ঠিক এই মুহূর্তে আমার মন চাইছে, সাত মাসের বাচ্চাটাকে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলি।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, রাত তিনটা বেজে পনেরো মিনিট।
অস্থির লাগছে।
আমি আর নিতে পারছি না। মাথাটা যেন ফেটে যাবে মনে হচ্ছে। মাথার দু’পাশের রগ টনটন করছে। চোখ দুটো অনবরত জ্বালা করছে।
দ্রুত বাচ্চাটাকে বিছানায় ফেলে বাথরুমে গিয়ে হরহর করে বমি করে দিলাম।
এত রাত, অথচ এই মুহূর্তে আমার পাশে কেউ নেই।
বাথরুমে কতক্ষণ ঝিম মেরে বসে আছি, জানি না।
কানে তালা মেরে গেছে। বাচ্চাটার তীব্র স্বরে কান্না আমার মগজে আর ঢুকছে না।
কতক্ষণ এমন মরার মতো ছিলাম, মনে নেই।
খেয়াল করলাম, আমি রুমের দরজা পেছন থেকে চাপিয়ে বারান্দায় বসে ঝুঁকে বাইরের অন্ধকার দেখছি।
ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছি।
ঐ যে, গলির দোকানের সামনে একটা লাইট জ্বলছে।
বাচ্চাটার শব্দ কানে আসছে না আর।
উঠে রুমে গেলাম।
ঘুমিয়ে গেছে।
এত অসহ্য লাগে বাচ্চাটাকে।
আমারই বাচ্চা।
ভালো লাগে না। নিজের মরে যেতে ইচ্ছে করে।
কেন যে বাচ্চাটা হয়েছিল!
কত মানুষ বাচ্চা চেয়ে আকুল হয়। সৃষ্টিকর্তা তো তাদের দিতে পারতেন।
এখন আমার শব্দ ভালো লাগে না। শোরগোল, হৈচৈ—কিছুই ভালো লাগে না।
অনার্সে পড়ি। থার্ড ইয়ার।
গত বছর বিয়ে হয়েছে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ।
মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ের বিয়ে হয়েছে নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরে।
কপালে থাকলে কী আর করা যাবে!
সব বাবা-মাই চায়, নিজেদের চেয়ে অবস্থাসম্পন্ন পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিতে।
শুনেছিলাম, ছেলে মামার সাথে পার্টনারে ব্যবসা করে। কিন্তু বিয়ের পর দেখি, ও মামার ওখানে চাকরি করে।
বাবা নেই। বৃদ্ধ মা নিয়ে ওর সংসার।
শাশুড়ি নিজেই অসুস্থ। কোনওরকমে চলাফেরা করতে পারেন।
আমার বর অন্য শহরে থাকেন। সপ্তাহে একদিন বাড়িতে থাকেন। কোনও কোনও সপ্তাহে কাজের চাপ থাকলে আসেন না।
আমার খারাপ লাগে না। উনি না এলে ঐ সপ্তাহে কাজের চাপ কম হয়।
উনি আসার আগে ভাগে আমার নাক-মুখ খিঁচে কাজ করা লাগে।
রান্নাবাড়ার খুব আধিক্য না থাকলেও তখন বাসার আনাচকানাচে পরিষ্কার করতে হয়।
আমার শাশুড়ি ভালো মানুষ। কথা খুবই কম বলেন।
নিজের রুমে সারাদিন পড়ে থাকেন।
তিনটা-চারটায় খেতে দিলেও কিছু বলেন না।
নির্জীব মানুষটার জন্য আমার মায়া লাগে।
চেষ্টা করি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর উনার সামনে কিছু খাবার দিয়ে আসতে।
উঠে দাঁড়াতে গেলেই কাঁপতে থাকেন।
কাঁপা কাঁপা পায়ে লাঠিতে ভর দিয়ে অজু-গোসল সারেন।
কোনওদিনও আমার জন্য গোসলের কাপড় ফেলে আসেন না।
বারান্দার এক কোণে কাপড় ফেলে রাখেন। পানি এমনিই ঝরে, দুদিন পরে শুকিয়ে যায়। আবার সেটা পরেন।
আমার মনে পড়লে, চোখে দেখলে অবশ্যই সাথে সাথে আম্মার কাপড় তুলে তারে নেড়ে দিই।
ইদানীং আমি সবকিছু ভুলে যাই।
বিয়ের পরপরই না চাইতেই বাচ্চা কনসিভ হয়ে গেছে।
স্বামী বাড়িতে থাকে না। শাশুড়িকে ফেলে বাপের বাড়ি চলে যেতেও বিবেকে বাধত।
আমি বেশিরভাগ সময়ই এখানে থাকতাম।
আম্মা আরেকটু শক্ত-সামর্থ্য ছিলেন।
বমি করে যখন আমি আধমরার মতো বিছানায় লেপ্টে থাকতাম, উনি কাঁপা কাঁপা হাতে আমার জন্য ডিম ভাজতেন।
ভাতের পাতিলটা একটা ঝুড়িতে উল্টে দিয়ে মাড় ঝরাতেন।
ক্লিষ্ট আমি ঘুমিয়ে যেতাম। খুব মাথা ঝিমঝিম করত।
ঘুম থেকে উঠে আম্মার রান্না করা ভাত খেতাম।
আমার খুব মায়া লাগত।
এই মানুষটাকে ফেলে রেখে আমি কিছুতেই বাড়ি যেতে পারতাম না।
মাঝেমধ্যে উনি নিজেই আমাকে জোর দিয়ে বাড়ি যেতে বলতেন।
নিজে একলা থাকলে আরও কষ্ট পাবেন। সবসময় তো রেঁধে খেতে পারেন না।
আমিই রান্না করি।
তবু উনি চাইতেন, আমি যেন বাপের বাড়িতে গিয়ে আরেকটু ভালোমন্দ খেতে পারি।
আমার ছাপোষা জীবনের কথা আমি কাউকে বলি না।
বাপ-মা বুঝেও না বোঝার ভান ধরেন।
আমি ভাগ্যকে মেনে নিয়ে এখানেই পড়ে থাকি।
আমার স্বামীর আচরণ আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
জানি না, বাচ্চা আসার খবরে সে খুশি হয়েছে কিনা।
থমথমে মুখে শুধু বলেছিল, “নিজের খেয়াল রেখো।”
একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাসও গোপন করল মনে হলো।
অভাবের সংসারে অনাকাঙ্ক্ষিত বাচ্চা বিড়ম্বনার।
সেবার চলে যাওয়ার পরে পরপর দু’সপ্তাহ সে বাড়ি আসেনি।
মাসের শেষ সপ্তাহে বাড়ি এসেছে। কিন্তু কোনও উচ্ছ্বাস নেই।
মাসের বাজার একসাথে করে দিয়ে গেছে।
এইবার বাজারের সাথে নুডুলসের প্যাকেট, পেয়ারা, আমলকি বাড়তি ছিল।
রাতে আমার সাথে কোনও কথা বলেনি।
অপেক্ষায় থেকে আমি একসময় ঘুমিয়ে পড়েছি।
পরদিন চলে গেছেন, আমার মনে আছে।
বুঝতে পারছিলাম না, উনি বাচ্চা আসার খবরে এত শীতল কেন হয়ে গেলেন।
হয়তো অল্প আয়ই কারণ হবে।
মাস শেষ হওয়ার আগেই আমার স্বামী আবার বাজার করে দিয়ে যেতেন।
হয়তো টাকা আছে, অথবা টাকা নেই।
আমি কিছুই জানি না।
উনার সাথে আমার জানাশোনাও কম।
বাচ্চা পেটে আসার পর থেকে কথা হয় আরও কম।
কী কথা বলব ভেবে গুছিয়ে নিতে নিতেই উনি লাইন কেটে দিতেন।
আর কোনওরকম বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই প্রেগন্যান্সির সময়টা কেটে গেছে।
তবে বেশ অসুস্থ ছিলাম।
শেষের দিকে পেট এত বড় হয়ে গিয়েছিল যে, পেট নিয়ে হাঁটতে কষ্ট হতো।
নড়তেও কষ্ট হতো।
সাপের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে কাজকাম করতাম।
বাপ-মা আগ বাড়িয়ে কষ্ট ভাগ করতে আসেননি।
জানি, উনাদেরই বহু ব্যস্ততা।
আরেকটা কষ্ট ছিল।
স্বামী মানুষটা ভালোমন্দ কিছুই বলতেন না। শুনতেনও না।
আমার জীবনটা যেন শুধু আমাকেই একা বয়ে বেড়াতে হবে।
ডেলিভারির দিন যত ঘনিয়ে এলো, আমার তত চিন্তা হতে লাগল।
একেক সময় একেক রকম চিন্তা হতো।
কখনও পজিটিভ, কখনও নেগেটিভ।
কখনও মনে হতো, আর তো কয়টা সপ্তাহ। তারপর শান্তি। পেট খালি হয়ে যাবে, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচব।
আবার মনে হতো, বাচ্চাটা হওয়ার পরে যদি একটু মুক্তি পেতাম!
মানুষ বড় একটা রোগ ভোগের পর যেমন একটা বিশ্রাম পায়, অমন।
প্রেগন্যান্সিও তো একটা ক্লান্তিকর জার্নি।
অথচ ডেলিভারির পর এই ক্লান্তির জার্নিটা শেষ হয়ে যায় না, বরং দ্বিগুণে শুরু হয়।
এই ঘরে মারপিট নেই। নীরব অশান্তি আছে।
কিন্তু মনের কোথায়, কী জন্য অশান্তিটা কাটা দেয়—আমি ধরতে পারি না।
অশান্তি কেন লাগে, সেটারও মোটাদাগে কোনও কারণ খুঁজে পাই না।
স্বামীকে তেমন জানি না।
কিন্তু বুঝি, উনি আমাকে ভালোবাসেন।
দায়িত্বশীল মানুষ।
আর খুবই পরিচ্ছন্ন।
উনি আসার আগে আমি বাসা ক্লিন করতে চেষ্টা করি।
হয়তো উনার পরিচ্ছন্নতা পছন্দ, তাই সেই রাস্তাতেই উনার মনের কাছে যেতে চাই।
বাচ্চা হয়।
দেড়দিন থেমে থেমে ডেলিভারি পেইন হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নরমালে হওয়ানো সম্ভব হয় না।
সিজার লাগে।
আমার মা কয়দিন এসে আমার ওখানে থেকে যান।
উনিও সংসারী মানুষ।
চাপা স্বভাবের আমার কষ্ট মাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যেচে বুঝতে চান না।
আমার বাচ্চা সারারাত জেগে থাকে।
কান্না করে।
মার অসুস্থ লাগে।
উনিও বয়স্ক।
হাই-প্রেশারের মানুষের এভাবে নিয়মিত রাত জাগা সম্ভব নয়।
মা চলে যেতে চান।
আমিই বলি, “আমি পারব। আপনি যান।”
কাজের মানুষ পার্মানেন্টভাবে রাখা সম্ভব নয়।
পেটে-ভাতে এখন আর কেউ কাজ করে না।
বাচ্চাটার বয়স সাত মাস।
এই পর্যন্ত একটানা দুই ঘণ্টা আমি ঘুমাতে পারিনি।
সারাক্ষণ বুকের দুধ খেত।
হয়তো পেট ভরত না বলে সারাদিন জোঁকের মতো বুকে লেগে থাকত।
আমি সময়মতো রান্না করতে পারতাম না।
ভিন্ন ভিন্ন আইটেম তো একেবারেই না।
নিজের রান্না দেখলে নিজেরই অরুচি লাগত।
কিন্তু মজা করে রান্না করার সময়, শক্তি—কোনোটাই আমার নেই।
পেটের ক্ষুধায় পেটে কিছু চালান করি।
আমার শাশুড়ি আরও অসুস্থ হয়ে গেছেন।
পারকিনসন্স রোগী।
আগে হাত-পা অতিরিক্ত কাঁপত। এখন শরীরের এক পাশ শক্ত হয়ে থাকে।
হাঁটতে-চলতে শক্তি পান না। গলার স্বরও ক্ষীণ হয়ে আসছে।
খেয়েছেন কি খাননি, কিছুই মনে করতে পারেন না। স্মৃতিভ্রম হয়েছে সম্ভবত।
ক্ষুধায় পেট জ্বলতে থাকলে বলেন, “বৌ, কিছু আছে?”
আমার খুব কান্না পায়।
আমি মানুষটাকে কিছু খেতে দিই।
আমার স্বামীকে মায়ের চিকিৎসার জন্য এখন আরও বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়।
উনি সন্তানের জন্য তোলা দুধের চিন্তাও করেন না।
আমার বড় পেরেশান লাগে।
সারাটা দিন একলা বাচ্চাটা টানতে টানতে ক্লান্ত লাগে।
রান্না গোছানো।
কিছু একটা রান্না করা।
দুই-চার দানা করে বাচ্চাকে তিলে তিলে খাওয়ানোর শক্তি, ধৈর্য—কোনোটাই কাজ করে না আমার।
বাচ্চা ঘুমিয়ে গেলে ওর গু-মুত, বমির কাপড়, রান্না, ঘর পরিষ্কার—সব এক হাতে করতে হয়।
কাজ শেষ করতে করতে আবার ও জেগে ওঠে।
এভাবেই ওর ঘুম আমার কাজ।
আমার ঘুমের সময় আর ওর জেগে ওঠা নিয়ে সময় চলছে সাত মাস।
আমার কেউ নেই।
একটা জীবন বাঁচিয়ে রাখার দায় শুধু আমার।
কোনও এক ভুল সময়ে জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্যারাকে আমি বহন করে চলেছি।
কতদিন বই ধরি না।
এক মহাকাল ধরে শান্তিতে ঘুম, গোসল, খাওয়া—কিছুই পারি না।
আজ তিনদিন ধরে টানা কেঁদেই যাচ্ছে।
ডাক্তার দেখিয়েছি।
তেমন রোগ নেই।
ভিটামিনের ওষুধ দিয়েছেন। খাওয়ালে ওর রুচি বাড়বে।
খাবে।
কম কাঁদবে।
দুনিয়াটাই বিষাক্ত লাগে।
আমি বুঝি, আমার শরীর-মন কিছুই ঠিকঠাক নেই।
কিন্তু আমার কিছুই ঠিকঠাক নেই—এটা বোঝারও কেউ নেই।
মনে হয়, বাচ্চাটাই ধকলের একমাত্র কারণ।
হয় আমি মরে যাই, অথবা ওকে মেরে ফেলি।
মধ্যবর্তী আর কোনও রাস্তা খুঁজে পাই না।
আমি খেতে নিলে ও হাগু করে সারা করে।
হাগু ধুয়ে সারতে না সারতেই বমি করে বালিশ-কাঁথা নষ্ট করে।
গোসল করতে নিলে খাট থেকে পড়ে যায়।
এসবের মাঝে নিজেকে খুবই তুচ্ছ কীট মনে হয়।
নিজের জন্য এক-দুই সেকেন্ড বাড়তি খরচ করতে পারি না।
আমার খুব সম্ভবত হ্যালুসিনেশন হয়।
রাতের বেলায় দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে আসতে আসতে আমার দরজায় স্থির হয়।
এটি ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে।
এখন অপরিচিত শব্দটাকে আমার নামের মতো মনে হয়।
মনে হয়, আমার নামেরই প্রতিধ্বনি ঐ শব্দটা।
এখন শব্দটা আর দরজায় থামে না।
আমার মাথায় এসে স্থির হয়, একটু থামে।
আবার সেই দূর থেকে শব্দটা আসতে থাকে।
এই সমস্যা আরও বেড়ে গেছে।
এখন আমি সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারি না।
প্রতিরাতে ভোরের দিকে হরহর করে বমি হয়।
আবছা একটা ফাঁসির দড়ি দেখি।
দড়িটা আগে দৃষ্টিসীমায় থাকত।
আবছা।
আবছা থেকে স্পষ্ট হয়।
এখন দড়িটা নিজে নিজেই ভেসে আসতে আসতে আমার সিলিং ফ্যানের মধ্যে স্থির হয়।
ফ্যান অনবরত ঘোরে, কিন্তু আমি দড়িটাকে স্থির দেখতে পাই।
“পোস্টপার্টাম সাইকোসিস”
Farida Ali Khan
Narayanganj
