শুরুর আগের শুরু : হবু মায়ের পূর্বপ্রস্তুতি (১ম পর্ব)

বীজ বপনের আগে যেমন জমি প্রস্তুত করতে হয়— আগাছা সাফ করে, পোকা-মাকড় দূর করে, মাটিতে পানি, সার, ও পুষ্টি উপাদান যোগ করে— ঠিক তেমনিভাবে কনসেপশনের আগেই হবু মায়েরও কিছু ‘মাস্ট ডু’ আছে। যেমন মাটিতে বপন করা বীজের ফলন মাটির গুণাগুণ ও অবস্থার উপর ডিপেন্ড করে, ঠিক তেমনিভাবে হবু মায়ের শরীর ও সুস্বাস্থ্যের উপর ডিপেন্ড করে তার অনাগত সন্তান কতটা সুস্থ, সবল, ও রোগমুক্ত হয়ে দুনিয়ায় আগমন করবে।

আল্লাহ্ দিলে সবচেয়ে বেস্ট হয় বিয়ের আগে থেকেই, আর না হলে বিয়ের পর সন্তান নেওয়ার প্ল্যান করার অ্যাটলিস্ট কয়েক মাস আগে থেকেই হবু মায়ের কিছু প্রিপেরেটরী মেজারস বা সহজ বাংলায় যেটাকে বলে পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন, নিজের শরীরকে প্রস্তুত করতে এবং নিজের গর্ভে আরেকটি মানবশিশুকে সুষ্ঠুভাবে ধারণ করতে। সেখান থেকেই কয়েকটি ইম্পর্টেন্ট বিষয় আমি এখানে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করবো।

এখন, যে বিষয়গুলো নিয়ে লিখবো ঠিক করেছি, সেগুলোর প্রত্যেকটি নিয়েই পাতার পর পাতা লেখা পসিবল। তবে আমি এখানে চেষ্টা করবো খুব বেশি ডিটেইলসে না গিয়ে যতটা পারা যায় ব্রিফলি লিখতে। এই পূর্ব প্রস্তুতিগুলো নিলে হবু মা ও তার অনাগত বাচ্চার সুস্থ থাকার সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়বে, বিইজনিল্লাহ্।

১) ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার, ও ব্যায়াম

শুরু করি ওয়েট কন্ট্রোল বা ওজন নিয়ন্ত্রণ দিয়ে। প্রেগনেন্সিতে মায়ের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও প্রবলেম, কম হলেও প্রবলেম [২]। ওজন বেশি হলে প্রেগনেন্সি চলাকালীন হাই ব্লাড-প্রেসার, জেসটেশনাল ডায়বেটিস, প্রি-এক্লাম্পসিয়াসহ নানান রোগ হানা দিতে পারে। আর ডেলিভারীর সময়ে বাচ্চার কাঁধ আটকে যেতে পারে [৩], অতিরিক্ত ব্লিডিং হতে পারে, এবং শেষে নরমাল ডেলিভারী না হয়ে সি-সেকশন করা লাগতে পারে।

আবার মায়ের ওজন কম হলে বাচ্চার ওজনও কম হতে পারে এবং প্রি-ম্যাচিউর বেবী ডেলিভারী হতে পারে।

এখন প্রশ্ন তোলা যেতে পারে অনেক মায়ের তো স্বাভাবিক ওজন থাকার পরও উপরে উল্লিখিত প্রবলেমগুলো হয়েছে! তাহলে?

হ্যাঁ, স্বাভাবিক ওজন থাকার পরও কখনো কখনো প্রবলেমগুলো হতে পারে। কিন্তু অস্বাভাবিক থাকলে এই প্রবলেমগুলো হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়!

তবে অতিরিক্ত ওজন নিয়ে কনসিভ করে ফেললে যদিও ঝুঁকি বেশি, কিন্তু প্রেগনেন্সী চলাকালীন আবার ওজন কমানোর চেষ্টা করা যাবে না।

আদর্শ ওজন হিসাব করার একটা উপায় হচ্ছে বিএমআই। তবে এটাকে বেস্ট পদ্ধতি বলা যায় না।[৪] কেননা স্রেফ ওজন এবং উচ্চতাই আদর্শ ওজন নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট না। আপনার আদর্শ ওজন কত হওয়া উচিত তা ডিপেন্ড করবে আপনার এথনিসিটি, এইজ, হাইট, মাসল ম্যাস, লাইফস্টাইল সব কিছুর উপর।

তারপর আসি খাবার-দাবারে।

আমরা বাঙালীদেরকে বলা হয় ভেতো-বাঙালী। ভাত এ উপমহাদেশের প্রধান খাদ্য। তাই স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় আমরা বেশিরভাগ মানুষই তিনবেলা যদি নাও হয়, দুইবেলা ডেফিনেটলি পেটপুরে ভাত খাই! কিন্তু আমরা খেয়াল করি না যে ভাত আমাদের স্রেফ কার্বোহাইড্রেট এর চাহিদাটুকুই পূরণ করছে। বাকি কার্বোহাইড্রেট এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেলস, এবং পানিও আমাদের দেহকে সুস্থ রাখার জন্য ক্রুশিয়াল। তাই প্রয়োজন হচ্ছে সুষম খাবারের ব্যালেন্সড একটা ডায়েট ফলো করা।

কুরআনুল কারীমের সূরা নাহলের ১১ নং আয়াতে আল্লাহ্ রব্বুল ইজ্জাহ্ ইরশাদ করেন— “তার মাধ্যমে তিঁনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন ফসল, যাইতুন, খেজুর গাছ, আঙ্গুর এবং সকল ফল-ফলাদি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।”

আল্লাহ্ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের শারীরিক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাহারী রকমের খাবার এ দুনিয়ায় দান করেছেন, যার প্রত্যেকটিই কোনো না কোনোভাবে আমাদের শরীরের জন্য ইম্পর্টেন্ট। দামি বা বিদেশী খাবার খাওয়া এখানে নেসেসারী না। নেসেসারী হলো খাবার ভ্যাজালমুক্ত ও ফ্রেশ হওয়া, বাসি-পঁচা না হওয়া।

তাই আপনার এলাকায় ইজিলি অ্যাভেইলেবল যে খাবার গুলো আছে— মৌসুমী ফল-ফলাদি, শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ডাল, দুধ-ডিম, খেঁজুর-বাদাম এগুলোই সাধ্যমতো খাবেন। সাদা চাল-আটার পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে লাল চাল-আটা খাওয়া বেটার।

কিছু খাবার সবসময় অ্যাভয়েড করে চলা উচিত। যেমন— ফাস্ট ফুড, হাইলি প্রসেসড ফুড, অতিরিক্ত তেল-চর্বী, চিনি ও লবনযুক্ত খাবার।

ফাইনালি, এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম। ব্যায়ামের ইম্পর্টেন্স তো বলে শেষ করা যাবে না। আমরা কমবেশী সবাই কিন্তু সেটা জানিও। তবুও আলসেমি করেই হোক বা অন্য কারণেই হোক, ব্যায়ামটা আমাদের করা হয়ে উঠে না। স্পেশালী আমরা মেয়েদের। অথচ উচিত ছিল টিনএইজের শুরু থেকেই হ্যাবিট করে নেয়া!

প্রেগনেন্সির আগে ও চলাকালীন ব্যায়ামের ইম্পর্টেন্স বুঝাতে ব্যস একটা কথা বলি যে কথাটা ‘আমানি বার্থ’ এর ফাউন্ডার উস্তাযা আইশা আল-হাজ্জার সবসময় বলেন। তিনি প্রেগনেন্সির সময়টা এবং ফাইনালি ডেলিভারীকে তুলনা করেন মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার সঙ্গে! তিনি কিছুটা এভাবে এক্সাম্পল দেন— কেউ কি কোনোদিন শুনেছেন কোনো প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া, ট্রেইনিং ছাড়া কেউ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করতে গিয়েছে?! করতে যাওয়া তো দূরের কথা, এমন উদ্ভট চিন্তাও কেউ কখনো করেনি! যদি কেউ করে, তাহলে ডেফিনেটলি সবাই বলবে— এই লোক একটা পাগল!

প্রেগনেন্সির শুরু থেকে ডেলিভারী পর্যন্ত অনেক লম্বা একটা সময়, অনেক কষ্টসাধ্য একটা সময়। বিশেষ করে নরমাল ডেলিভারী হলে মাকে আনডাউটেডলি ভীষণ রকমের পরিশ্রম করতে হয়। লেবারের নাম লেবার কেন হয়েছে? কারণ এটা অনেক পরিশ্রমের একটা কাজ! তাই মায়ের যদি স্ট্যামিনায় ঘাটতি থাকে, তার শরীর যদি এই প্রচন্ড পরিশ্রমের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সেই মা লেবারের এই প্রচন্ড ধকলটা নিতে পারবে না। যার একটা রিয়েল লাইফ কমন সিনারিও হচ্ছে— মা মাঝপথে ক্লান্ত হয়ে, দিশেহারা হয়ে হাল ছেড়ে দেয়, আর রেজাল্ট ইমার্জেন্সি সি-সেকশন।

তাই প্রেগনেন্সি ও লেবারের কষ্টসাধ্য সেই সময়টার জন্য নিজের শরীরকে তৈরী করা উচিত আগেভাগেই। সবসময় এই কথাটা মনে রাখা উচিত যে, কোনো প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি বা ট্রেইনিং ছাড়া মাউন্ট এভারেস্ট জয় করতে যাওয়া যেমন বোকামি, ঠিক তেমনি নিজের শরীরকে তৈরী না করেই কমপ্লিটলি আনপ্রিপেয়ারড ভাবে প্রেগনেন্সির এই কঠিন জার্নিটা শুরু করে দেয়া তারচেয়েও বড় বোকামি!

এছাড়া ব্যায়াম প্রেগন্যান্ট হওয়ার পসিবিলিটি বাড়িয়ে দেয় এবং প্রেগনেন্সি রিলেটেড বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও কমায়। যেমন— প্রি-এক্লাম্পসিয়া, জেসটেশনাল ডায়বেটিস ইত্যাদি।

তো, কি কি ব্যায়াম করা যেতে পারে?

ফর স্টার্টার, সহজ ও ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম যেগুলো, যেমন— প্রতিদিন পনের মিনিট থেকে আধঘন্টা হাঁটার অভ্যাস করা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। কেগেল আরেকটি ব্যায়াম যেটা নারী-পুরুষ, মেয়ে-বুড়ো সকলের জন্যই ভীষণ ইম্পর্টেন্ট একটা ব্যায়াম [৫], এবং আমার মতে এটা প্রত্যেকের লিটারেলি নিজের উপর ওয়াজিব মনে করে করা উচিত! এছাড়া কারো সুযোগ থাকলে সাঁতার কাটা যেতে পারে।

সর্বোপরি, প্রতিটি দেহই আলাদা এবং আলাদা দেহ বুঝে তার একটা আদর্শ ওজন, পুষ্টি চাহিদা, এবং ব্যায়ামের রিকোয়্যারমেন্ট আছে। তাই বেস্ট হয় অভিজ্ঞ কোনো ডক্টরের পরামর্শ মতো ওজন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে, সুষম খাবারের একটা ডায়েট চার্ট, এবং কি কি ব্যায়াম করবে তার একটা ডিটেইলড গাইডলাইন নেয়া এবং সেটা সিরিয়াসলি ফলো করে চলা।

২) টিকা, ও রোগ নিয়ন্ত্রণ

মর্ডান মেডিসিনের কল্যাণে অনেক ধরনেরই টিকাই বর্তমান বিশ্বে আবিষ্কার হয়েছে, হচ্ছে। তারমধ্যে কয়েকটি টিকার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করছি যেগুলো মা ও গর্ভে থাকা সন্তানকে নানান রোগ-ব্যাধি থেকে প্রটেকশন দিয়ে থাকে। এই টিকা গুলো না নেয়া থাকলে কনসেপশনের আগেই নিয়ে নেয়া ইম্পর্টেন্ট।

হেপাটাইটিস বি টিকা প্রেগনেন্সি চলাকালীন মা যদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাহলে গর্ভের সন্তানও আক্রান্ত হতে পারে। রেজাল্ট মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি। বাংলাদেশে যাদের জন্ম ২০০৩ সালের আগে হয়েছে, তারা এই টিকা পাননি। তাই হেপাটাইটিস বি টিকা নেয়া না থাকলে আগেই নিয়ে নেয়া নেসেসারী।

টিটেনাস টিকা এটা বাংলাদেশে টিটি টিকা নামেও পরিচিত। এই টিকা মা ও নবজাতকে ধনুস্টংকার রোগ থেকে প্রটেকশন দেয় [৬]।

এমএমআর টিকা এই টিকা না নেয়া থাকলে গর্ভের সন্তান রুবেলাতে আক্রান্ত হতে পারে। যেকারণে বাচ্চার হার্ট, ব্রেইন, চোঁখ ও কানে প্রবলেম হতে পারে— এমনকি মিসক্যারেজও হয়ে যেতে পারে।

এমএমআর টিকা অলরেডি প্রেগনেন্ট এমন নারীদেরকে দেওয়া যায় না। এটা তাই কনসেপশনের আগেই নিতে হয় এবং টিকা নেয়ার পর ১ মাস পর্যন্ত বাচ্চা নেয়া থেকে বিরত থাকতে হয় [৭]।

টিকা নেয়ার ক্ষেত্রে ইম্পর্টেন্ট হলো আপনার ডক্টরের সাথে কনসাল্ট করে নেয়া। কোনটা নেয়া আছে, কোনটা নেয়া নেই, তা ভালোভাবে জানানো। এরপর তারাই আপনাকে গাইড করবেন কোন টিকা নিতে হবে, কি ডোজে।

কিছু কিছু টিকা আছে যেগুলো প্রেগনেন্সির আগেই নিতে হয়, কিছু প্রেগনেন্ট অবস্থায় নেয়া যায়, আবার কিছু টিকা প্রেগনেন্ট অবস্থায় নেয়া যায় না। তাই এই ব্যাপারগুলোতে কেয়ারফুল থাকা ইম্পর্টেন্ট।

এবারে একটু বলি রোগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

বর্তমান দুনিয়ায় ভেজাল খাবার-দাবার খেতে খেতে আমাদের এমন সব রোগ-ব্যাধি এখন হচ্ছে যেগুলোর অস্তিত্ব হয়তো দশ বছর আগেও ছিলো না। ডায়বেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার, থাইরয়েড, পিসিওডি, পিসিওএস এর মতো রোগগুলো তো আনফরচুনেটলি এখন ঘরে ঘরে! মা’আযাল্লাহ্!

কিছু রোগ আছে যেগুলো কনসেপশনের আগেই বা প্রেগনেন্সি চলাকালীন কন্ট্রোলে রাখা খুবই ইম্পর্টেন্ট। তাই আপনার ডক্টরের সাথে আগেই ভালোভাবে কনসাল্ট করুন এ ব্যাপারে ডিটেইলসে। আপনার কোনো রোগ আছে কি না, আপনি কি কি মেডিসিন রেগুলারলি নিচ্ছেন, আগের প্রেগনেন্সিতে কোনো প্রবলেম বা মিসক্যারেজের হিস্ট্রি আছে কি না, এমনকি আপনার ফ্যামিলি মেম্বারদের কি কি রোগ আছে— সবকিছু ডিটেইলসে জানান আপনার ডক্টরকে। আগে থেকেই যদি রোগ কন্ট্রোলে রাখা যায়, তাহলে আল্লাহ্ চাইলে প্রেগনেন্সি চলাকালীন, ডেলিভারীর সময় এবং তারপরের অনেক কমপ্লিকেশন অ্যাভয়েড করা যায়।

সর্বোপরি সুস্থতা ও অসুস্থতা দুটোই আল্লাহর রব্বুল ইজ্জাহের পক্ষ থেকে নিয়ামত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— “দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, বেদনা, ক্লান্তি, অসুস্থতা, এমনকি কাটা ফোটার দ্বারাও মুমিন ব্যক্তির কিছু গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন।” [সহিহ আল বুখারি: ৫৬৪০]

তাই মু’মিনের কাজ হলো সকল সিচুয়েশনেই আল্লাহ্ রব্বুল ইজ্জাহের শুকরিয়া আদায় করা। অসুস্থ হলেই ডিপ্রেসড না হয়ে যাওয়া। সুস্থতার জন্য চিকিৎসা নেয়ার পাশাপাশি দু’আ ও রুকইয়াহ করা, এবং সবর ও ইস্তিকামাতের সাথে থাকার চেষ্টা করা।

৩) ফলিক এসিড, আয়রন, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য

ফলিক এসিড প্রেগনেন্সি চলাকালীন যে পুষ্টি উপাদানগুলো শিশুর গঠনের জন্য অত্যন্ত ক্রুশিয়াল, তার মধ্যে অন্যতম একটা হলো ফলিক এসিড। ভিটামিন বি৯ বিভিন্ন খাবারে ‘ফোলেট’ হিসেবে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। এই ভিটামিন বি৯ যখন আর্টিফিশিয়ালি তৈরি করা হয় তখন তাকে ফলিক এসিড বলে।

আপনি কনসিভ করার প্রথম মাস থেকেই গর্ভের শিশুর ব্রেইন ও স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশ গড়ে উঠতে থাকে [৮]। কিন্তু প্রথম পিরিয়ড মিস হওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি প্রেগনেন্ট কি না সেটা হয়তো আন্দাজ করা সবসময় পসিবল হয় না। ততদিনে গর্ভের শিশুর বয়স প্রায় এক মাস হয়ে যায়। 

তাই সন্তান নেওয়ার প্ল্যান শুরু করার সময় থেকেই প্রতিদিন ফলিক এসিড খাওয়া খুবই ইমপর্টেন্ট। কম করে হলেও অ্যাটলিস্ট এক মাস আগে থেকে। এতে করে প্রথম মাসেও গর্ভের শিশু নেসেসারী ফলিক এসিড পাবে, যা শিশুর ব্রেইন ও স্নায়ুতন্ত্র গঠনে সাহায্য করবে [৯]।

ফলিক এসিডের অভাব হলে শিশুর ব্রেইন ও স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশের গঠনে বিভিন্ন ধরনের সিরিয়াস প্রবলেম দেখা দিতে পারে। এমন ক্ষেত্রে শিশু নানান জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মায় [১০]। যেমন— অ্যানেনসেফালি (এক্ষেত্রে মাথার খুলির হাড় ও ব্রেইন সঠিকভাবে গড়ে ওঠে না), স্পাইনা বিফিডা (এই জটিলতায় মেরুদণ্ড সঠিকভাবে তৈরি হয় না), ইত্যাদি। এছাড়া ফলিক এসিড ডেফিসিয়েন্সির জন্য মায়ের ম্যাটারনাল অ্যানিমিয়া বেড়ে যেতে পারে।

যেসব খাবারের মধ্যে ফোলেট পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সবুজ শাক; যেমন— পালং শাক, পুঁইশাক, পাট শাক, কচু শাক, মেথি শাক, সজনে পাতা, লাল শাক, নটে শাক, সবুজ ডাঁটা শাক, মুলা শাক ও লাউ শাক, বিভিন্ন সবজি; যেমন— বরবটি, মটরশুঁটি, ঢেঁড়স, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ব্রকলি, বিভিন্ন ডাল; যেমন— ছোলার ডাল, মাসকলাই ডাল ও মুগ ডাল, বিভিন্ন ফল; যেমন— কমলা, অ্যাভোকাডো, স্ট্রবেরি, ও বিভিন্ন বাদাম; যেমন— চিনাবাদাম।

প্রাকৃতিক খাদ্য উৎস আর্টিফিশিয়ালি তৈরী সাপ্লিমেন্টের চেয়ে সবসময়ই ভালো। তবে গর্ভের সন্তানের জন্য যে পরিমাণ ফলিক এসিড শরীরে থাকা নেসেসারী, তা স্রেফ খাবার থেকে সাধারণত পূরণ করা পসিবল হয় না। তাই ফোলেট সমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি আলাদা করে ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খাওয়ার সাজেশ্চন দেওয়া হয়।

সাধারণত সন্তান নেওয়ার চেষ্টা শুরু করার সময় থেকে প্রেগনেন্সির অ্যাটলিস্ট ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম সপ্তাহ পর্যন্ত নিয়মিত ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড ট্যাবলেট খাওয়া স্পেশালি ইম্পর্টেন্ট।

তবে সাজেশ্চন থাকবে যেকোনো মেডিসিনের মতো ফলিক এসিড ট্যাবলেটও খাওয়ার আগে নিজের ডক্টরের সাথে কনসাল্ট করে নেয়ার। আপনার ডক্টরই আপনাকে গাইড করবে কতটুকু পরিমাণে, কতদিন পর্যন্ত আপনার জন্য ফলিক এসিড খাওয়া নেসেসারী।

আয়রন প্রিম্যাচিউর বাচ্চা ডেলিভারী হওয়া, বাচ্চার ওজন কম হওয়া, বা মৃত বাচ্চা জন্মানোর ঝুঁকির একটা অন্যতম কারণ হলো প্রেগনেন্সিতে আয়রনের অভাবজনিত কারণে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা। তাই প্রেগনেন্সিতে আয়রনের অভাবজনিত কারণে রক্তস্বল্পতা না থাকা খুবই ইম্পর্টেন্ট।

বাচ্চা কনসিভ করার আগেই টেস্ট করে দেখুন আপনার রক্তস্বল্পতা রোগ আছে কিনা। থাকলে ডক্টরের পরামর্শ মতো আয়রন ট্যাবলেট খেলে এই রোগ অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই সেড়ে যায় ইংশাআল্লাহ্।

এছাড়া প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত পরিমাণ মতো। যেমন— গরুর কলিজা, রেড মিট, পালং শাক, শুটিজাতীয় খাবার, মিষ্টি কুমড়ার বীজ, জলপাই, ডার্ক চকলেট, ড্রাই ফ্রুটস (কিসমিস) ইত্যাদি।

আয়রন-ফলিক এসিড ট্যাবলেটের সাথে একই সময়ে অ্যান্টাসিড অথবা ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়া ঠিক না। এতে আয়রনের কার্যকারিতা কমে যায়। অ্যান্টাসিড অথবা ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়ার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে অথবা ২ ঘণ্টা পরে আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া উচিত। আয়রন সবচেয়ে ভালো অ্যাবজর্ব হয় ভিটামিন সি এর সাথে। তাই ভিটামিন সি যুক্ত ফলের জুসের সাথে আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে।

ভিটামিন ডি বাংলাদেশের একটি জাতীয় জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন নারীর ভিটামিন ডি এর ঘাটতি আছে [১১]। শুধুমাত্র খাবার থেকে ভিটামিন ডি এর অভাব পূরণ করা খুব কঠিন। সাধারণত রোদে গেলে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করে নেয়। কিন্তু রোদে না যাওয়া, রোদে গেলেও শরীরের প্রায় সবটুকু কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা— এসব কারণে অনেক নারীর ভিটামিন ডি এর ঘাটতি থাকে।

গর্ভের বাচ্চার দাঁত ও দেহের হাড়সহ বিভিন্ন অঙ্গের সুস্থ গঠনের জন্য মায়ের পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি নেসেসারী।[১২]

তাই আপনার ডক্টরের সাথে কনসাল্ট করে টেস্ট করে জেনে নিন আপনার শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি আছে কি না। যদি থাকে তাহলে আগেই ব্যবস্থা নিন।

এছাড়াও ভিটামিন সি, বি ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, জিংক সহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান আপনার শরীরের জন্য এবং আপনার গর্ভের সন্তানের জন্য খুবই ইম্পর্টেন্ট। তাই চাহিদামতো এই পুষ্টি উপাদানগুলো শরীর পাচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। [১৩]

৪) ক্যাফেইন, ও ধুমপান

ক্যাফেইন প্রেগনেন্সিতে মায়ের ক্যাফেইন গ্রহণ নিয়ে অনেকগুলো রিসার্চ হয়েছে যেখানে বাচ্চার কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করার রিলেশন পাওয়া গিয়েছে  [১৪]। আর ওজন কম হওয়ার ফলে শিশু নানান শারিরীক জটিলতায় ভুগতে পারে, এমনি মিসক্যারেজ হওয়ার চান্সেসও আছে। তাই প্রেগনেন্সি চলাকালীন ক্যাফেইন জাতীয় খাবার-পানীয় একদমই এড়িয়ে চলা উচিত। তবে অনেকের অনেক বছরের অভ্যাস থাকে যা হুট করে ছাড়া কষ্টকর হয়ে যায়। তাই চেষ্টা করা উচিত ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার এবং প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রামের বেশি না খাওয়ার [১৫]।

ক্যাফেইনযুক্ত খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে— চা-কফি, সফট ড্রিঙ্কস, এনার্জি ড্রিঙ্কস, ও চকলেট।

সাধারণত ৩৫০ মিলিলিটারের এক কাপ চায়ে ৭৫ মিলিগ্রাম এবং একই পরিমাণ ইনস্ট্যান্ট কফিতে ১০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। তাই প্রেগনেন্সিতে প্রতিদিন ২ কাপের বেশি চা-কফি খাওয়া উচিত না। তবে চা-কফি ছাড়া অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত খাবার খেলে সেই অনুযায়ী চা-কফি খাওয়াও কমাতে হবে।

ধুমপান দুঃখজনক হলেও সত্যি বর্তমানে আমাদের দেশেও ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে মেয়েরা এখন নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে! আর এসব নেশাজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে সিগারেট বা ধুমপান রয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে। অথচ উচিত ছিলো ভালো কাজের জন্য প্রতিযোগিতা করা।

যাই হোক। প্রথম কথা ধুমপান হারাম [১৬]। সেটা মাথায় রেখেই তো ছেড়ে দেয়া উচিত। তারপর দুনিয়াবি ক্ষতির হিসেব যদি করি তাহলে ক্যান্সারসহ অন্যান্য অনেক রোগের পাশাপাশি আরেকটা বড় ক্ষতি হলো ধুমপান নারী-পুরুষ উভয়েরই সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে [১৭]। প্রেগনেন্ট মা নিজে যদি ধুমপান নাও করেন, তার আশেপাশে কেউ করলেও প্যাসিভলি সেটা গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। যেমন— সেকেন্ডহ্যান্ড বা প্যাসিভ স্মোকিং এর কারণে বাচ্চা কম ওজন নিয়ে জন্মাতে পারে [১৮]।

তাই মায়ের এই বদ অভ্যাস থাকলে মা তো অবশ্যই কনসিভ করার কয়েকমাস আগেই এই বদ অভ্যাস ছাড়বেন, সাথে ফ্যামিলির কেউ; স্পেশালি বাচ্চার বাবার থাকলে তাকেও ছাড়তে বাধ্য করবেন। নিজের সুস্বাস্থের জন্য তো বটেই, অনাগত বাচ্চার সুস্বাস্থের জন্য এতটুকু স্যাক্রিফাইস করতেই হবে।

চলবে ইংশাআল্লাহ্…

আমাতুল্লাহ অদ্রি

চাইল্ডবার্থ এডুকেটর (আমানি বার্থ) অ্যান্ড ডুলা ট্রেইনি (মাতৃত্ব)

রেফারেন্স

[১] Shohay Health. (n.d.). Things to know about getting pregnant. Shohay Health.

[২] Weston, P., Crofts, J., & Draycott, T. (2012). Shoulder dystocia in maternal obesity. In P. Ovesen & D. Møller Jensen (Eds.), Maternal obesity and pregnancy (pp. 123-130). Springer. https://doi.org/10.1007/978-3-642-25023-1_12

[৩] Tabet, Maya, et al. “Prepregnancy Body Mass Index in a First Uncomplicated Pregnancy and Outcomes of a Second Pregnancy.” American Journal of Obstetrics and Gynecology, vol. 213, no. 4, Oct. 2015.

[৪] Harvard Health Publishing. (2016, March 30). How useful is the body mass index (BMI)? Harvard Health. https://www.health.harvard.edu/blog/how-useful-is-the-body-mass-index-bmi-201603309339

[৫] American Pregnancy Association. (n.d.). Kegel exercises. American Pregnancy. Retrieved October 2, 2024, from https://americanpregnancy.org/healthy-pregnancy/labor-and-birth/kegel-exercises/

[৬] World Health Organization. (2017). WHO recommendations on antenatal care for a positive pregnancy experience (p. 70). World Health Organization.

[৭] McLean, H. Q., et al. (2013). Prevention of measles, rubella, congenital rubella syndrome, and mumps, 2013: Summary recommendations of the Advisory Committee on Immunization Practices (ACIP). MMWR. Recommendations and Reports, 62(RR-04).

[৮] Korenbrot, C. C., Pappas, J. J., & Hinton, E. (2002). Preconception care: A systematic review. *Maternal and Child Health Journal, 6*(2), 75–88. https://doi.org/10.1023/A:1019822500953

[৯] Viswanathan, M., MacDonald, R., & Hwang, W. (2017). Folic acid supplementation for the prevention of neural tube defects. *JAMA, 317*(2), 190. https://doi.org/10.1001/jama.2016.15985

[১০] Centers for Disease Control and Prevention. (2021, November 15). Planning for pregnancy. https://www.cdc.gov/preconception/planning.html

[১১] Ahmed, F., Saha, S., & Hasan, M. (2016). Micronutrient deficiencies among children and women in Bangladesh: Progress and challenges. Journal of Nutritional Science, 5, Article e23. https://doi.org/10.1017/jns.2016.1

[১২] Urrutia-Pereira, M., & Solé, D. (2015). Vitamin D deficiency in pregnancy and its impact on the fetus, the newborn and in childhood. Revista Paulista de Pediatria, 33(1), 104–110. https://doi.org/10.1016/j.rppede.2015.01.001

[১৩] Al Hajjar, A. (2018). Pregnancy Nutrition. In AMANI Birth Student Workbook Teacher's Guide (p. 62). AMANI Inc.

[১৪] Chen, L.-W., Wu, Y., & Chen, Y. (2014). Maternal caffeine intake during pregnancy is associated with risk of low birth weight: A systematic review and dose-response meta-analysis. BMC Medicine, 12, 174. https://doi.org/10.1186/s12916-014-0174-6

[১৫] American College of Obstetricians and Gynecologists. (2010). Committee opinion No. 462: Moderate caffeine consumption during pregnancy. Obstetrics and Gynecology, 116(2 Pt 1), 467–468. https://doi.org/10.1097/AOG.0b013e3181e2e1f1

[১৬] Hadith BD. (n.d.). Retrieved October 11, 2024, from http://www.hadithbd.com/books/link/?id=2213

[১৭] American Society for Reproductive Medicine. (n.d.). Smoking and infertility. https://www.reproductivefacts.org/news-and-publications/fact-sheets-and-infographics/smoking-and-infertility/

[১৮] Hamadneh, S., & Hamadneh, J. (2021). Active and passive maternal smoking during pregnancy and birth outcomes: A study from a developing country. Annals of Global Health, 87(1), 122. https://doi.org/10.5334/aogh.3384

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ মার্চ ১৬, ২০২৫