
শেষ দশ রাতের জন্য দশটি গুরুত্বপূর্ণ দোআ ও যিকর
যারা দীর্ঘক্ষণ স্বলাত পড়তে পারেন না, যেমন- গর্ভবতী মা, নবজাতকের মা, বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তি, তারা জিহ্বা ও হৃদয়ে অনেক দোআ ও যিকর করতে পারেন, যা তাদের জন্য অধিক সওয়াবের কারণ হতে পারে ইনশাআল্লাহ।
নবজাতকের মা বা ছোট সন্তানের মা, যদি আপনি দীর্ঘ তারাবীহ পড়তে না পারেন, ইতেকাফ করতে না পারেন, তাহাজ্জুদে উঠতে না পারেন, বা সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতে না পারেন, তাহলে মন খারাপ করবেন না।
আপনিও অনেক কিছু করতে পারেন!
এখানে শেষ দশ রাতে পড়ার জন্য দশটি সহজ কিন্তু অধিক সওয়াবের যিকর ও দোআ উল্লেখ করা হলো:
১) এই দোআটি পড়ুন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।”
আমাদের মা আয়িশা (রাযি.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রসূল! যদি আমি জানতে পারি যে কোন রাত লাইলাতুল কদর, তাহলে আমি কী বলবো?”
নবী (ﷺ) বললেন: “বলবে, হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।”
(তিরমিজি: ৩৫১৩, ইবনে মাজাহ: ৩৮৫
২) সূরা ইখলাস পড়ুন:
• ৩ বার পড়লে, সম্পূর্ণ কুরআন পড়ার সওয়াব লাভ করা যায়।
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“তোমাদের কেউ কি এক রাতে এক-তৃতীয়াংশ কুরআন পড়তে অক্ষম?”
সাহাবিরা বললেন, “কে কিভাবে এক রাতে এক-তৃতীয়াংশ কুরআন পড়তে পারে?”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন:
সূরা ইখলাস এক-তৃতীয়াংশ কুরআনের সমান।”
(সহিহ বুখারি: ৫০১৫, মুসলিম: ৮১২)
• ১০ বার পড়লে, জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করা হয়।
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি দশবার ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ পড়বে, তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করা হবে। যে বিশবার পড়বে, তার জন্য দুইটি প্রাসাদ তৈরি হবে। যে ত্রিশবার পড়বে, তার জন্য তিনটি প্রাসাদ তৈরি হবে।”
৩) সূরা আল-বাকারা-এর শেষ দুই আয়াত পড়ুন:
“রসূল (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।”
(সহিহ বুখারি: ৫০০৯, মুসলিম: ৮০৮)
৪) “সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহি” পড়ুন:
سبحان الله وبحمده
অর্থ: “আল্লাহ পবিত্র এবং প্রশংসা তাঁরই জন্য।”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহি’ বলবে, তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো বেশি হয়।”
(সহিহ বুখারি: ৬৪০৫, সহিহ মুসলিম: ২৬৯১)
৫) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু…” পড়ুন:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ ٱلْمُلْكُ وَلَهُ ٱلْحَمْدُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।”
এই দোআ পড়ার ফজিলত:
• এটি ঈমানের শ্রেষ্ঠ দোয়া।
• এটি পড়লে জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হয়।
• এটি পড়ার দ্বারা শয়তান দূরে সরে যায়।
(সহিহ বুখারি: ৬৪০৩, সহিহ মুসলিম: ২৬৯৩)
শেষ দশ রাতে বলার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ দোআ ও যিকর
৬) “সুবহানাল্লাহ” পড়ুন:
سبحان الله
অর্থ: “আল্লাহ পবিত্র।”
মুসআব ইবন সা’দ (রহ.) তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেছেন:
আমরা আল্লাহর রসূল (ﷺ)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন,
“তোমাদের কারো জন্য কি প্রতিদিন এক হাজার নেকি অর্জন করা কঠিন?”
সাহাবাদের একজন বললেন, “আমাদের মধ্যে কেউ কীভাবে প্রতিদিন এক হাজার নেকি অর্জন করতে পারে?”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
“যদি কেউ একশো বার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে, তাহলে তার জন্য এক হাজার নেকি লেখা হবে অথবা এক হাজার গুনাহ মুছে ফেলা হবে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৬৯৮, তিরমিজি: ৩৪৬৩)
৭) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু…” পড়ুন:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ ٱلْمُلْكُ وَلَهُ ٱلْحَمْدُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই, এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি এক দিনে ১০০ বার এই দোয়াটি পড়বে, সে দশজন ক্রীতদাস মুক্ত করার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, তার আমলনামায় ১০০ নেকি লেখা হবে, ১০০ গুনাহ মুছে দেওয়া হবে এবং সে দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তানের থেকে সুরক্ষিত থাকবে। এবং কেউ তার চেয়ে উত্তম আমল করতে পারবে না, তবে সে ব্যক্তি, যে এটি তার চেয়েও বেশি পড়বে।”
(সহিহ বুখারি: ৬৪০৩, সহিহ মুসলিম: ২৬৯৩)
৭) “সুবহানাল্লাহিল আজীম ওয়া বিহামদিহি” পড়ুন:
سبحان الله العظيم و بحمده
অর্থ: “মহান এবং প্রশংসার অধিকারী আল্লাহ পবিত্র।”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ‘সুবহানাল্লাহিল আজীম ওয়া বিহামদিহি’ পড়বে, তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হবে।”
(তিরমিজি: ৩৪৬৪, ইবনে মাজাহ: ৩৮০৭)
৮) রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর দরুদ পাঠ করুন:
اللهم صل على محمد وعلى آل محمد
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর দরুদ ও রহমত বর্ষণ করুন।”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি একবার আমার ওপর দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করবেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করবেন।”
(সহিহ মুসলিম: ৪০৮)
৯) “লা হাওলা ওয়া লা কু্ওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” পড়ুন:
لا حول ولا قوه الا بالله
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোনো ক্ষমতা ও শক্তি নেই।”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“লা হাওলা ওয়া লা কু্ওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ জান্নাতের ধনভাণ্ডারের অন্যতম সম্পদ।”
(সহিহ বুখারি: ৬৩৮৪, সহিহ মুসলিম: ২৬৮৭)
১০) এই দোআটি পড়ুন:
اللهم اغفر للمؤمنين والمؤمنات الاحياء منهم والاموات
অর্থ: “হে আল্লাহ! জীবিত ও মৃত সকল মুমিন পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করুন।”
রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি সকল মুমিন নর-নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি মুমিন নর-নারীর বিনিময়ে একটি নেকি দান করবেন।”
(সহিহুল জামে: ৫৬০৫)
যদি সবগুলো পড়তে না পারেন, তাহলে অন্তত কয়েকটি বেছে নিন।
উদ্দেশ্য হলো, এই বরকতময় রাতগুলোতে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা এবং যতটুকু সম্ভব ইবাদত করা।
আল্লাহ আমাদের সবার দোআ কবুল করুন, আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের ওপর দয়া করুন, আমাদের পরিবারসহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন এবং জান্নাতের বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন!
মূল লেখাঃ উম্ম খালিদ
অনুবাদঃ নুসরাত জাহান চৌধুরী