গর্ভাবস্থায় একজন নারী যেসব জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন তাদের মধ্যে অন্যতম হল প্রিএক্লামশিয়া (Preeclampsia)। পূর্বে একে প্রেগন্যান্সি টক্সিমিয়া (Toxemia) বলা হত। যদি এ সময় আপনার রক্তচাপ বেশি বেড়ে যায় আর প্রশ্রাবের সাথে প্রোটিন নিঃসরণ শুরু হয়, তাহলে বুঝতে হবে আপনি প্রিএক্লামশিয়াতে ভুগছেন। কারো কারো ক্ষেত্রে রক্তে প্লেটলেট সংখ্যা কমে যাওয়া, লিভার বা কিডনির সমস্যা ইত্যাদিও দেখা দিতে পারে। 

সাধারণত গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পর থেকে এই সমস্যা দেখা যায়। এর আগে, কিংবা ডেলিভারির পরেও এটি হতে পারে। প্রিএক্লামশিয়া খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করে খিঁচুনি হলে তাকে এক্লামশিয়া বলে। 

কেন ক্ষতিকর

উচ্চ রক্তচাপ যেকোন সময়ের থেকে প্রেগন্যান্সি কালীন সময়ে একটু বেশিই ক্ষতিকর। কারণ তা প্লাসেন্টার মাধ্যমে গর্ভের শিশুর নিকট অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছনোর কাজে বাধা প্রদান করে। ফলে শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় কম ওজন হতে পারে, বাচ্চার গ্রোথ সময় অনুযায়ী ঠিক না হতে পারে ও আরো অনেক সমস্যা নিয়ে সময়ের আগেই জন্মগ্রহণ করে।

রক্তচাপ যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে একসময় কিডনীর ও লিভারের সমস্যা শুরু হয়ে যাবে। লোহিত রক্ত কণিকা ধ্বংসের কারণে এনিমিয়া (রক্তস্বল্পতা) হবে, প্লেটলেট কমে যাবে। ফলে ডেলিভারির সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুও হতে পারে। তাছাড়া উচ্চ চাপের কারণে প্লাসেন্টা ফেটে শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।

কারণ

কোন একটি কারণকে নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তবে কিছু সুপ্ত কারণ রয়েছে যা প্রিএক্লামশিয়ার জন্য দায়ী, যেমন :

  • জীনগত
  • রক্তনালীর ক্ষত বা সমস্যা, ফলে ইউটেরাস (জরায়ু)-তে কম রক্ত প্রবাহ হয়
  • ইমিউন সিস্টেমের সমস্যা (অটোইমিউন ডিসঅর্ডার)

এছাড়া আরো কিছু ঝুঁকির কারণ রয়েছে, যেমন :

  • স্থূলতা
  • গর্ভধারণের বয়স অনেক কম (<১৫ বছর) বা বেশি (>৩৫ বছর)
  • গর্ভে যমজ সন্তান বা ততোধিক
  • ডায়বেটিস
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • অনেক বার গর্ভধারণ
  • কিডনি বা লিভারের সমস্যা

প্রিএক্লামশিয়া ঠিক ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে এটি কিছুটা রোধ করতে প্রথম ট্রাইমেস্টারে অনেক সময় বেবি এস্পিরিন সেবন করতে বলা হয়। শুরু থেকেই নিয়মিত চেকআপ করালে এটি গোড়াতেই ধরা পরে, ফলে জটিলতা এড়ানো যায়। 

লক্ষণসমূহ

প্রিএক্লামশিয়ার লক্ষণ গুলো মাথায় রাখা খুব জরুরি:

  • উচ্চ রক্তচাপ (১৪০/৯০ এর বেশি)
  • উপরের পেটে ব্যথা
  • হাত পা ফুলে যাওয়া
  • দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, আলোক সংবেদনশীলতা, চোখে ঝাপসা দেখা
  • লাগাতার মাথা ব্যথা 
  • হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি
  • বমি ভাব, ক্ষুধা মন্দা ইত্যাদি 

এছাড়াও রক্ত ও মূত্র পরীক্ষায় অতিরিক্ত প্রোটিন ক্ষরণ (মূত্রে), অস্বাভাবিক মাত্রার লিভার এনজাইম ও প্লেটলেট পাওয়া যাবে। এমনটা হলে ডাক্তার আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভের শিশুর হার্ট রেট চেক করবেন,ওজন ও গ্রোথ দেখবেন এবং এমনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ দেখবেন। সেই সাথে ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড এর মাধ্যমে আম্বিলিক্যাল শিরা ধমনীতে রক্ত প্রবাহ ঠিক  আছে কিনা পরীক্ষা করবেন। 

চিকিৎসা

প্রিএক্লামশিয়ার মূল চিকিৎসা হল শিশুর ডেলিভারির জন্য চেষ্টা করা। এভাবে জটিলতা আরো প্রকট হওয়া ঠেকানো সম্ভব। তবে অন্যান্য পন্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে। আগে কিছু বিষয় লক্ষ করতে হবে যাতে বোঝা যায় অবস্থা কতটা গুরুতর-

  • শিশুর হার্ট রেট বেশি (ফিটাল ডিসট্রেস)
  • পেটে ব্যাথা
  • খিঁচুনি
  • কিডনি ও লিভার প্রায় বিকল
  • ফুসফুসে তরল জমা (শ্বাসকষ্ট হবে) 

এগুলো ছাড়াও যেকোন অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলেই অবিলম্বে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।

ক. ডেলিভারি

  • যদি আপনি প্রেগন্যান্সির ৩৭ সপ্তাহের অধিক সময় পার করে থাকেন তাহলে অবিলম্বে ডেলিভারি করে ফেলাই উত্তম। শিশুর ওজন খুব কম হওয়ার আর সুযোগ নেই। 
  • কিন্তু ৩৭ সপ্তাহ পার না করলে ডাক্তার আপনার আর আপনার সন্তানের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিবেন। 
  • যদি ৩৪ সপ্তাহের বেশি হয়, বাচ্চার ওজন ও গ্রোথ ঠিক,  প্রেশার কন্ট্রোল করা যাচ্ছে তাহলে ৩৭ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রেগন্যান্সি কন্টিনিউ করার চেষ্টা করা হবে৷ 
  • যদি ৩৪ সপ্তাহের কম হয় এবং প্রেশার কন্ট্রোল করা না যায় তাহলে অন্তত ৩৪ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রেগন্যান্সি কন্টিনিউ করার চেষ্টা করা হয় (বাচ্চার ফুসফুস পরিণত হয় ৩৪ সপ্তাহে)             
  •  এছাড়াও লেবার পেইন উঠলো কিনা, প্রেশার একদম ই কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না কিনা,  বাচ্চার গ্রোথ রেস্ট্রিকটেড কিনা (IUGR)  ইত্যাদি বিবেচ্য বিষয়। 

খ. অন্যান্য চিকিৎসা

  • কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আপনাকে শুধু প্রেশারের ওষুধ খেতে দেওয়া হবে। সেই সাথে খিঁচুনি এড়াতেও ওষুধ খাওয়া লাগতে পারে, যা কিনা প্রিএক্লামশিয়ার ফলে ঘটা অন্যতম একটি জটিলতা।
  • বাড়তি সতর্কতার জন্য ডাক্তার আপনাকে হসপিটালে এডমিট হতে বলতে পারেন। সরাসরি রক্তশিরার মাধ্যমে ও মাংসে ইঞ্জেকশন করে ওষুধ দেয়া লাগতে পারে যাতে এর ফলে আপনার শিশুর ফুসফুস দ্রুত সচল করা যায় এবং খিচুনি প্রতিরোধ করে সেইফ ডেলিভারি করে মায়ের জীবন বাচানো যায়।      

গবেষকদের মতে ডেলিভারির পর ৪৮ ঘন্টার মাঝেই রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে আসে।এছাড়া অন্য লক্ষনসহ কিডনি ও লিভারের সমস্যা গুলোও দূর হয়ে যায়। 

কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে  প্রেশার বাড়তি রয়ে যেতে পারে এবং ওষুধ না খেলে পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। কারো কারো আবার ডেলিভারির পরই প্রিএক্লামশিয়ার লক্ষণ সব শুরু হয়ে যায়। এজন্য ডেলিভারির পরও ডাক্তারের চেকআপ প্রয়োজন নিয়মিত। 

প্রতিরোধ

সতর্কতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনই প্রিএক্লামশিয়া প্রতিরোধের মূল উপায়। নিজের জন্য, সন্তানের জন্য হলেও ভালো খাওয়া জরুরি। ভালো বলতে দামি বা ক্যালোরিপূর্ন খাবার না, বরং পুষ্টিকর খাবার বোঝানো হয়েছে। 

প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডে ডায়েট কিরকম হবে তা নিয়ে বিস্তারিত লেখা রয়েছে, দেখে নিতে পারেন । যারা স্থূল, তাদের যেহেতু প্রিএক্লামশিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাই তাদের জন্য ডায়েট আরো গুরুত্বপূর্ণ। 

ডায়েটের পাশাপাশি নিয়মিত ভিটামিন, ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট গুলো খেলে, হাঁটাহাঁটি করলে এবং ডাক্তারি চেকআপের মধ্যে থাকলে প্রিএক্লামশিয়া নিয়ে আর দুশ্চিন্তার কিছু নেই, ইন শা আল্লাহ। 

ছবিঃ March of Dimes

তথ্যসুত্রঃ Healthline

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ নুসরাত জাহান প্রমা
এমবিবিএস
জেনারেল প্র্যাকটিশনার