রমাদান ও ব্রেস্টফিডিং মুসলিম মহিলা

বাচ্চাকে ব্রেষ্টফিডিং করানো মায়েদের রমাদানে রোযা রাখার ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য মতামত হলো যদি মা বাচ্চার জন্য ঝুঁকি মনে করেন, রোযা ছেড়ে দিতে পারেন (পরে রেখে নিবেন) অথবা বাচ্চার জন্য ঝুঁকি মনে না করলে রাখবেন। যেহেতু এই বিষয়ে ছাড় আছে, ফিকহি্‌ ইস্যু ভালো ভাবে জেনে (প্রয়োজনে স্কলারদের সাথে কথা বলে), চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিবেন। এই লেখা সেইসব মায়েদের জন্য যারা ডিসিশন নিচ্ছেন ব্রেষ্টফিডিং করানো অবস্থায় রমাদানে রোযা রাখবেন।

যেসব বাচ্চারা সম্পূর্ণরূপে বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল, সলিড শুরু করে নি, সেসব মায়েদের জন্য রমাদানের রোযা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। সলিড শুরু করা বাচ্চারা যেহেতু পুষ্টির একটা অংশ বাইরের খাবার থেকে পাওয়া শুরু করে, তারা শতভাগ মায়ের উপর নির্ভরশীল হয় না খাবারের জন্য। যদিও বড় বাচ্চাদের খাওয়ার চাহিদা বেশি থাকে। রোযা অবস্থায় মায়ের প্রধান চিন্তা থাকে, মা রোযা রাখলে দুধের যোগান কমে যাবে কিনা। বাচ্চা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে কি না, সেটা বোঝার উপায় হলো বাচ্চার যতটুকু ওজন বাড়ার কথা, তা বাড়ছে কিনা এবং প্রতিদিন যত সংখ্যক ভেজা ডায়াপার থাকার কথা, সেটা থাকছে কিনা। বাচ্চার ওজন ঠিক থাকলে, বাচ্চার স্বাস্থ্য ভালো থাকলে তার মানে বাচ্চা ঠিক মতই দুধ খেতে পারছে। এখানে মা সুস্থ বোধ করছেন কিনা, তার শরীরের উপর মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব পড়ছে কিনা সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ন। 

রোযা রাখা অবস্থায় মায়ের দুধের গুনগত মানের কোন পরিবর্তন আসে কিনা, এটা নিয়ে নানান রকম রিসার্চ হয়েছে। কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে আসলেই তেমন কোন পরিবর্তন নেই। তবে দুধে যেহেতু পানির পরিমাণ বেশি থাকে, মা পর্যাপ্ত পরিমাণে হাইড্রেটেড থাকছেন কি না, এটা দেখার বিষয়। মা যদি সচেতনভাবে সেহেরী এবং ইফতারে পুষ্টিকর খাবার খান এবং যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান করেন, তাহলে তিনি সহজেই নিজেকে হাইড্রেটেড রাখতে পারবেন। 

কখন মায়েরা সতর্ক হবেন?

যেসব মায়েরা বাচ্চাকে ব্রেষ্টফিডিং করানোর পাশাপাশি রোযা রাখবেন, নীচের এই দুইটা পয়েন্ট মাথায় রাখবেন। 

  • নিজের শরীরের দিকে খেয়াল করেন। যদি পানিশূন্যতার লক্ষণগুলো প্রকট হয়ঃ মাথাব্যাথা,অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘুরানো, ঘন হলুদ পরিমাণে কম হওয়া প্রস্রাব। 
  • বাচ্চার দিকে খেয়াল রাখেন। যদি বাচ্চার ওজন না বাড়ে, প্রতিদিন ব্যবহার করা ডায়াপারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে, বাচ্চাকে দেখে যদি অসুস্থ মনে হয়। 

মায়েদের জন্য টিপস 

প্রচুর দু’আ করুনঃ

রমাদানে রোযা রাখবেন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় থেকে প্রচুর দু’আ করুন, যাতে আল্লাহ্‌ আপনাকে সামর্থ্য দেন রোযা রাখতে পারার এবং তা সহজ করে দেন। ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখুন। শারীরিক সামর্থ্যের পাশাপাশি শক্ত মনোবল রাখা জরুরী। যদি নিজের কিংবা বাচ্চার কারণে চেষ্টা করার পরও রোযা না রাখতে পারেন, মনে রাখবেন, আল্লাহ্‌ আমাদের নিয়ত দেখেন।   

পানির চাহিদা পূরণে সচেষ্ট হোনঃ 

শরীরকে পানিশূন্যতার হাত থেকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত পানি পানের বিষয়টি নিশ্চিত করুন। সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত পানি খাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। এই সময়ে ঠিকমতো পানির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করুন। একসাথে বেশি পানি খাওয়া কাজে আসে না, কারণ বেশি পানি খেলে সেটা ব্লাডারের উপর চাপ দেয় আর প্রস্রাবের সাথে পুরোটাই বের হয়ে যায়। ইফতার থেকে শুরু করে সেহেরী পর্যন্ত অল্প অল্প পানি খেতে থাকুন। পানির পরিমাণও শুরুতে কিছুটা বেশি দিয়ে শুরু করে সেহেরী পর্যন্ত আস্তে আস্তে কমান। এতে শরীর  বেশি সময় পানি ধরে রাখবে।   

সচেতনভাবে খাবার বাছাই করুনঃ 

আপনার খাবার যেন অবশ্যই পুষ্টিমান সম্পন্ন হয়, সেটা নিশ্চিত করুন। সুষম খাবার- প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেড, ভিটামিন, মিনারেল যেন ঠিক থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। আমাদের দেশের লোকজন ইফতারে প্রচুর ভাজাপোড়া খায়। যেকোন ধরনের ভাজাপোড়া খাবার গ্যাস্ট্রিক উদ্রেককারী। যথাসম্ভব চেষ্টা করুন ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলতে। একেবারে বেশি পরিমাণ খেয়ে পেট ভারী করে ফেলবেন না। খাবারটাকে ছোট ভাগে ভাগ করে নিন। পানির পরিমাণ বেশি এমন সব সবজী ও ফল বেছে নিতে পারেন। লেবুর শরবত, ডাবের পানি, তরমুজ রাখুন খাবার তালিকায়। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের   সমস্যা আছে, ইসপগুল খাবেন রেগুলার। নানান মৌসুমি ফল দিয়ে বানানো শরবত খেতে পারেন। 

পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন

রোযায় শারীরিক ইবাদতের অংশটা অবশ্যই পরিশ্রমসাপেক্ষ। দিনে যখনি পারবেন বিশ্রাম নিয়ে নিন। বাসার কাজ যতদূর সম্ভব হালকা রাখার চেষ্টা করুন। যে কাজ না করলেই না, সেটি করুন। এক্ষেত্রে রমাদান শুরুর আগে বাসাবাড়ি গুছানো, কিছু খাবার প্রসেস করে ডীপফ্রিজে রেখে দেয়া এগুলো করে নিতে পারেন।

সময়মত ইফতার করুন

সময় হওয়া মাত্রই ইফতার করা সুন্নাহ্‌। কাজেই খাবার সামনেই রাখুন, যাতে ইফতার করতে দেরী না হয়। শুরুতেই এমন খাবার বাছাই করুন যা উচ্চ-এনার্জি সম্পন্ন, এবং আপনাকে তৎক্ষণাৎ শক্তির যোগান দিবে। খেজুর এমনই একটা খাবার। ইফতারের সময় হওয়ার সাথে সাথে খেজুর খান। অনেক দেশের মায়েরা ট্র্যাডিশনাল খাবার হিসেবে দুধের সাথে খেজুর মিশিয়ে খান। পানির পরিমাণ বেশি এমন ফল (আঙ্গুর, তরমুজ ইত্যাদি) ও সবজি (লাউ, টমেটো, লেটুস, শসা, বাঁধাকপি) পরিমাণে বেশি খান। প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম, মাছ মাংসের পাশাপাশি বাদাম রাখতে পারেন।  

দিনের বেলায় ব্রেষ্টফিডিংঃ 

এক্সক্লুসিভ ব্রেষ্টফিডিং করানো মায়েদের যাদের অন-ডিমান্ড ব্রেষ্টফিড করানো লাগে তাদের সারাদিনে বেশ কয়েকবার ফিডিং এর প্রয়োজন পড়ে। যেহেতু রোযায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পানির কিছুটা ঘাটতি থাকে, কিছু মায়েরা হয়ত খেয়াল করবেন দিনের শেষভাগে এসে বাচ্চা খাওয়ার সময় দুধের ফ্লো কিছুটা কমে যাবার কারণে বাচ্চা কিছুটা অস্থির বোধ করতে পারে। এক্ষেত্রে মায়েরা দুধ খাওয়ানোর আগে ব্রেষ্টে হালকা হাতে ম্যাসাজ করতে পারেন উপর থেকে নীচে। এতে উপরের দিকে জমে থাকা দুধ নীচে এসে দুধের ফ্লো ঠিক রাখতে সাহায্য করবে। যেসব বাচ্চারা সলিড শুরু করেছে, তারা বাচ্চার খাওয়ার রুটিন ঠিক করার চেষ্টা করুন। দিনে কয়েকবার পানি দিন। আট/নয় মাস থেকে দুই বছরের বাচ্চাদের নিয়ম করে তিন বেলা ভারী খাবার, দুই বেলা স্ন্যাক্স দিন। এক বছর থেকে পাস্তুরিত গরুর দুধ দিন। এতে মায়ের উপর চাপ কম পড়বে।

দুধ এক্সপ্রেস করে রাখা

যেসব মায়েরা বাইরে কাজ করেন, তাদের অনেকেই বাচ্চার জন্য সারাদিনের ব্রেষ্টমিল্ক এক্সপ্রেস করে রেখে যান। রোযা রাখা মায়েরা এই টেকনিক প্রয়োগ করতে পারেন। ইফতারের পর বাচ্চাকে ভরপেট খাওয়ানো ছাড়াও কিছুটা দুধ এক্সপ্রেস করে সংরক্ষণ (সঠিক নিয়ম অনুসরণ) করে রাখতে পারেন। যেটা দিনের বেলায় বাচ্চাকে খাওয়াতে পারেন।

সেহেরী বাদ দিবেন নাঃ

সেহেরী খাওয়া সুন্নাহ্‌ এবং এর জন্য সাওয়াব আছে। অনেকে ভারী ইফতার করলে গড়িমসি করে সেহেরী বাদ দেন। বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েরা এটা কখনোই করবেন না। সেহেরী বাদ দিলে আপনি দিনের প্রথম অংশেই ক্লান্ত হয়ে পরতে পারেন। সেহেরীতে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে চেষ্টা করুন। খেজুর আর দুধ হলেও খান। তবে অতিরিক্ত খাবেন না, এটা আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলবে।সাদা চালের ভাত/রুটির মতো কার্বহাইড্রেডের বদলে বাদামী চাল, হোল গ্রেইন খাবারের (whole grain food) মতো কমপ্লেক্স  কার্বহাইড্রেড খান। 

কী কী খাবেন নাঃ

ইফতারের সময় থেকে একদিকে যেমন প্রচুর পানি খাবেন, অন্যদিকে চা কফি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। কারণ এই ধরনের পানীয় শরীরে পানির পরিমাণ কমিয়ে দেয়, যা ব্রেষ্টমিল্ক তৈরিতে প্রভাব ফেলে। যাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা,  ভাজাপোড়া খাবেন না। যে সব মায়েদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা ভাত, রুটি জাতীয় খাবার কম খেয়ে প্রোটিন, শাকসবজির পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। এক থেকে দুইবার ইসপগুল খান নিয়মিত। আর বাচ্চা বুকের দুধ খেলে, শরীর থেকে পানি বের হয়ে গেলে,এমনিতেও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে পেট শক্ত করে ফেলতে পারে এমন খাবার এড়িয়ে চলুন। 

দুধ ও দুধজাতীয় খাবার খানঃ

বাচ্চাকে ব্রেষ্টফিড করানো মায়েরা তাদের খাদ্য তালিকায় দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার অবশ্যই রাখবেন। দুধ, পনির, দই এই খাবারগুলো সেহেরী কিংবা ইফতারের সময় রাখুন। যারা সরাসরি দুধ খেতে পছন্দ করেন না, তারা অন্যভাবে দুধ দিয়ে বানানো জিনিস খাওয়ার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, বাচ্চা বুকের দুধ খাওয়া মানে আপনার শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি, যেটা এড়াতে এই খাবারগুলো বাদ দিবেন না। 

নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখুন, চাপ নেবেন নাঃ 

যেসব মায়েরা রোযা রাখবেন, মনে রাখবেন নিজের আর বাচ্চার স্বাস্থ্য সবার আগে। এই দিক চিন্তা করেই আল্লাহ্‌ বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের ছাড় দিয়েছেন। যদি আপনি মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্তি বোধ করেন, অসুস্থ হয়ে পড়েন, বাচ্চার ডায়াপারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক কমে যায় বা বাচ্চা পানি স্বল্পতায় ভুগছে বলে মনে হয়, নিজের উপর জোর করবেন না। আল্লাহ্‌ আপনাকে যে ছাড় দিয়েছেন, সেটি নিন। পরবর্তীতে সময় সুযোগ বুঝে ছেড়ে দেয়া রোযা রেখে নিন।

যেসব মায়েদের বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চা ছাড়াও বয়সে বড় হাঁটতে শেখা বাচ্চা,আট/দশ বছর বয়সী বাচ্চা থাকে, তারা একটু সতর্কতার সাথে রমাদানের ডেইলি রুটিন ঠিক করুন। রমাদানের আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন, বাচ্চাদের কী ধরনের কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখবেন, কিভাবে বাচ্চাদের সময় কাটাতে দিবেন। যে বয়সেরই হোক, বাচ্চাদের ঘরের কাজে লাগান, এতে নিজের উপর চাপ কম পড়বে। মায়ের বুকের দুধের যোগান অনেক ক্ষেত্রেই নানান ধরনের চাপের উপর নির্ভর করে। যতদূর সম্ভব চাপ মুক্ত থাকার চেষ্টা করুন। রমাদান অত্যন্ত বরকতপূর্ন একটা সময়। ব্রেষ্টফিডিং করা মায়েরা যারা রোযা রাখতে পারবেন, তারা রাখবেন। বাকীরা রোযা ছাড়া অন্যান্য সব ইবাদাত থেকে সর্বোচ্চ সাওয়াব পাওয়ার চেষ্টা করবেন।

ফিকহী বিষয়ের তথ্যসূত্রঃ

১. ইসলাম কিউ/এ

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন
এফসিপিএস(অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলজি)
কনসালট্যান্ট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল।

সম্পাদনায়ঃ হাবিবা মুবাশ্বেরা