মায়েরা গর্ভাবস্থায় প্রায়ই শুনে “মা দু’জনের জন্য খাচ্ছেন।” কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি শুধু খাবারের পরিমাণের বা বাহ্যিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত ঐচ্ছিক কোন বিষয় নয়; বরং এটি এক ধরনের জৈবিক যোগাযোগ (Biological Communication)।
গর্ভের শিশুটি সরাসরি খেতে পারে না বা বলতে পারেনা যে সে খাবার খেতে চায়, কিন্তু সে তার মায়ের শরীরকে বিশেষ সংকেত পাঠিয়ে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে।
এই লেখায় আমরা জানবো—
- কীভাবে এই সিগনালিং প্রক্রিয়া কাজ করে
- সাম্প্রতিক গবেষণায় কী নতুন জানা গেছে এবং
- এর বাস্তব গুরুত্ব কী।
বিষয়সূচী
প্লাসেন্টা: একটি “স্মার্ট অর্গান”

গর্ভের শিশুর সাথে মায়ের সংযোগ স্থাপন করে Placenta। আগে এটিকে শুধু পুষ্টি আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে ভাবা হতো। কিন্তু এখন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে—
- প্লাসেন্টা একটি dynamic endocrine organ
- এটি হরমোন তৈরি করে
- মায়ের metabolism (শর্করা, চর্বি ব্যবহার) নিয়ন্ত্রণ করে
অর্থাৎ, প্লাসেন্টা শুধু খাবার পৌঁছে দেয় না—বরং মায়ের শরীরে একধরনের সমন্বয় করার চেষ্টা করে যাতে শিশুটি তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।
এখন আমরা জানব কিভাবে গর্ভের শিশু মা’কে তার পুষ্টির প্রয়োজনীয়তার সংকেত পাঠায়_
“Greedy gene” — শিশুর পক্ষ থেকে সংকেত
গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনের কথা বলা হয়: IGF2 জিন। রিসার্চাররা আবিষ্কার করেছে যে গর্ভে থাকা শিশু বাবার থেকে পাওয়া গ্রিডি জিন ব্যবহার করে মায়ের মেটাবলিজম কে কিছু মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করে এবং বেশি খাবার সাপ্লাই দেয়ার ডিমান্ড করে। গর্ভাবস্থায় মায়ের খাবারের অতিরিক্ত ক্ষুধা অনেক ক্ষেত্রে এই গ্রিডি জিন ব্যবহার করে পাঠানো সিগনালের ফল।
এই জিনটি:
- সাধারণত বাবার দিক থেকে আসে (paternal gene)
- প্লাসেন্টাকে নির্দেশ দেয় বেশি হরমোন ছাড়তে
- ফলে মায়ের রক্তে গ্লূকোজ ও ফ্যাট বাড়ে
এর ফলে শিশুটি বেশি energy পায় এবং দ্রুত বেড়ে ওঠে।
জিনের টানাপোড়েন: মা বনাম শিশু?
এখানে মায়ের জিন এবং বাবার জিনের মধ্যে একটা জৈবিক টানাপোড়েন চলে। বাবার জীন চায় শিশুর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আর মায়ের জিন চায় এই বৃদ্ধিকে একটি নির্দিষ্ট সীমার রাখতে যাতে মায়ের নিজের স্বাস্থ ভালো থাকে এবং ভবিষ্যতেও সন্তান ধারণ সহজভাবে করতে পারে। এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয় Genomic Imprinting ধারণার মাধ্যমে।
সহজভাবে:
- পিতৃসূত্রের জিন (father genes) → শিশুর growth সর্বোচ্চ করতে চায়
- মাতৃসূত্রের জিন (mother genes) → মায়ের শরীরের সুরক্ষা ও balance বজায় রাখতে চায়
এই “tug of war” বা টানাপোড়েনের মধ্যে ভারসাম্যই একটি সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য জরুরি।
গবেষণার বিস্তারিত
মায়ের গর্ভ থেকেই বাচ্চা যে অতিরিক্ত খাবারের জন্য সিগনাল দেয় তা 11 July 2023 সালে Elsevier এর প্রকাশিত Cell Metabolism নামের একটি প্রকাশনায় এসেছে “Fetal manipulation of maternal metabolism is a critical function of the imprinted Igf2 gene” এই নামে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সাম্প্রতিক আবিষ্কার এবং এটি এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রাসঙ্গিক ও আলোচনায় আছে।
- এই ধারণায় (baby → placenta → mother signaling) আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
- বিশেষ করে Genomic Imprinting নিয়ে গবেষণা বাড়ছে।
- IGF2 ছাড়াও আরও কিছু imprinted gene নিয়ে কাজ চলছে।
মানে, এটা কোনো পুরনো বা বাতিল থিওরি নয়—বরং এখনো active research area। এখানে_
১. একাধিক জিন একসাথে কাজ করে
আগে শুধু IGF2-কে গুরুত্ব দেওয়া হতো। এখন জানা যাচ্ছে—
- এটি একটি gene network
- বিভিন্ন জিন মিলে nutrient transport ও hormone control করে
২. প্লাসেন্টা মায়ের শরীরকে “reprogram” করে
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে:
- insulin sensitivity পরিবর্তন করে
- fat storage বাড়ায় বা কমায়
- blood glucose level নিয়ন্ত্রণ করে
৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সাথে সম্পর্ক
Gestational Diabetes এর ক্ষেত্রে:
- অতিরিক্ত signal → মায়ের রক্তে sugar বেড়ে যায়
- শিশুর growth বেশি হয়ে যেতে পারে
তাই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শুধু খাবারের কারণে নয়, বরং hormonal ও genetic কারণেও হতে পারে।
৪. ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব
এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় Fetal Programming
গর্ভে থাকা অবস্থার এই পুষ্টির সমন্বয় ভবিষ্যতে শিশুর মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে শিশুর ওবেসিটি, ডায়বেটিস হতে পারে কিনা, মেটাবোলিজম প্যাটার্ন কেমন হবে অনেক কিছুই নির্ভর করে।
বাস্তব জীবনে এর গুরুত্ব
মায়েদের জন্য
- বেশি খাওয়া মানেই ভালো না
- সুষম খাদ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
- নিয়মিত চেকআপ জরুরি
শিশুর জন্য
- সঠিক সুষম খাদ্য → সুস্থ বৃদ্ধি
- ভারসাম্যহীন হলে বৃদ্ধিতে সমস্যা হতে পারে
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য
- প্লাসেন্টাকে “সক্রিয় অঙ্গ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা জরুরি
- শুধুমাত্র খাবার না, হরমোনের প্রভাব-ও বোঝানো দরকার
- গর্ভকালীন শিক্ষায় এই বিষয়টি যুক্ত করা যেতে পারে
গর্ভাবস্থা একটি জটিল কিন্তু চমৎকার সমন্বয়। শিশু ও মায়ের শরীর একসাথে কাজ করে একটি নতুন জীবনের বিকাশ ঘটায়। এবং শিশু সম্পূর্ণভাবে মায়ের শরীরে বেড়ে উঠলেও বাবার জিন বড় ভূমিকা পালন করে। ঠিক এই কারণে বাবাদের সুষম খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা অত্যন্ত জরুরী। শিশু মায়ের গর্ভ থেকেই তার প্রয়োজন জানিয়ে সংকেত দেয়। কিন্তু সেই সংকেতকে সঠিকভাবে support করার দায়িত্ব মায়ের।
“Healthy mother = Healthy baby” — এই ভারসাম্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
