জন্মের পর থেকে এক এক সময় দেখবেন আপনার বাচ্চা এক এক রকম অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কোন কোন সপ্তাহে সব ভালো। কান্নাকাটি কম করে, দিব্যি লক্ষী বাচ্চা- খাওয়ানো, ঘুম নিয়ে কোন ঝামেলা নেই। আবার আরেক সপ্তাহে দেখলেন সব রুটিন এলোমেলো। কারন ছাড়াই কাঁদছে, ঘুমাচ্ছে না ঠিকমতো, একটু পরপর খেতে চাইছে, রাতে বারবার উঠছে অথবা রাতে উঠা বাচ্চাটা সারারাত ঘুমাচ্ছে, যা আপনার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকছে।

বাবা-মা ভীষন চিন্তিত হয়ে পড়েন বাচ্চার কি হলো এই ভেবে। হতে পারে আপনার বাচ্চা দ্রুতবর্ধন (Growth Spurt) স্টেজের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

“গ্রোথ স্পার্ট” নাম থেকেই বোঝা যায়- এই সময় বাচ্চার বৃদ্ধি অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় বেশী হয়। ওজন বেড়ে যায় হঠাত করে, লম্বা হয়, মাথার পরিসীমা বাড়ে। শারীরিক, মানসিক দক্ষতা প্রকাশ পায়, যেমন- হঠাৎ হাসতে শিখলো, উল্টানো শিখলো। এগুলা সাধারনত গ্রোথ স্পার্টের সময়ের কাছাকাছি সময় হয়। এই বাড়তি বৃদ্ধির কারনে যে শক্তি তৈরী হয়, সেটা বহিঃপ্রকাশ (Channel) করতে গিয়ে, বাচ্চার স্বাভাবিকের বাইরের কিছু আচরণ বাবা-মায়ের জন্য চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়।

কিভাবে বুঝবো বাচ্চার গ্রোথ স্পার্ট হচ্ছে?

  • বাচ্চা বেশী বেশী খেতে চাইবে। একটু পর পর খেতে চাইবে, লম্বা সময় ধরে খাবে এবং খাওয়ার পরও মনে হবে হয়ত পেট ভরে নি। মায়ের মনে হতে পারে, সারাদিন-রাত খাওয়াচ্ছেন বাচ্চাকে।
  • বাচ্চা সারাদিন বিরক্ত করতে পারে। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় কিংবা ফরমুলা খাওয়া বাচ্চারা মুখে ফিডার নিয়েও অস্থির থাকতে পারে।
  • বাচ্চা কারন ছাড়াই কাঁদতে পারে। সুস্থ থাকার পরও, খাওয়ানো-ডায়াপার বদল-কোলে রাখা সব কিছুর পরও বাচ্চা কাঁদতে পারে। কোলে থাকতে চাইতে পারে বেশী বেশী। কোল থেকে রেখে দিলে হয়ত দেখা যাবে কাঁদছে।
  • এই সময় কিছু বাচ্চা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী ঘুমায়, সারাদিনই হয়ত পড়ে পড়ে ঘুমাতে চাইবে। আবার কেউ অনেক বেশী কম ঘুমায়। রাতে বারবার উঠতে থাকে, আর কান্না তো আছেই।

কোন সময়গুলোতে সাধারনত গ্রোথ স্পার্ট হয়?

বাচ্চার গ্রোথ স্পার্ট যে কোন সময়ে হতে পারে। তবে সাধারনত এক বছর বয়সের মধ্যে যে যে সময়গুলো গ্রোথ স্পার্ট হয়–

  • দুই সপ্তাহ
  • তিন সপ্তাহ
  • ছয় সপ্তাহ
  • তিন মাস
  • ছয় মাস
  • এক বছরের কাছাকাছি সময়

সব সময় যে ঠিক এই সময়গুলোতেই বাচ্চা বাড়ন্ত হবে, তেমন না।যেহেতু প্রত্যেকটা বাচ্চার স্বকীয়তা আছে, তাই এটা পরে করেও হতে পারে। তবে সময়গুলো খেয়াল রাখুন। আবার এক বছর পরই গ্রোথ স্পার্ট বন্ধ হয়ে যাবে, এমন চিন্তা করা যাবে না। অনেক মায়েরাই এক বছরের পর থেকে কিছুদিন পরপর, এমনকি বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত, বাচ্চার গ্রোথ স্পার্ট বুঝতে পারেন।

বাবা-মা কি করবেন?

  • মনে রাখবেন, গ্রোথ স্পার্ট মানেই বাচ্চার বাড়ন্ত সময়। এই সময়ে তাই অধৈর্য না হয়ে বাচ্চার প্রতি যত্নবান হন। এই সময়টায় বাবা-মায়ের অন্য সময়ের তুলনায় কষ্ট হয় বেশী। কিন্তু মনে রাখবেন, খারাপ সময় বেশীদিন থাকে না।
  • বাচ্চাকে আদর করুন, কোলে নিয়ে আরাম দেয়ার চেষ্টা করুন। বোঝানোর চেষ্টা করুন যে তার দরকারে আপনি পাশে আছেন। বাচ্চা হয়ত প্রকাশ করতে পারবে না, কিন্তু আপনার অতিরিক্ত মনোযোগে খুশি থাকবে।
  • বাচ্চা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী খেতে যায় বলে, শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন সহজে। পানি জাতীয় খাবার বেশী করে খান। নিজের খাবারের প্রতি যত্নবান হোন।
  • শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো মা ভাবতে থাকেন বাচ্চা বোধহয় যথেষ্ট পরিমান বুকের দুধ পাচ্ছে না। তাই ফরমুলা দেয়া শুরু করে দেন। বাচ্চা বারবার বুকের দুধ খেতে চাইলে খেতে দিন। আর এই সময়টা পার হওয়ার সুযোগ দিন। বাচ্চা আবার স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসবে।
  • যেসব বাচ্চারা বাইরের দুধ খায়, তাদেরকে এই সময় এক বোতল অতিরিক্ত দুধ দিতে পারেন। কিন্তু সেটা শুধু এই নির্দিষ্ট দুই-একদিনের জন্য। এরপর বাচ্চার রুটিন ঠিক হয়ে গেলে, এই অতিরিক্ত দুধ খাওয়ানোর জন্য চাপাচাপি করবেন না। একই ভাবে অতিরিক্ত ফরমুলাও মেশাতে যাবেন না, বাচ্চার পেট খারাপ করতে পারে।
  • সারারাত ঘুমানো বাচ্চাগুলোও এই সময় রাতে বারবার ঘুম ভেঙ্গে ওঠতে পারে। এমনকি দিনের ঘুমেও সমস্যা হতে পারে। ক্ষিধা পেয়েছে বলে বারবার উঠছে, এরকম চিন্তা করার কারন নেই। সময় আগেই শক্ত (Solid) খাবার শুরু করতে যাবেন না, কারণ শক্ত খাবার দেয়ার জন্য নির্ধারিত সময় যেমন আছে তেমনটি আপনার বাচ্চা এরজন্য প্রস্তুত হতে হবে। গ্রোথ স্পার্টের সম্ভাব্য সময়গুলো খেয়াল করুন। কিছুদিন অপেক্ষা করুন।
  • এই সময়গুলোতে বারবার বুকের দুধ খেতে চাইলে বিরক্ত হবেন না। বরং বারবার বাচ্চাকে খেতে দিন, কারণ অতিরিক্ত খাবারের যোগান প্রাকৃতিকভাবেই তৈরী হবে।
  • যদি বেশী টেনশন লাগে, বাচ্চার ওজনের দিকে খেয়ালের রাখুন। ওজন কি আগের চাইতে কয়েকগ্রাম বেড়েছে অথবা যে কাপড়গুলো বাচ্চাকে পড়াচ্ছেন, সেগুলো কি সাইজে একটু ছোট বা আটসাঁট মনে হচ্ছে? উত্তর ইতিবাচক হলে সম্ভবত আপনার  তাহলে বাচ্চার সবকিছু ঠিক আছে।
  • প্রতিদিনের ডায়াপারের হিসাব রাখুন। প্রতিদিন যদি গড়ে পাঁচ/ছয়টা ভেজা ডায়াপার বদলাতে হয়, তাহলে নিশ্চিন্ত থাকুন। এই সময়টা কাটিয়ে উঠতে দিন।
  • নিজের যত্ন নিন। সারাক্ষন বাচ্চার যত্ন নিতে যেয়ে, নিজের কথা ভুলে গেলে চলবে না। বাচ্চার দেখাশোনায় বাচ্চার বাবার সাহায্য নিন। ঘরের কাজে পরিবারের অন্য সদস্যদের, নইলে সম্ভব হলে প্রতিবেশী বা বন্ধুদের সহযোগীতা নিন।

কখন চিন্তিত হবেন?

বাচ্চা যদি গ্রোথ স্পার্ট হওয়ার সময়গুলো খুব অস্থির থাকে, বা কান্নাকাটি করে, তাহলে ধৈর্য্য ধরুন। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে গ্রোথ স্পার্ট দুই/তিন দিন পর স্বাভাবিক হয়ে যায়। বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সপ্তাহ খানেক সময়ও লাগতে পারে। তবে এই সময় অন্য কোন শারীরিক সমস্যা যেমন জ্বর হওয়া, ঘনঘন বমি করা বা মাত্রাতিরিক্ত বিরক্ত করা, এগুলো স্বাভাবিক না। কারণ এগুলো অন্য কোন অসুস্থতার ইঙ্গিত বহন করে। বেশী খেলে বাচ্চা বমি করতে পারে। কিন্তু ১২ ঘন্টার ভেতর ঘনঘন বা লম্বা সময় বমি করা ভিন্নরকম অর্থবহন করতে পারে। জ্বর বা বমির মতো অসুস্থতার লক্ষন দেখা দিলে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হন।

শুধুমাত্র গ্রোথ স্পার্টের কারনে যে বাচ্চারা অস্থির হয় যায়, তা কিন্তু না। অনেক বাচ্চা দাঁত উঠবার সময়ও বিরক্ত করে। কখনো কখনো বাচ্চার প্রতিদিনের রুটিনে ছন্দপতন ঘটলেও বিরক্ত করতে পারে। আপনার বাচ্চার ভালো-মন্দ আপনিই সবার আগে বুঝবেন। মায়েদের মাতৃসুলভ প্রবৃত্তি (Motherly Instinct) থেকে মায়েরা অনেকক্ষেত্রেই বাচ্চার ভালো-মন্দ আঁচ করতে পারে। বাচ্চা ক্রমাগত বিরক্ত বা কান্না করলে কারন বোঝার চেষ্টা করুন। তবে যদি বেশী সময় ধরে খাওয়া-ঘুম নিয়ে সমস্যা করে বা লম্বা সময় আচরনগত পরিবর্তন চোখে পড়ে, ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিন।