাকে নির্দিষ্ট সময়ে করতে হচ্ছে তখন সে নিজেই এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। ঐ কাজটা না হলে তার নিজের কাছেই ফাঁকা ফাঁকা লাগবে।
তবে আমি খুব বেশি স্ট্রিক্ট হবার চেষ্টা করি না কখনোই। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে ইফেক্টিভ প্যারেন্টিং টেকনিক মনে হয়। আমি যদি ওদেরকে অনেক বেশি প্রেসারে রাখি তাহলে ওদের মনে হবে ওদের জীবনটা গদবাধা রুটিনের মধ্যে আটকে গেছে।

তার চেয়ে বরং অনেক হাসিখুশি একটা জীবন উপহার দিতে পারলে পজিটিভ কিছু করার উৎসাহ ওদের ভিতর থেকেই উদয় হবে।
ওদের জীবনটা অনেক বেশি সাফোকেটেড হোক আমি চাইনা।

১৬. টেক্কা দিয়ে অনেক মানুষকে ডিঙিয়ে তাদেরকে প্রতিযোগিতায় জিততেই হবে , এরকম কোন শিক্ষা আমি কখনো ওদেরকে দিই না। ওদের জীবনে কি প্রয়োজন সেটা ওরা নিজেরাই বুঝবে। আমার শুধু দায়িত্ব ওদেরকে গাইডলাইন দেয়া এবং কোন বিষয়টা কেন প্রয়োজন, এর পজিটিভ নেগেটিভ বিষয়গুলো কি কি তা বুঝিয়ে বলা। সবসময় বুঝাতে থাকা। বকাঝকা না দিয়ে সুন্দর করে বুঝানো।

১৭. বাচ্চাদের সাথে #কোমলএবংআদর মাখানো কন্ঠে কথা বলা। এর চেয়ে বড় ওষুধ আর হয়না।
মাহের নিজেই আমাকে বলেছে, ওর আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে, যখন আমি সফট ভয়েসে কথা বলি।

১৮. #বাচ্চাদেরকে রেস্পেক্ট করা। বাচ্চারা খুব ভালভাবে বুঝে ওদেরকে যথাযথ সম্মান দেয়া হচ্ছে কিনা। মানুষের সামনে ছোট করা হচ্ছে কিনা।

নিয়মিত অপমান করতে থাকলে বাচ্চারা একসময়ে নিজেদেরকে মূল্যহীন ভাবতে থাকে। নিজের কাছে নিজের রেস্পেক্ট কমে যায়। তখন এক পর্যায়ে সে খারাপ কিছু করতে লজ্জা পায়না।
ভাবে যে “আমিতো খারাপই।”

১৮. সবকিছুর মূলে গোড়াপত্তন হচ্ছে এই পয়েন্টটা। #Parenting_And_Child_Psychology বিষয়ে পড়াশোনা করা। দুয়ার পরেই এর স্থান। এই বিষয়গুলোতে পড়াশোনা করা যে কত জরুরি সেটা পড়াশোনা করতে থাকলেই কেবল বুঝা যাবে। আর কোনভাবে বুঝানো সম্ভব না।

১৯. বাচ্চাদের মধ্যে #জান্নাতে যাবার স্বপ্ন দেখানো।

জীবনের আর যেকোন বিষয়ে স্বপ্ন দেখালে সেটা একসময়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে সিভিয়ার হতাশার কারণ হতে পারে!!!
সেজন্য আমি কোন বিষয়ের প্রতি ওদের ক্রেইজিনেস তৈরী হোক , সেটা চাইনা।

জান্নাতে যাবার জন্য জীবনে যা যা প্রয়োজন, আর দুনিয়ার জীবনেও ভাল থাকতে যা যা প্রয়োজন, সেগুলো সুন্দর করে বুঝিয়ে দেই। এরপরে তারা নিজেরাই নিজ উদ্যোগে সেগুলো করতে থাকবে। মূলত আমার কাউন্সিলিং এর টপিক এগুলোই থাকে।


সবকিছুর আগে দুয়াটাই আসল। দুয়াই বাকি সবকিছুর দরজা খুলে দেয়, সহজ করে দেয়।
সেই সাথে Unconditional Love! ❤
এবং যেকোন ভাল কাজে যথেষ্ট পরিমাণে প্রশংসা। সেটা যত ছোট কাজই হোক।

উল্লেখ্য, আমার এখনো অনেক ইম্প্রুভমেন্টের জায়গা আছে। নিঃসন্দেহে। আমি চেষ্টা করছি।
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে আরো বেশি করে পজিটিভ প্যারেন্টিং করার তৌফিক দান করেন। এবং আমাদের সকলের সন্তানদেরকে চক্ষুশীতলকারী বানিয়ে দেন। আল্লাহুম্মা আমীন।
.

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা