২০ সপ্তাহে আপনি এখন ৫ মাসের গর্ভবতী। যেহেতু গর্ভাবস্থা সাধারণত ৪০ সপ্তাহ হিসাবে ধরা হয় তাই এর মানে হচ্ছে আপনি গর্ভধারণের অর্ধেক সময় পার করে এসেছেন! মাত্র ২০ সপ্তাহ আগেও আপনি একা ছিলেন কিন্তু এখন আপনি নিজের ভেতর আরেকটা প্রাণ ধারণ করছেন। স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে ভুলবেন না!

গর্ভধারণের বিশতম সপ্তাহ, ২০তম সপ্তাহ

মাত্র ২০ সপ্তাহ আগেও আপনি একা ছিলেন কিন্তু এখন আপনি নিজের ভেতর আরেকটা প্রাণ ধারণ করছেন। স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে ভুলবেন না!

আপনার শারীরিক পরিবর্তন

অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন দেখে আপনার মন যেমন খুশি, তেমনই আপনার শরীরও এখন বেশ জানান দিচ্ছে আপনার ভেতর আরেকটা অস্তিত্বের খবর। পাশ থেকে আপনাকে দেখে গর্ভবতী বলে বোঝা যেতে শুরু করেছে। জরায়ু বড় হওয়ার সাথে সাথে রাউন্ড লিগামেন্টগুলোতে টান লাগে ও প্রসারিত হয়, ফলে আপনার নিতম্ব, তলপেট ও কুঁচকিতে মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ ব্যথা হবে। ঘাবড়াবেন না, এটা স্বাভাবিক ব্যপার।

এছাড়া প্রথম ট্রাইমেস্টারের মর্নিং সিকনেস কেটে যাওয়ায় আপনি এখন আগের চেয়ে ভালো খেতে পারবেন এবং বেশ এনার্জি পাবেন। তবে ওজন বৃদ্ধির চেয়ে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার বেছে নেয়ার দিকে লক্ষ্য রাখবেন। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এমনটা নাও হতে পারে। আপনি হয়ত ক্লান্ত বোধ করতে পারেন, সেই সাথে খিটখিটে মেজাজের  হতে পারে। যেমনটাই হোক, কিছু কমন প্রেগন্যান্সি সমস্যা এই সময় আপনি অনুভব করবেন।      

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

চুলকানি

পেট ও স্তনের চারপাশে মৃদু চুলকানি এই সময় স্বাভাবিক ব্যাপার যেহেতু আপনার বাড়ন্ত আকৃতিকে ধারণ করার জন্য আপনার ত্বকের চামড়া প্রসারিত হচ্ছে। প্রায় ২০% গর্ভবতী মায়েদের এই সমস্যা হয়। আরাম পেতে গন্ধহীন ময়েশ্চারাইজিং লোশন ব্যবহার করতে পারেন। তবে যদি আপনি প্রেগন্যান্সিতে নতুন র‍্যাশ লক্ষ্য করেন, ত্বকের কোন সমস্যা আরও খারাপের দিকে যায়, এবং র‍্যাশ ছাড়াই অনেক চুলকানি হয় তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবেন।

কম ঘুম হওয়া

ঘুম আসার জন্য সারা রাত এপাশ-ওপাশ করছেন অথচ কোন আরামদায়ক শোয়ার ভঙ্গী খুঁজে পাচ্ছেন না? পাশ ফিরে শুয়ে দুই পায়ের মাঝে বালিশ দিতে পারেন। বাড়তি আরামের জন্য আরও কিছু বালিশ পেটের নিচে ও পিঠের পেছনে দিতে পারেন। গর্ভাবস্থায় আরামদায়ক ঘুমের জন্য আর্টিকেলটি দেখতে পারেন।  

ফোলাভাব

এসময় থেকে আপনার পায়ের পাতায় ফোলাভাব দেখা যেতে পারে। আপনাকে অবশ্যই ব্লাড প্রেসারের প্রতি নজর দিতে হবে। কারণ এটি গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি একলাম্পসিয়ার একটি লক্ষণ। ফোলাভাব যদি হঠাৎ বা তীব্র না হয় এবং ব্লাড প্রেসার যদি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে চিন্তিত হবেন না।  মৃদু ফোলাভাব স্বাভাবিক এবং ডেলিভারির পর চলে যায়। যখন সম্ভব হবে পা উপরে তুলে বসুন। 

বুকজ্বলা বা বদহজম

আপনার বাবু বড় হওয়ার সাথে সাথে আপনার পরিপাকতন্ত্রের উপর চাপ পড়ছে এবং সেটা আর একদম আগের মতো কাজ করতে পারছে না। সমস্যা বোধ করলে আপনার খাবারের দিকে খেয়াল করুন। অম্লজাতীয় ও বেশি মশলা দেয়া খাবার পেটের সমস্যার কারণ হতে পারে।    

পা কামড়ানো বা লেগ ক্রাম্প

বিশেষজ্ঞরা এখনও নিশ্চিত না গর্ভাবস্থায় কেন পা কামড়ানোর সমস্যা হয়। তবে এই সমস্যা কমিয়ে আনতে পর্যাপ্ত পানি পান করবেন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেন খাদ্য তালিকায় থাকে সেদিকে খেয়াল রাখবেন।  

বাচ্চার বৃদ্ধি

আপনার বাবু এই সপ্তাহে প্রায় ৬.৪৬ ইঞ্চি লম্বা। এতদিন পর্যন্ত বাবুর দৈর্ঘ্য মাপা হতো তার মাথা থেকে নিতম্ব পর্যন্ত যেহেতু তার পা শরীরের সাথে ভাঁজ করা অবস্থায় থাকত। তবে এখন থেকে তার দৈর্ঘ্য মাপা হবে মাথা থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত। তার ওজন এখন প্রায় ১০.৫৮ আউন্স। আপনার বোঝার সুবিধার জন্য একটি কলার সমান বড় আকৃতি কল্পনা করতে পারেন।

২০ সপ্তাহে বাচ্চার আকার অনেকটা কলার মতো

এই সময় আপনার বাবুর খুব পাতলা ভ্রুযুগল তৈরি হতে পারে। তার মাথার তালুতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুলও গজাতে পারে। সেই সাথে, তার অনেক টেস্ট বাডই এখন তার মস্তিষ্কে স্বাদের সিগনাল পাঠাতে পারছে। এটা কিভাবে সম্ভব হচ্ছে? আপনি যে খাবার খাচ্ছেন সেগুলোর অণু পরিমাণ অংশ আপনার রক্ত থেকে এমনিওটিক ফ্লুয়িডে প্রবেশ করছে এবং বাবু সেগুলো গিলে ফেলছে। গবেষকরা নিশ্চিত না বাবু এখনই খাবারের স্বাদ পায় কিনা তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে আপনার শিশু পরবর্তীতে কোন খাবারগুলো পছন্দ করবে তা গর্ভাবস্থায় আপনি কী খাচ্ছেন তা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। তাই মায়েরা, ভবিষ্যতে শিশুর খাদ্যাভ্যাসজনিত সুঅভ্যাস গড়তে চাইলে এখন থেকেই পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।  

আপনার ছোট্ট বাবুটা এখনও সাকিং রিফ্লেক্স প্র্যাকটিস করছে, সম্ভবত তার কোন এক আঙ্গুল মুখে পুরে দিয়ে। আপনি যদি এখনও তার হালকা লাথি-ঘুষি অনুভব করে না থাকেন তাহলে হয়ত এই সপ্তাহে সেটা হতে পারে, অথবা আরও কিছুদিন বেশি সময়ও লাগতে পারে। 

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের আল্ট্রাসাউন্ড, যাকে এনাটমি স্ক্যানও বলে, সাধারণত ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের ভেতর শিডিউল করা হয়। এই আল্ট্রাসাউন্ডে দেখা যায় আপনার বাবুর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সঠিকভাবে বড় হচ্ছে কিনা। আপনার সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে সেটাও এই আল্ট্রাসাউন্ডে জানা সম্ভব। সে যদি মেয়ে হয় তাহলে তার ক্ষুদ্র ডিম্বাশয়ে এখনই অসংখ্য ডিম রয়েছে!  

আপনার জন্য টিপস

পরিকল্পনা শুরু করুন

প্রথম ট্রাইমেস্টারের মর্নিং সিকনেস ও দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে আপনি এখন বেশ এনার্জি পাচ্ছেন। একে আগামী দিনগুলোর জন্য পরিকল্পনা করতে ও সেসব বাস্তবায়নে কাজে লাগান। শিশুর জন্য নিমা, কাঁথা, মশারি, রাবার শীট, বেবি রকিং চেয়ারসহ কী কী আপনি কিনতে চান তার একটা লিস্ট তৈরি করে ফেলুন। সেই অনুযায়ী একটু একটু করে শপিং শুরু করে দিন।

তৃতীয় ট্রাইমেস্টার ও ডেলিভারির পর পরার জন্য আরও ঢোলা জামা, সামনে চেইন দেয়া জামা বা ম্যাক্সি জাতীয় পোশাকের একটা লিস্ট করে ফেলুন। একটু একটু করে সেগুলো জোগাড় করতে শুরু করুন। সেই সাথে আরও ভাবুন আপনি কোথায় ডেলিভারি করবেন। আপনার ডাক্তার যে সব জায়গায় প্র্যাকটিস করেন তার মাঝে কোনটা আপনার জন্য সুবিধাজনক হবে সেই নিয়ে ভাবুন।

এই প্রসঙ্গে শুধুই বাড়ি থেকে কম দূরত্বের কথা মাথায় রাখবেন না, বরং কোথায় দক্ষ নরমাল ডেলিভারি টিম আছে, ইমার্জেন্সি (বা যদি প্রযোজ্য হয় তাহলে ইলেকটিভ) সি-সেকশনের ভালো ব্যবস্থা আছে সেসব দেখবেন। নরমাল ডেলিভারি চাইলে অবশ্যই যেখানে ডেলিভারি করতে চাচ্ছেন সেখানের লেবার রুম আগে ঘুরে দেখতে চেষ্টা করবেন। এতে আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন ডেলিভারির দিন। যদি লেবারের সময় কেবিন নিতে চান তাহলে সেই ব্যবস্থা কেমন সেটা জানতে চেষ্টা করবেন। এই সব কিছুর বাছাই নির্ভর করবে আপনি ডেলিভারির সময় কী কী ব্যবস্থা চান বা চান না তার উপর।

এই প্রসঙ্গে একটা বার্থ প্ল্যান তৈরি করতে পারেন যেখানে উল্লেখ থাকবে আপনি লেবার ও ডেলিভারির সময়টা কীভাবে পার করতে চান। যেমন, আপনি কি শুয়ে থাকবেন পুরো সময় নাকি লেবারের সময় যতক্ষণ সম্ভব হাঁটাহাঁটি করবেন, লেবারকে স্বাভাবিক গতিতে অগ্রসর হতে দেবেন নাকি হাসপাতাল স্টাফদের রুটিনমাফিক পিটোসিন দিতে দেবেন, ব্যথা সামলানোর জন্য আপনি কি কোন ফার্মাসিউটিক্যাল মেডিসিনের সহায়তা নেবেন নাকি প্রাকৃতিক পদ্ধতি যেমন তলপেট থেকে গভীরভাবে শ্বাস নেয়া অবলম্বন করবেন, ডেলিভারির সময় কি রুটিনমাফিক এপিযিওটমি করতে দেবেন নাকি একে প্রত্যাখান করবেন।

এই সব কিছু নিয়েই আপনাকে আগে থেকে ভেবে রাখতে হবে, এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করে জানতে হবে, প্রয়োজনে লিখে রাখতে হবে এবং এটাই হবে আপনার বার্থ প্ল্যান। সেই সাথে, অবশ্যই নরমাল ডেলিভারিতে দক্ষ ও আগ্রহী এমন ডাক্তারের খোঁজ করবেন ও তাঁর সাথে এই বার্থ প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করবেন। সেই ডাক্তারের প্রাকটিসের জায়গা আপনার বাসা থেকে দূরে হলে কী ব্যবস্থা নিতে পারেন সেসব নিয়ে ভাববেন। 

সক্রিয় বা একটিভ থাকুন 

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের এনার্জিকে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে কাজে লাগান। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে গর্ভকালীন ব্যায়াম করুন। আপনি যে হাসপাতালের ডাক্তারকে দেখাচ্ছেন সেখানে গর্ভকালীন ক্লাস আছে কি না খোঁজ নিন। অথবা কোন অনলাইন গর্ভকালীন ক্লাসে যোগ দিন যেখানে গর্ভকালীন ব্যায়াম করানো হয়। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে প্রতিদিন হাঁটতে বের হন। এতে মানসিকভাবেও ভালো থাকতে পারবেন। সেই সাথে কেগেল ব্যায়াম করতে মনে রাখবেন। 

ব্রাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন নিয়ে জানুন

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার থেকে আপনি এটা অনুভব করতে শুরু করবেন। এর ফলে প্রসবব্যথার মতো কনট্রাকশন হবে কিন্তু এটা আসল লেবার না যার ফলে বাচ্চার জন্ম হয়। এমনটা অনিয়মিতভাবে হয়, আপনি এতে অস্বস্তি বোধ করবেন এবং সবার এটা হয় না। এটা শুরু হয়ে নিজেই থেমে যাবে, তবে যদি দীর্ঘসময় ধরে হয় তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবেন এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে কি না বোঝার জন্য। ব্রাক্সটন হিক্স বা ফলস পেইন নিয়ে আরো জানতে এই লেখা পড়ুন

তথ্যসূত্র 

ছবি কৃতজ্ঞতা: BabyCenter

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন
এফসিপিএস(অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলজি)
কনসালট্যান্ট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা