বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম

যাইনাব আমার সেকেন্ড বেবী। ওর বার্থ স্টোরি লিখতে বসে প্রথমেই মনে হচ্ছিলো সেকেন্ড প্রেগন্যান্সিতে পাওয়া আমার সব চেয়ে বড় শিক্ষাটার কথা। সেটা হলো, আল্লাহ যা ভাগ্যে রেখেছেন তাই হবে। যা আমার জন্য নির্ধারিত তাই ঘটবে। আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি। আন্তরিকভাবে ভালো কিছুর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলে এর পর আমার সাথে যাই ঘটুক, তাই আমার জন্য উত্তম ছিলো, এমনটা ভেবে শান্তি পাওয়া যায়। আমার দুইটা প্রেগন্যান্সিতেই একটা স্টেইজে এসে সি-সেক হবে এমনটা মোটামুটি কনফার্ম হয়ে গিয়েছিলাম। অনেক চেষ্টা করেছিলাম নরমাল ডেলিভারীর জন্য তাই সেই মুহূর্ত গুলোতে প্রচন্ড হতাশ লাগলেও পরমুহূর্তেই এটা ভেবে শান্তি পাচ্ছিলাম, আমিতো আমার জায়গা থেকে সব টুকু দিয়েই চেষ্টা করেছি। তারপর ও আলহামদুলিল্লাহ বাংলাদেশে সি-সেক এর রেট এত বেড়ে যাবার পর ও আমার দুইটা নরমাল ডেলিভারী হয়েছিলো এবং এজন্য আমি আল্লাহ’র কাছে অনেক শুকরিয়া আদায় করি।

এবার যখন প্রেগন্যান্সি টেষ্টে পজিটিভ রেজাল্ট পেলাম তখন আমার বড় মেয়ের বয়স ১৬ মাস। ব্রেষ্টফীড করতো। ডাক্তার বলেছিলেন প্রেগন্যান্ট অবস্থায় দুধ খাওয়ানো কন্টিনিউ করলে কোন সমস্যা হবেনা। আমি তাই বড় মেয়ের ২১ মাস পর্যন্ত দুধ খাওয়ানো কন্টিনিউ করেছি। এর পর আমার মিল্ক প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

অনিয়মিত মাসিক হবার কারনে ফার্স্ট প্রেগন্যান্সিতে EDD ডেট নিয়ে খুব ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। ফার্স্ট প্রেগন্যান্সিতে আমার ডাক্তার LMP অনুযায়ী EDD ডেট ধরেই হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছিলেন। অন্যদিকে LMP অনুযায়ী EDD ডেট এর ১৪ দিন পরে ছিলো USG তে ৮ সপ্তাহের প্রেগন্যান্সির EDD ডেট। আমার দুই প্রেগন্যান্সির কোনটাতেই পেইন উঠেনাই, লেবার ও নিজে থেকে প্রগ্রেস করেনাই।

ডাক্তার বলেছিলেন আমাকে ইন্ডিউস করে পেইন উঠানোর চেষ্টা করবেন। ৬ ঘন্টা দেখবেন এর মধ্যে পেইন না উঠলে সি-সেক এ যেতে হবে। তাই আমি চাচ্ছিলাম রিস্ক না থাকলে অপেক্ষা করতে যেনো সময়ের সাথে শরীর লেবারের জন্য প্রস্তুত হয় এবং ইন্ডাকশন প্রসেস টা সাকসেসফুল হয়। প্রথম প্রেগন্যান্সিতে আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম অনেক গাইনী ডাক্তার’ই অনিয়মিত মাসিক এর ক্ষেত্রে প্রেগন্যান্সিতে আর্লি করা আল্ট্রাসনোগ্রাফির EDD ডেট কেই মোটামুটি সঠিক ধরেন। আমিও তাই প্রথম প্রেগন্যান্সিতে USG র EDD ডেট ধরেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম এবং আমার ইন্ডাকশন প্রসেস টাও সাকসেসফুল হয়েছিলো । সেকেন্ড প্রেগন্যান্সিতে ডেট নিয়ে এই সমস্যায় পরতে হয়নাই। আলহামদুলিল্লাহ। LMP অনুযায়ী EDD এবং আর্লি USG র EDD একি ছিলো।

আমি হাইপোথাইরয়েড পেশেন্ট হবার কারনে শুরুতেই আমার এন্ড্রোকাইনোলজিস্ট কে প্রেগন্যান্সির বিষয়টা জানাই। পুরো প্রেগন্যান্সিতে আমাকে প্রতি ট্রাইমিষ্টারেই ডাক্তার ব্লাড টেষ্ট করতে দিয়েছিলেন এবং সেভাবেই ওষুধ এর ডোজ এডযাষ্ট করে দিতেন। এটা খুব ই গুরুত্বপূর্ণ। থাইরয়েড পেশেন্ট দের প্রেগন্যান্সিতে এই বিষয়ে খুব যত্নশীল থাকা উচিত। নিউনবর্ণ বেবীর ও ৭ দিনের মধ্যে ব্লাড টেষ্ট করতে হয়।

ফার্স্ট ট্রাইমিষ্টার : প্রথম প্রেগন্যান্সির মতো বমির সমস্যা থেকে মুক্তি মিললেও লো প্রেশারে কাবু হয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম নাই হয়ে গিয়েছিলো। কোন কোন দিন মাথা তুলে দাঁড়ানোটাও কষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো। এবার খাবার একদম ই হজম করতে পারতাম না। কি খাবো, কি খেলে একটু শান্তি পাবো সারাদিন খুঁজতাম কিন্তু যাই খেতাম গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকতো। অনেক কিছুতে গন্ধ পেতাম।

সেকেন্ড ট্রাইমিষ্টার : দুই প্রেগন্যান্সিতেই ৪ মাস পর একদম সুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। শরীরে বিভিন্ন রকম পেইন থাকলেও কাজ কর্ম করার এনার্জী পাচ্ছিলাম। ঘুম ভালো হতো। এবার সেকেন্ড ট্রাইমিষ্টারে সেন্টমার্টিন বেড়াতে গিয়েছিলাম। ৩ দিনের সফরে প্রতিদিন প্রায় ৪/৫ ঘন্টা হাঁটতে হয়েছিলো।

থার্ড ট্রাইমিষ্টার: এবারের থার্ড ট্রাইমিষ্টার ছিলো খুব বৈচিত্র্যময়।

ব্রীচ বেবী : এত দিন ভালো ভাবে কাটলেও ৩২ সপ্তাহের আল্ট্রাতে জানা গেলো বেবীর পজিশন ব্রীচ। ডাক্তার জানালেন ব্রীচ বেবী নরমাল ডেলিভারী সম্ভব না। কিন্তু বাচ্চা পজিশন চেইঞ্জ করতে পারে। EDD ডেট এর ৭ দিন আগে আরেকটা আল্ট্রা করে আসতে বললেন। আর বললেন পজিশন চেইঞ্জ না হলে ৭ দিন আগেই সি সেক করতে হবে। খুব হতাশ লাগছিলো। একা একা সেদিন যখন ডাক্তার এর চেম্বার থেকে বাসায় আসছিলাম মনে হচ্ছিলো আল্লাহ’র ইচ্ছার উপর আমাদের কারোর’ই হাত নাই। চেষ্টা আর দোয়া ছাড়া কিছুই করার নাই। ব্রীচ বেবী যে নরমাল ডেলিভারী হয়না,তা না। কিন্তু আমি জানতাম আমাদের দেশে ব্রীচ বেবী নরমাল ডেলিভারী হবার চান্স খুবই কম।

বাসায় আসার পর বিভিন্ন ভাবে জানার চেষ্টা করলাম। কিছু এক্সারসাইজ পেলাম যেগুলো ব্রীচ বেবীর পজিশন চেইঞ্জ এর জন্য করতে বলা হয়েছে। এগুলো কতটা হেল্পফুল জানিনা। কারন আমার ডাক্তার এক্সারসাইজ করতে বলেন নাই। আমি নিজে থেকেই ব্যয়াম, হাঁটাহাঁটি, পানি খাওয়া আর দোয়া করা এগুলাই করে যাচ্ছিলাম। খুবই মন খারাপ ছিলো সেইদিন গুলোতে। বড় মেয়েটাও ছোট হওয়ায় ওকে রেখে রেগুলার হাঁটতে না পারলেও ১/২ দিন গ্যাপ দিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করেছি অল্প বেশি যাই পারি। খেজুরও রেগুলার না খেলেও মোটামুটি খাওয়ার চেষ্টা করেছি শেষ সময় পর্যন্ত।

সেই সময় গুলোতে ছিলো প্রচন্ড গরম আবহাওয়া। টানা ২ মাস কোন বৃষ্টির দেখা নাই৷গরমে খুব ই কষ্ট হচ্ছিলো। সেকেন্ড প্রেগন্যান্সির কথা ভাবলেই সবার আগে গরমে যে কষ্ট পেয়েছি সেটার কথা মনে পরে। আর ঘুম আবার নাই হয়ে যায়। শেষ ২ মাস একদম ই ঘুম আসতোনা। আবার প্রেশার লো হয়ে যায়। শরীর খুব দুর্বল থাকতো। দিন গুলো শেষ হচ্ছিলোনা। অবশেষে ৩৮ সপ্তাহ পরে আল্ট্রা করতে যাই। আলহামদুলিল্লাহ বেবীর পজিশন চেইঞ্জ হয়ে যায়। বেবী cephalic পজিশনে চলে আসে। কিন্তু বেবীর ওজন বেশ কম আসে৷ প্রেগন্যান্সির একদম শেষ দিন গুলোতে ১-২ ঘন্টা হাঁটতাম। এখানে বলে রাখি হাঁটা আমার খুব প্রিয় একটা এক্সারসাইজ। দুই প্রেগন্যান্সিতেই আমি অনেক হেঁটেছি। হাঁটতে আমার কষ্ট কম লাগে। সারা শরীরে অনেক রকম ব্যথা ছিলো তখন। খুব কষ্টে নিজের কাজ গুলো করতাম। পেলভিক রকিং, স্কোয়াট পজিশনে বসা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা এগুলো করার চেষ্টা করেছি। আমি চাচ্ছিলাম না আমি এবার ওভারডিউ হই। কিন্তু এবার ও ডেট এর মধ্যে আমার পেইন উঠলোনা। ডাক্তার কে EDD ডেট এর দিন ফোন করলাম। উনি ২ দিন পর দেখা করতে বললেন।

এদিকে সেই সময়টাতেই আমার বড় মেয়ে খুব অসুস্থ হয়ে গেলো। ২ বার হাসপাতালে নিতে হলো ডাক্তার দেখানোর জন্য। পেটে অসুখ হয়েছিলো। জ্বর ছিলো।খুব খারাপ লাগছিলো নিজের শারীরিক অসুস্থতার জন্য বাচ্চার ভালো যত্ন করতে পারছিলাম না। EDD ডেট এর ২ দিন পর গেলাম ডাক্তারের কাছে।

PV চেক করে বললেন বাচ্চার পজিশন এখনো অনেক উপরে আর সময় ও শেষ হয়ে আসছে। একটা USG করতে দিলেন৷ সেইদিন ই USG করে ওনাকে ফোনে রিপোর্ট জানালাম। উনি বললেন বাচ্চার ওজন আর সব কিছু ঠিক আছে। কিন্তু আর অপেক্ষা না করে ভর্তি হয়ে যেতে। কারন EDD ডেট চলে গেছে। আমার মন টা একদম ভালো লাগছিলোনা। সব ঠিক থাকলে আমি ৪১ সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাচ্ছিলাম। কারন আমার পেইন যদি নাও উঠে ইন্ডিউস করলে সাকসেস হবার চান্স হয়ত বেড়ে যেতে পারে। ঠিক করলাম ৪১ সপ্তাহ শেষে ভর্তি হবো। ডাক্তারকেও জানালাম। এদিকে বড় মেয়েটা খুব সিক হয়ে যাচ্ছিলো। যেদিন আমি হাসপাতালে ভর্তি হবো সেই দিন সকালে সে দুর্বলতার জন্য চোখ খুলতে পারছিলোনা। চোখ বন্ধ অবস্থায় একটু খাইয়ে, ওষুধ খাইয়ে আমার মা এর কাছে বাচ্চাকে দিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে যখন রওনা হলাম তখন সকাল সাড়ে ৯ টা। হাসপাতালে যাবার পর ভর্তি হয়ে ডেলিভারীর দিকে মন টা ফোকাস করার চেষ্টা করছিলাম। এর আগ পর্যন্ত বড় মেয়ের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিলো। সকালে গোসল করে এসেছিলাম।

১০ টায় আমাকে ভর্তি করে PV চেক করে জানালো আমার বাচ্চার Head Engage হয় নাই। সারভিক্স একটুও ওপেন হয় নাই। কিন্তু সারভিক্স সফট আছে। পেইন উঠলে ওপেন হয়ে বাচ্চার Head Engage হতে পারে। নার্সরা অবাক হচ্ছিলো ডেট এর ৭ দিন পর এত দেরীতে কেনো ভর্তি হলাম।

সকাল ১০-১১ টা : ভর্তি হবার পর ই ডাক্তারকে ফোনে জানালাম। আমি ১ ঘন্টা হাঁটলাম রুমের ভিতর। ছোট একটা রুম। দুইটা বেড। আমার পাশের বেডে আরেকজন পেশেন্ট ছিলেন। রুমের বাইরে আমার হাজব্যান্ড আর শ্বাশূড়ি অপেক্ষা করছিলেন। এই ১ ঘন্টা নার্সরা আর কিছু করলোনা। ১১ টায় আমার হাসব্যান্ড ডাক্তার কে ফোন দিলেন। ডাক্তার নার্স দের কে ফোনে বলে দিলো ইন্ডাকশন শুরু করে দিতে।

১১-১২ টা: ১১ টা থেকে ১২ টায় শুধু স্যালাইন চলছিলো। স্যালাইন এর ভিতর কোন পিটোন দেয়া হয় নাই তখনো। আমি বেডের চারপাশে হাঁটছিলাম। মনে অনেক ভয় কাজ করছিলো যদি এবার সি-সেক হয়। পেইন না উঠে। নার্ভাসনেস কাটাতে পাশের বেডের পেশেন্ট এবং ডিউটি নার্স দের সাথে কথা বলছিলাম। বড় মেয়েটার কথা বারবার মনে পরছিলো।

১২-১ টা: ১২ টায় আবার আমার হাজব্যান্ড আমার ডাক্তারকে ফোন দিলেন। ডাক্তার বললেন ইন্ডাকশন তো শুরু করে দিতে বলেছি। ওরা শুধু স্যালাইন দিয়ে রেখেছে কেনো। নার্স রা বললো, ওনারা ডাক্তার আসলে শুরু করবেন এমন চিন্তা করেছিলেন । অবশেষে ১২ টায় ইন্ডাকশন প্রসেস শুরু হয়। স্যালাইন এর সাথে পিটোন দেয়া হয়। ১২ টার একটু পর ডাক্তার ও আসেন। ১২ টা ১০ মিনিট থেকে আমার কন্ট্রাকশন শুরু হয়। আমার একটু একটু করে সাহস ফিরে আসতে থাকে। কনট্রাকশন যেহেতু শুরু হয়েছে ইন শা আল্লাহ নরমাল ডেলিভারী হবে। ১২ টা ২০ এর দিকে আমার পানি ভেংগে যায়। ঘড়ি দেখছিলাম ১ মিনিট পেইন আর ৪৫ সেকেন্ড রেস্ট এভাবে কন্ট্রাকশন হতে থাকে। চুপ করে সহ্য করে যাচ্ছিলাম। ওয়াটার ব্রেক হয়ে ড্রেস ভিজে গিয়েছিলো। তাই হাঁটা বন্ধ করে বেডে শুয়ে ছিলাম৷ আমাকে মুখে এন্টিবায়োটিক খাওয়ালো। আর নাকে অক্সিজেন দেয়া শুরু করলো। ডাক্তার বললেন বেবি ভালো থাকার জন্য আমাকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। নার্সরা একটু পর পর বাচ্চার হার্টবীট চেক করতেন এবং অনেক বার PV চেক করেছেন। ডাক্তার আমাকে এই সময় কিছু খেতে বলছিলেন। তাই স্যুপ খেয়েছিলাম।

১-২ টা : দুপুর ১ টায় আবার PV চেক করে নার্স বললো আমার সারভিক্স ২.৫ সে.মি. ওপেন হয়েছে। পেইন এর তীব্রতা অনেক বেড়ে গেলো। কিন্তু পেইন এর মাঝে গ্যাপটা ৪৫ সেকেন্ড থেকে বেড়ে প্রায় মিনিট খানেক হলো । সহ্য করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। এবার লেবার পেইন এর পুরা সময়টাই আমার নাকে অক্সিজেন দেয়া ছিলো। এখানে একটা কথা বলে রাখি, পেইনের সময় PV চেক করে নার্সরা লেবার প্রোগ্রেস দেখছিলো। খুব পেইনফুল জিনিস হলেও ওনারা বললেন, এটাতে দ্রুত লেবার প্রোগ্রেস হবে৷ আমার ডিউটি নার্সরা বিকাল ৩ টায় চলে যাবে। তাই ওরা চাচ্ছিলো ওরা থাকতে যেনো বাচ্চা হয়। বাচ্চা হলে এখানে সবাইকে বকশিশ দিতে হয়। এজন্য সবাই চায় বাচ্চাটা তাদের হাতে হোক! সবাই বারবার বলছিলো কেনো আরো পেইন বাড়ছেনা। পেইন যত বাড়বে পেইনের সাথে বাচ্চা দ্রুত নিচে নামবে, Head Engage হবে। ডেলিভারী তাড়াতাড়ি হবে৷

পানি ভেংগে যাবার পর আর প্রথম ঘন্টার পর ওনারা কত বার যে চেক করলেন! কারন ওনারা তখন বলছিলেন আরেকটু পেইন উঠলেই বাবু হয়ে যাবে। আর এই পেইনটা ওনারা নিজেরা PV চেক করে করে বাড়াতে চাচ্ছিলেন। আর ডাক্তার নার্সরা মিলে রুমের ভিতর অনেক গল্প করছিলেন। শ্বশুড়বাড়ি-সংসার-বাচ্চা-হাসপাতালের পলিটিকস, অন্য পেশেন্টদের নিয়ে কথা বলছিলেন। আমার শ্বশুড়বাড়িতে কে কেমন এগুলো জিজ্ঞেস করছিলেন। এসব প্রশ্ন পেইন এর মধ্যে খুব বিরক্তিকর লাগছিল। আবার ভালো ভাবে কথাও বলা লাগছিল কারন ওনারা আন্তরিক থাকলেই নরমাল এর জন্য ট্রাই করবেন।

২-৩ টা: দুপুর ২ টায় আবার PV চেক করে বললো ৫/৬ সে.মি. এর মতো ওপেন হয়েছে সারভিক্স। কিন্তু এখনো Head Engage হয় নাই। আমাকে আরো ওষুধ দিলো স্যালাইন এর মাধ্যমে। হাত এর ক্যানুলায়। দুপুর ২-৩ টা এই শেষ ঘন্টাটা আমার খুব কষ্টে গিয়েছে। ঘন্টার শুরুতেই প্রচন্ড বমি আসলো। পেট একদম খালি হয়ে গেলো। এর পর সারা শরীরে প্রচন্ড কাঁপুনী হচ্ছিলো। ব্যথায় আমি AC ‘র ঠান্ডার ভিতর ও ঘেমে ভিজে গিয়েছিলাম। পেইন টা প্রচন্ড তীব্র হচ্ছিলো। যখন চলে যাচ্ছিলো তখন ঘুমিয়ে যাচ্ছিলাম। বেড এর স্ট্যান্ড ধরে অনেক কষ্টে শুয়ে ছিলাম।

শেষের দিকে মনে হচ্ছিলো আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি। সামনে ডাক্তার, নার্স সবার গল্প গুলো কানে আসছিলো কিন্তু সবকিছু কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার মতো মনে হচ্ছিলো। আমার নাকে ছিলো অক্সিজেন নল। হাত এর ক্যানুলায় স্যালাইন চলছিলো। শরীর পানিতে আর ঘামে ভেজা। কী যে একটা অবস্থা! এর মাঝেও মন কে অল্প অল্প সাহস দিচ্ছিলাম আর বেশি সময় নাই। আর সামান্যই। শুরু থেকে শ্বাস বন্ধ করে, ছেড়ে দিয়ে এভাবে চেষ্টা করেছিলাম পেইন এর সাথে এডযাস্ট করতে। কিন্তু শেষ ঘন্টাটায় আর সম্ভব হয়নাই। মনে হচ্ছিলো সেন্সলেস হয়ে যাবো।

আমি তখন সারাটা সময় মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ছিলাম। এভাবেই আমার দুইটা বাচ্চার সময় শেষেরদিকে আমি পেইনটা সহ্য করেছি। পেইন এর সময় মুখ খোলা রাখলে, মুখে শব্দ করলে বা চিৎকার করলে আমি পেইন টা সহ্য করতে পারিনা। আরো অসহনীয় লাগে৷ এইবার প্রেগন্যান্সির শেষ দুইটা মাস রাতে গরমের জন্য ঘুমাতে না পেরে আমি অনেক দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম। নার্স’রা শেষ ঘন্টায় আরো দুইবার PV চেক করলো। আমি এত ব্যথা পাচ্ছিলাম! নার্সরা বারবার বলছিলেন, আমি কেনো চুপ করে আছি। আমার পেইন হচ্ছেনা মনে হয় ঠিক ভাবে। এত সময় লাগার কথা নাহ!!! ডাক্তার বলছিলেন উনি চাচ্ছেন আমার ডেলিভারীটা শেষ করে বাসায় যাবেন, তারপর একবারে দুপুরের খাবার খাবেন। নার্সরা চাচ্ছিল তাদের ডিউটি চেঞ্জের আগে যেন বাবু হয় আর ডাক্তার বলছিলেন আমার কেসটা শেষ করেই উনি বাসায় যাবেন। সবার মাঝেই একটা তাড়া কাজ করছিল। কিন্তু উনারা বুঝতে পারছিলেন না যে এসব কথায় আমার পেইনের দিকে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হচ্ছিল। ডাক্তার আর নার্সরা জানতো আমার বড় একটা মেয়ে আছে। তাই আবার মেয়ে হলে কী হবে এগুলা নিয়ে গল্প করছিলো। আমাকে বলছিলো আমার পেইন এর ধরন দেখে মনে হচ্ছে হয়ত আমার মেয়ে না, ছেলে হতে পারে!! পেইনের সাথে কোপ করার জন্য তারা কোন টেকনিক বলছিলেন না। এই অবস্থায় আমি নিজের ভেতর ফোকাস করতে চেষ্টা করছিলাম। দোয়া ইউনূস পড়ছিলাম, আবার মাঝে মাঝে অন্য কিছু দোয়া করছিলাম। আবার ঘুমিয়ে যাচ্ছিলাম। এভাবে চলছিলো!

এর মধ্যে ডাক্তার বাইরে বসা আমার হাজব্যান্ডকে বলে একটা জুস আনিয়েছিলেন। নার্স অল্প অল্প করে খাইয়ে দিলেন। ৩ টার একটু আগে নতুন নার্স’রা আসলো। এতক্ষন যে নার্স’রা ছিলো তারা চলে গেলেন। আমার চোখের সামনেই একটা ঘড়ি ছিলো। আমি সারাক্ষন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ডাক্তার বললেন, আমাকে বাথরুম এ যেয়ে প্রস্রাব করে আসতে। কিন্তু আমার কন্ডিশন তখন এতটাই কাহিল হয়ে গিয়েছিলো উঠে দাঁড়াতে পারবো বলে মনে হচ্ছিলো না। আমি অনেক কষ্টে বললাম, আমি পারছি না৷ আমাকে তখন ক্যাথেটার দেয়া হলো।

৩ টার সময় ডাক্তার বললেন তোমার যদি পায়খানা করবে এমন মনে হয়, এমন প্রেশার লাগে, আমাদেরকে বলবে। আমার ৩ টা ৫ মিনিটের দিকে একবার এমন লাগলো। আমি ডাক্তারকে বললাম। আমাকে দুইজন নার্স ধরলো দুই দিক থেকে। ওরা আমাকে হেঁটে পাশের রুমে যেতে বললো। কোনরকম রুমে গিয়েছি। যে বেডে বাচ্চা ডেলিভারী করানো হয় সেখানে উঠতে বললো। কিন্তু ব্যথায় আমার পক্ষ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয় নাই। আমি বসে যাচ্ছিলাম ফ্লোরে। আমাকে দুইজন নার্স ধরে বেডে তুলে ঠিক ভাবে শোয়ানোর আগেই আমার পেইন এর সাথে পুশ করার টেন্ডেন্সি অটো চলে আসলো। আমি আর একটু প্রেশার দিতেই বাচ্চার মাথা বের হয়ে গেলো। আলহামদুলিল্লাহ!! আলহামদুলিল্লাহ!!

নার্স ডাক্তার কেউ ই তখম ফুল প্রিপেয়ার্ড ছিলোনা। ডাক্তার বললেন, তুমি এত পেইন নিয়ে চুপ করে আছো কেনো। তোমাকে এখানে নিয়ে আসার আগেই যদি বাচ্চা হয়ে যেতো! ৩টা ১০ মিনিটে আমার দ্বিতীয় মেয়ে যাইনাব দুনিয়ার আলো দেখলো৷ ওর কান্নার শব্দ শুনলাম। এক পলক দেখলাম। নার্সরা নিয়ে গেলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্লাসেন্টা ডেলিভারী হলো। ডাক্তার বসলেন আমাকে এপিসিওটোমি’র সেলাই দিতে। আমার দুই পা ঠক ঠক করে কাঁপছিলো। কোনভাবে স্থির রাখা যাচ্ছিলোনা। সেলাই দেয়ার আগে লোকাল এনেস্থাশিয়া দিয়ে নিয়েছিলেন। ফার্স্ট বাচ্চা ডেলিভারীর সময় এনেস্থাশিয়া ছাড়াই সেলাই করেছিলো৷ এবার তাই এখানেও কষ্ট কম পেয়েছি।

আমার মনে হচ্ছিলো, আলহামদুলিল্লাহ কষ্টের সময় শেষ। কষ্টের পর ই স্বস্তি আছে। ১০ মিনিট আগেও আমি পেইনে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম আর এখন আমি সুস্থ! আলহামদুলিল্লাহ!! প্রথম বাচ্চার সময় পুশ করতে খুব কষ্ট হয়েছিলো। অনেক সময় নিয়েছিলাম৷ আরো অনেক লম্বা লেবার টাইম ছিলো। সেকেন্ড প্রেগন্যান্সিতে আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ অনেক সহজ করে দিলেন।

কিছুক্ষন পর আমার শ্বাশূড়ি এবং নার্স বাচ্চা কে নিয়ে আসলো দুধ খাওয়ানোর জন্য। বাচ্চা কে অল্প সময় সাক করতে দিলো। এর পর আবার নিয়ে গেলো। আগের ডেলিভারীতে PPH এর হিষ্ট্রি থাকায় আমাকে কিছুক্ষন সেই রুমেই রেখে দিলো৷ কিছুক্ষন অবসার্ভ করে কেবিনে নিয়ে যেতে বললেন ডাক্তার। আলহামদুলিল্লাহ হাসপাতালে ১ রাত ছিলাম। পরের দিন বাসায় চলে আসি। বাচ্চাকে ব্রেষ্ট সাক করাতে থাকি। ৩ দিনের দিন দুধ আসে। এছাড়া হাসপাতালে বাচ্চার তাহনীক করানো হয়, কানে আজান দেয়া হয়।কেবিনে ঢুকেই আমার মা কে ফোন করি। মা বলেন বড় মেয়েটার ১০২ ডিগ্রী ফারেনহাইট জ্বর আসছে। আমার মনটা খুব ই খারাপ হয়ে গেলো। ছোট মেয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম কখন বাসায় যাবো আর বড় মেয়েকে একটা “ছোত্ত বেবী” গিফট করে খুশি করে দিবো।

(লিখেছেনঃ উম্ম যাইনাব)

বিঃ দ্রঃ
নরমাল ডেলিভারির সময় মায়ের চারপাশের পরিবেশ তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। পরিবেশ অনুকূল না হলে লেবার প্রগ্রেস হওয়ার গতি কমে যাওয়াও স্বাভাবিক। আশপাশের মানুষদের কথা, কাজ ইত্যাদিতে মায়ের লেবারের প্রতি মনোযোগ বিঘ্নিত হয়। তাই লেবার রুমে যারা থাকেন তাদের উচিত মায়ের জন্য বিরক্তির কারণ হয় এমন কথা ও কাজ না করতে চেষ্টা করা, তাকে তার লেবারের প্রতি মনোযোগ দিতে সহায়তা করা। তাড়া দেখানো, মায়ের থেকে ভালো পারফর্মেন্স আশা করা মায়ের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। পরিবেশ প্রতিকূল না হলে মা এমন সময়ে নিজের ভেতর ফোকাস করতে চেষ্টা করতে পারেন। লেবারের সময় আশপাশের পরিবেশ কিভাবে আমাদের হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে ও হরমোন কিভাবে আমাদের লেবারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে তা জানতে দেখুন প্রাকৃতিক প্রসবে হরমোনের ভূমিকা লেখাটি। – মাতৃত্ব

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা