সিরিজ ইনডেক্স
১. প্রথম পর্ব
২. দ্বিতীয় পর্ব
৩. শেষ পর্ব

প্যারেন্টিং বিষয়ে সচেতন এমন কয়েকজনের কাছে আমরা নিচের প্রশ্নগুলো করেছিলাম:

১. প্রেগন্যান্সি ও ব্রেস্ট ফিডিং, সন্তান পালন নিয়ে পড়া ও জানার ব্যপারে স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছেন কি?(যেমন  আপনি ও আপনার স্বামী একসাথে এই নিয়ে কিছু পড়া, আপনার পড়া উনার সাথে আলোচনা করা, উনি আপনার পড়া থেকে শুনতে আগ্রহ দেখানো, উনি নিজেই কিছু পড়ে জানা) 
২. সময়মতো ডাক্তার দেখানো, শরীর খারাপ লাগাকে গুরুত্ব সহকারে আপনার স্বামী দেখেছেন কি?  
৩. বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং বা তেমন প্রয়োজনে ফর্মুলা যে সিদ্ধান্তই আপনি নিয়েছেন তাতে স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছেন কি? 
৪. ঘরের কাজ, রান্না, বাচ্চার দেখাশোনা করায় স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছেন কি? 
৫. পছন্দের খাবার খাওয়া, মন ভালো রাখতে প্রেগন্যান্সি ও বাবু হওয়ার পর কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়া এসব ব্যপারে স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছেন কি?  
৬. পোস্ট পার্টাম বিষন্নতা নিয়ে আপনি জানতেন কি? এসব ব্যপারে স্বামীর সাথে আলোচনা করা ও উনার সহযোগিতা পেয়েছেন কি? 
৭. প্রেগন্যান্সি, বুকের দুধ খাওয়ানো ও নবজাতকের যত্ন নেয়া এসব বিষয়ে স্বামীর সহযোগিতা, অন্য কথায় দুজন মিলে এই পথটা পাড়ি দেয়া কতটুকু দরকার মনে করেন?  
৮. স্বামীর সহযোগিতা  দাম্পত্য সম্পর্কে ও বাচ্চার সাথে বাবার সম্পর্কে কেমন ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন?

অংশগ্রহণকারীদের উত্তরগুলো কেস স্টাডি আকারে নিচে তুলে ধরছি।

কেস স্টাডি: উম্মে নুসাইবা

প্রেগন্যান্সি, প্যারেন্টিং নিয়ে পড়াশোনায় হাজব্যান্ডের সহযোগিতা পেয়েছি। অনেক কিছু যা আমি পড়তাম, উপকারী টিপস মনে হয়েছে, শেয়ার করেছি, পরে নিজেরা কথা বলেছি।

সময়মত ডাক্তার দেখানোতে হেল্প পেয়েছি। কাজের জন্য সবসময় ফিজিক্যালি সাথে না থাকলেও খোঁজ খবর রেখেছে। 

শুরু থেকেই ডিটারমাইন্ড ছিলাম ব্রেষ্টফিডিং করাবো। হাজব্যান্ডের সমর্থন ছিল। 

ঘরের কাজ, রান্না, বাচ্চার দেখাশোনায় শতভাগ না হলেও যথাসম্ভব সাহায্য করেছে। 

হরমোনাল কারনে প্রেগন্যান্সি, পোষ্টপার্টাম ডিপ্রেশন ছিল। আমার মনে হয়েছে, হাজব্যান্ডরা গোটা ব্যাপারটা ঠিক ভালো বোঝেন না। যদিও আগে থেকে জানতাম, তারপরও অন্তর্মুখী স্বভাবের হওয়াতে ভুগতে হয়েছে। মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য ঠিক যে পরিমাণ সাপোর্ট আশা করতাম, তা পাইনি। তবে আমার মনে হয়েছে, হাজব্যান্ডের সঠিক সাপোর্ট এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যদি আশেপাশে পরিবারের অন্য সদস্য না থেকে থাকে। মন ভালো রাখতে কদাচিৎ বাইরে ঘুরতে যাওয়া, বাইরে খাওয়া, প্রেগন্যান্সিতে এমনকি বাচ্চা হওয়ার পর ঘুরতে যাওয়া এগুলো হয়েছে। 

প্রেগন্যান্সি, ব্রেষ্টফিডিং এগুলো একটা মেয়ের নিজস্ব জার্নি হলেও হাজব্যান্ডের সাপোর্ট অনেক বড় ভূমিকা রাখে, শারীরিক এবং মানসিক দুই ভাবেই। ঘরের কাজে সাহায্য করলে, কষ্টকর সময়গুলোতে মানসিক সাপোর্ট দিলে মায়েদের জন্য অনেক সহজ হয়। প্রতিদিন অন্তত কিছুক্ষণ মাকে কিছু সময় দেয়া, যাতে সে এই সময়টা নিজের মতো করে ব্যয় করতে পারে স্ট্রেস রিলিফের জন্য টনিক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া সময় বের করে প্রতিদিন নিজেদের জন্য ভালো কিছু সময় ব্যয় করা, সম্পর্ক রক্ষার জন্য অনেক জরুরী। সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য দুই পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। প্রেগন্যান্সির শারীরিক কষ্ট মায়ের জন্য হলেও প্যারেন্টিংটা বাবা-মা দুইজন মিলে করতে পারেন। এছাড়া বাচ্চার সুস্থ বিকাশের জন্য বাবার ভূমিকা অপরিহার্য। অনেক বাবারাই বাইরের কাজ করা, অর্থের যোগান দেয়াটাকে পর্যাপ্ত মনে করেন। অথচ ফ্যামিলিকে সময় দেয়া, ঘরের কাজে সাহায় করা, স্ত্রীর সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটানো, বাসায় ফিরে বাচ্চাকে সময় দেয়া এগুলো  হাজব্যান্ডদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এগুলা সুন্নাহ্‌ও।

কেস স্টাডি: উম্ম সু’য়াইবা

প্রেগন্যান্সি ও ব্রেস্টফিডিং, সন্তান পালন নিয়ে পড়া ও জানার ব্যপারে স্বামীর সহযোগিতা সহযোগিতা পেয়েছি । তবে বাচ্চার বাবা আমার সাথে কিছু পড়েননি বা নিজে থেকে কিছু পড়েননি।  খুব আগ্রহ নিয়ে কিছু পাঠালেও দেখলাম যে পড়েন না, হয়ত বাবাদের আবেগগুলো মায়েদের মত হয় না, বা তাদের ব্যস্ততার কারণে এমনটা হয়। এজন্য অনেক অভিমান হলেও ধৈর্য্য ধরেছি, তার অবস্থান থেকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। তবে আমি যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি বা আগ্রহ নিয়ে বলতে গিয়েছি, তিনি শুনেছেন। বই পড়তে ভালবাসি, তাই প্রচুর বই প্রিন্ট করে দিয়েছিলেন যেন পড়তে পারি – লেখালেখির ব্যাপারে অনেক উৎসাহিত করেছেন। 

চাকরি ও পড়াশোনার জন্য দুইজন দুইজায়গায় থাকতাম, তাই একসাথে চেক আপে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ফোনে সবসময় খোঁজ নিয়েছেন, ছুটি পেলে এক রাতের জন্য হলেও আসতে চেষ্টা করতেন। এ নিয়ে কোন অভিযোগ ছিল না আমার।

বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং বা তেমন প্রয়োজনে ফর্মুলা যে সিদ্ধান্তই আমি নিয়েছি তাতে স্বামীর সহযোগিতা  পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ পরিবারের মধ্যে তিনিই একজন ছিলেন যিনি সন্তানের ব্যাপারে আমার নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন, কোনো কৈফিয়ত বা অযুহাত এর কথা মাথায় আনেননি। আর এই রাহমা আর সম্মান দেওয়ার জন্যে আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ, আলহামদুলিল্লাহ – বারাক আল্লাহু ফিহ। 

ঘরের কাজ, রান্না, বাচ্চার দেখাশোনা করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাচ্চার দেখা শোনা করেছেন অত্যন্ত আন্তরিকভাবে। কিন্তু বাকি কাজে সহযোগিতা করতে পারেননি। 

পছন্দের খাবার খাওয়া, মন ভালো রাখতে প্রেগন্যান্সি ও বাবু হওয়ার পর কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়া এসব ব্যপারে স্বামীর সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠে নি। 

পোস্ট পার্টাম বিষন্নতা নিয়ে জানতাম। স্বামী মোরাল সাপোর্টটা দিয়েছেন ,কিন্তু চাকরি আর পড়াশোনার কারণে তিনি একজায়গায় আর বাচ্চা নিয়ে আমি আরেক জায়গায় ছিলাম। যার কারণে তিনি পাশে থাকতে পারেননি।  

প্রেগন্যান্সি, বুকের দুধ খাওয়ানো ও নবজাতকের যত্ন নেয়া এসব বিষয়ে স্বামীর সহযোগিতা, অন্য কথায় দুজন মিলে এই পথটা পাড়ি দেয়া অত্যন্ত জরুরী।  আমরা মায়েরা যেমন সন্তানদের গর্ভে ধারণ করি, বুকের ওমে আগলে রাখি-তেমনি সন্তানের বাবা সন্তান আর তার মাকে সবদিক দিয়ে আগলে রাখবেন- এটাই স্বাভাবিক বলে আমরা ( আমি এবং আমার হাজবেন্ড) বিশ্বাস করি। সবাই যদি সাপোর্ট দেনও-তবুও বাচ্চার বাবার সাপোর্টটা বিশেষভাবে লাগে, বিশেষ করে স্ত্রীর জন্য। আর এই পথ চলা একসাথে হলেই নিজেদের মাঝে বোঝাপড়াটা যেমন সুন্দর হয়, তেমনি বাচ্চার সাথেও বাবার সম্পর্ক দৃঢ় হয়। যতদূর জানি, ইসলামের দৃষ্টিতেও বাবা/ স্বামীর জন্য এ দ্বায়িত্ব পালন করা ওয়াজিব,  কিছুক্ষেত্রে ফরজও। 

স্বামীর সহযোগিতা  দাম্পত্য সম্পর্কে ও বাচ্চার সাথে বাবার সম্পর্কে নি:সন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং  বাস্তবে তা দেখতে পাচ্ছি আলহামদুলিল্লাহ।

কেস স্টাডি: ডাঃ ইশফাক আহমাদ

প্রেগন্যান্সি ও ব্রেস্ট ফিডিং, সন্তান পালন নিয়ে পড়ালেখা কম করেছি কিন্তু আমি সহযোগিতা করেছি।

সময়মতো ডাক্তার দেখানো, শরীর খারাপ লাগাকে ইত্যাদি সময়ে আমি কাছে ছিলাম না। স্ত্রী একাই এসব  করেছে। যখন সম্ভব হয়েছে আমি গুরুত্ব সহকারে করেছি।

বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং বা তেমন প্রয়োজনে ফর্মুলা যে সিদ্ধান্তই স্ত্রী নিয়েছেন তাতে সহযোগিতা করেছি।

রান্নায় সহযোগিতা তেমন করতে পারিনি, তবে বাচ্চার দেখাশোনা করেছি।

পছন্দের খাবার খাওয়া, মন ভালো রাখতে প্রেগন্যান্সি ও বাবু হওয়ার পর কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়া এসব ব্যপারে খুব বেশি সুযোগ হয়ে উঠেনি।

পোস্ট পার্টাম বিষন্নতা নিয়ে খুব বিস্তারিত জানতাম না, তবে সহযোগিতা ছিলো।

প্রেগন্যান্সি, বুকের দুধ খাওয়ানো ও নবজাতকের যত্ন নেয়া এসব বিষয়ে স্বামীর সহযোগিতা, অন্য কথায় দুজন মিলে এই পথটা পাড়ি দেয়া অবশ্যই খুব দরকার মনে করি,  কেননা এই জার্নিটা দুইজনের (বাবা ও মায়ের)। যদি এই জার্নিটা  দুইজন মিলে করার মানসিকতা ও সামর্থ্য না থাকে তাহলে এই পথচলা শুরু করার আগে চিন্তা করা উচিত৷ তবে অনেকের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে,  এক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার মানসিকতা প্রথমেই তৈরি করে নেওয়া উচিত।  

স্বামীর সহযোগিতা  দাম্পত্য সম্পর্কে ও বাচ্চার সাথে বাবার সম্পর্কে নি:সন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।  কেননা এটি একটা বাচ্চার ব্যক্তিত্ব তৈরির ব্যাপারে যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি স্বামী -স্ত্রীর সম্পর্ককেও মজবুত করে।

কেস স্টাডি: শিবলী মেহেদী

প্রেগন্যান্সি ও ব্রেস্ট ফিডিং, সন্তান পালন নিয়ে পড়া ও জানার ব্যপারে আমি সহযোগিতা করেছি।

সময়মতো ডাক্তার দেখানো, শরীর খারাপ লাগাকে ইত্যাদি ব্যাপারে আমি সকল সময়েই সময়মতোই গুরুত্ব সহকারে করেছি।

বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং বা তেমন প্রয়োজনে ফর্মুলা যে সিদ্ধান্তই স্ত্রী নিয়েছেন তাতে সহযোগিতা করেছি।

রান্নায় সহযোগিতা তেমন করতে পারিনি, তবে ঘরের কাজ ও বাচ্চার দেখাশোনায় করেছি।

পছন্দের খাবার খাওয়া, মন ভালো রাখতে প্রেগন্যান্সি ও বাবু হওয়ার পর কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়া এসব ব্যপারে সহযোগিতা করেছি।

পোস্ট পার্টাম বিষন্নতা নিয়ে খুব বিস্তারিত জানতাম না, তবে সহযোগিতা ছিলো।

প্রেগন্যান্সি, বুকের দুধ খাওয়ানো ও নবজাতকের যত্ন নেয়া এসব বিষয়ে স্বামীর সহযোগিতা, অন্য কথায় দুজন মিলে এই পথটা পাড়ি দেয়া অবশ্যই খুব দরকার মনে করি বলেই আমি নিজে থেকেই এই কাজগুলো করেছি। আর তাছাড়া, আমার বিশ্বাস মতে এই কাজের অন্যতম দায়িত্বই বাবার বা হাজবেন্ডের। ফরজ বলেন আর ওয়াজিব বলেন, এই দায়িত্ব প্রধানত বাবার/হাজবেন্ডের।

স্বামীর সহযোগিতা  দাম্পত্য সম্পর্কে ও বাচ্চার সাথে বাবার সম্পর্কে নি:সন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং সেই সুফল বাস্তবে পাচ্ছিও, আল্‌হাম্‌দুলিল্লাহ্‌।

পরের পর্বে আমরা মাতৃত্বে বাবার ভূমিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী বলেন দেখব।

ছবি কৃতজ্ঞতা: Vector Stock