ডিভাইস: শুধু "বিগ নো" বললেই কি সমাধান?

গল্পটা এমন…
বাচ্চাটা যথেষ্ট মেধাবী। পড়াশোনা, স্কুলে যাওয়া—সবই একদম নিয়মিত। হঠাৎ করেই বাবা-মা লক্ষ্য করলেন, বাচ্চাটা আর আগের মতো ভালো ফলাফল করছে না। এমনকি স্কুল থেকেও অভিযোগ আসছে, সে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে না।
বাবা-মা অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে…

তারপর খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, বাচ্চাটা আসলে প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে না। স্কুলের নাম করে বের হয়ে পথিমধ্যে একটি সাইবার ক্যাফেতে বসে গেম খেলছে।

বাবা-মা একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তিনি বাচ্চাটিকে পুরোপুরি গেম থেকে দূরে রাখতে বললেন না। বরং বুঝিয়ে বললেন, "তুমি বাসায় বসে গেম খেলতে পারবে, তবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। বাকি সময় পড়াশোনা করবে এবং নিয়মিত স্কুলে যাবে।"
এরপর বাবা-মা একটি রুটিন তৈরি করে দিলেন, এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করল।

এই ঘটনাটি একটি ইসলামিক প্যারেন্টিং বইয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে প্রত্যেক শিশুর পরিস্থিতি এক রকম নয়। তাই সমাধানও পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

অনেক অভিভাবকই আজকাল ডিভাইসকে "বিগ নো" মনে করে একেবারে নিষিদ্ধ করে দেন। একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন শিশু আশপাশে—এমনকি নিজের বাসাতেও—মানুষকে ডিভাইস ব্যবহার করতে দেখে।
তখন সে বুঝতে শেখে, এই ডিভাইসের ভেতরে মজার ছবি, ভিডিও ও গেম রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়।
এরপরও যদি সে শুধু "ডিভাইস মানেই নিষেধ"—এই বার্তাই বারবার পায়, তাহলে শিশুর ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ফলে বাসায় সুযোগ না পেলে সে স্কুলে, বাইরে কিংবা অন্য কারও ফোনে লুকিয়ে ডিভাইস ব্যবহার শুরু করতে পারে। এতে সে ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের কাছে মিথ্যা বলা, কথা লুকিয়ে রাখা বা বিশ্বাসের সম্পর্ক দুর্বল করার মতো আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ডিভাইসের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানি। তারপরও বাস্তবতা হলো, বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক পরিবারের পক্ষেই সন্তানকে সম্পূর্ণ ডিভাইসমুক্ত রাখা খুবই কঠিন।

তাই শুধু "বিগ নো" বলার পরিবর্তে বয়স অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং সঠিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে ডিভাইস ব্যবহার শেখানো বেশি উপযোগী হতে পারে।

তাকে ডিভাইসের ভালো ও ক্ষতিকর—দুই দিকই বুঝিয়ে বলুন। কোন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে হবে এবং কেন এড়িয়ে চলতে হবে, সেটাও শেখান। এরপর পরিষ্কার নিয়ম ঠিক করুন—কতক্ষণ ব্যবহার করা যাবে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখা যাবে এবং কোন সীমাগুলো মানতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার আগে নিজেদের অভ্যাসও ঠিক করুন। কারণ শিশুরা কথার চেয়ে কাজ থেকেই বেশি শেখে। তারা বড়দের আচরণই সবচেয়ে বেশি অনুকরণ করে।

আমাদের লক্ষ্য শুধু সন্তানকে ডিভাইস থেকে দূরে রাখা নয়; বরং এমনভাবে ব্যবহার শেখানো, যাতে সে আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে পারে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক বজায় থাকে।

সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছেঃ জুলাই 16, 2026