মাত্র ক’দিন আগে চমৎকার ফুটফুটে এক সন্তান প্রসব করেছেন। পরিবারের নতুন অতিথি নিয়ে সবাই বেশ খুশি। কিন্তু আপনি তাদের সঙ্গে শামিল হতে পারছেন না! আপনারও তো সমান মাত্রায় খুশি হবার কথা, তবুও আপনি কেন এমন বিষণ্নতা অনুভব করছেন?

আসলে আপনার-ই শুধু এরকম হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। অনেকেই এ অবস্থার মধ্য দিয়ে যান। সন্তান প্রসবের পর কিছু মাত্রার আবেগ প্রবণতা স্বাভাবিক। প্রায় ৮০ শতাংশ মা বাচ্চা জন্মের পর ‘বেবি ব্লু’ নামের আবেগ প্রবণতায় আক্রান্ত হন, যেটা বাচ্চা জন্মের সাত দিনের মধ্যে শুরু হতে পারে। এ প্রবণতা কারো কারো ক্ষেত্র দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এ সময় আপনার কান্না-কান্না বোধ হতে পারে, দুশ্চিন্তায় হয়তো ঘুম আসতে চাইবে না। এছাড়া বিরক্তিবোধও হতে পারে এবং মুড খারাপ থাকতে পারে।

মায়েরা সাধারণত বিশ্রামের মাধ্যমে এ সময় ভাল বোধ করেন। এছাড়াও কেউ এ সময় বাচ্চার দেখভাল করলে এ সমস্যা দ্রুত সেরে যেতে পারে। যদি দেখেন এটা সহজে সারছে না বা বেশি সময় নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে আপনার করণীয় নিয়েই এ লেখা।

 

আপনি কি প্রসব পরবর্তী বিষন্নতায় ভুগছেন?

যদি বুঝতে না পারেন, তবে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। তিনি আপনার বিভিন্ন উপসর্গ দেখে ঠিক করতে পারবে আপনার সমস্যা কী। ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মা এসময় ডাক্তারি বিষন্নতা (ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন), দুশ্চিন্তা বা অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার এ ভুগে থাকেন।

আপনার যদি মনে হয় আপনি নিজেকে আঘাত করবেন বা আপনার বাচ্চাকে বা নবজাতকের যথাযথ যত্ন নিতে পারবেন না, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আপনার নিকটজনকে জানান এবং যথাযথ সাহায্যের ব্যবস্থা করতে বলুন।

প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা কি?

বাচ্চার জন্মের পর থেকে পরবর্তী ১ মাস যে কোন সময় এ সমস্যা শুরু হতে পারে। কয়েকটি উপসর্গ এরকম:

  • সহজেই বিরক্ত হওয়া বা অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা
  • কোনোকিছুতে মনসংযোগ করতে না পারা
  • দুশ্চিন্তা করা
  • কান্না বা কান্নার ভাব হওয়া
  • রেগে যাওয়া
  • দুঃখ, অসহায় বা অপরাধবোধের মতো নেতিবাচক অনুভূতি
  • পছন্দের কাজগুলো অপছন্দ হতে থাকা
  • ঘুমাতে সমস্যা হওয়া বা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর ঘুম আসতে না চাওয়া
  • অবসাদগ্রস্ততা
  • খাবারে অনীহা
  • মাথাব্যাথা, পেটব্যাথা বা পেশিতে ব্যাথা ও পিঠ ব্যাথা ইত্যাদি

প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতার স্বরূপ

যদি আপনি এসময় বারবার সহিংস চিন্তায় আক্রান্ত হন বা বিভিন্ন সহিংস ছবি আপনার চোখে ভেসে ওঠে, তাহলে সম্ভবত আপনি প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়েছেন। বাচ্চা জন্মের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ ধরনের চিন্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসতে পারে। আক্রান্তদের মধ্যে বাচ্চাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার প্রবণতা দেখা যায়, এমনকি বাচ্চাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা বা আগুনে ফেলে দেয়া।

প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্তরা সবজায়গায় বিপদ দেখতে পান, ফলে তারা বারবার হাত ধোয়া বা বারবার দরজাল লক করা কি না তা চেক করে দেখার মতো কাজ করে থাকেন। অনেকে এ ধরনের ভাবনা রোধ করতে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের চেষ্টা করেন। তারা ছুরি নিজের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখেন বা রান্নাঘরে যেতে চান না। অনেকে বাচ্চার কাছ থেকেও নিরাপদ দুরত্বে থাকেন যাতে বাচ্চাকে কোন আঘাত না করে ফেলেন।  এসব কারণে বাচ্চা তার মৌলিক যত্নআত্তি থেকে বঞ্চিত হয়।

পোস্টপারটাম সাইকোসিস নামের আরেক ধরনের কঠিন অসুখে এসময় মা আক্রান্ত হতে পারেন যার উপসর্গ এরকম:

  • দৃষ্টিবিভ্রম/হ্যালুসিনেশন
  • উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা
  • পাগলামি ভাব
  • ডিল্যুশন
  • আত্মঘাতি প্রবণতা

যদিও এটা বেশ দুর্লভ রোগ, তবুও এধরনের উপসর্গ দেখা মাত্রই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত। অন্যথায় মা ও শিশু দুজনেরই ক্ষতি হতে পারে।

কেন এ সমস্যা হয়?

বিশেষজ্ঞরা এর কোন নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাননি। বরং হরমোন, জৈব, পারিপার্শ্বিক, মানসিক ও জন্মগত বিভিন্ন উপাদান সম্মিলিতভাবে এ ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। সমসাময়িক গবেষণাগুলো বলছে গর্ভকালীন বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা এ ধরণের অসুখের একটা জোরালো চিহ্ন।

প্রসব পরবর্তী বিষন্নতায় কারা বেশি আক্রান্ত হয়?

কারও কারও এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের থেকে বেশি। গর্ভধারণ বা বাচ্চা জন্মের পূর্বেই আপনি নিচের উপসর্গগুলো দেখে ধারণা করতে পারেন:

  • গর্ভাবস্থায় হঠাৎ বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগা, বিশেষত শেষ ৩ মাসে
  • আগে থেকেই বিষন্নতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগা
  • পারিবারিকভাবেই বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগা
  • বৈবাহিক/দাম্পত্য সমস্যা
  • আর্থিক সমস্যা বা চাকরি হারানোর মতো বড় ঘটনা
  • বাচ্চা পালনের মানসিক চাপ
  • পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তা না পাওয়া
  • বদমেজাজি বাচ্চা পালন করা
  • হীনমণ্যতায় ভোগা

এ ছাড়াও অন্যান্য উপসর্গগুলো হলো:

  • অপরিকল্পিত বা অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ
  • বিবাহপূর্ব গর্ভধারণ
  • দুর্বল আর্থ-সামাজিক অবস্থান

এসব উপসর্গ থাকা মানেই আপনি বিষণ্নাতায় আক্রান্ত হবেন, এরকম নয়। অনেকের এসব উপসর্গের অনেকগুলো থাকার পরও তারা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন না। আবার কারও মধ্যে মাত্র একটি উপসর্গ থাকলেও প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হযেছেন এমন নজির বিদ্যমান।

 

এ অবস্থার মোকাবেলা করবেন যেভাবে:

ডাক্তারি পরামর্শ বা ঔষুধের পাশাপাশি আপনি নিজেই নিজেকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতে পারেন।

নিজের প্রতি যত্নবান হওয়া

আপনার সব মৌলিক প্রয়োজন মিটছে এটা নিশ্চিত করুন। পর্যাপ্তপরিমাণে খাবার খান ও ঘুমান। অপরাধবোধের কাছে হার মানবেন না। প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়া মানেই আপনি ব্যর্থ মা বা আপনি আপনার বাচ্চাকে ভালবাসেন না এমনটা মনে করার কারণ নেই। আপনার খারাপ অনুভূতি চলে যাবার পর দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।

নিজের কাছ থেকে অতিরিক্ত আশা না করা

যদি আপনি বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে আপনার উচিত হবে শুধু নিজের যত্ন নেওয়া, প্রতিদিন বিছানা ছেড়ে নিজের অতি প্রয়োজনীয় কাজ গুলো করার চেষ্টা করা। যদি এটুকু করতে পারেন, তাহলে জেনে রাখুন, আপনি প্রতিদিনই সেরে উঠছেন।

দরকার মতো পরিজনদের সাহায্য চান। একজন ভাল মা জানেন কখন সহায়তা চাইতে হয়। অন্যের কাছে সহায়তা চাওয়া মানে এই না যে আপনি খারাপ মা বা ব্যর্থ, বরং আপনি ভবিষ্যতে আরো ভালভাবে মাতৃত্বের দায়িত্ব পালনের জন্য সাহায্য চাচ্ছেন। বিভিন্ন ধরণের পরিজনরা আপনাকে সাহায্য করতে পারে, হতে পারে আপনার বন্ধু বা আত্মীয়।

মনের কথা অন্যকে খুলে বলুন

পছন্দের কাউকে মনের কথা ও সমস্যাগুলো খুলে বলুন। এতে মন হালকা হয়, হয়তো শ্রোতা এমন কোন সমাধান দিতে পারে যা আপনার মনকে শান্ত করবে। সমমনা মানুষ বা আপনার মতো সদ্য মা হওয়া কারো সঙ্গে কথা বললে দেখবেন আপনি একা নন, অনেকে এধরনের সমস্যায় ভুগে থাকেন। ্আপনার স্বামী বন্ধুসুলভ হলে তাকেও মনের কথা খুলে বলতে পারেন।

“বাইরে” ভাল থাকাকে গুরুত্ব দিন

অনেক সময় একটু পরিচ্ছন্ন থাকা, হালকা সাজ আপনার মনকে প্রফুল্ল করতে পারে। তাই বাহ্যিকভাবে সুন্দর থাকাকেও গুরুত্ব দিন। আরাম করে শাওয়ার (গোসল) নিন এবং এসময় আপনার স্বামীকে বলুন বাচ্চার দেখাশুনা করতে। স্বামী ও বাচ্চাকে নিয়ে হয়তো ঘুরতে গেলেন বা কোথাও খেতে গেলেন। আপনার পছন্দের জামাটি পড়েই বের হন। এগুলোতে মন ভাল হয়ে যাবার সম্ভাবনা অনেক।

বিশ্রাম নিন

দিনরাত ২৪ ঘন্টা বাচ্চার দেখাশুনা করা সত্যিই ক্লান্তিদায়ক, যদি আপনাকে একটা একা করতে হয়। বিশেষত বিষণ্নতায় আক্রান্ত মায়ের যখন বিশ্রামের দরকার, হয়তো তখনো তিনি বিশ্রামে যেতে পারেন না বাচ্চার দেখভাল করতে গিয়ে। অথচ এ সময় বিশ্রাম খুবই জরুরী। প্রতিদিনই নিজের জন্য কিছু সময় বের করার চেষ্টা করুন- ঘুমান, টিভি দেখুন বা একটা ম্যাগাজিন পড়ুন। বিশ্রামের সময় বাচ্চাকে দেখার জন্য শাশুড়ি বা অন্য আত্মীয়ের সাহায্য নিন। অথবা একজন আয়া রাখুন।

বাইরে ঘুরতে যান

বাচ্চাকে স্ট্রলারে বসিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। অথবা কোন বান্ধবীর সঙ্গে কাছের কোন কফি শপে কথা বলে আসুন। বাইরের খোলা বাতাস, সূর্যের আলো, আলাপ এসবই আপনার ও বাচ্চার জন্য ভাল। যদি বাইরে গিয়ে ঘুরে আসা আপনার জন্য কঠিন হয়, তবে বাসার বারান্দায় গিয়ে দাড়ান, গভীর ভাবে শ্বাস নিন, সূর্যালোক উপভোগ করুন। এগুলো মনকে হালকা করবে।

ধীরে চলো নীতি

সবকিছুতেই ‘ধীরে চলো’ নীতিতে যান এখন থেকে। কারণ আপনি সদ্য বাচ্চা প্রসব করেছেন। বাচ্চা ঘুমালেই বাসার কাপড় ধোয়া বা বাসা পরিষ্কার করার মতো কাজে ঝাপিয়ে পড়ার মানে নেই। হালকা কাজগুলো ধীরে ধীরে করতে থাকুন। এতে মন ব্যস্ত থাকবে। ঘুমানোর চেষ্টার সময় ফোনের রিংটোন কমিয়ে রাখুন বা ফোন বন্ধ রাখুন। যদি আপনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকেন, তবে অফিসের কথা একেবারের ভুলে যান। এসময় রান্না করতে ইচ্ছে না হলে স্বামীকে বলুন খাবার কিনে আনতে। হয়তো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটা ততটা বাস্তবিক শোনায় না, তবে নিজেকে প্রশান্ত রাখা এসময় ভাল কাজ দেয়।

বিষন্নতা প্রতিরোধক ওষুধ কি দুগ্ধদানে প্রভাব ফেলে?

আসলে এটা নিয়ে ভাল কোন গবেষণা নেই। অনেক ডাক্তার মনে করেন বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা এত বেশি যে বিষণ্নতা প্রতিরোধক ওষুধ হয়তো তেমন কোন সমস্যা তৈরি করবে না। বেশিরভাগ সময় বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়ের জন্য প্রশান্তিকর অভিজ্ঞতা, তাই এটা মা ও বাচ্চা দুজনের জন্যই উপকারী।

স্ত্রী যখন বিষণ্নতায় আক্রান্ত স্বামী হিসবে তখন আপনার করণীয়

সন্তানের মা যখন প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত তখন বাবা হিসেবে এ সময়টা আপনার জন্যও কঠিন। কারণ এসময় আপনিও বাচ্চার বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। তাই দরকারমতো বিশ্রামের বিষয়ে খেয়াল রাখুন। একই সঙ্গে আপনার স্ত্রীর দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করুন কোন কিছু লাগবে কি-না। এসময় তার অনেক আচরণ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তাই এগুলোকে ভাল মন্দের মাপকাঠিতে না মেপে এটা মনে রাখুন- তার সুস্থ হওয়া আপনার বাচ্চার জন্যই বেশি জরুরী। আর তার সুস্থ হয়ে  ওঠা নির্ভর করছে আপনি তাকে কতটা সমর্থন দিচ্ছেন তার উপর।

সময়মতো আপনার স্ত্রীকে ডাক্তার দেখান। তার সঙ্গে সময় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলুন। আপনি হয়তো তার সমস্যা সমাধান করতে পারবেন না, তবে তার পাশে তো থাকতে পরবেন, আর তা কিন্তু কম নয়।

লেখাটি আপনার সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি? সেক্ষেত্রে আপনি ফেসবুকে মাতৃত্ব গ্রুপে যোগ দিতে পারেন। মাতৃত্ব হলো বাংলাভাষী মা ও হবু মা'দের ভাব আদান-প্রদানের মাধ্যম।"