গর্ভধারণের পনেরতম সপ্তাহে আপনাকে দেখে গর্ভবতী বলে কিছুটা আঁচ করা গেলেও আপনি এখনও স্বাচ্ছন্দ্যেই নড়াচড়া করতে পারবেন এবং বেশ কর্মোদ্দম অনুভব করবেন। প্রথম ট্রাইমেস্টারেও আপনার জরায়ু পেলভিসে বা শ্রোণীচক্রের ভেতর বেশ ভালোই এঁটে যেত। কিন্তু এখন যখন আপনার বাবু বড় হচ্ছে তখন তাকে জায়গা করে দিতে জরায়ুও বড় হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে তা পেলভিসের সীমা থেকে বেরিয়ে এসে আপনার পেটের উপরের দিকে চলে আসছে। যদিও একেক মায়ের শারীরিক অবস্থা একেকরকম তাই সবাইকেই হয়ত এই সপ্তাহে একইরকম দেখতে লাগবে না। তবে এটা যদি আপনার প্রথম গর্ভাবস্থা হয় তাহলে হয়ত আপনাকে দেখে বোঝা যেতে কিছুটা সময় লাগতে পারে আর দ্বিতীয় গর্ভাবস্থায় যেহেতু আগেই জরায়ু প্রসারিত হয়েছিল তাই হয়ত কিছুটা আগে থেকেই আপনাকে দেখে গর্ভবতী বলে বোঝা যাবে। যদি আপনার যময সন্তান হয় তাহলে সম্ভবত সবকিছু আরও দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে তাই আপনাকে হয়ত এখন থেকেই দেখে বোঝা যাচ্ছে।

আপনার শারীরিক পরিবর্তন

ওজন বৃদ্ধি

এই সপ্তাহে আপনার এক থেকে দুই পাউন্ড বাড়ার কথা তাই বাড়তি ৩০০ ক্যালোরি খেতে চেষ্টা করুন তবে খেয়াল রাখুন তা যেন স্বাস্থ্যকর হয়। যদি হঠাতই বেশি ওজন বৃদ্ধি হতে দেখেন তাহলে আপনার ডাক্তারকে জানান সাথে সাথে কারণ এটা গর্ভকালীন মারাত্মক সমস্যা প্রিএক্লাম্পশিয়ার লক্ষণ হতে পারে। 

পেট ও চামড়ার যত্ন

পেটের আশপাশে যে টান ও হালকা ব্যথাগুলো লাগছে যার কথা আমরা আগের সপ্তাহে বলেছি তা থেকে আরাম পেতে পা উপরে তুলে বিশ্রাম নিতে পারেন। গর্ভাবস্থায় বেশিরভাগ হবু মায়েদের চামড়ার উপর একটা কালচে আবরণ পড়ে যা প্রসবের কয়েক মাস পর চলে যায়। রোদে বেশি সময় কাটানো এড়িয়ে চলতে পারেন বা রোদে গেলে চেহারা উন্মুক্ত না রাখতে চেষ্টা করতে পারেন। হরমোনজনিত কারণে আপনার চামড়ায় চুলকানি অনুভব করতে পারেন। এজন্য পেটের চামড়াকে আদ্র রাখতে চেষ্টা করুন। 

সাদা স্রাব

অনেক মায়েরা এই সময় প্রচুর সাদা স্রাব লক্ষ্য করেন। আপনার পেলভিক অঞ্চলে এই সময় রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যাবে আর তাই আপনার শরীর লিউকোরিয়া নামক সাদা তরল বেশি উৎপাদন করবে যা আপনার যোনিপথকে পরিষ্কার ও সংক্রমণমুক্ত রাখবে। তবে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন যদি: 

  • এর রঙ পরিবর্তন হয়, এটা পরিষ্কার সাদা বা ক্রীম জাতীয় হয়
  • এটা থেকে দুর্গন্ধ আসে
  • এটা দেখতে অন্যরকম হয় যেমন ফেনিল বা দলা পাকানো
  • প্রস্রাব করার সময় ব্যথা হয়
  • চুলকায় বা যন্ত্রণা হয় 

উপরের যে কোনটা ভ্যাজাইনাল ইনফেকশনের কারণ হতে পারে তবে এই সমস্যা সহজেই সারানো যায় তাই ডাক্তার দেখিয়ে নিন। 

মাড়ী ফোলা ও মাড়ী থেকে রক্ত পরা

আপনি হয়ত আপনার রক্তিম ও ফোলা মাড়ী লক্ষ্য করেছেন। ব্রাশ করার সময় হয়ত ব্যথা লাগে, মাড়ী সংবেদনশীল হয়ে থাকে এবং রক্ত বের হয়। এমনটা গর্ভকালীন হরমোনের কারণে হয় যা এসময় মাড়ীর ইনফেকশন জিনজিভাইটিসকে দাঁতের ব্যাকটেরিয়ার সাথে ভিন্নভাবে ক্রিয়া করায়। এতে চিন্তার কিছু নেই, প্রসবের পর এসব আস্তে আস্তে চলে যাবে। কিন্তু যা আপনার জানা প্রয়োজন তা হচ্ছে, এই জিনজিভাইটিস বেড়ে গিয়ে আপনার দাঁতকে ধরে রাখা হাড় ও টিস্যুর ইনফেকশন ঘটাতে পারে যাকে বলে পেরিওডনটাইটিস এবং গবেষণায় পেরিওডনটাইটিসের সাথে সময়ের আগে প্রসবব্যথা ওঠা এবং প্রিএক্লাম্পশিয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই এসময় নিয়মিত মুখের যত্ন নিতে হবে আপনাকে। দৈনিক দুইবার দাঁত ব্রাশ করা ও অন্তত একবার ফ্লস করার মাধ্যমে এই সমস্যাকে আপনি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারবেন। 

বুকজ্বলা, গ্যাস হওয়া ও বদহজম

এখন যেহেতু আপনার আগের চেয়ে বেশি ক্ষুধা লাগবে আপনি লক্ষ্য করবেন যে একবারে বেশি খেলে বুকজ্বলা ও বদহজম হচ্ছে। এটা এড়াতে তিন বেলা ভরপেট না খেয়ে কয়েকবারে অল্প অল্প করে খান। এছাড়া হরমোনজনিত কারণেও পেটের সমস্যা হয়। কোন খাবারে আপনার সমস্যা হচ্ছে খেয়াল করে সেটা এড়িয়ে চলুন। আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলে জেনে নিন কী ধরণের ওষুধ খাওয়া এসময় নিরাপদ। গ্যাসের সমস্যায় এন্টাসিড একটা ভালো প্রতিষেধক।   

নাক থেকে রক্ত পরা

আপনার শরীরে এসময় রক্তের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে এবং সংবেদনশীল নাসা পথের কারণে এমনটা হয়। এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই।  

বাচ্চার বৃদ্ধি

আপনাকে কেন এখন গর্ভবতী বলে বোঝা যাচ্ছে জানেন? কারণ আপনার বাচ্চা এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে আরও বড় থেকে বড় হচ্ছে। তার ওজন এখন প্রায় ২.৪৭ আউন্স এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৯৮ ইঞ্চি। এর মানে হচ্ছে আপনার বাবুটা এখন একটা আপেলের সমান। আপনার বাবু এখন তার শরীরের সব মাংশপেশীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং নড়তেও পারে। সে এখন ডিগবাজি খেতেও পারে, তবে এটা যদি আপনার প্রথম গর্ভাবস্থা হয় তাহলে বাবুর নড়াচড়া টের পেতে আপনার আরও কয়েক সপ্তাহ লাগবে। 

ল্যানিউগো নামে পশমের মতো পাতলা চুল আপনার বাবুর পিঠ, কাঁধ, কান, কপালকে ঢেকে রেখেছে এখন। এটা তাকে শরীরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। যখন তার শরীরে যথেষ্ট চর্বি জমা হবে তখন এই পশমগুলো ঝরে যাবে এবং জন্মের আগেই তা অনেকখানি হারিয়ে যাবে। 

এই সপ্তাহ থেকে সে নানারকম মুখভঙ্গি করতে পারবে – ভ্রু কুঁচকানো, আড়চোখে তাকানো, ভেংচি কাটা ইত্যাদি। চিন্তা করবেন না, এগুলো সবই তার মুখের পেশীকে নমনীয় করার কায়দা।

এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে আপনার বাবু ধীরে ধীরে একজন স্বাভাবিক মানুষের আকৃতিতে আসতে থাকবে।এতদিন কানগুলো ঘাড়ের দিকে আর চোখ দুটো মাথার পাশে ছিল, এখন সেগুলো অনেকটাই জায়গা মতো আসবে। 

আপনার বাবুর চোখ এখন আলোর প্রতি সংবেদনশীল হবে। যদিও তার চোখ বন্ধ থাকে কিন্তু পেটের বাইরে তীব্র আলো সে বুঝতে পারবে। 

মোটামুটি এই সময় থেকে আপনার বাচ্চা শুনতে শুরু করবে। সে আপনার হৃদস্পন্দন ও পরিপাকতন্ত্রের করা কোন শব্দ শুনতে পারবে।  আপনি এখন থেকেই তার সাথে কথা বলতে পারেন, সম্ভবত সে শুনবে। তাকে কোন আদরের নামে ডাকতে পারেন, সুন্দর গল্প শোনাতে পারেন। তার মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর এমন শব্দ এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করুন। টিভি ও মিউজিক থেকে দূরে থাকুন, বাচ্চাকে শুনিয়ে জোরে কুরআন তিলাওয়াত করুন, দৈনন্দিন যিকিরগুলো সামান্য জোরেপড়তে পারেন। আত্মিক সহায়তার জন্য আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগে এই নিয়ে আরও লেখা পাবেন।  

আপনার জন্য টিপস

আপনার ডাক্তারের সাথে প্রিএক্লাম্পশিয়া নিয়ে কথা বলুন। এটা সাধারণত বিশ সপ্তাহের পর দেখা দেয় এবং এর লক্ষণ হচ্ছে হঠাত উচ্চ রক্তচাপ, পা, হাত ও মুখ অনেক ফুলে যাওয়া। তবে সবার এটা হয় না এবং আপনার হবে এমন কোন কথা নেই। তাই ডাক্তারের সাথে কথা বলে জেনে নিন আপনি এর ঝুঁকিতে আছেন কিনা।

এই সপ্তাহে আপনি কর্মোদ্দম অনুভব করবেন, মানে হচ্ছে আপনার লিবিডোও বেশি থাকবে। তাই সহবাসে আগ্রহ বাড়বে। যদি না আপনার ডাক্তার নড়াচড়ার ওপর কোন বিধিনিষেধ দিয়ে থাকেন, সহবাসে বাচ্চা বা আপনার গর্ভাবস্থার কোন ঝুঁকি নেই। আরও জানতে দেখুন গর্ভাবস্থায় সহবাস নিয়ে আপনার যা জানা প্রয়োজন আর্টিকেল। 

সমবয়সীদের সাথে দেখা করুন, গল্পগুজব করুন, ব্যস্ত জীবনে তা যতই কঠিন মনে হোক না কেন। সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য আপনার মানসিক স্বাস্থ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত সোশ্যাল মিডিয়াতে সমসাময়িক হবু মায়েদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগাগুলো নিয়ে কথা বলে, মজার কোন রেসিপি শেয়ার করে কিছুক্ষণ ভালো সময় কাটান।

আমাদের প্রকাশিত প্রসব অভিজ্ঞতাগুলো সময় বের করে পড়ে  নিন। 

তথ্যসূত্রঃ

১। What to expect.
২। Start 4 life
৩। the BUMP
৪। Parents

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ সাবরিনা আফরোজ
MBBS, MPH
লেকচারার, ঢাকা কমিউনিটি মেডিসিন কলেজ

ছবি: BabyCenter Canada