গর্ভাবস্থায় ত্বকের যত্ন

আলহামদুলিল্লাহ, আপনি এখন মা হতে চলেছেন। জানেন তো হবু মা হিসেবে কিভাবে আমাদের ত্বকের যত্ন নিতে হবে? কেমন হওয়া উচিৎ প্রতিদিনের রুটিন? আসেন এখনি আমরা জেনে নেই কি করা উচিৎ এবং কি করা উচিৎ নয়।

আপনি গর্ভবতী বলে ত্বকের যত্ন করা যাবেনা, তা কিন্তু না। আধুনিক ত্বকের যত্নে আমরা দেখছি বর্তমানে আমাদের ত্বকের নানা সমস্যা সমাধানের জন্য গবেষনার মাধ্যমে নানা উপাদান এর অবদান আবিষ্কৃত হয়েছে। এখন গর্ভাবস্থায় কি এসব অসাধারণ উপাদানগুলো ব্যবহার করা যাবেনা? আশেপাশে অনেক কথা শুনতে পাওয়া যায় যে গর্ভাবস্থায় এসব কিছু ত্বকে দেয়া যাবেনা, নিরাপদ না। আজকে আমরা জানবো আপনার বাচ্চার জন্য ক্ষতিকারক না এমন সব উপাদানের ব্যপারে।

কিছু কিছু উপাদান আছে যেগুলো আপনি ব্যবহার করতে পারবেন না আপনার গর্ভকালীন সময়ে। কি সেগুলো?

গর্ভাবস্থায় ত্বকের যত্নে যেকোন সেবা সামগ্রী ব্যবহারের প্রথম ধাপ হলো কোন কোন উপদান এতে ব্যবহৃত হয়েছে তা দেখে নেয়া।

কোন উপাদানগুলো ব্যবহার করা যাবে না?

১. রেটিনল (একেবারেই না) এটা একটা ভিটামিন এ ঘরানার উপাদান। রেটিনল, রেটিনইক এসিডঃ (রেটিন এ), এডাপেলিন (ডিফেরিন) এবং টেযারটিন ( টাযারাক) ইদানিং আমরা খুব ব্যবহার করি। এটা একনি মার্ক কমাতে সাহায্য করে, এন্টি এজিং এর জন্য কাজ করে। কিন্তু এটা গর্ভাবস্তায় ব্যবহার করা যাবেনা। এটা আপনার স্কিনের মাধ্যমে এবজর্ব হয়ে বাচ্চার কাছে চলে যেতে পারে যেটা জন্মগত ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে।

২. সেলিসেলিক এসিড এটা ব্রণের নিরাময়ক হিসেবে বেশ কার্যকরি। কিন্তু সাধারণত এতা গর্ভাবস্তায় এড়িয়ে চলতে বলা হয়। যদিও কিছু কিছু ডাক্তারের মতে ২% বা তার নিচে এই উপাদান ব্যবহার করা যাবে। এবং ২% বা তার নিচে সেলিসেলিক এসিড যুক্ত ভালো ভালো ব্র্যন্ডের ত্বকের চর্চার পণ্য পাওয়া যায় আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যদি আপনার মনে কনপ্রকার শঙ্কা থাকে তাহলে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলে নিতে পারেন।

৩. বেনযল পার অক্সাইড ও এমন একটা উপাদান যেটা ৫% বা এর নিচে ব্যবহার করা যাবে।

৪. হাইড্রাকুইনোন (একেবারেই না) ত্বকের ফর্সাকারী হিসেবে ব্যবহৃত এই উপাদানটি বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে। এটা হেয়ার ব্লিচিং এর ও একটা উপাদান, এই কারণে প্র্যাগন্যন্সিতে চুল রঙ করা বা ব্লিচ করা থেকে বিরত থাকা ভালো। এমনকি মেহেদি দেয়ার ক্ষেত্রে আপনি যদি নিজে গাছের পাতা বেটে মেহেদি দিতে পারেন তাহলেই দিবেন। এছাড়া প্যাকেটের গুড়া মেহেদি বা আড়ং এর ডাই যুক্ত মেহেদি এসব এভয়েড করবেন।

৫. অক্সিবেনজোন বা এভোবেনজোন এই উপাদান দুটি সাধারণত থাকে ক্যামিক্যাল সান্সক্রিনে। এই দুটি উপাদান থেকে বিরত থাকতে বলা হয় কারন এটি শরীরের এন্ড্রোক্রাইন হরমন গুলোতে ভাঙ্গন ধরাতে পারে। যদিও এই উপাদানগুলো মাদের উপর কোন প্রকার পরীক্ষা করা হয়নি, কিন্তু বিশেষজ্ঞ মতে এর ব্যবহার থেকে বিরত থাকায় ভালো।

এছাড়াও সব ধরনের ক্যামিকাল এক্সফোলিয়েশন থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।

এতো ভালো ভালো উপাদানগুলো যদি ব্যবহার করা না যায় বা কিছু মাত্রায় ব্যবহার করা যায় তাহলে কি আর কিছু আছে যেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে?

কি ব্যবহার করা যাবে?

১. ভাইটামিন সি খুব খুব ভালো একটা অপশন, ত্বককে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করবে। প্রেগন্যান্সিতে আমাদের ত্বকে কালো কালো আবরণ পরতে দেখা যায়। শরীরের বিভিন্ন অংশ কালো হয়ে যায়। যাকে আমরা হাইপার পিগমেন্টেশন বলি। এটার জন্য নিয়মিত এক্সফোলিয়েশন/স্ক্রাবিং এবং ভিটামিন সি ব্যবহার করা যেতে পারে। কালো দাগ দূর করতে, উজ্জ্বল করতে আর আপনার ত্বককে বলিরেখা মুক্ত রাখত্রে সাহায্য করবে।

২. গ্লাইকোলিক এসিড একনিতে ব্যবহার করা যাবে, পিগমেন্টেশন দূর করতে ব্যবহার করা যাবে।

৩. ল্যাকটিক এসিড একনিতে ব্যবহার করা যাবে

৪. এযেলিক এসিড একনিতে ব্যবহার করা যাবে

৫. এসকর্বিক এসিড পিগমেন্টেশন দূর করতে ব্যবহার করা যাবে

৬. নায়াসিনামাইড, ৫% এর নিচে ব্যবহার করা যাবে।

৭. হায়লোরনিক এসিড, পেপ্টাইড ব্যবহার করা যাবে।।

৮. সানস্ক্রিন খুবই প্রয়োজনীয় একটা জিনিস। গর্ভাবস্থায় খুব সহজে কালো দাগ বা ম্যালাসমা হয়ে যেতে পারে যদি সানস্ক্রিন ব্যবহার না করা হয়। মিনারেল সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন অবশ্যই।

প্রেগন্যন্সিতে সাধারণ কিছু পরিবর্তন শরীরে লক্ষ্য করা যায়

১. ত্বক অনেক বেশি শুষ্ক হয়ে যায়, বিশেষ করে পেট এবং স্তনের দিকে।

২. হরমোনের প্রভাবে মুখে অনেক বেশি ব্রণ, গুটিগুটি র‍্যাশ দেখা দেয়।

৩. ঘুমের অভাবে চোখের নিচে কালো হয়ে যায়.

৪. শরীরের বিভিন্ন অংশ কালো হয়ে যায়। বিশেষ করে গলা, ঘাড়, আন্ডারআর্মস ইত্যাদি স্থানে কালচে আবরণের মতো দাগ বেশি দেখা দেয়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মেলাজমা (Melasma) বলা হয়।

৫. কারো যদি প্রেগনেন্সির আগে থেকেই স্কিনের সমস্যা থেকে থাকে যেমন একজিমা, সোরিয়াসিস ইত্যাদি এ সময়ে সেটা পরিবর্তিত হয়। কারও ক্ষেত্রে ভালো হয়, কারও ক্ষেত্রে অবস্থার অবনতি হয়।

৬. এছাড়াও স্ট্রেচ মার্কস, ভেরিকস ভেইন / স্পাইডার ভেইন, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, ইচিনেস এই ধরনের সমস্যাও দেখা দেয়।

কেমন হওয়া উচিৎ ত্বকের যত্নে প্রতিদিনের রুটিন?

১. সকালে উঠেই মাইল্ড ফেইস ওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিতে পারেন।

২. এরপর আপনার ত্বকে স্যুট করে এমন কোন এলকহল ছাড়া টোনার ব্যবহার করতে পারেন।

৩. এরপর আপনার ত্বকে স্যুট করে এমন কোন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করবেন। এটা বাদ দিবেন না কোনভাবেই।

৪. মিনারেল সানস্ক্রিন দিয়ে নিবেন। এতাও অবশ্যই রুটিনে রাখবেন।

৫. সপ্তাহে এক বা দুইবার পুরো শরীর স্ক্রাবিং করবেন।

৬. এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী ফেইসপ্যাক বা অন্য কোন সিরাম ব্যবহার করতে পারেন।

এইসব ব্যবহারের সময় অবশ্যই উপাদান দেখে নিবেন।

কিভাবে স্ট্রেচ মার্ক প্রতিরোধ বা দূর করবেন?

কোষের মধ্যে কোলাজেন আঠার মতো কাজ করে। গর্ভাবস্থায় কোলাজেন দূর্বল হয়ে ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে স্ট্রেচমার্ক দেখা দেয়। তার জন্য মাদেরকে সবসময় পেট, থাই, কোমড়, স্তনে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। তার জন্য বিভিন্য এসেনসিয়াল অয়ল, অলিভ অয়ল, কোকোনাট অয়ল, বডি বাটার ব্যবহার করতে পারেন। উপাদানের মধ্যে প্যাপ্টাইড ব্যবহার করতে পারেন, গ্লাইকলিক এসিড কোলাজেন কে স্টিমুলেইট করতে সাহায্য করে, এটাও ব্যবহার করা যাতে পারে। এটা আপনার ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখতেও সাহায্য করবে।

প্রেগন্যন্সি এবং ল্যাকটেশন খুবই ছোট সময় আপনার জীবনে। যদি জীবনকে একটা সরলরেখায় ধরি তাহলে বলা যায় প্রেগন্যন্সি তার মধ্যে ছোট একটা দাড়ি মাত্র। তাই এই সময়ে শরীরের বিভিন্য বদলকে মেনে নিন। যতটুকু যত্ন করা যায় আমরা করবো। এরপরেও যা ছুটে যাচ্ছে যাক। সেটাকে মেনে নিয়ে খুশিমনে সময়টা পার করুন। এখানে লজ্জা বা ভয়ের কিছু নেই।

Last but not the least! চুল! 

চুলের কথা কিছু না বললেই না। প্রেগন্যন্সিতে স্বাভাবিক ভাবেই হরমোনের প্রভাবে চুলের গ্রোউথ ভালো হয়ে যায়, চুল খুব সুন্দর, মোটা, শক্ত হয়ে যায়। তাই চুল নিয়ে খুব বেশি সাধারণত আমাদের ভাবতে হয়না। চুলের ভাবনা শুরু হয় মোটামুটি ৪র্থ ট্রাইমেস্টার থেকে…!!!! সেটা ইন শা আল্লাহ প্রসব পরবর্তী যত্নের লেখায় লিখব।

যেসব ব্র্যান্ড বা নন ব্র্যান্ড পণ্য তাদের উপাদানের তালিকা পুরোপুরি দেয়না বা একেবারেই দেয়না সেসব ব্র্যান্ড বা নন ব্র্যান্ড পণ্য ব্যবহার থেকে আপনার প্র্যাগন্যন্সি এবং ল্যাকটেশন সময়কালে দূরে থাকুন। 

সব শেষে বলতে চাই বাজারে অনেক অনেক মানসম্মত ব্র্যন্ডের পণ্য পাওয়া যায়। প্রয়োজনে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে পণ্য নির্বাচন করুন।

এবং দৈনিক ৮০-১০০গ্রাম প্রোটিন খাওয়া নিশ্চিত করুন (মাতৃত্বের প্রোটিন চার্ট দেখে নিন), পর্যাপ্ত পানি খান। আপনার গর্ভাবস্থা হোক সুস্থ এবং সুন্দর ইন সা আল্লাহ।

তথ্যসূত্রঃ

এন্ড্রোক্রাইন হরমন Schlumpf M, Cotton B, Conscience M, Haller V, Steinmann B, Lichtensteiger W. In vitro and in vivo estrogenicity of UV screens. Environ Health Perspect. 2001;109(3):239–244. [PMC free article] [PubMed] [Google Scholar] [Ref list]

https://nudieglow.com/blogs/nudieblog/your-guide-to-pregnancy-safe-korean-skin-care