গর্ভাবস্থা ও প্রসব, হোক সেটা স্বাভাবিক বা সিজারিয়ান, একজন মায়ের শরীরে লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন এনে দেয়। এই পরিবর্তন যেমন বাইরে থেকে বোঝা যায়, তেমন সে নিজেও এটা অনুভব করে। গর্ভাবস্থায় শারীরিক উপকারিতার কথা ভেবে অনেকে ব্যয়াম করার প্রতি সচেতন থাকলেও, প্রসবোত্তর অবস্থায় ক্লান্ত শরীরে ও সেই সাথে নতুন মা হয়ে ওঠার বিহ্বলতায় অনেকের কাছে এই বিষয়টা প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না। কিন্তু সামান্য সচেতনতা ও সময় দেয়া পারে প্রসবের পরও শারীরিক ও মানসিকভাবে আপনাকে ভালো অনুভব করাতে।

সন্তান জন্ম দেয়ার পর একজন মা প্রসবোত্তর সময়ে প্রবেশ করেন যার স্থায়িত্বকাল  প্রায় ৬ সপ্তাহ। এই সময়ে মায়ের বেশ কিছু শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হতে পারে। গর্ভাবস্থা ও প্রসবের কারণে মায়ের ওপর যে চাপ ও ব্যথার সৃষ্টি হয় তার জন্য  প্রসবোত্তর নাজুক শরীরকে আবার পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে প্রায় ৬ থেকে ৮ মাসের মতো সময় লাগে। সেই সাথে গর্ভবতী মা হরমোনজনিত অসামঞ্জস্যতার সম্মুখীন হতে পারেন যা সরাসরি তার মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে একজন নারীর মাঝে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায় যার কয়েকটা নিচে তুলে ধরা হলো –

শারীরিক পরিবর্তন

  • চুল পড়া
  • পেটে চর্বি জমা
  • হাত ও পা ফোলা
  • যোনিপথে ব্যথা
  • গায়ের রং পরিবর্তন হওয়া
  • সংবেদনশীল স্তন

 

মানসিক পরিবর্তন

  • কর্মশক্তির অভাব
  • কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
  • ঘুম না আসা
  • অস্থির ও বিরক্ত বোধ করা
  • নিজেকে একা, দুঃখী, হতাশ ও দোষী মনে করা
  • সারাক্ষণ কান্না পাওয়া

তবে, যদি আমরা কিছু টিপস ও ব্যয়াম মেনে চলি তাহলে এসব পরিবর্তন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ।

 

প্রসব পরবর্তী মায়ের যত্ন

প্রসব পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে সিজারের পর হাসপাতাল ছাড়ার আগে নিশ্চিত করুন যে বেডের পাশের হাতল না ধরেই আপনি সহজভাবে বিছানা থেকে উঠানামা করতে পারছেন। বিছানা থেকে নামার সময় কাত হয়ে, পা ঝুলিয়ে দিয়ে ভর প্রয়োগ করে বসুন (গর্ভাবস্থায় যেমন করতেন অনেকটা তেমন)।

 

ঘরের কাজ করার সময় সহজ কাজ দিয়ে শুরু করুন। আপনার প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন কাজের সবই আপনি প্রথম সপ্তাহ থেকে করতে পারবেন তবে কিছুতা ধীরগতিতে, দ্রুতলয়ে নয়। দীর্ঘ সময় বাঁকা হয়ে থাকা লাগে, শরীর মোচড়ান লাগে বা বার বার একই ভঙ্গীতে নড়তে হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। ছয় সপ্তাহ ভারী কিছু তুলবেন না। আপনার বাচ্চার যতটুকু ওজন সেই পরিমাণ ওজন পর্যন্ত জিনিস তুলবেন। আপনার তলপেটের পেশী সবসময় মজবুত বন্ধনী দিয়ে বেঁধে রাখবেন। পেশীগুলো সক্রিয় আছে যদিও সেগুলো ধীরে ধীরে সেরে উঠছে।

পিঠের যত্ন

পিঠের যত্ন নেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ গর্ভাবস্থা আপনার পিঠকে আঘাত পাওয়ার প্রতি অপ্রতিরোধ্য করে দেয়। গর্ভাবস্থার পরের কয়েক মাস আপনার পিঠকে আরও সুদৃঢ় করতে ও সুরক্ষিত রাখতে এর যত্ন নিতে হবে। সাধারণভাবে, অতিরিক্ত কোমর বাঁকানো ও ভারী কিছু তোলা থেকে বিরত থাকবেন।

ভারোত্তোলন পদ্ধতি

  • যা তুলবেন তার যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব যান।
  • পিঠ বাঁকা করার চেয়ে হাঁটু গেড়ে বা উবু হয়ে বসুন।
  • তোলার আগে ও তোলার সময় পেট ও পেলভিক ফ্লোরের পেশী টানটান করুন।
  • মাথা উঁচু রাখুন যার ফলে আপনার মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক বজায় থাকবে।

 

বাচ্চার ন্যাপি পাল্টানো

বাচ্চার ন্যাপি, কাঁথা, কাপড় পাল্টানোর সময় বাচ্চাকে আপনার কোমর সমান উঁচু কিছুর ওপর রাখুন যেন আপনাকে ঝুঁকতে না হয়। সেটা সম্ভব না হলে বিছানার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কাজটা করুন যেন পিঠের উপর চাপ না পড়ে।

 

বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময়

বসার সময় নিশ্চিত করুন যে আপনার পা মেঝের সাথে সমান্তরাল অবস্থায় আছে। আপনার কোমরের পেছনে ও কনুইয়ের নিচে বালিশ ব্যবহার করুন। পিঠ সোজা রাখুন। দীর্ঘ সময়ের জন্য মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে রাখবেন না। মাঝে মাঝেই আপনার ঘাড় উপর- নিচ করুন এবং সামনে-পেছনে নাড়ুন। তাতে আপনার ঘাড় ও পিঠ ব্যথামুক্ত থাকবে।

 

নতুন মায়েদের জন্য আরও কিছু ফিটনেস টিপসঃ

দ্রুত সেরে ওঠার জন্য নতুন মায়ের প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও সেই সাথে প্রসবোত্তর ব্যয়াম। মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটা নতুন মায়ের প্রথমেই বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত।

  • যখন আপনার বাচ্চা ঘুমায় তখন ভালো ভাবে ঘুমিয়ে নিন।
  • ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য বাচ্চাকে সাথে নিয়ে হাঁটতে বের হন বা সকালের সূর্যের আলোতে কিছু সময় থাকুন।
  • সুস্বাস্থ্যের জন্য ভালো এমন ধরণের খাবার খান। প্রচুর পরিমাণে তরল পান করুন।
  • নিয়মিত চেকআপের জন্য হাসপাতালে যান।
  • প্রসব পরবর্তী ব্যায়াম করুন।

ইনশা আল্লাহ পরবর্তী পোস্ট এ প্রসব পরবর্তী ব্যায়াম নিয়ে আলোচনা করা হবে।

 

তথ্যসূত্রঃ

  • নিউযিল্যান্ডের ডানেডিন হাসপাতাল থেকে রোগীদের দেয়া প্রসবোত্তর ব্যয়ামের ওপর প্যাম্ফলেট
  • List of Tummy Flatenning Exercises After Delivery

ছবিঃ

 

এই আর্টিকেল তৈরিতে সার্বিক সহযোগিতা করেছেনঃ

ডঃ ফাতেমা ইয়াসমিন

এফসিপিএস (অবস ও গাইনি)

কনসালটেন্ট(অবস ও গাইনি)

শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল, গাজীপুর।