প্রেগন্যান্সির সময়ে গর্ভের সন্তানের সঠিক পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য একটু বাড়তি খেতে হয়। তাতে ওজনও বাড়ে বেশ। কিন্তু যদি আপনি যদি শুরুতেই ওভারওয়েট বা স্থূল হয়ে থাকেন তাহলে কি করবেন? বলাই বাহুল্য, এ বাড়তি ওজন আপনার ও আপনার অনাগত সন্তানের জন্য বিপজ্জনক। তাহলে কি শরীরের এই অতিরিক্ত ওজন ঝরালেই বিপদমুক্ত হবেন? আদৌ কি ঝরানো সম্ভব? সম্ভব হলেও তা কি করে? এসব নিয়েই আজকের আলোচনা।

কি করে বুঝবেন আপনি ওভারওয়েট কিনা?

সবার আগে বুঝতে হবে আপনি ওভারওয়েট কিনা। অনেক রকম উপায়ই আছে, তবে সাধারণত এক্ষেত্রে Body Mass Index (BMI) বের করা হয়। সে জন্য আপনার উচ্চতা আর বর্তমান ওজন জানা থাকতে হবে। আমাদের বিএমআই ক্যালকুলেটর দিয়ে খুব সহজেই BMI বের করে নিতে পারেন।

জানিয়ে রাখি, ২৫ এর থেকে BMI যত বেশি, প্রেগনেন্সির সময়ে রিস্কও তত বেশি। 

ওভারওয়েট হলে কি কি জটিলতা হতে পারে?

এমন না যে স্বাভাবিক ওজনের কারো কোন জটিলতা হয় না, তবে ওভারওয়েট হলে নিচের জটিলতা গুলো হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

মায়ের ক্ষেত্রে-

  • প্রিএকলাম্পশিয়া: এটি প্রেগনেন্সির মাঝামাঝি থেকে শুরু হতে পারে। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, উপরের পেটে ব্যথা, রক্ত থেকে প্রচুর প্রোটিন চলে যাওয়া ও হাত-পায়ে পানি আসার মত সমস্যা হতে পারে। ডেলিভারির সময় ও পরেও  এই উচ্চ রক্তচাপ থেকে যেতে পারে এবং শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
  • থ্রম্বোসিস (রক্ত-জমাট): পেটের কাছে অতিরিক্ত চর্বি থাকলে তা রক্তের স্বাভাবিক সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত করে। আবার অতিরিক্ত ওজনের ফলে শরীরে প্রদাহ ও সুগার বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে শিরা-উপশিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি খুব বেড়ে যায়। পরবর্তী জীবনে হৃদরোগের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।
  • গর্ভকালীন ডায়াবেটিস: শরীরে উৎপাদিত ইনসুলিন যখন গর্ভের শিশু ও মায়ের বাড়তি ওজনের ভার আর নিতে পারে না, তখনই কোষে ঢুকতে না পারার কারণে রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত সুগার মায়ের শরীরের রক্ত নালী, স্নায়ুর যেমন ক্ষতি করে, আবার বাচ্চারও অনেক ক্ষতি করে। পরবর্তী জীবনে মা ও শিশু উভয়েরই টাইপ-২ ডায়বেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
  • মিসক্যারেজ: মূলত রক্তচাপ ও রক্তে সুগার বেড়ে যাওয়ার ফলেই এ সময়ে মিস্ক্যারেজ এর আশঙ্কা বেড়ে যায়।
  • দীর্ঘ লেবার ও জরুরি অপারেশন (সি সেকশন): অনেক ক্ষেত্রেই স্থূল মায়েদের দীর্ঘক্ষণ লেবার পেইনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া মায়ের ডায়বেটিস থাকলে বাচ্চার সাইজ বড় হয়ে যায়, তাই হেড এনগেজ হতে সময় নেয়। অতঃপর পানি ভেঙ্গে যাওয়া কিংবা ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার কারণে জরুরি সি-সেকশনের দিকেই যেতে হয় ডাক্তারদের।
  • প্রচুর রক্তপাত: স্থূল মায়েদের সচরাচর ডেলিভারির পর প্রচুর রক্তপাত হয় (> ৫০০মিলি)।  এর ফলে মা খুবই দুর্বল হয়ে যায়, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

সন্তানের ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে-

  • সময়ের আগেই জন্ম (প্রিম্যাচিউর বার্থ): ৩৭ সপ্তাহ হওয়ার আগেই শিশু জন্ম হলে তার পর্যাপ্ত ওজন হয় না (<২.৫ কেজি), যাকে লো বার্থ ওয়েট বেবি (LBW) বলা হয়। এরকম শিশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিপক্ক হয় না, সাথে বিভিন্ন পুষ্টির ঘাটতি থাকায় জন্মের পরপর অসুস্থ হওয়ার ও পরবর্তী সারা জীবনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। 
  • বেশি ওজন (ম্যাক্রোসমিয়া): মায়ের ব্লাড সুগার বেশি হলে গর্ভের সন্তানেরও অনুরূপ হয়, ধীরে ধীরে তা ফ্যাট আকারে জমতে থাকে শরীরে।
  • মৃত শিশু (স্টিল বার্থ): ওভারওয়েট মায়ের প্রেশার, ডায়বেটিস সহ আরো নানান সমস্যার কারণে গর্ভের সন্তান মারাও যেতে পারে। অনেক সময় মা নিজেও সেটা টের পায় না।
  • অপরিপক্ক পৌষ্টিকতন্ত্র: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব শিশুদের খাদ্যনালী সুগঠিত হয় না, তাই খেতে পারে না। তাছাড়া সময়ের আগেই জন্মের কারণে দুধ টানতে বা গিলতে পারে না। ফলে পুষ্টির ঘাটতি থেকে যায়, বার বার অসুস্থ হয়ে যায়।
  • জন্মগত সমস্যা (বার্থ ডিফেক্ট): হৃৎপিণ্ড ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা যেমন, স্পিনা বিফিডা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এছাড়াও পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন জটিল রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

কি করে ওজন কমাবেন?

এ সময়ে ওজন কমানোর জন্য বেশি ব্যতিব্যস্ত না হলেই ভালো। তবে খাবার নিয়ম মেনেই খেতে হবে। তাতে ওজন না কমলেও, ওজন বেশি বাড়বে না অন্তত। মনে রাখবেন, ওয়েট মেশিন যে ওজন দেখাবে, তাতে আপনার গর্ভের সন্তান, বেড়ে যাওয়া রক্ত ও এমনিওটিক তরলের ওজন অন্তর্ভুক্ত। ডেলিভারির পর কিছু ওজন তাই এমনিতেই কমে যাবে। আরো কিছু কমবে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে, যেহেতু জমে থাকা চর্বিই দুধ উৎপাদন করতে সাহায্য করবে।

স্বাভাবিক ওজনের প্রেগন্যান্ট মহিলার ওজন নয় মাসে বাড়া দরকার যেখানে প্রায় ১১-১৬ কেজি, একজন ওভারওয়েট মহিলার ক্ষেত্রে তা ৭-১১ কেজি। আর BMI ৩০ এর উপর হলে ৫-৯ কেজি। তবে জমজ সন্তান আশা করলে এই মাত্রাটা আরো বেশি হবে। 

আপনার ডায়েট কেমন হবে?

যেহেতু সন্তানের পুষ্টি চাহিদার কথা ভেবে ওজন কমানোর কোন ডায়েট অনুসরণ করতে পারছেন না, আবার ওজন বেশি বেড়ে গেলেও সন্তান ও আপনার ক্ষতির আশঙ্কা আছে, তাই প্রতিটি খাবার নির্বাচন করতে হবে খুব গুরুত্বের সাথে। 

সবার আগে আপনাকে কয়টি জিনিস সম্পর্কে জানতে হবে-

১. ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার (ক্যালোরি ডেন্স ফুড)- এসব খাবার অল্পতেই প্রচুর শক্তি দেয়, কিছু পুষ্টিও বিদ্যমান থাকে, যেমন- তেল, ঘি, বাদাম ইত্যাদি।

২. পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার (নিউট্রিয়েন্ট ডেন্স ফুড)- এগুলো বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে ভরপুর থাকে, যেমন- ডিম, দুধ ইত্যাদি।

৩. পুষ্টি বিহীন, ক্যালোরি পূর্ণ খাবার (এম্পটি ক্যালোরি)- খালি শক্তি দেয়, কোনোই ভিটামিন, মিনারেল থাকে না, যেমন- চিনি, কোক ইত্যাদি।

৪. খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ খাবার (ফাইবার রিচ ফুড)- এগুলো অল্প খেলে পেট ভরে যায় দ্রুত, ক্যালোরি কম কিন্তু প্রচুর পুষ্টি থাকে, যেমন- শাক সবজি, ফল ইত্যাদি। 

প্রেগন্যান্সির সময় গর্ভের সন্তানের জন্য বাড়তি শক্তি ও পুষ্টি প্রয়োজন, কিন্তু মায়ের পাকস্থলী তো একটাই। তাই ক্যালোরি ও নিউট্রিয়েন্ট ডেন্স খাবার খেতে বলা হয়। যেমন, দুধের সাথে একটু সর সহ খেলেই কিন্তু একের ভেতর দুই হয়ে যায়! কিন্তু ওভারওয়েট মায়েদের কি করণীয়? তারা নিউট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাবে, ক্যালোরি যথাসম্ভব কমিয়ে। যেমন, দুধের সর তুলে রেখে খাবে, আরো ভালো হয় লো-ফ্যাট দুধ কিনে খেলে। 

প্রেগন্যান্ট মায়েদের ডায়েটের আদ্যপান্ত নিয়ে আরেকটি লেখা রয়েছে । পড়লে নিজের ডায়েট প্ল্যানিং নিজেই তৈরি করে নিতে পারবেন। তবে যেহেতু আপনি ওভারওয়েট, তাই ক্যালোরির ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা বজায় রাখবেন। এছাড়াও আপনার জন্য আরো কিছু টিপস-

  • তেলে ভাজা খাবারের বদলে সেদ্ধ, বেক করা খাবার খেতে পারেন। ভাজা কিছু খেলেও ডুবো তেলে না ভেজে সেকা তেলে ভাজা যেতে পারেন।
  • মাংস খেলে চর্বি বাদ দিয়ে খেতে হবে। রেড মিট (গরু, খাসি) এ সময়ে না খেলেই ভালো।
  • কোমল পানীয়, চিনি ইত্যাদি এম্পটি ক্যালোরি একেবারেই বাদ দিতে হবে। মিষ্টি কিছু খেতে নিতান্তই ইচ্ছা করলে মধু, মিষ্টি ফল দিয়ে কিছু বানিয়ে খাওয়া যায়। চিনি বাদ দিয়ে জিরো-ক্যাল বা এরকম কৃত্রিম কিছু না খাওয়াই উত্তম।
  • কারো বেশি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে, ফল, সালাদ ইত্যাদি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খেলে পেট অনেক ক্ষণ ভরা থাকবে, পুষ্টিও পাওয়া যাবে।
  • শাক-সবজিতেও পেট ভরা থাকে অনেক ক্ষণ। তবে অধিক পরিমান হলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে। এমনটা হলে পরিমাণ কমানো যায়। শাক ছোট কুচি করে খেলে, আর কিছু সবজি ভাপিয়ে নিয়ে রান্না করলে হজমে সহায়ক হতে পারে।
  • সাদা চালের বদলে লাল চাল ভালো। এ ছাড়া চিড়া, ওটস, লাল আটার রুটি ইত্যাদি খাবারও ফাইবার এ পরিপূর্ণ, তাই পেট ভরা রাখে, রক্তে সুগার ধীরে ধীরে ছাড়ে। ফলে ডায়বেটিসের ঝুঁকি কমে।
  • লবণ কম খাবেন, নাহলে প্রেশার আরো বাড়িয়ে দিবে। ঝাল ও অন্যান্য মশলা কম খেতে হবে, নাহলে পেট জ্বালাপোড়া বেড়ে যাবে। 
  • অনেকের এ সময়ে আচার খাওয়ার ঝোঁক থাকে, তাতে তেল আর লবণ দুটাই কিন্তু বেশি। তাই পরিহার করলেই ভালো।
  • বাইরের খাবারের থেকে বাসার খাবারে তেল, মশলা, ক্ষতিকর কেমিক্যাল (যেমন, টেস্টিং সল্ট, কালার) কম থাকে। প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই বাসায় বানানো খাবারই খাবেন।
  • তরকারির ঝোল বেশি খাবেন না, এর পরিবর্তে ডাল খাবেন।
  • বেশি বেশি পানি খেতে হবে, খাওয়ার আগে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলে খাবার বেশি খেয়ে ফেলার সম্ভাবনা কমবে।

আর কি কি করণীয়?

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হওয়া ছাড়াও আরো কিছু কাজ অবশ্যই আছে। পর্যাপ্ত বিশ্রামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত শারীরিক শ্রমের ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে। প্রেগন্যান্সি মানে শুয়ে বসে থাকা না। ঝুঁকে কাজ করা, ভারী কিছু বহন করা ইত্যাদি ছাড়া দৈনন্দিন সব কাজই করা যায়। আগের দিনে এ অবস্থায় ব্যায়াম করাকে বিপজ্জনক মনে করা হত, এখন সুস্থতার জন্য ব্যায়াম ও হাঁটাকে ডাক্তাররা আরো জরুরি মনে করেন।  

সব প্রেগন্যান্ট মায়েরই এ সময় কিছু স্পেশাল ব্যায়াম করা উচিত, যেসব করলে শরীর ঝরঝরা থাকে। ওভারওয়েট হলে তো আপনার সেসব আরও বেশি করে করা উচিত। 

যেহেতু ওভারওয়েট মায়েরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, তাই নিয়মিত চেকআপের ক্ষেত্রে তাদের আরো সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে প্রেশার ও ব্লাড সুগার নিয়মিত মনিটর করতে হবে। কোনভাবেই ওজন আর বাড়তি হতে দেয়া যাবে না। 

কেউ সন্তান নিতে ইচ্ছুক হলে সে মুহূর্ত থেকেই তার ওজনের ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার। যেহেতু গর্ভ ধারণের পর প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তই মা ও শিশুর ভবিষ্যতের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই কোন রকম ঝুঁকি না নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবু যদি আপনি ওভারওয়েট অবস্থায় প্রেগন্যান্ট হয়ে যান, তাহলেও বেশি দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। একটু কষ্ট করে নিজেকে স্বাস্থ্যকর জীবনে অভ্যস্ত করার মাধ্যমে অনাগত সন্তানকে এবং নিজেকেও উপহার দিতে পারবেন একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ। সেই শুভকামনাই রইলো।

ছবিঃ ইন্টারনেট

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন
এফসিপিএস(অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলজি)
কনসালট্যান্ট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল।

সম্পাদনায়ঃ হাবিবা মুবাশ্বেরা