মৃতপ্রসবের কারণ ও প্রতিরোধে করণীয়

লিখেছেন Samiha Nabila

স্টিলবার্থ কি?

বাবা-মায়ের বুকে সন্তানের নিথর দেহ সবসময়ই যন্ত্রণাদায়ক। সেটা হোক গর্ভাবস্থার শুরুতে, শেষে কিংবা সন্তান জন্মের পর। আমাদের মাঝে গর্ভের প্রথম ৩ মাসের সতর্কতা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। তবে, গর্ভের শেষদিকে, যখন পৃথিবীতে নতুন প্রাণটিকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেয় সবাই, যখন ভাবে বিপদের আর কোন অবকাশ হয়তো নেই, সেই সময়ে বিনা নোটিশে প্রাণটি যখন আল্লাহর মেহমান হয়ে ফিরে যায়- মেডিকেলের ভাষায় একে বলে স্টিলবার্থ। আমার পরিচিত তিনজন আত্মীয়া ৭ মাসের সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কয়েকদিন যাবৎ আমার নিউজফিডেও এইরকম ঘটনাগুলোই বেশি আসছে। এতো ক্রুশাল একটা বিষয় নিয়ে না লিখে পারছিনা।

ঈমান ও সতর্কতা

নিঃসন্দেহে হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। একজন মানুষ তার যতোটা আয়ু নিয়ে দুনিয়াতে এসেছে, সে ততদিনই বাঁচবে। কিন্তু তাই বলে বেপরোয়া ও অসাবধান চলাচল আল্লাহ পছন্দ করেন না। শুরুতেই তাই ঈমান আর ভারসাম্যের মধ্যকার সম্পর্কটা বুঝে নিতে হবে। প্রথমত, তাকদীর দুয়ার ওপর নির্ভর করে। তাই যত পারা যায় একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে দুয়া করে যেতে হবে। দুয়াগুলো এমন হতে পারে,

الهم لَا تَسْمَحْ لِحُبِّ ناقِصٍ اَنِ ادْخُلَ حياتي

অর্থ: আল্লাহ, আমার জীবদ্দশায় আমার কোন ভালোবাসা অসম্পূর্ণ রেখে দিয়েন না।

আল্লাহ, সকল সন্তানদেরকে কল্যাণের সাথে দীর্ঘ হায়াত দান করুন, কোন মায়ের আগে তার সন্তানের বিদায়ের ডাক না আসুক। এমন পরীক্ষা থেকে আল্লাহ প্রতিটা মা ও বাবাকে হেফাজত করুন।

দুয়া করার পর পালা আসে ঊটটা বেঁধে নেয়ার। অর্থাৎ, স্টিলবার্থ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করে নেয়া। (হাদীসটা নিশ্চয়ই জানেন? আগে ঊট বেঁধে তারপর তাওয়াক্কুল করতে হয়?) আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনার সতর্কতার মুখাপেক্ষী নন। তিনি "কুন" বললেই সব হয়ে যায়। কিন্তু তিনি বান্দাকে পরীক্ষা করতে বড়ই ভালোবাসেন। আপনি যদি নিজের জীবনকে সহজ করে নিতে চান, তবে আল্লাহও আপনার জন্য সহজ করে দিবেন।

স্টিলবার্থের কয়েকটা কমন কারণঃ

  • প্লাসেন্টাল ইনসাফিশিয়েন্সি: প্লাসেন্টার কাজ হলো মায়ের শরীর থেকে যাবতীয় পুষ্টি, অক্সিজেন, রক্ত শিশুর শরীরে সরবরাহ করা। মাঝেমাঝে প্লাসেন্টার কার্যকরী ক্ষমতা কমে যায়। ফলে শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন, রক্ত ও পুষ্টি সরবরাহ বাঁধাপ্রাপ্ত হয়।
  • মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানী, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস (অনিয়ন্ত্রিত) ইত্যাদি থাকলে শিশুকে সরবরাহ করার মতো পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও ব্লাড ফ্লো মায়ের শরীরেই থাকেনা।
  • মা যদি দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ ও উদ্বিগ্নতার মধ্য দিয়ে যান, তাহলে শরীরে কর্টিসল ও এড্রেনালিন হরমোন বৃদ্ধি পায়। এসব হরমোন শিশুকে প্রভাবিত করে দুভাবে। প্রথমত মায়ের শরীরের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যহত করে, ্দ্বিতীয়ত প্লাসেন্টায় ইনফেকশন তৈরী করে শিশুর নিরাপত্তা বলয় নষ্ট করে ফেলে।
  • সোজা হয়ে অনেকক্ষণ শুয়ে থাকলে। এতে শিশুর রক্তনালির ওপর চাপ পড়ে, অক্সিজেন প্রবাহ ব্যহত হয়।
  • গর্ভে নড়াচড়া করার সময় শিশুর গলায় নাড় পেঁচিয়ে যায়। কিংবা, গর্ভস্থ পানি যা আ্যামনিওটিক ফ্লুইড নামে পরিচিত, তা কমে যেতে পারে।

উপরোক্ত সবগুলো কারণই ফিটাল ডিসট্রেস তৈরী করে। ফিটাল ডিসট্রেস হলো শিশুর হার্টবিট কমে যাওয়া। ফলে, নড়াচড়া কমে যায় অনেক। মা মূলত শিশুর নড়াচড়া মনিটরিং করার মাধ্যমেই টের পান গর্ভস্থ শিশু ঠিক আছে কী নেই।

৭ মাসের আগ অবধি শিশুর নড়াচড়া কম মনে হলে মিষ্টি জিনিস খেয়ে বা দেড় ২ গ্লাস পানি খেয়ে বাম কাৎ হয়ে শুয়ে থাকলে নড়াচড়া স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পায়। কিন্তু ৭ মাসের পর শিশুর ওজন ও আকারের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। যেকারণে মায়ের হৃৎপিন্ড, লিভার ও অন্যান্য অর্গানে চাপ পড়ে। ফলে, মা সহজেই হাঁপিয়ে ওঠেন, হৃদপিন্ডের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসার ফলে সাময়িক হাঁপানি তৈরী হয়; উচ্চ রক্তচাপও দেখা দিতে পারে- যা মা ও শিশুর জন্য অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরী করে। বাহ্যিকভাবে হুট করে শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়ার কারণ নির্ধারণ করা মুশকিল। নিজের গাইনোকলজিস্টের কাছে গিয়ে চেকআপ করে নেয়া ভালো, অক্সিজেন দিয়ে, নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে তিনি প্রয়োজনীয় স্টেপ নিবেন।

গাইনোকলজিস্ট আপনাকে হেল্প করবে প্রবলেম তৈরী হওয়ার পর। কিন্তু ২৮-৩৩ সপ্তাহের সময় আপনি নিজের দৈনন্দিন রুটিনে কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন, যা আপনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত এই সিচুয়েশনগুলো থেকে রক্ষা করতে পারবে ইন শা আল্লাহ।

প্রতিরোধের উপায়: ইয়োগা ও মাইন্ডফুল স্ট্রেচিং

২০১৫ সালে ভারতে একটি জার্নাল প্রকাশিত হয়, যেখানে দেখা যায় Yoga বা Mindful stretching প্লাসেন্টায় রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ এমনকি মায়ের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্দিষ্ট কিছু আসন পেলভিক এরিয়া বা জরায়ুর আশেপাশে রক্ত প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করে, যা প্লাসেন্টার মাধ্যমে শিশুর কাছে অক্সিজেন পৌঁছাতে সহায়ক হয়।দেখা গেছে যে, নিয়মিত নিয়ন্ত্রিত ইয়োগা ও মাইন্ডফুল স্ট্রেচিং এর ফলে নাড়ি এবং শিশুর মস্তিষ্কের ধমনীতে রক্ত প্রবাহের বাধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ব্রিদিং এক্সারসাইজ মায়ের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ায়, যা সরাসরি শিশুর হার্টবিট স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।এটি জরায়ুর পেশিগুলোকে অতিরিক্ত টানটান হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং স্ট্রেস হরমোন (Cortisol) কমায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা সাধারণ হাঁটাচলা করেছে, তাদের তুলনায় যেসব মায়েরা নিয়মিত ইয়োগা করেছে, তারা অপেক্ষাকৃত বেশি স্বাস্থ্যবান ও সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পেরেছেন।

কীভাবে ইয়োগা করবেন? কোন কোন স্ট্রেচিং ফলো করবেন? এই গাইডলাইন কোথা থেকে নিবেন? আপাতত আমি ফ্লো এ্যপের সন্ধান দিতে পারি। এপের সকল কার্যক্রম ইংরেজিতে। সাহিত্যিক ইংরেজি না হওয়াতে আশা করি স্মার্ট ফোন ইউজ করতে পারা সকলেই এর থেকে উইকলি স্ট্রেচিং গাইড ফলো করতে পারবেন।

অবশ্যই, ইউটিউব বা ফেসবুক রিলস থেকে নিজে নিজে কোনরকম ইয়োগা অনুসরণ করতে যাবেন না। ইয়োগা আপনার শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করবে, কিন্তু রক্ত তৈরী করতে হবে খাবারের মাধ্যমে। রক্তে আয়রনের অভাব থাকলে অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমে যায়। তাই কচু শাক, কলিজা, ডালিম বা ডাক্তারের দেওয়া আয়রন সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত গ্রহণ করুন।

তথ্যসূত্র:

https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC4320907/?hl=en-GB

https://www.researchgate.net/publication/272512128_Effects_of_Yoga_on_Utero-Fetal-Placental_Circulation_in_High-Risk_Pregnancy_A_Randomized_Controlled_Trial?hl=en-GB

https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/25130-placental-insufficiency?hl=en-GB

https://www.rcog.org.uk/for-the-public/browse-our-patient-information/your-babys-movements-in-pregnancy/?hl=en-GB

ফ্লো এপ:-

https://play.google.com/store/apps/details?id=org.iggymedia.periodtracker

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ এপ্রিল ৩, ২০২৬