রমাদ্বন ও মা হওয়ার আনন্দ: চ্যালেঞ্জ থেকে প্রশান্তির যাত্রা

যখন আমার বাচ্চারা একদম ছোট ছিল, তখন পরিবারের মধ্যে শুধু আমি আর আমার স্বামী রোজা রাখতাম।

ফজরের আগের সময়টা, রাতের সেই শেষ অংশ ছিল একদম শান্ত আর নিরিবিলি। আমি একা একা সুহুর করতাম এবং নীরবতার মাঝে ইবাদতে মনোযোগ দিতাম। (আমার স্বামীর সুহুর ছিল শুধু একটি খেজুর এবং কিছু পানি।)

দিনটি কেটে যেত ছোট বাচ্চাদের দেখাশোনায়—তাদের জন্য সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবার তৈরি করা, কারণ তারা সারাদিন খাবার, স্ন্যাকস, পানি, দুধ, খেলনা ও গেমস চাইতো। তাদের দৌড়াদৌড়ি, খাওয়ানো,ডায়াপার পরিবর্তন করা, আর ঘুম পাড়ানোর কাজ চলতেই থাকত।

আজ, বহু বছর পর, সবকিছু অনেক বদলে গেছে।

আমার পাঁচজন সন্তানের মধ্যে তিনজন এখন রোজা রাখছে, মাশা আল্লাহ।

আমি এখন আরও আগে জেগে উঠি, যেন দিনের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরুর আগে অন্তত কিছুটা একাকীত্বের সময় পাই।

কিছু কিছু দিন, যেমন আজ, দুই বছরের ছোট্ট শিশুটি সে আমাকে এই অর্ধ ঘণ্টা একাকীত্বের সুযোগটুকুও দিতে রাজি না। ফলে, সে জেগে ওঠে, আর সুহুরের আগেই হৈ-হুল্লোড় করতে করতে থাকে।

তারপর আমি আমার তিনজন রোজাদার ছেলেকে জাগাই। ছয় বছর বয়সী ছোট ছেলেটিও প্রায়ই জেগে উঠতে চায়, কারণ সে যদি ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে!

ফলে, রাতের শেষ অংশ, ফজরের আগে যে সময়টা এক সময় এত শান্ত ছিল, তা এখন হয়ে উঠেছে এক প্রাণবন্ত, হাসি-ঠাট্টায় ভরা মুহূর্ত—পাঁচজন বাচ্চা জেগে থাকে, খায়, খেলাধুলা করে, আর দুষ্টু হাসি দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে!

আযানের আগে শেষ কয়েক মিনিট, “আর মাত্র এক মিনিট, আর মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড!”—এই কাউন্টডাউনটা বাচ্চাদের জন্য এক বিশাল উত্তেজনাময় বিষয়!

ফজরের সালাতের সময়টাও দারুণ মজার হয়। ছোট্ট শিশুটি জোরে “আমীইইন!” বলে ওঠে, আর নিজের খেলনা পশুগুলোকে আমাদের কাতারে সাজিয়ে “স্বলাত পড়ায়”।

সুহুর এবং ফজরের এই ছোট্ট উৎসবের পর, সব বাচ্চারাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়।

দিনের সময়টা এখন একটু ধীরগতির।

এখন দিনের সময়টা কিছুটা শান্ত থাকে, কারণ বড় ছেলেরা তাদের কুরআনের হিফজ পুনরাবৃত্তি করে।
রমাদ্বন আমাদের জন্য সব ব্যস্ততা থেকে বিরতি নিয়ে কুরআনের মাস।

পুরো রমাদ্বনের মধ্যে যেন প্রতিটি ছেলে তার শিখে রাখা সব সূরা একবার করে পুনরাবৃত্তি করতে পারে, সে জন্য আমি প্রতিটি সন্তানের জন্য একটি নির্দিষ্ট হিফজ শিডিউল তৈরি করেছি।

আমি যখন তাদের এই শিডিউল বুঝিয়ে দিলাম, তখন শুধু একটা তালিকা দিইনি। বরং তাদের সাথে লম্বা এক আলোচনা করেছি—
• সময় ব্যবস্থাপনা
• লক্ষ্য নির্ধারণ
• ধাপে ধাপে পরিকল্পনা
• উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখা
• আল্লাহর তাওফীক কামনা করা

মাগরিবের সময়, ইফতার করা এক অনন্য মুহূর্ত।

আযানের ধ্বনির সাথে সাথে একসাথে রোজা ভাঙার মুহূর্তটি আনন্দে ভরা থাকে। খেজুর আর দুধ খেতে খেতে আমরা একে অপরের দিকে তৃপ্তির হাসি দেই।

বাচ্চারা গর্বিত অনুভব করে, কারণ তারা তাদের রোজা পূর্ণ করতে পেরেছে।
আমরা বাবা-মায়েরা কৃতজ্ঞতা অনুভব করি—আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে, তারা ধৈর্য শিখছে, আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখছে।

রমাদ্বনে একটা নতুন সংযোগ তৈরি হয় বাবা-মা আর সন্তানদের মাঝে।
সবাই একসাথে রোজা রাখার আনন্দে একটা বিশেষ বন্ধন তৈরি হয়।

ইফতারের মজার ব্যাপার

ইফতার কখনো কখনো খুব মজার হয়ে যায়। কারণ বাচ্চারা সারাদিন রোজা রেখে বিভিন্ন অদ্ভুত খাবারের কথা ভাবে!

আমি সাধারণত পুরো পরিবারের জন্য ইফতার তৈরি করেই রাখি, কিন্তু কখনো কখনো বাচ্চারা তাদের রুচি অনুযায়ী ছোটখাটো মজার খাবার যোগ করি—
• পিনাট বাটার আর জেলির স্যান্ডউইচ!
• আরবী রুটি আর পনির!
• টোস্টের ওপর শুধু মাখন!

তারাবীহ—যেটা একসময় আমার একান্ত ইবাদতের সময় ছিল, এখন পারিবারিক বিষয়

আগে যখন বাচ্চারা একদম ছোট ছিল, তখন তারাবীহ নামাজ আমার জন্য একান্ত, নিরিবিলি সময় ছিল।

এখন? এখন এটা একটা দলবদ্ধ ইবাদত!

কখনো কখনো বাচ্চারা মসজিদে গিয়ে তারাবীহ পড়ে।
আবার কখনো তারা আমাদের ঘরেই তারাবীহ পড়ায়!

যে সূরাগুলো তারা সারা দিন রিভিউ করেছে, সেগুলো তারাবীহতে তিলাওয়াত করে।

এই পরিবর্তনগুলো আমাকে সময়ের গতি সম্পর্কে ভাবায়

কিছুই আগের মতো থাকে না।সবকিছু বদলে যায়।

• শিশুরা বড় হয়।
• দিনের রুটিন বদলে যায়।
• পরিবারের সময়সূচি নতুনভাবে সাজে।

কিছু কিছু ব্যাপার সহজ হয়ে যায়, আবার কিছু কিছু ব্যাপার হয়তো একটু কঠিন হয়ে পড়ে।

কিন্তু আমরা যদি খেয়াল করি, তাহলে দেখতে পাবো—আল্লাহ আমাদের জন্য কত সহজ করেছেন, কত বরকত দিয়েছেন।

আমাদের সন্তানরা কেমন বেড়ে উঠছে, কীভাবে তারা বদলাচ্ছে—এগুলো উপলব্ধি করাও বাবা-মায়ের জন্য বড় এক সৌভাগ্যের বিষয়।

তবে আমাদের বাবা-মা হিসেবে মাঝে মাঝে একটু থামা দরকার, পেছনে ফিরে দেখা দরকার—আমরা কোথায় ছিলাম, আর এখন কোথায় এসেছি।

এই পরিবর্তনগুলোকে শ্রদ্ধা করা দরকার, আল্লাহ আমাদের জন্য যে সকল সুবিধা এনে দিয়েছেন, তা উপলব্ধি করা দরকার।

আমাদের সন্তানদের সত্যিকার অর্থে দেখা দরকার—

• তাদের দেহ, মন, হৃদয় কিভাবে বেড়ে উঠছে, তা খেয়াল রাখা দরকার।

• তাদের চরিত্রের বিকাশ কীভাবে হচ্ছে, তা লক্ষ্য রাখা দরকার।

আর ছোট শিশুদের মায়েরা, বিশ্বাস করুন—এটা সময়ের সঙ্গে সহজ হয়ে যায়!

যে শিশুর কান্না আর বারবার দুধ খাওয়ার চাহিদা একসময় আপনাকে সুহুরের আগে দুই রাকাত কিয়ামও পড়তে দিত না—

একদিন ইনশাআল্লাহ সে-ই আপনাকে তারাবীহ নামাজে ইমামতি করবে, সুন্দর তাজউইদে মুখস্থ সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করবে।

মা হওয়া কঠিন, কিন্তু অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর।আলহামদুলিল্লাহ।

আল্লাহ আমাদের যেন কোনো নিয়ামতকে অবহেলা না করতে দেন, আমাদের যেন সব সময় তাঁর দানকৃত বরকতের ব্যাপারে সচেতন রাখেন, এবং কৃতজ্ঞ বানিয়ে রাখেন।

আমীন।

মূল লেখাঃ Umm Khalid
অনুবাদ : নুসরাত জাহান চৌধুরী

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ মার্চ ৯, ২০২৫