বাচ্চার জন্ম কোথায় হয়েছে সেটার উপর ডিপেন্ড করে কখন নাড়ি কাটা (cord clamping &cutting) হবে। বাড়িতে বা গাড়ীতে জন্মানো বাচ্চার নাড়ি মা-বাবা মিলে ঠিক করতে পারেন কখন কাটবে। ( আমাদের দেশে হোমবার্থ এখনও সেইফ না, তাই হসপিটালই ভরসা।)
সাধারণত গর্ভফুল (Placenta) বের হওয়ার পর পনের মিনিটের মধ্যে স্পন্দন (pulsation) থেমে যায়। স্পন্দন পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পরই নাড়ি কাটা উচিত।
কিন্তু হসপিটালের হওয়া বাচ্চা জন্মের সাথে সাথে, এমনকি গর্ভফুল বের হওয়ার আগেই নাড়ি কেটে দেয়া হয়। এটা অনেকটা তাদের রুটিন প্রটোকলের মত।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে (WHO, 2014), কমপক্ষে ১-৩ মিনিট অপেক্ষা করে এরপর নবজাতকের (সিজারিয়ানের ক্ষেত্রেও) নাড়ি কাটা মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।
জুডি মার্সার (Judy Mercer), একজন ইউএস নার্স-মিডওয়াইফ এবং প্রফেসর। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি এই বিষয়ের উপর গবেষণা করেছেন। ২০০৬ সালে তাড়াতাড়ির বিপক্ষে দেরিতে নাড়ি কাটার তার এই গবেষণা আন্তর্জাতিক এটেনশন পায়। যেটাতে তিনি দেখিয়েছেন বত্রিশ সপ্তাহের আগে জন্ম নেয়া বাচ্চাদের দেরিতে নাড়ি কাটা হলে ব্রেইনে রক্তক্ষরণ ও ইনফেকশনের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রার কম হয় । পরে ইউএস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাকে ফুল-টার্ম ও সিজারিয়ান বেবিদের নিয়ে আরও বড় স্কেলে দেরিতে নাড়ি কাটা নিয়ে গবেষণা করতে দুই মিলিয়ন ডলারের পুরষ্কার দেয়।
জন্মের পর সাথে সাথে নাড়ি কাটা হলে বাচ্চার শরীরের এক-তৃতীয়াংশ রক্ত গর্ভফুলেই রয়ে যায়। ভাবা যায়! ফলে বাচ্চার জন্মের পর প্রায় ৬ মাস অবধি
রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে যা সরাসরি গ্রোথ কমিয়ে দেয়। সাথে বাচ্চার নিজের প্রচুর স্টেম (stem cell) সেল এবং অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তও রয়ে যায় গর্ভফুলে। ফলে পরবর্তীতে শ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে দেরিতে নাড়ি কাটা হলে ২০-৫০% বেশি রক্ত গর্ভফুল থেকে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। বিশেষ করে দেরিতে কর্ড কাটার সুফল প্রিম্যাচিউর বাচ্চাদের জন্য একটা ব্লেসিং।
হসপিটালে কেন দ্রুত নাড়ি কাটে?
কারণ যতদ্রুত সম্ভব ডেলিভারি পরবর্তী রুটিন কাজগুলো সেরে আপনাকে বিদায় দিতে পারলে তারা পরের পেশেন্টকে নিয়ে কাজ শুরু করতে পারবে। এটা একটা বিজনেস। রুটিন কাজগুলো হল ডেলিভারি হওয়ার সাথে সাথে বাচ্চাকে ক্লিন করা, হার্টবিটসহ অন্যান্য রুটিন চেকআপ, গোসল করানো ইত্যাদি।
কতটা জরুরি?
মোটেও না। জন্মের সাথে সাথে সর্বপ্রথম জরুরি কাজ হল বাবুকে আপনার খালি বুকে দেয়া। একটা পাতলা কাপড়ে জড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। এরপর উপরে একটা গরম কম্বল বা মোটা কাপড়ে ঢেকে দেয়া। খানিকটা ফ্লুইড বা রক্ত লেগে থাকলে আপনি কি বাবুকে বুকে নিতে সংকোচবোধ করবেন? ময়লা লেগে গেলে পরে না হয় একটা গোসল দিয়ে নিলেন। কিন্তু রুটিন কিছু কাজের জন্য হসপিটালের ঠান্ডা ট্রেতে শুয়ে থাকার চেয়ে ওই সময়ে মায়ের বুকের ওম বাবুর জন্য খুব বেশি জরুরি । এতে দুনিয়ায় বাবুর প্রথম ব্রিদিংটা সহজ হয়, তাপমাত্রার সাথে মানিয়ে নেয়া সহজ হয়, ব্রেস্টফিডিংটা জরুরি, মায়ের সাথে বন্ডিং মজবুত হয়, মায়ের গর্ভফুল সহজে বেরিয়ে আসে, রক্তপাত কম হয় এবং আরও অনেক অনেক উপকার হয় । গর্ভফুল বেরিয়ে আসার পনের মিনিট পর নাড়ি কেটে এরপর বাবুকে রুটিন চেকআপে নিয়ে যাক। নতুন দুনিয়ায় ধাতস্থ হতে এই সামান্য সময়টুকু বাবুর জন্য খুব দরকার।
দেরিতে নাড়ি কাটলে বাবুর ক্ষতি হবে না তো?
একদম না। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে এবং নানান ট্রাইবদের মধ্যে আদিকাল থেকে লোটাস বার্থ (Lotus Birth) বলে একটা প্রাকটিস আছে। তারা কখনোই নাড়ি কাটে না। গর্ভফুলসহ রেখে দেয়। শুকিয়ে সপ্তাহখানেকের মধ্যে নাভি থেকে পড়ে যায়। আপনাকে লোটাস বার্থ করতে হবে এটা বলছি না । এজন্য বললাম যে দেরি করে কাটলে কোন সমস্যা তো নাই ই বরং বাবুর জন্য এটার অনেক বেশি উপকারিতা আছে।
মা হিসেবে আপনি কী করতে পারেন?

ছবির দিকে লক্ষ্য করুন। বামপাশের টুইনটি সাদাটে, বোঝা যাচ্ছে শরীরে রক্ত কম। ডানপাশেজন কি সুন্দর লালচে, পর্যাপ্ত রক্ত আছে শরীরে। টুইন প্রেগন্যান্সির লেবারে প্রথমে জন্ম নেয়া বাচ্চার নাড়ি কেটে দেয়া লাগে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার উপায় নাই। সাদাটে বাচ্চাটি হল প্রথমে জন্ম নেয়া। কিন্তু লালচে বাচ্চাটি গর্ভফুল থেকে তখনও রক্ত পেয়েছে। সময়ের ব্যবধান হয়তো খুবই সামান্য কিন্তু পার্থক্যটা লক্ষনীয়।
প্রিয় মা, সন্তান আপনার। আপনাকেই ভয়েস রেইজ করতে হবে। নিজের সন্তানের ভালোর জন্য আপনাকে শক্তভাবে আপনার সিদ্ধান্ত জানাতে হবে ডাক্তারকে। হসপিটালগুলো এখনও দেরি করে নাড়ি কাটায় অভ্যস্ত না। এজন্য আপনিই ঠিক করে দিবেন কয়মিনিট পর আপনি চান নাড়িটা কাটা হোক। পনের মিনিট হয়তো রাখতে পারবেন না, কিন্তু ৫-১০ মিনিট তো রাখাই যায়। বার্থপ্ল্যানে আপনি এ বিষয়ে (Delayed cord clamping) লিখতে পারেন। কীভাবে বার্থপ্ল্যান লিখতে হয় তা জানতে প্রিনাটাল কোর্সটা করে নিতে পারেন।
নাসরিন সুলতানা
চাইল্ডবার্থ এডুকেটর এন্ড দৌলা (Amani Birth)
মাতৃত্ব
