বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বাসায় বসে চর্চা করা কোন পদ্ধতি ১০০% নিশ্চয়তাসহ কাজ করেন

ways-to-induce-labor-naturallyহয়তো আপনার প্রসবের তারিখ আর সপ্তাহখানেক বাকি, কিংবা এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এ সময় বাবা-মা তাদের হবু সন্তানের মুখ দেখার জন্য মুখিয়ে থাকেন। ফলে তারা ইন্টারনেট আতিপাতি করে খুঁজেন কিভাবে বাসায় বসেই প্রসব বেদনা তরান্বিত করা যায়। ইন্টারনেটে বিভিন্ন জনপ্রিয় ওয়েব সাইটের ফোরামও এ ধরনের আলোচনায় পূর্ণ। যেখানে পরামর্শ হিসেবে মসলাযুক্ত খুব ঝাল খাবার থেকে শুরু করে ক্যাস্টর অয়েল খাওয়া পর্যন্ত কি নেই!

কিন্তু বাস্তবতা কি বলে- আসলেই কি এসব টিপস কাজ করে? শিশু জন্মদান বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসবের পক্ষে ততটা ভাল কোন প্রমান নেই। ‘প্রসব বেদনা তরান্বিত করার জন্য হোম মেইড কোন পদ্ধতি নেই যা শতভাগ নিশ্চয়তাসহ কাজ করে’, এলিজাবেথ স্টেইন নামের একজন আমেরিকান মিডওয়াইফ বলেন। তবে এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে দেয়া ঔষধই বেশি কার্যকর ও নিরাপদ। বাদবাকি বেশিরভাগ টেকনিক-ই গুজব এবং কখনো কখনো মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ। তবে চিকিৎসকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও কয়েকটি টেকনিক বেশ সম্ভাবনাময়।

আকুপাংচারের সাহায্য প্রসব বেদনা:

সম্ভবত আকুপাংচার প্রসব বেদনা তরান্বিত করে, তবে এখনই নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। আকুপাংচার হচ্ছে দেহের বিভিন্ন আকু-বিন্দুতে ইনেজকশনের সুচের চেয়েও বড় বিশেষ এক ধরনের পিন ভেদ করিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রেখে চিকিৎসা করা। শত শত বছর ধরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মুহুর্তেই প্রসববেদনা ওঠানোর জন্য এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা’র একটা ছোট গবেষনায় দেখা গেছে যেসব মহিলা আকুপাংচার চিকিৎসা নেন তাদের ঔষধের সাহায্য ছাড়াই প্রসব বেদনা ওঠার সম্ভাবনা বেশি।

৫৬ জন গর্ভবর্তীর মাঝে চালানো এই গবেষনায় অর্ধেককে ৩টি আকুপাংচার সেশন দেয়া হয়। বাকিদের কোন সেশন দেয়া হয়নি। আকুপাংচার নেয়া ২৮ জন গর্ভবর্তীর ৭০% স্বাভাবিকভাবে প্রসব বেদনার স্টেজে গেছেন যেখানে না নেয়া মহিলাদের মাঝে এই হার ৫০%। গবেষকদের একজন বলেন, ‌’আকুপাংচার দেয়ার ফলে সিজারিয়ান হবার হার ৫০% পর্যন্ত কমে এসেছে, তবে এখনো ততটা নিশ্চয়তাসহ বলা যাচ্ছে না। বরং এ বিষয়ে আরো গবেষণা দরকার’।

সহবাদ কি প্রসব বেদনা আনতে পারে?
এবিষয়ে জানতে আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ুন।

প্রসববেদনা তরান্বিত করার অন্যান্য পদ্ধতিগুলো:

নিচে বর্ণিত পদ্ধতিগুলোতে শিশুজন্মদান বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এর কারণ হলো, হয় এসব পদ্ধতির পক্ষে ততটা শক্ত কোন প্রমাণ নেই, অথবা এগুলোতে ঝুঁকি জড়িত। যাই হোক না কেন, এ ধরনের কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করার আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তার বা মিডওয়াইফের সাথে পরামর্শ করতে ভুলবেন না।

দীর্ঘহাটাহাটি:
হার্পার নামের একজন ডাক্তার বলেন, “লম্বা হাটাহাটি ভাল ব্যায়াম, তবে আমি মনে করি না এটা প্রসব বেদনায় কোন সাহায্য করে”। এলিজাবেথ স্টেইন অবশ্য বেশ কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এবিষয়ে, “অল্প হাটাহাটি ভালো, তবে ক্লান্তিকর লম্বা হাটাহাটির ভক্ত আমি নই। ক্লান্ত হয়ে প্রসববেদনা আনা মনেহয় ভাল চিন্তা না”।

ঝাল খাবার:
খুব ঝাঝালো ঝাল খাবার খেয়ে প্রসব বেদনা আনা বেশ জনপ্রিয় ধারণা। তবে এটা জেনে রাখুন জরায়ু ও পাকস্থলির মাঝে সরাসরি কোন যোগসুত্র নেই। তাই এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে কোন বিশেষ খাবার পেটে সংকোচন ( contraction) নিয়ে আসবে। হার্পার জানান এধরনের কোন ঘটনা বা প্রমান তিনি কখনো দেখেন নি।

ক্যাস্টর বা রেড়ীর তেল:

ভেন্নার তেলের বহুল প্রচলিত নাম ক্যাস্টর অয়েল বা রেড়ীর তেল। ড. স্টেইন অনেকটা অনিচ্ছুকভাবেই এই তেলের কথা বলেন। ৩৮ সপ্তাহ পর দৈনিক খুব অল্প পরিমানে এই তেল গ্রহণ করা যেতে পারে। ‘রেড়ীর তেল সরাসরি জরায়ুতে কোন প্রভাব ফেলে না, বরং এটা অন্ত্রে উদ্দীপনা যোগায় যা জরায়ুতে প্রভাব ফেলে’। তবে এটা তখনই হয় যখন শরীর প্রসবের জন্য তৈরি হয়। ড. হার্পার অবশ্য এটা কোনভাবেই সমর্থন করেন না, ‘ক্যাস্টর তেলে বরং মারাত্নক ডায়রিয়া হয় এবং এর ফলে মা’র শরীরে পানির অভাব হতে পারে। তাই আমি এর পক্ষে নেই”।

কোহস:
কোহস নামের একধরনের ঔষধি অনেকেই এসময় ব্যবহার করেন যাতে প্রসববেদনা উঠে, যেটা শরীরে ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে। তবে হার্পার এর ব্যবহার নিয়ে বেশ সন্দেহবাদি, “এটা নিয়ে আসলে ততটা স্টাডি আমাদের হাতে নেই”।

সান্ধ্য-প্রিমরোজের তেল:
এটা একধরনের আমেরিকান ফুল যা ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বৈজ্ঞানিক নাম Oenothera। ড. হার্পার অবশ্য এর ব্যাপারে বেশ ইতিবাচক। এই তেলে একধরনের উপাদান আছে যা শরীরে প্রোস্টাগ্লানডিনে পরিণত হয় এবং এটা গলদেশ (cervix) কে নরম করে এবং প্রসববেদনা তরান্বিত করে। তবে হার্পার জানান, এটা নিয়েও আরো স্টাডি দরকার।

ওষুধনির্ভর পদ্ধতি:
আপনার প্রসবের নির্ধারিত তারিখ যদি পার হয়ে যায় তবে আপনার ডাক্তার বা মিডওয়াইফ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রসব বেদনা তরান্বিত করার পরামর্শ দিতে পারেন। অধিক-ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতীর ক্ষেত্রে একেবারে ৪০ সপ্তাহ বা তার আগেই ডাক্তাররা এধরনের পরামর্শ দেন। কম-ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতীর জন্য সর্বশেষ কাট-অফ (cut-off) সময় হলো ৪২ সপ্তাহ। এরপর ডাক্তাররা কোনভাবেই গর্ভাবস্থা চালিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেন না।

হাসপাতালে প্রোস্টাগ্লানডিন পিল দেয়া হয় কিংবা যৌনাদ্বারে প্রয়োগ করা হয়। বেশিরভাগ সময়ই এটা প্রসববেদনা আনার জন্য যথেষ্ট। এতেও কাজ না হলে পিটকয়েন নামের অক্সিটোসিন হরমোন প্রয়োগ করা হয় যা জরায়ুতে সংকোচন শুরু করে। তবে পিটকয়েনএর ব্যবহারে সতর্কতা আবশ্যক বলে হার্পার জানান।

অপেক্ষার প্রহর…

অবশেষে আপনার কাঙ্ক্ষিত সময় আসে, আপনি অনাগত যে সন্তানের মুখ দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন সে ভূমিষ্ঠ হয় । আপনার প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয়। আসলে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহুর্তের জন্য অপেক্ষা করা সত্যিই কষ্টের। তবে ভাল কিছুর জন্য অপেক্ষা বাঞ্চনীয়। আর এ জন্যই হার্পার পরামর্শ দেন অপ্রয়োজনীয় টেকনিকের পেছনে না দৌড়ে ধৈর্য্য ধরুন। আপনার শক্তি সঞ্চয় করুন।

অন্যভাবে বললে, যতটা পারুন ঘুমিয়ে নিন।