প্রসব পরবর্তী যত্ন post partaum careসাধারনত হবু মায়েরা ডেলিভারী আগে বা ডেলিভারীর সময়কার প্রস্তুতি নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকেন, প্রসবের পরে যে নিজের শরীরের যত্নের প্রয়োজন হয়, সে সম্পর্কে জানতে আর তার প্রস্তুতি নিতে ভুলে যান।স্বাভাবিক প্রসবের পর মায়ের শরীরে অনেক ধরনের পরিবর্তন আসে। স্বাভাবিক প্রসবের (Vaginal Delivery) পর যেসব পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিকঃ

যোনীপথে রক্তপাত (Vaginal Discharge)

সাধারনত ডেলিভারীর পর বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পিরিয়ডের মতো রক্তপাত হয়। প্রথমদিকে এর প্রবাহ বেশী থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে কমে আসে। শুরুতে রক্তপাতের সাথে ছোট রক্তের পিন্ড বের হতে পারে। পরে সেটা চাকাচাকা না হয়ে পানির মতো হয়। এভাবে এই ডিসচার্জ আস্তে আস্তে গোলাপী বা হলদেটে থেকে সাদা বর্ন ধারন করে। সাধারনত এরকম ডিসচার্জ ডেলিভারীর পর ৪০ দিন পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে আরো আগেই বন্ধ হতে পারে। এই ডিসচার্জ চলাকালীন সময়ে কারো যদি খুব বেশী ব্লিডিং বা বেশ বড় রক্তপিন্ড বের হতে থাকে, ডিসচার্জ বাজে গন্ধযুক্ত হয় বা জ্বর থাকে সাথে, অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

যোনীপথের ক্ষত (Vaginal Soreness)

ডেলিভারীর পর প্রজনন অঙ্গগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে বেশ খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিক প্রসবে অনেকের এপিসিওটমি লাগে বা টিয়ার থাকে, যা সারতে বেশ কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। সময়ের সাথে ধীরে ধীরে এই ক্ষতগুলো সেরে উঠার কথা। যদি কোন কারনে ব্যাথা বেড়ে যায় বা ইনফেকশনের সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্রস্রাবের সমস্যা

স্বাভাবিক প্রসবের পর ব্লাডার এবং প্রস্রাবের রাস্তার আশেপাশের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, যেটি সারতে কিছুটা সময় নেবে। এসময় প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, বিশেষ করে পেরিনিয়াম এরিয়ায় কাঁটাছেড়া হলে, সেলাইয়ের জায়গা বেশ জ্বলতে পারে। অনেকের আবার ঘনঘন কিন্তু পরিমানে অল্প প্রস্রাব হয়। ডেলিভারীর পর ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যু পুরোপুরি না সারা পর্যন্ত এই সমস্যা থাকতে পারে। অনেকের আবার কাশি বা হাঁচি দিলে অথবা জোরে হাসলে সামান্য প্রস্রাবের ফোঁটা বের হয়ে আসতে পারে। সাধারনত সময়ের সাথে সাথে এই সমস্যা দূর হয়।

কন্ট্রাকশন (Contraction)

ডেলিভারীর পরও কয়েকদিন জরায়ুর কন্ট্রাকশন চলতে পারে। এটা স্বাভাবিক। অতিরিক্ত রক্তপাত কমাতে এবং জরায়ু তার আগের অবস্থানে ফিরে যেতে এই কন্ট্রাকশন দরকার। এটা অনেকটা পিরিয়ডের সময় অনেকের যেরকম তলপেটে ব্যাথা হয়, সেরকম। এই কন্ট্রাকশন, ডেলিভারীর সময়কার মতো এত তীব্র না হলেও, মা এটা অনুভব করতে পারবেন। ডেলিভারীর পর আস্তে আস্তে এটা কমে আসার কথা। তবে এর সাথে যদি জ্বর থাকে, তলপেটে সহনীয় মাত্রার বেশী ব্যাথা থাকে, চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।

হেমরোয়েড (Hemorrhoids)

নরমাল ডেলিভারীর পরপর মলত্যাগ করবার সময় বেশ ব্যাথা অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে এপিসিওটমি (Episiotomy) হলে আরো বেশি ব্যাথা থাকে। স্বাভাবিক প্রসবের “পুশ” করার স্টেজে, নীচের দিকে প্রচন্ড চাপ পড়ে বলে অনেকের হেমরোয়ড ফর্ম করে। আমাদের দেশে যেটা পাইলস নামে পরিচিত। সামান্য কোষ্ঠকাঠিন্য এই সমস্যাকে অনেকগুন বাড়িয়ে তোলে। হেমোরয়েডে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে রক্তপাত হতে পারে। এছাড়া অনেকের জরায়ুর দেয়াল দূর্বল হয়ে পড়ে। এতে এসময় বাথরুম চেপে রাখা সম্ভব হয় না।

স্তনের ক্ষত ও লিকেজ

গোটা প্রেগন্যান্সিতে স্তনের পরিবর্তন ঘটে। স্তন আকারে বড় হয়, দৃঢ ও ভারী হয়। ডেলিভারীর পর দুধের ফ্লো বাড়লে, অতিরিক্ত দুধের চাপে, স্তনে ব্যাথা হতে পারে। ওভারফ্লোর কারনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুধের কারনে যে ব্যাথা, তাকে এনগোরজমেন্ট (Engorgement) বলে। অনেক সময় দুধ লিক করে (নিজ থেকেই গড়িয়ে পড়ে)। এছাড়া বাচ্চাকে ঠিকমতো দুধ খাওয়ানো শিখাতে সময় লাগে। বারবার বাচ্চাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করানোর ফলে, ঘর্ষনে নিপলে ঘা এর মতো হতে পারে। ব্যাথা থেকে জ্বর আসতে পারে।

মেজাজের উঠানামা (Mood Swing)

প্রেগন্যান্সিতে অনেকেরই খুব মুড সুইং হয়, যেটা সাধারনত হরমোনগত ভারসাম্যহীনতা (Hormonal Imalance) জন্য হয়ে থাকে। ডেলিভারীর পর তা রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যায় না। বরং ডেলিভারীর পর “বেবি ব্লু” সহ নানা রকম পোষ্ট-পার্টাম ডিসওর্ডার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নতুন মায়েদের মন খারাপ থাকা বা ডিপ্রেশন, যা সাধারনত বেবি-ব্লু নামে পরিচিত, দুই এক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে থাকলে, তা পোষ্ট-পার্টাম সাইকোসিসে পরিনত হতে পারে। শরীরের সাথে সাথে নতুন মায়ের মনের যত্ন নেয়া সমান গুরুত্বপূর্ন। কারন মন ভালো না থাকলে, মায়ের পক্ষে বাচ্চার দেখাশুনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ওজন কমা

ডেলিভারীর পরপরই মায়ের শরীরের একটা নির্দিষ্ট ওজন, যা বাচ্চা ও ইউটেরাসের ফ্লুইডের থাকে, তা কমে যায়। এছাড়া বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে থাকলে মাসখানেকের মধ্যে আরো বেশ কিছু ওজন কমে আসে। যদিও পেটের বাড়তি ফ্যাটের কারনে ডেলিভারীর মাসখানেক পরও মা’কে দেখতে গর্ভবতী মনে হতে পারে। তবে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে এই সময় কঠোর ডায়েট না করাই ভালো।

চুল ও ত্বকের পরিবর্তন

প্রেগন্যান্সিতে সাচরাচর চুল পড়া কমে যায়, অনেকের স্কিন বেশ ভালো হয়ে যায়। কিন্তু ডেলিভারীর পরপর শুরু হয় চুল পড়া। পরবর্তী বেশ কয়েক মাস এই চুলপড়া চলতে থাকে। এছাড়া অনেকের প্রেগন্যান্সীর সময়কার স্ট্রেচমার্ক, ডেলীভারীর পর প্রকট ভাবে দৃশ্যমান হয়। পেটে, উরুতে, স্তনে স্ট্রেচমার্ক বেশ পরিস্কার বোঝা যায়। স্ট্রেচমার্ক না থাকলেও, ডেলিভারীর পর পেটের চামড়ায় ঝোলাভাব চলে আসে। তবে কিছুকিছু দাগ, যেমন তলপেটে, নাভীর নিচের দাগ, যা প্রেগন্যান্সিতে প্রকট ছিলো, আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। স্ট্রেচমার্ক থাকলে তার কালো বা লালভাব চলে যেয়ে ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যায়।

প্রসব পরবর্তী যত্নে যা যা সাথে রাখবেনঃ

সম্ভব হলে ডেলিভারীর আগেই প্রসব-পরবর্তী যত্ন সম্পর্কে জানুন এবং প্রস্তুতি নিন। পোষ্ট-পার্টাম কিট-এ যা যা রাখবেনঃ

  • ভারী ব্লিডিং এর জন্য ভারী, ম্যাক্সি স্যানিটারী প্যাড (উইং সহ)।
  • এপিসিওটমি বা হেমরয়েডের ব্যাথা এড়াতে মেডিকেটেড প্যাড।
  • প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া এড়াতে পেরি-বোটল (ছোট প্লাস্টিকের বোতল, যা ভ্যাজাইনাল এরিয়াতে পানি ব্যবহারের জন্য ব্যবহার করা হয়)।
  • বাথরুমের প্যানের উপর ব্যবহার করার মতো সিটজ বাথ, ভ্যাজাইনাল ও হেমোরয়েডের ব্যাথার জন্য বেশ কার্যকর।
  • স্টুল সফেনার, যা স্টুল নরম রাখার জন্য বেশ কার্যকর।
  • নার্সিং ব্রা ও নার্সিং প্যাড, মিল্ক ওভারফ্লো হলে লিকেজ এড়ানোর জন্য।
  • নিপল ক্রিম (লেনোলিন), যেকোন ধরনের নিপল ক্রাক হলে এর ব্যবহার বেশ উপকারী।
  • হুইচ হ্যাজেল ও এলোভেরা জেল, এগুলো সাধারনত এন্টিব্যাক্টেরিয়াল ও ব্যাথা প্রশমক হিসেবে প্যাডের উপর ব্যবহার করা যায়।

নতুন মায়ের জন্য টিপস

  • এপিসিওটমি হলে বা হেমরোয়েডের সমস্যা বেশী হলে, বসতে অসুবিধা হয়। নরম বালিশের উপর বসতে পারেন।
  • প্রস্রাবের সময় ছোট প্লাস্টিকের বোতলে (পেরি বোটল)হালকা গরম পানি ব্যবহার করুন। আরাম পাবেন।
  • এপিসিওটমি থাকলে, পরিস্কার পাতলা কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরুন মলত্যাগের সময়। এতে অনেক বেশী ব্যাথা এড়ানো সম্ভব।
  • ক্ষতস্থানের জ্বালাপোড়া এড়াতে বরফ ব্যবহার করতে পারেন। ফ্রিজে আইস ট্রেতে বরফ রাখুন সবসময়।
  • স্যানিটারি প্যাডে হুইচ হ্যাজল ও এলোভেরা জেল স্প্রে করে, সারারত ফ্রিজে রেখে দিয়ে, নিজেই পোষ্টপার্টাম পপসিকল প্যাড বানাতে পারেন। ব্যাথায় এটি বেশ ভালো কাজে দেয়।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে স্টুল সফেনার খেতে পারেন। এটি মল নরম রাখে, যা হেমোরয়েডে ক্ষত সৃষ্টি থেকে দূরে রাখে।
  • কনট্রাকশনের সাথে জ্বর থাকলে ও তলপেটে নরম অনুভূত হলে, সেটি ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষন হতে পারে। এরূপ হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  • পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ করুন নিয়মিত। এটি জরায়ুর দেয়াল মজবুত করে, পেলভিক মাসল শক্ত করে। এটা অনেকটা প্রস্রাবের বেগ চেপে রাখার মতো। প্রথম পাঁচ সেকেন্ড করে শুরু করুন। আস্তে আস্তে সময় বাড়ান। দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে- যেকোন অবস্থানে থেকে এটি করা সম্ভব।
  • হেমোরয়েডের সমস্যার জন্য সিটজ বাথ নিন দিনে কয়েকবার। হালকা গরম পানি ব্যবহার করতে পারেন। মল নরম রাখার চেষ্টা করুন। প্রচুর পানি খান। ফাইবার যুক্ত খাবার খান। সবজি-ফলমূল ডায়েটে রাখুন নিয়মিত। ইসবগুলের ভুষি খেতে পারেন প্রতিদিন। প্রয়োজনে মল নরমকারক ঔষুধ খান।
  • ডেলিভারীর পর ব্রেস্টের ইনগোরজমেন্ট এড়াতে বাচ্চাকে বারবার দুধ খেতে দিন। প্রয়োজনে ব্রেস্ট পাম্প ব্যবহার করুন। প্রতিবার খাওয়ানোর আগে স্তনে ম্যাসাজ করুন, উপর থেকে নীচে। এক টুকরো কাপড় সহনীয় মাত্রায় গরম করে স্তনের উপর সেঁক দিন। ঠান্ডা বরফের প্যাক ব্যবহার করতে পারেন।
  • দুধের লিকেজ এড়াতে ব্রেস্ট প্যাড ব্যবহার করতে পারেন।
  • চুল পড়া বা স্কিনের সমস্যা এড়াতে ভালোমতো খাওয়া দাওয়া করুন। ব্রেস্টফিড করাকালীন সময়ে পোষ্ট-ন্যাটাল মাল্টিভিটামিন খেতে পারেন, এতে সমস্ত প্রয়োজনীয় মাল্টিভিটামিন থাকেন।
  • প্রসব পরবর্তী মুড সুইং নিয়ে পড়াশুনা করুন। হাজব্যান্ড বা কাছের বন্ধুর কাছে ভালো লাগা- খারাপ লাগা শেয়ার করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।
  • ওজন হঠাত করে কমাবার চেষ্টা করবেন না। সাধারনত ডেলিভারীর ৬ সপ্তাহ পর থেকে ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ শুরু করতে পারবেন। বাচ্চাকে ব্রেস্টফিড করালে পুষ্টিকর খাদ্যাভাস বজায় রাখুন।

সাধারনত ডেলিভারীর ছয় সপ্তাহ পর ডাক্তারের চেক আপ থাকে, যেখানে ডাক্তার জরায়ু, ভ্যাজাইনা, সারভিক্স সহ সমস্ত কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন। ব্লাডপ্রেসার, জ্যাস্টেশনাল ডায়াবেটিস এগুলোরও ফলো-আপ হয়। ডাক্তার ব্রেস্ট পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। ঠিক কখন থেকে শারীরিক সম্পর্ক শুরু করতে পারবেন, কি ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রন ব্যবহার করবেন এগুলো নিয়ে দিকনির্দেশনা দেন। এর পাশাপাশি বেবি ব্লু’র মতো মুড সুইং জনিত সমস্যা তখনো থেকে থাকলে, ডাক্তারের সাথে কথা বলুন, প্রয়োজনে কাউন্সিলিং করান।