শুরুর আগের শুরু : হবু মায়ের পূর্বপ্রস্তুতি (শেষ পর্ব)

প্রথম পর্ব

৫) দু’আ, দু’আ, ও দু’আ:

মা-বাবা হওয়ার জার্নিটা আসলে কখন থেকে শুরু হয়, বলেন তো?

কেউ হয়তো বলবেন সন্তান ধারণের সময় থেকে, আবার কেউ বলবেন সন্তান যখন দুনিয়াতে প্রথমবারের মতো শ্বাস নিলো তখন থেকে।

কিন্তু আমি বলবো, প্রকৃতপক্ষে মা-বাবা হওয়ার জার্নি শুরু হয় আরও অনেক অনেক আগে থেকেই। যখন আপনি প্রথমবারের মতো স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, যখন আপনি প্রথমবারের মতো নিজের মধ্যে মাতৃত্ব/পিতৃত্বের অনুভূতি অনুভব করতে পেরেছিলেন, এবং যখন আপনি প্রথমবারের মতো আল্লাহ্ রব্বুল ইজ্জাহর দরবারে দুই হাত তুলে সন্তানের জন্য দু’আ করেছিলেন— ঠিক তখন থেকেই আপনার মা-বাবা হওয়ার জার্নি আসলে শুরু হয়ে গিয়েছিলো!

আপনার সন্তান দুনিয়াতে ও আখিরাতে আপনার জন্য নিয়ামত হবে নাকি আযিয়াত হবে, আপনার জন্য সাদকায় জারিয়া হবে, নাকি গুনাহে জারিয়া হবে, তার অনেকটাই ডিপেন্ড করে আপনার উপর। আপনার করা তারবিয়াহর উপর, আর আপনার করা দু’আর উপর।

সন্তানের জন্য মা-বাবার দু’আ যে ঠিক কতটা ক্রুশিয়াল তা লিখে বা বলে বুঝানোর ভাষা আমার জানা নেই। তাই ব্যস এতটুকুই বলি, রব্বুল ইজ্জাহর অনুমতিতে এ দুনিয়ায় কোনোকিছু যদি তাকদ্বীরের লিখন পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে, তা স্রেফ দু’আ [১৯]! একটা হাদিসে এসেছে মা-বাবার করা বদদোয়াও সন্তানের লেগে যায় [২০]! স্রেফ একটু ভেবে দেখুন তাহলে।

রব্বুল ইজ্জাহর দরবারে করা মু’মিনের কোনো দু’আই কখনোই বৃথা যায় না [২১]। আমাদের ব্যস দু’আর মতো দু’আ করে চেয়ে নিতে জানতে হয়।

তাই যারা মা-বাবা হননি, তারা এখন থেকেই প্রচন্ডভাবে দু’আ করতে শুরু করে দিন। আর যারা মা-বাবা হয়েছেন, এতদিন কোনো কারণে যদি আপনার বাচ্চার জন্য করা আপনার দু’আয় ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে আজ থেকেই নতুন উদ্যোমে আরও বেশি করে দু’আ করতে শুরু করে দিন। সিজদাহতে, রহমতের সময়গুলোতে, দু’আ কবুলের সময়গুলোতে, দু’আ কবুলের বিশেষ জায়গায়গুলোতে এমনভাবে দু’আ করুন, যেভাবে আল্লাহ্ রব্বুল ইজ্জাহ্ নিজেই আমাদের কুরআনুল কারীমে বলেছেন, আর তাঁর রাসূল (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন।

নিচে সরাসরি কুরআন থেকে সন্তানের জন্য এমনই কয়েকটি দু’আ উল্লেখ করছি —

رَبِّ لَا تَذَرۡنِى فَرۡدًا وَأَنتَ خَيۡرُ ٱلۡوَٰرِثِينَ

(সূরা আল-আনবিয়া: ৮৯)

উচ্চারণ: রব্বী লা- তাযারনী ফারদাও ওয়া আংতা খইরুল ওয়া-রিছী-ন।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে একা রেখো না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ মালিকানার অধিকারী।

رَبِّ هَبْ لِى مِنَ ٱلصَّـٰلِحِينَ

(সূরা আস-সফফাত: ১০০)

উচ্চারণ: রব্বী হাবলী- মিনাছ ছ-লিহী-ন।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে সৎ, কর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।

رَبِّ هَبْ لِى مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ

(সূরা আলে-ইমরান: ৩৮)

উচ্চারণ: রব্বী হাবলী- মিল্লাদুনকা যুররিইয়াতান ত্বইয়্যিবাতান ইন্নাকা ছামী-‘উদ দু’আ~।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَیْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّیَّتِنَآ أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَیْنَآ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِیمُ

(সূরা বাকারাহ: ১২৮)

উচ্চারণ: রব্বানা- ওয়াজ ‘আলনা- মুসলিমাইনি লাকা ওয়া মিং যুররিইয়াতিনা~ উম্মাতাম মুসলিমাতাল লাকা ওয়াআরিনা- মানা-ছিকানা- ওয়াতুব ‘আলাইনা~ ইন্নাকা আংতাত তাওওয়াবুর রহী-ম।

অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধরের মধ্য থেকে আপনার অনুগত জাতি বানান। আর আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের বিধি-বিধান দেখিয়ে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

رَبِّ ٱجۡعَلۡ هَٰذَا ٱلۡبَلَدَ ءَامِنًا وَٱجۡنُبۡنِى وَبَنِىَّ أَن نَّعۡبُدَ ٱلۡأَصۡنَامَ

(সূরা ইব্রাহীম: ৩৫)

উচ্চারণ: রব্বীজ ‘আল হা-যাল বালাদা আ-মিনাও ওয়াজনুবনী ওয়া বানিইইয়া আন-না’বুদাল আসনা-ম।

অর্থ: হে আমার রব, আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন।

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَآءِ‏

(সূরা ইব্রাহীম: ৪০)

উচ্চারণ: রব্বীজ ‘আলনী মুক্বীমাস সলা-তি ওয়া মিং যুররিইয়াতী রব্বানা- ওয়া তাক্বব্বাল দু’আ~।

অর্থ: হে আমার রব, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমার রব, আর আমার দু’আ কবুল করুন।

.

رَبِّ أَوۡزِعۡنِىٓ أَنۡ أَشۡكُرَ نِعۡمَتَكَ ٱلَّتِىٓ أَنۡعَمۡتَ عَلَىَّ وَعَلَىٰ وَٰلِدَىَّ وَأَنۡ أَعۡمَلَ صَٰلِحًا تَرۡضَىٰهُ وَأَصۡلِحۡ لِى فِى ذُرِّيَّتِىٓۖ إِنِّى تُبۡتُ إِلَيۡكَ وَإِنِّى مِنَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ

(সূরা আল-আহক্বাফ: ১৫)

উচ্চারণ: রব্বী আওঝি’নী~ আন আশকুরা নি’মাতাকাল লাতী~ আন’আমতা ‘আলাইইয়া ওয়া ‘আলা- ওয়া-লিদাইইয়া ওয়া আন ‘আমালা ছ্বলিহাং তারদ্ব-হু ওয়া আছ্বলি’হ লি- ফী- যুররিইইয়াতী~ ইন্নী- তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নী- মিনাল মুছলিমী-ন।

অর্থ: হে আমার রব, আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতা-পিতার উপর যে নিআমত দান করেছ, তোমার সে নিআমতের যেন আমি শোকর আদায় করতে পারি এবং আমি যেন সৎকর্ম করতে পারি, যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।

رَبَّنَا ھَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّیَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْیُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِینَ إِمَامًا

(সূরা আল-ফুরক্বান: ৭৪)

উচ্চারণ: রব্বানা- হাবলানা- মিন আঝওয়া-জিনা- ওয়াযুররিইয়া-তিনা- ক্বুররতা আ’য়ুনিউ ওয়াজ’আলনা- লিলমুত্তাক্বীনা ইমা-মা-।

অর্থ: হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন জীবনসঙ্গী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।

رَبِّ إِنِّى نَذَرۡتُ لَكَ مَا فِى بَطۡنِى مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلۡ مِنِّىٓۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ

(সূরা আলে- ইমরান: ৩৫)

উচ্চারণ: রব্বী ইন্নী- নাযারতু লাকা মা- ফী- বাত্বনী- মু’হার ররাং ফাতাক্বববাল মিন্নী~ ইন্নাকা আংতাছ ছামী-‘উল ‘আলী-ম।

অর্থ: হে আমার রব, আমার গর্ভে যা আছে, নিশ্চয় আমি তা খালেসভাবে আপনার জন্য মানত করলাম। অতএব, আপনি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।

رَبِّ إِنِّى لِمَآ أَنزَلۡتَ إِلَىَّ مِنۡ خَيۡرٍ فَقِيرٌ

(সূরা আল-ক্বাসাস: ২৪)

উচ্চারণ: রব্বী ইন্নী লিমা~ আংঝালতা ইলাইইয়া মিন খইরিং ফাক্বী-র।

অর্থ: হে আমার রব, নিশ্চয় আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহই নাযিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।

পরিশেষে এই দু’আই করি যে আল্লাহ্ রব্বুল ইজ্জাহ্ প্রত্যেক মা-বাবাকেই এমন সন্তানাদি দান করুন যারা হবে দুনিয়াতে তাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী নিয়ামত, আর আখিরাতে উম্মত হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর গর্বের কারণ!

আমিন ইয়া রব্বুল 'আলামিন।

নোটঃ বাংলা উচ্চারণ দেখে আরবি পড়লে সেটা কখনোই পুরোপুরি শুদ্ধ হয় না। আর শুদ্ধ উচ্চারণে না পড়লে অনেকসময় অর্থ বিকৃত হয়ে যায়! তাই অনুরোধ থাকবে নিজে পড়তে না পারলে যে পারে তার থেকে ঠিক উচ্চারণটা শিখে নিতে। অথবা, আয়াত নম্বর মিলিয়ে ইউটিউব বা কুরআন অ্যাপ (আমার সবচেয়ে পছন্দের কুরআন অ্যাপের লিংক দিয়ে দিচ্ছি এখানে) [২২] থেকে অডিও শুনে শিখে নিতে।

আমাতুল্লাহ অদ্রি
চাইল্ডবার্থ এডুকেটর অ্যান্ড ডুলা ট্রেইনি,
আমানি বার্থ, মাতৃত্ব।

রেফারেন্স:

[১৯] Tirmidhi, A. ibn 'Isa. (n.d.). Sunan al-Tirmidhi (Hadith no. 2139). Retrieved October 11, 2024, from http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=40838

[২০] Muslim ibn al-Ḥajjāj. (n.d.). Sahih Muslim (Hadith 3009). Retrieved October 11, 2024, from http://www.hadithbd.com/books/link/?id=11300

[২১] Ahmad ibn Hanbal. (n.d.). Musnad Ahmad (Hadith no. 9785). Retrieved October 11, 2024.

[২২] Greentech Apps. (n.d.). Al Quran (Tafsir & By Word) [Mobile app]. App Store. Retrieved October 11, 2024, from https://apps.apple.com/app/id1437038111

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ মার্চ ১৬, ২০২৫