আমার আলী

লিখেছেন Samantha Saberin Mahi

আলী আমার ৩য় সন্তান। ওর বড় আব্দুল্লাহ , আমার বড় ছেলে। আর ওর বড় আঈশা, আমাদের মেয়ে। আলহামদুলিল্লাহ। আলী পেটে আসার আগে অনেক পরিকল্পনা , অনেক কিছু করেছি যেমনঃ ডায়েট কন্ট্রোল , এক্সারসাইজ , হাটা ইত্যাদি। যাতে ফিট থাকি , আলহামদুলিল্লাহ ফিট ছিলাম এবং আছি। আলী পেটে আসার ২ মাস আগে একটা মিসক্যারেজ হয়। তবে আলহামদুলিল্লাহ D&C লাগে নাই। ডাক্তার বললেন এরকম হতে পারে , অনেকে বোঝানো না তবে আমি বুঝতে পেরেছি এই যা। তবে অনেক কেঁদেছিলাম , খুব কষ্ট লেগেছিলো। তাই ওজন কমানো বা যে পরিকল্পনা মত এগোচ্ছিলাম সব বাদ দিয়ে সন্তান চাচ্ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ ২মাস পরেই আলীর খবর পেলাম। সবকিছু ঠিকঠাক যাচ্ছিলো। তবে মধ্যে ভয়ানক গরম পড়লো। রাতে গরমে ঘুমাতে পারলাম না। এসি ছিল না। গায়ে, পায়ে হালকা পানি আসলো। কিন্তু ব্লাড প্রেসার নরমাল। খুব একটিভ থাকার চেষ্টা করেছি , ছিলামও।

চট্টগ্রাম গেলাম বেড়াতে শশুরবাড়ি। আসার পরের দিন হঠাৎ আঈশার বাবা অফিস থেকে কল করে বললো "তোমার মনে হয় অনেক পানি চলে এসেছে একটু প্রেসারটা মাপো তো। " প্রেসার মাপলাম , ১০০/১৫০!! ও কে ফোন করে জানালাম। ডাক্তার দেখলাম, ওষুধ দিলেন। ২ সপ্তাহ কন্ট্রোল থাকলো তারপর আবার বেশি। ডাক্তার বললেন ভর্তি হতে, মনিটরে রাখতে হবে। ওষুধের ডোজ বাড়াতে হলো। প্রেসার কন্ট্রোল হলো। ডাক্তার বললেন আল্ট্রাসাউন্ড করা লাগবে , দেখতে হবে বাচ্চা ঠিকভাবে বাড়ছে কি না। আল্ট্রাসাউন্ড করানোর জন্য নেয়া হলো। তাতে দেখাচ্ছে আলী ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়েছে কিন্তু আমার তখন চলে ৩০ সপ্তাহ ! সোনোগ্রাফার ম্যাডাম ২০ মিনিট ধরে দেখলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম , " ম্যাডাম, আমার বাবু ঠিক আছে?" উনি বললেন, " হুম! তবে ছোট" খুব চিন্তিত মনে হলো ওনাকে। আমাকে রুমে আনার পর একটু শুয়েছি ঠিক তখনি, আমার গাইনি ডাক্তারের সহযোগী আরেকজন ডাক্তার পুরা টীম নিয়ে আমার রুমে ঢুকলেন। আমার বড় বোন ছিল সেইদিন হসপিটালে। আঈশার বাবা আমাকে রুমে দিয়ে সবে রওনা হয়ে গেলো অফিসের দিকে। ওনারা এসেই আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন আমার বোন কে। তারপর বললেন আজকেই সিজার করতে হবে আমার আলীর রিস্ক হয়ে যাচ্ছে। আমার বোন বললো যে ওর ( আমার বোনের) প্রথম বাচ্চার সময় প্রেসার হাই ছিল কিন্তু ডাক্তার রা অপেক্ষা করেছেন ৩২ সপ্তাহ পর্যন্ত। তখন ডাক্তার রা বললেন আমার প্লাসেন্টা ম্যাল ফাংকশন করছে। বাচ্চা পেটে বাড়া বন্ধ হয়ে গেছে। ওর ব্রেন এ শুধু ব্লাড ও অক্সিজেন যাচ্ছে , নিউট্রিশন যাচ্ছে না। এই কন্ডিশন কে IUGR ( Inter Uterine Growth Retardation ) বলে। যদি এই অবস্থা থাকে তাহলে ষ্টীল বার্থ হতে পারে। তক্ষুনি আমার হাসব্যান্ড কে ডেকে আনার কথা বললেন। আঈশার বাবা পথেই ছিল। ও ব্যাক করলো সাথে সাথেই।

আমি কিন্তু শুয়ে শুয়ে শুনছি সব। আমার মনে হচ্ছিলো সবকিছু কেমন ওলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে। আমার আলী কে বের করে ফেললে অনেক কিছুই হতে পারে! আমি কাঁদলাম , আমার বোন কে জিজ্ঞেস করলাম " কেন?" ও বললো " আপু ধৈর্য্য ধরো ইনশাআল্লাহ , আল্লাহ সাথে আছেন।" তখন মনে পড়লো হাসপাতালে আমার রুমের (room no : ৮১৭-A এন্ড B আমি ছিলাম বেড A তে ) পাশের বেডের মেয়েটার কথা, মাত্র ২৬ বছর বয়স , বিয়ের বয়স ৮ বছর। ৮ বছরে ২টা বাচ্চা মারা গিয়েছে। prematurely হয়ে যায় ওর। পেইনলেস কন্ট্রাকশন্স হয়। uterus ধরে রাখতে পারে না। তাই ৩য় বাচ্চার জন্য হসপিটালেই আছে , যে কোনো ইমার্জেন্সি তে যাতে কিছু করা যায়. ( আলহামদুলিল্লাহ ওর বাচ্চা হয়েছে , ভালো আছে, আল্লাহ যেন হায়াত দেন আর নেক মুসলিম হতে পারে দোআ রইলো ) ওর কথা ভেবে নিজেকে স্বান্তনা দিচ্ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ বললাম। জোহর ও আসর সালাহ জমা করে পড়লাম।প্রতিটা সিজদাহ মনে হচ্ছিলো জীবনের শেষ সিজদাহ। আম্মু, আব্বু , আমার ছোট বোন, ছোট মামা আসল। আমার যেই বাবা যে কোনো বিপদে সবসময় সবার আগে বলে,"তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ " , সে আজকে এসে কিছু বলতে পারছে না। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে নির্বাক হয়ে আছে। আমি বললাম ," বাবা, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ". বাবা কিছু না বলে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। আম্মুকে দেখে শুধু বললাম ," মা, আমার আলী যদি থাকে তাহলে যেন সুস্থ থাকে আর না থাকলে যেন আমাদের জন্য শাফায়াত করে এই দুয়া করো। " আম্মু বললো ," অবশ্যই মা"..... আমরা সবাই কাঁদলাম। আমার স্বামী কে আল্লাহ রহমত করেন , ও হাসি মুখে ছিল। আমাকে সবাই অনেক সাহস দিলো। আমাকে যখন OT এর জন্য রেডি করে wheelchair এ বসানো হলো, আমি চিৎকার করে বলতে চাচ্ছি ----" আমাকে নিয়ো না। আমি যাবো না। আমার আলী অনেক ছোট্ট। কিন্তু মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারছিনা।

আলহামদুলিল্লাহ স্কয়ার হাসপাতালের পুরা টীম অপরিসীম সাহস দিয়েছেন এবং আমার পর্দার পূর্ণ হিফাজত নিশ্চিত করেছে আলহামদুলিল্লাহ। OT তে যাওয়ার পর থেকেই অনেক সাহস পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ডাক্তার আসলেন আর বললেন ,"কি করবো বলেন রিস্ক হয়ে যাচ্ছিলো, আল্লাহ চাইলে সব ঠিক হবে ইনশাআল্লাহ। " উনি অপারেট করছেন আমি শুনছি বলছেন ," এই টুকু একটা সাইজ আবার শক্তি দেখায়।" কথাটা শুনে খুব ভালো লাগলো। মনে হলো আলহামদুলিল্লাহ আমার আলী দুর্বল না। ম্যাডাম আমার বাচ্চাটাকে এক ঝলক দেখালেন। NICU এর ডাক্তার ছিলেন ভিতরে, উনি হ্যান্ডওভার নিলেন আলীর। আলী কে নিয়ে যাওয়া হলো। ওর কান্না শুনছিলাম। পোস্ট অপারেটিভ এ নার্স রা খুব ভালো ছিলেন। আমার প্রতি সবাই খুবই সহানুভুতিশীল ছিলেন। আমি খুব অস্থির ছিলাম আলীর কোনো খবর পাচ্ছি না। বের হয়েই দেখি আঈশার বাবা দাঁড়িয়ে হাসছে , আমাকে বললো ," মাশাআল্লাহ , কি বাচ্চা জন্ম দিসো? ওর ওজন ১.০৬২ কেজি। লাইফ সেভিং একটা ইনজেকশন লাগে premature বেবিদের , ওর সেটা লাগে নাই, লাইফ সাপোর্ট লাগে নাই। শুধু। ০.২লিটার অক্সিজেন লাগছে।" আমি বললাম ," আল্লাহ দিসেন, আল্লাহু আকবার" আলহামদুলিল্লাহ। তখনি বুঝেছি আমার আলী স্পেশাল বাচ্চা। আল্লাহর প্রিয় ইনশাআল্লাহ।

পুরোটা পড়তে সহজে লগিন করুন

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ সেপ্টেম্বর 24, 2017